(১০৭)


কি বলি বলুন তো? এমনিতে আমি বিশেষ ধম্ম কম্মের ধার দিয়ে যাই না… মানে আমি মনে করি যে ধর্ম ভীষণ ব্যক্তিগত বিষয়, কারুর কোথাও নাক গলাবার অধিকার নেই। কিন্তু কোন কিছুরই কি অতি ভালো? অগতির গতি অনাথের নাথ সবি তো থিক কিন্তু যদি প্রতি পদক্ষেপে মন্দির আর সেই মন্দিরের বন্দনার গল্প তৈরী হয় তাহলে কি আর কাজ করা সম্ভব হয়? এই যে আমি তামিলনাড়ুর ভিল্লুপুরমে এসে গ্রামীণ উন্নয়ন বিষয়ক একটি রিপোর্ট তৈরী করছি আরও বেশ কিছু সমপদভুক্ত অধিকারীর সঙ্গে সেখানে ভগবানের উপস্থিতি মাঝে সাঁঝে হলে মন্দ না। তবে বেশী খেলে বিরিয়ানী কেন ডালভাতও পেটে সয় না। ভগবান তো মনের জিনিস মনজিনিস।

তা কি হয় কাকা? নাইতে নেমে চুল ভেজাব না, নাচতে নেমে বাঁকা উঠোন এসব বললে ভবি ভোলে নাকি? এসেছ মন্দিরের রাজ্য তামিলনাড়ুতে, যেখানে প্রতিটি গ্রামে একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়য়, একটা অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র, একটা জনবন্টন ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গে একটা করে মন্দির উপস্থিত। তার তার মধ্যে তো কিছু কিছু জায়গায় ঢুকতেই হবে, না হলে ঘাড় শক্ত হয়ে যায়।
ভিন্ন ভিন্ন ব্যাকগ্রাউণ্ডের ব্যক্তিদের দলনেতার কাছে দাবী অনেক। সমতা ক্ষমতা এবং মমতা দুমদাম করে জায়গা বদল করে নেয় আর তখন হাতে পড়ে থাকে পেনসিল।

তবু দু একটা জায়গার কথা তো বলতেই হয়। এই যেমন কালকেই গেছিলাম চিদাম্বরমে। মানে আমাদের বিগত অর্থমন্ত্রীর দেশ আর কি! চিদাম্বরমের নটরাজ মন্দিরের অবশ্য ব্যাপারই আলাদা। কথিত আছে যে, এই নটরাজ মন্দির থেকেই ভারতনাট্যমের যাত্রা শুরু। মন্দিরের গোপুরমের চৌকাঠ পেরবার সঙ্গে সঙ্গেই যেন সম্পূর্ণ গল্প বদলে গেল।

তখন সন্ধ্যা হব হব করেছে কি হয় নি! সিন্দূরই আকাশের ছোঁয়া বেয়ে যখন চিদাম্বরম শহরটাতে প্রবেশ করছি তখন সারাদিনের পরিশ্রমের শেষে, তখন শরীর বেয়ে ক্লান্তির ধারা। আশা আকাঙ্ক্ষার বিন্দুমাত্র বাকি ছিল না, পথচলতি মন্দিরে মন্দিরে হতাশার বোঝা বয়ে বেড়ানো ছাড়া তো কিছুই পাই নি।

গোপুরমটি বেশ সুন্দর এবং সমস্ত দক্ষিণই মন্দিরের মতই দশাসই। কিন্তু চমকটা ছিল দু কদম দূরেই। মন্দিরে প্রবেশের দরজায় যথারীতি বিধিবদ্ধসতর্কীকরণ, ক্যামেরা এবং মোবাইল প্রয়োগ নিষিদ্ধ। কিন্তু অন্যান্য অসহিষ্ণুদের মতো বিদেহসীদের প্রতি কোন নিষিদ্ধিবার্তা নেই। আশ্চর্য! এমনিতে দক্ষিণভারতীয় মন্দিরগুলিতে বিদ্বেষভাবের জন্য আমার অসূয়ার অন্ত থাকে না। প্রত্যেক মন্দিরেই সাধারণ দর্শনার্থী, বিশেষ দর্শনার্থী এবং বিশেষ বিশেষ দর্শনার্থীদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থা। আরে ভগবানের কাছে ভক্তের আবার শ্রেণীবিভাগ হয় না কি রে পাগলা? তাও আবার অর্থের বিনিময়ে কিনে নেওয়া ভক্তের ভালবাসা! তার উপর বিদেশী দেখলেই নিষেধাজ্ঞা- যেন বিদেশীদের মধ্যে হিন্দু আর স্বদেশীদের মধ্যে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হয় না।

যাই হোক নটরাজে ফিরে আসি। আরও দু কদম এবার মন্দিরের দরজা দিয়ে ঢুকতেই যেন এক ধাক্কায় সময়টা পিছিয়ে গেল একেবারে দুশো তিনশো বছর। সন্ধ্যার আলোটাতেও কেমন যেন নস্টালজিয়ার ছোঁয়া। মন্দিরের গায়ে গায়ে কষ্ঠিপাথরের কারুকার্য আর ভরতনাট্যমের মুদ্রা। আহা ঘণ্টার আওয়াজ তো নয় যেন যুগের ঘড়ি ঢং ঢং করে সময়কে বুকের মধ্যে আগলে রেখে দিয়েছে।

এদিক ওদিক বিষ্ণু পার্বতীর মন্দির ছুঁয়ে সবার অলক্ষে ঢুকে গেলাম গর্ভগৃহে। নাহ হে নটরাজ আমি সত্যিই হেরে গেলাম! মন সরিয়ে ঢুকে রাখতে গিয়েও কেমন যেন রোমাঞ্চ অনুভব করলাম। এই কি সেই গদাধরের বক দর্শন?

চুপচাপ আরতির সময় হেঁটে হেঁটে বেরিয়ে এলাম বাম দিকের পুষ্করিণীর পাড়ে। দূরে আকাশে নীল কমলা মেঘ সূর্যের মাখামাখির মধ্যে দিয়ে চারদিকের চারটে গোপুরম মাথা উঁচু করে রয়েছে আর দিঘির শ্যাওলা ধরা জলে তার টলমলে ছায়া। আবীর লেপে দিয়েছেন তিনি আকাশ ভরে। পুকুরের ওপারে বোধহয় শ্যুটিং চলছে। প্রদীপ আর পদ্ম ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাঁ দিকের মন্দিরের গা বেয়ে ভেসে আসছে ঘণ্টার শব্দ আর আরতির গন্ধ। কেউ কোত্থাও নেই। মোবাইলও অবস্থা অনুধাবন করে বাসের খোপে আশ্রয় নিয়েছে। অতীত বর্তমান আর অনাদৃত ভবিষ্যৎ মিলে মিশে একাকার হয়ে বসে আছে। বসে আছি আমিও অনন্তের অপেক্ষায়।

আরও একটু পিছিয়ে যাই, আরও একটা দিন। অনেক কসরত করে তবেই অরোভিলের মাতৃমন্দিরে ঢুকতে পারলাম। শব্দহীন বর্ণহীন আড়ম্বরহীন প্রবেশ। ভক্তের বেশ ছেড়ে মানব বেশে প্রবেশ। প্রার্থনা গৃহে স্ফটিক গোলকের মধ্যে দিয়ে আমার ফেলে আসা দিনগুলি ফিরে ফিরে আসছে। নিচের তলার কলকল শান্ত জলের মধ্যে দিয়ে বিলীন হচ্ছে মহাশূন্যে।

হারিয়েছি যত তা সত্যিই কি হারিয়ে গেছে? সামান্য মোবাইল থেকে শুরু করে, চটি ছাতা ওয়াটার বোতল এমন কি মানুষও। ছেলেবেলার যারা সব ছিল তারা কি আর কোথাও নেই! নাকি সময়ের অন্তরালে তারা আমার আশেপাশেই অবস্থান করছে। অরোভিলের কেন্দ্রের বিশাল বটগাছের বিশালত্বের মধ্যেও অনুভূতি হয়, মানব সম্ভাবনার কথা। ভিতর পানে একটু ঝাঁপাও দেখি মন! ডুবে দে ডুবে দ্যাখ দিকি। কি সৌন্দর্য্য ছড়িয়ে রয়েছে সেখানে।
আমার রুমমেট ঝাজী আমায় বললেন সকলের মধ্যেই তিনি বাস করেন। তাকে খুঁজে পেতে নিজের নিজের পথ ধরতে হয়, তার জন্য ভিতরে তাকালেই চলে, খুড়োর কলের দরকার পরে না।

মনে পড়ে গেল সেই ছিয়ানব্বইতে প্রথমবার অরোভিলে আসার সময় আমার ভাইটাও সঙ্গে ছিল। এখনো আছে বোধহয় আনাচে কানাচে! চোখের জল যে মিথ্যা বলে না…!

(১০৬)


শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সেই অমোঘ পঙক্তিটি মনে পড়ে যায়- ‘ধর্মেও নয় জিরাফেও নয়’। মাথা উঁচু করে চলতে চলতে হঠাৎ আবিষ্কার করি যে অর্ধেক লেফটে এবং অর্ধেক রাইটে চলে গেছে আর বাকিরা আমার পিছনে। ফিসফাসের পাঠক পাঠিকারা ভাবতেই পারেন যে হঠাৎ কাব্যি করার চেষ্টা করছি কেন? আসলে গভীরতা মাপার ফিতে দিয়ে তো মন মাপা যায় না। তাই বলদ শ্রেণীর প্রাণী হয়েও সেখানেই খেয়ে দেয়ে শিবের গাজন গাওয়া সবার ধাতে নেই। সহ্যও যে হয় তা আর বলছি না।

কর্মক্ষেত্রে যখন ল্যাদ আসতে আরম্ভ করে তখনই বুঝতে হবে যে সঠিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন আছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা ল্যাদ ভুলে গিয়ে উদ্যমী কর্মশক্তিতে পরিণত হয় বলেই তাবড় তাবড় প্রবন্ধন গুরুর বক্তব্য। সেই অনুসারে আমাদেরও পাঠানো হয় সিঁড়ি ভাঙা অঙ্কের হিসাব মেলাতে প্রশিক্ষণ শিবিরে।

লিডারশিপ কারে কয়? নেতা টাইপের ব্যক্তিত্বরা যখন হুম হাম সহযোগে দলীয় ভাবনাকেই মদীয় ভাবনা মেনে নেন এবং তা সমাপন করতে যারপরনায় উদ্যোগী হয়ে ওঠেন তখনই নেতৃত্বের পূর্ণতা। তা প্রশিক্ষণ শিবিরে নেতৃত্ব বা লিডারশিপের উপরেও পরিমিত জ্ঞান প্রদান করা হয়।

এমনিতেই সরকারি সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাঝারি স্তরের অধিকারীদের কর্ম সম্পর্কিত বহু অভাব অভিযোগ থাকে। তার উপরে যদি তার পরিশ্রম করার ক্ষমতা এবং কর্মের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে আধিকারিক কার্মিক প্রশিক্ষণ সংস্থার প্রধান প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে হ্যাঁচড় প্যাঁচড় করে জ্ঞান বিতরণ করতে থাকেন এবং মঞ্চে আসীন প্রশিক্ষকরা বিব্রত এবং ঘুমন্ত হয়ে পড়েন, তাহলে সত্যকারের নেতার কি কাজ? বুক চিতিয়ে শব্দভেদী বান বুকে নেওয়া? মঞ্চে আসীন প্রশিক্ষকদের পদানুসরণ করে মন্ত্রের সাধন এবং অবশেষে দিবানিদ্রা গমন করা? নাকি চলন্ত ট্রেনকে দুম করে চেন টেনে হ্যাঁচকা মেরে থামিয়ে দেওয়া? সুনেতার কর্তব্য হল শেষটি।

আরে বিশেষ কিছু নয় লিডারশীপ ক্যাম্প শেষ হবার পর আই এস টি এমের মুখ্য আধিকারিক এসে ‘তোমরা দেশের ভবিষ্যৎ’ ‘তোমাদের হ্যানা করা উচিত তেনা করা উচিত’ বলে হরির লুটের মত জ্ঞান বিতরণ করছিলেন। কেউ কিস্যু করতে পারছেন না। মঞ্চে বসে থাকা প্রশিক্ষকরা সারা দিনের পরিশ্রমের শেষে যা তা রকমের ক্লান্ত। কোর্স ডাইরেক্টর বিব্রত এই সময় উপায় না দেখে যদি ‘ধন্যবাদ মহাশয়, আপনার উদ্দীপক বক্তৃতার জন্য। আমাদের কর্ম জীবনে এমন বক্তৃতাই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে’ বলে যদি দুম করে ব্রেক মেরে গাড়ি বন্ধ করে গ্যারেজের চাবি যদি শিকেয় তুলে দিই তাহলে তাকে কি জনসেবা বলা যাবে? ভেবে দেখার বিষয়।

প্রশিক্ষণের আবার একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হল ক্লাসে বসে পড়াশুনো। আরে বাবা সেই রামও নেই আর নেই সে অযোধ্যাও! দোল দোল দুলুনি চোখ জুড়ে ঢুলুনি! সামলাবি কেমনে পাগলা খাবি কি? জল খা! জল খা, হাওয়া খা, কপালে হাত ঘস, উঠে ঘুরে আয়! কিন্তু এসব করেই যদি চোখে টুথপিক লাগাতে হয়? তাহলে আর কি স্বীকার করেই নে! ঘুমনে গয়া থা! আব ওয়াপস! সব শুনেছি অবচেতনে! বলব আপনি শেষ বাক্য কি বলেছেন? আহা এ সব তো তরিবৎ শিল্প!

সেই প্রাচীনকালে যখন কেরিয়ার শুরু করি জুটমিলের পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট বিভাগে, তখন চাকুরীর পরীক্ষা আর মেটিয়াবুরুজের যাত্রায় ঘুমের আনাগোনা খুব কম হত। তাই জাব্দা লেজার এক হাতে এক পাশে ধরে অপর হাতে পেন নিয়ে স্থির ঘুম বেশ আয়ত্ব ছিল। পারফেকশন! পারফেকশন! এতদিনের অভ্যেস একটু টান মারলেই ফিরে আসে। সাইকেল চালানো আর সাঁতার কি কেউ ভোলে হে?

যাই হোক, প্রশিক্ষণের একটি বিশেষ অঙ্গ হিসাবে এবারে আছে রাজ্য সংযুক্তি আব স্টেট অ্যাটাচমেন্ট। অর্থাৎ কি না, ভারতের কোন একটি অঙ্গ রাজ্যে গিয়ে সকলে মিলে দিন চোদ্দর মোচ্ছব করা আর রাজ্যে কেন্দ্রীয় সরকারী বিভিন্ন স্কিমগুলি খাচ্ছে না মাথায় মাখছে তার খবরদারি করে রিপোর্ট তৈরী করা।

চেন্নাইতে আমি এর আগে বার চারেক এসেছি। কিন্তু এবারের আসাটা যেন অন্য রকম। বাক্স প্যাঁটরা ছেড়ে এত দিনের জন্য সত্যিই কোথাও থাকি নি। পার্শ্ববর্তিনীর কথা ছেড়েই দিলাম চোদ্দটা দিন যেন ছেলে মেয়ে দুটো হুশ হুশ করে বড় হয়ে যাচ্ছে ফোনের ওপারে।

যাই হোক কাজে তো মন দিতেই হয়, নাহলে তো হাতে থেকে যায় পেন্সিল। প্রথম দিনের ব্রিফিং এবং জরুরী আলোচনা শেষে আমাদের দলকে দুই ভাগ করে পাঠানো হবে ভিল্লুপুরম এবং কুড্ডালোর জেলায়। যা হয় আর কি, ডানপিটে বাঁদর ছেলেগুলোকে তুলে পাঠানো হয় শুকনো এলাকায়, আর বাকিদের মনোরম স্থানে। আমরা মানে আমাদের ছোট নদী যাব ভিল্লুপুরম।

কিন্তু ঈদ তো মাশাল্লাহ। তাই ছুটি কাটাতে ছোট কাছে পিঠের নিরালায়। নিরালায় বলে নিরালায়? কাঞ্চিপুরম, জীবনে পার্শ্ববর্তিনীদের খুশী রাখতে সব পুরুষকেই অফিসের কাজে কিছু কিছু স্থানে তীর্থ করতে যেতে হয়। যেমন বেনারস, যেমন জয়পুর, যেমন কাঞ্চিপুরম। কিন্তু সঙ্গের সঙ্গীসাথীরা বিশেষত যিনি আমাদের স্থানীয় সঞ্চালক তিনি যদি তা লিটারালি নিয়ে ফেলেন? তাহলে আর কি? যাও হে পবননন্দন অনন্তধামে।

এমনিতেই তামিলনাড়ুর মন্দির শহর, আর কাঞ্চির তো কথাই নেই। শিব মন্দির বিষ্ণু মন্দির শঙ্করাচার্য মন্দির। ছয় কেন একশোলাপেও শেষ হবে কি না কে জানে। তার উপর সোনায় সোহাগা শঙ্করাচার্য দেবেন্দ্র সরস্বতীর দর্শন। আহা এত পুণ্য এক জীবনে পাব কোথায়? না হয় ধর্মে আর জিরাফে মেল খায় না। কিন্তু আঁটি পড়ে থেকে থেকে দেখে যায় আমরসের কাব্য।

আড়াই ঘণ্টা ধরে এই মন্দির সেই মন্দির। এমনিতে বিখ্যাত প্রখ্যাত ধর্মস্থানগুলিতে পরধর্ম অসহিষ্ণুতা, ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি এবং বৈষম্য বড়ই চোখ টানে। Natives and Dogs are not allowed, আর As per Hindu belief and tradition, foreigners are not allowed beyond this point এই দুটির মধ্যে গুণগত মানের কি কোন পার্থক্য আছে? কে জানে তর্কে যাব না। বরং ঘুরে ঘুরে শিল্প স্থাপত্য দেখে কাটাই। আমার প্রাণের ঠাকুর আমার প্রাণেই থাকুক। তাকে না হয় সকল পানেই দেখি। চোখ বন্ধ করলেই কি মন বন্ধ হয় রে পাগলা?

অবশেষে স্থানীয় সঞ্চালকের সহায়তায় গিয়ে হাজির হই শাড়ির দোকানে। আহা ভানুরেখা গনেশন তো ঘরে ঘরে হে ঠাকুর। লক্ষ্মী যখন আসবে… তখন কোথায় তারে দিবি রে ঠাঁই। দ্যাখ রে চেয়ে আপন পানে, পথ দুটি নাই পথ দুটি নাই। পূজার তো প্রসাদ হয়। প্রণামীও। লক্ষ্মী পূজোয় প্রণামী সওগাত কাঞ্জিভরমের ভারিক্কি সম্ভার। কিন্তু যে দোকানে নিয়ে গেল সে তো ত্রিশঙ্কুর স্বর্গ। না পারি গিলতে না পারি ফেলতে। অতঃপর, টুক করে বেরিয়ে গিয়ে সরকারি দোকানে দর দস্তুর করে বাকিদের খবর দিই। ইধার আও বাওয়া, স্বর্গ এখানেই কিন্তু জিপিএসে থোড়া গড়বড় হো গঈল বা। তবু ভুল ঠিক করতে কতক্ষণ। দরদাম দরদাম ধূম ধাম আহা গোলক ধাম।

তেরো বছর আগে কাঞ্চিপুরমে আরেকটি প্রশিক্ষার্থী দলের সঙ্গে এসে একই শাড়ি কিনেছিলাম আমি অপর এক প্রশিক্ষার্থীর অর্ধেক দামে। আরে বাবা ৪০% ছাড় দিচ্ছে তো কেয়া হুয়া? একটু দর দাম করে দেখিই না। চল্লিশ তো তখনও অনেক দূর ছিল, তবু ষাটেই রফা হয়েছিল। তাই নিয়ে কি চাপান উতোর। আরে হামে পতা হোতা তো হাম ভি বারগেনিং করতে। তুম ক্যায়সে কর লিয়া। এ দুনিয়ায় জিতে যাওয়াটাও পাপ। কাঁকড়ারা শুধু বাঙালীই হয় না।

যাই হোক, শেষে ফেরার পথে ফিরে এসে আবার দুপুরে গন্তব্য হয় মহাবলীপুরম। দক্ষিণ ভারতের আমার অন্যতম প্রিয় স্থান। যেখানে মন্দির আছে, কিন্তু ধর্মের ধ্বজাধারীরা নেই। সুন্দর আছে কিন্তু অনিত্যের পূজারীর স্থান নেই। সব তো এক দিনে হয় না। কিন্তু সময় তো বাধ্য না। অ্যায় যাতে হুয়ে লমহো যরা ঠ্যাহরো… ম্যায় ভি তো চলতা হুঁ, যরা উনসে মিলতা হুঁ! যো এক বাত দিল মে হ্যায় উনসে কহুঁ…… তো চলু! কথায় কথায় যে রাত হয়ে যায়। তাই সমুদ্রের বিচ পাশেই পরে থাকে। এক মুহুর্তের ভালবাসা নিয়ে ফিরে আসি, কাঁকড়া চিবোতে চিবোতে! এ কিন্তু সে নয়, এ আসল তাজা স্ফুর্তিলা রসিলা কাঁকড়াভাজা। চাটুতে দিয়ে চটর পটর করে মুখে! তবে সাবধানে, এত তার তাজা রস ছিটকে যেতে পারে এদিক ওদিক। দিন ফুরোয়ে।

পরের দিন যাত্রা করি চ্যালেঞ্জের পথে। চ্যালেঞ্জের নাম ভিল্লুপুরম। সবই আছে কিন্তু কিছুই নেই। সেই স্বর্ণ চতুর্ভূজ প্রকল্পের পর থেকেই রাষ্ট্রীয় বা রাজ্য রাজমার্গগুলি একদম ঝাঁ চকচকে ইউরোপীয় উন্নত দেশগুলির রাস্তার মতো হয়ে গেছে। পথে অনলি কফিতে শুধু কফি কাপে চুমুক দিয়ে মন তাজা প্রাণ তাজা। এসে পৌঁছই জেলা সদরালয়ের কাছে আমাদের অস্থায়ী বাসস্থানে।

ভিল্লুপুরম জেলাটি ১৯৯৩ সালে গঠিত হয়, অনগ্রসর অঞ্চলের উপর নজর দেবার জন্য। তামিলনাড়ুতে কিন্তু সরকারি কার্যে কোন ঢিলেমি নেই। সে আম্মাই হোক বা প্রবীণ চিত্রনাট্যকার। নিজের ঢাক পেটাতে গিয়ে কিন্তু খালি ঢাকের বোলেই কান ভরায় না। তাই কাজে লেগে যাও! দিনমান পেরিয়ে যায় কাজের চক্করে, রাতে একটু খোলা হাওয়া একটু ফরাসী বাতাস, একটু সমুদ্র সন্ধান। পুঁদিচ্চেরী ত সেই টেনিদার আমল থেকেই ফ্যাশনদুরস্ত। তাই মন লাগিয়ে প্রাণ লাগিয়ে একটু অন্ধকারের উৎস সন্ধান, একটু ভূরিভোজন বা ভুঁড়িভোজন। তারপর? তারপর আর কি? ফিরে চল বাওয়া অস্থায়ী বাসস্থানে। পর দিন থেকেআবার কাজ শুরু! সাত দিনের মধ্যে জেলার হালহকিকত নিয়ে রিপোর্ট পেশ। বাস্তব অভিজ্ঞতা! আর তার পরেই, ডাস্টবিনের দাসত্ব। সে উঠে আসুক পরের কিস্তিতে! আজ যাই? আহা যাই কি বলতে আছে? বল আসি! আসি আসি আসি!!

(১০৫)


(১০৫)
“বাবা তারকনাথের চরণে সেবা লাগি…………”
একটা সময় সন্ধ্যা রায়ের এই সিনেমাটি সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে আবেগের বান ডেকে এনেছিল মনে আছে? আর তারপর সারা ছেলেবেলা জুড়ে তারকেশ্বরে বর্ষা নামার ধূম। আহা বৃষ্টি ভেজা কোলকাতার রাস্তা দিয়ে খালি পায়ে, বাঁশের বাঁখারি কাঁধে ঘড়া ভরা জলের উপর মাটি লেপে আর প্লাস্টিকের ত্রিশূল ম্যুরাল চাপিয়ে, ছেলেগুলো বাবা তারকনাথের মাথায় জল ঢালতে চলেছে, যদি বাবা মাথা ঠাণ্ডা হয়। যদি একটু আধটু জোগাড় টোগার হয় একটু হিল্লে হয়ে যায় আর কি। আজ বছর পঁয়ত্রিশ পরে এসে এর হিসাব নিতে গেলে আবার ভক্তির ভাঁড়ারে টান পরে যেতে পারে। তার চেয়ে বরং স্বীকার করে নিই যে দূরবীনে চোখ রাখব না। বরং জিন্দেগী না মিলেগি দোবারার নায়কের মতো খোলা মাঠে ঘোড়ার নৃত্য দেখি আর আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিই। কি বলেন পাঠক পাঠিকারা?

এ তো গেল ফ্ল্যাশব্যাক! এবারে আসুন ফিরে আসি বাস্তবের গল্পে, এই পচা শহরের পচা গরমের পরিমণ্ডলে বৃষ্টির বরাভয় আসতে আসতে সময় হয়ে গেছ শ্রাবণ মাস। কিন্তু তাতে কি? প্রথম বৃষ্টি আর প্রথম প্রেম কি কখনও পুরনো হয়? যখনই এসেছিল ঝমঝমিয়ে ভিজিয়ে দিয়ে যায়। ছেলেটাও, “মা ভিজতে যাচ্ছি!” বলে ছাদের উপর উপর হয় সমবয়সীদের সঙ্গে। যত পোড়া কালঘাম, ঘামাচি আর দুর্ভাবনা নর্দমার পথে তেপান্তরে পাড়ি লাগায়।

আমিও ক দিন ধরে বেণী ভেজাব না পণ করে ছাতা হাতে চলেছি সুদূর আইএসটিএম-এ। সরকারী চাকুরেরা যাতে অ্যাসেম্বলী লাইন চাকর বাকরে পরিণত না হয় তার জন্য দক্ষতাবৃদ্ধির বরাদ্দ ইনস্টিটিউটখানিতে ঘানি ঘুরিয়ে উত্তম গুণমানের নির্যাস বার করা হয়। তাতে কেউ কেউ স্লিম ট্রিম ফিট ফাট হয়ে যায়। আর কেউ কেউ শুধু ছিবড়ে হয়ে পড়ে থাকে ডাস্টবিনের আশায়।
তা আমিও গত এক বছরের পদোন্নতিকে পোক্ত করার জন্য আবশ্যিক প্রশিক্ষণের কারণে বর্ষামঙ্গলে সপ্তাহের পাঁচ দিন ভিজিয়ে চলেছি।

তা আছি মন্দ না বুঝলেন! বুড়ো বয়সে পড়াশুনো চাপের হতে পারে কিন্তু ইনস্টিটিউটের সুন্দর ব্যবস্থাপনায় কনসেপ্ট পেপার প্রেজেন্টেশন, স্টেট অ্যাটাচমেন্ট স্টাডি ট্যুর আর মড্যিউল পরীক্ষার যাঁতাকলকেও শিমূল তুলোর পাশবালিশ বলে মনে হচ্ছে। তার সঙ্গে জুটেছে বিভিন্ন চরিত্রের সহকর্মী বা সহপাঠীরা। আরে রোজ রোজ বাড়িতে চিকেন চচ্চড়ি খেতে খেতে রেস্টুরেন্টে সামান্য নুডলস আর চিলি পনিরও মুখে অমৃতের দই আর দ্বারিক ঘোষের আমসত্ত্ব সন্দেশ মনে হয়।

তা গন্তব্যটা বেশ কাছাকাছি নয় বুঝলেন! কমফোর্ট জোনের বাইরে বার করে নিয়ে তবে জ্ঞান প্রবেশ করাবে! তা ভাল, তবে কিনা সাতটার সময় ত্রিশ কিমি গাড়ি চালিয়ে আবার সন্ধ্যা আটটায় ফিরে এসে বই মুখে বসতে ধক লাগে। বাড়ির চাতক পাখীগুলোর দিকে চাওয়া যায় না। তা কি আর করব। পেটে খেলে পিঠে সয়!

তাই রোজ সকালে উঠে গোপাল বড় সুবোধ ছেলের মত, পিঠে ব্যাগ আর হাতে জলের বোতল নিয়ে গুটগুটিয়ে গাড়িতে উঠে বসি! আর নিঃস্বর্গের বিসর্গ বাদ দিয়ে ছাঁকনিতে ছেঁকে নেওয়া তলানিটুকু দেখতে দেখতে পৌঁছে যাই পঠনের পথে।

এখন তো আবার শ্রাবণ বা শাওনের সময়। শাওন যে তোর বাঁধন মানে না- ভাসান দিয়ে যা রে শাওন ভাসান দিয়ে যা…

শাওনে কাঁওয়ারদের ভিড় বাড়ে। তা এই পোড়ার দেশে তারকেশ্বর আর কোথায় পাবে, তাই তারা গাঁ উজিয়ে ছুটে যায় হরিদ্বারে, হরের মাথায় জল ঢালতে। হরিদ্বার বলতে সেই দুহাজার চারের কথা মনে পড়ে গেল। আমি আর আমার এক বন্ধু সপরিবারে সেথা গিয়েছিলাম শ্রাবণের ধারার মাঝেই। তা একদিন হর কি পৌরিতে ঘোরাঘুরির সময় উভয়েরই বেগ সঙ্কট এসে উপস্থিত। উঠেছিলাম ভারত সেবাশ্রম পেরিয়ে কাটিয়া বাবার আশ্রমে। সে প্রায় সেখান থেকে আধ ঘণ্টার পথ। লট বহর নিয়ে সেখানে ফিরে যাবার থেকে দুজনেই মনস্থ করলাম যে হালকা হবার শুদ্ধ স্থান কাছাকাছি কোথাও খুঁজে বের করব। কিন্তু আমরা তো শহুরে সচেতনবাদী। পরিবেশ এবং দৃশ্যদূষণে বেজায় বিরাগ। তাই সহধর্মিনীদের “এই একটু আসছি” বলেই সোনার হরিণের খোঁজে গরু খোঁজা করে যখন প্রাণ যায় যায় অবস্থা তখনই বিষ্ণু ঘাটের কাছের এক ধরমশালায় ভুজুং ভাজুং দিয়ে পতিতোদ্ধারিণী গঙ্গের স্পর্শ লাভ।
আহা গোপাল ভাঁড় বড়ই সত্যবাদী ছিল হে। তা ততক্ষণে স্টুডিওর ঘড়ির কাঁটা দেড় ঘণ্টার পথ অতিক্রম করেছে। আর মোবাইলের অস্তিত্বও তখন বাঙালীর পকেটের ইতিউতি উঁকি ঝুঁকি শুরু করে নি। অতএব বাস্তবের জমি বড়ই কঠোর ছিল হে পড়ুয়া পাবলিক। সহধর্মিনীদের না বলিয়া কোন কাজ করিলে রাখাল বালকের দশা হয়। তখন পালে বাঘ পড়লেও নট নড়ন চড়ন।

সে যাই হোক, মোদ্দা কথা হল কাঁওয়ার আর কাঁওয়ারি! এ কিন্তু উচ্চারণের ফেরে কাওয়ারি হয়ে যাওয়া নয়। কাওয়ারি আপনার বাড়ির আবর্জনা কিনে নেয়। আর কাঁওয়ারি তার মনের আবর্জনা কৃচ্ছসাধনের মাধ্যমে বইয়ে দেয় গঙ্গার জলে। তা সে যাই হোক শাওন মানেই কাঁওয়ারি মরসুম শাওন মানেই কাঁওয়ার কাঁধে পথ চলার ধুম। কিন্তু সেটা তো নতুন কিছু নয়। নতুন হল তার ইনস্টিটিউশনালাইজড প্রফেশনালাইজেশন বা সংস্থাগত ব্যবসায়িকরণ।

সারা পৃথিবীর উত্তর ভারতীয় রাজনীতিবিদরা কাঁওয়ারিদের যাতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা না হয় তাই জাতীয় সড়ক পথের ধারে ধারে “নমস্কার ডানদিকে” মার্কা পোস্টার লাগিয়ে ঘাঁটি বানিয়ে দিয়েছেন।
নমস্কার ডানদিকে জানেন না? গাইড ফিল্মের দেব সাহাবকে মনে আছে? মুখ ঢেকে যায় নমস্কারে, তা দেব সাহাবের মুখ বিমুখ হলে তো চলবে না! তিনি তো আর মনোজ কুমার নয় যে হাত ঢেকে মুখের ডায়লগের চব্বিশ শতাংশ ইনফ্লেশনের ঘুর্ণিতে হারিয়ে দেবেন। তাই তিনি আবিষ্কার করলেন “নমস্কার ডানদিকে” মানে নমস্কার করবেন কিন্তু ডান দিকে, যাতে মুখ দেখা যায়। আর কি সেই মান্ধাতা আমল থেকে আজকালকার রাজনেতারাও শিখে গেছে সেই ট্রিক। মোদী বাবু অবশ্য সবেতেই নতুন পথের দিশারী! তিনি আবার বাহু মূলে হাওয়া লাগিয়ে মাথার উপরে ঘোরা ফেরা করা মশা মারেন পট পট।

সে যাই হোক, সেই সব রাজনেতারা বিভিন্ন রাজনৈতিক রঙে রাঙিয়ে (সংখ্যাগরিষ্ঠ যে কে তা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না) যে সব বিশ্রাম স্থল করে দিয়েছেন তার তারস্বরে চোঙা লাগিয়ে চিল্লিয়ে বাজি মাত করছেন। তবে গানগুলো সবই ভক্তিগীতি! মানে চলতি হিন্দি গানের নকলনবিশি। বর্তমানে হিন্দিগানের বাজারটার কথা পাঠক পাঠিকারা ভালই জানেন। যে গুলো এখন মুম্বইয়ের কারখানা থেকে বেরোচ্ছে সেগুলো হিন্দি গানা না ইংরাজি গান তা তারাই ভাল বলতে পারবেন। অবশ্য জনগণ যদি বারুদ মুখে নিয়ে বসে থাকে তাহলে আর মুখ পুড়িয়ে পকেট ভরালে তাদেরই বা দোষ দিই কেমনে বলুন! অতএব সুদীর্ঘ তিন কিলোমিটার জুড়ে কানের দফা রফা থেকে বাঁচাচ্ছি কিভাবে তা ভগাই জানেন।

অবশ্য শুনতে সক্ষম না হলেও চোখের ব্যায়াম মন্দ হচ্ছে না। কাঁওয়ারিরা সব দলীয় জার্সি গায়ে ভজন সাধন করছেন। কারুর জার্সিতে সামরিক ছোঁয়া আবার কারুর জার্সির রং কমলালেবুর কোয়া। বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে শিবের খোঁয়ারি একেবারে শিকেয় উঠেছেন। মাথা গরম হবে তারপর জল ঢেলে ঠাণ্ডা করতে হবে! এতে আর নতুন কি! সেই ছেলেবেলায় দেখা পরেশনাথের প্রশেশন! আহা চমকিলা ভড়কিলা আলোর মালায় গরু ঘোড়া যন্ত্রচালিত কাঁওয়ারদের গাড়ি পেরিয়ে যেতে যেতে বেলা বয়ে চলে যাচ্ছে বটে। কিন্তু মজা মন্দ লাগে না। খাবি যদি হাওয়া খাবি ঢেঁকুর তুলবি কেমনে! আহা রাজনীতি আর ধর্মের নামে যে টাকা ছড়ানো হয় তা যদি শিক্ষা ও স্বাস্থে ছড়ানো যেত, তাহলে ভারতের উন্নতির পথটাই আজকের দিনে মসৃণ হয়ে যেত, বাজার অর্থনীতি আর বিদেশী বিনিয়োগকে হেঁচকি তোলানো গাল পেড়ে খামোখা আমাদের জিন্দেগী খারাব হতো না।

তা সে যাক গে গিয়া। এসব ফালতু ব্যাপারে চিন্তা করে করব কি বলুন, বোকো হারেম আর গাজাতেই তো মন মজে পড়ে আছে। বিদেশ কথাটার মধ্যেই তো দেশ লুকিয়ে! বিশ্বনাগরিক হয়ে সেখানেই মন্তব্যের বন্যা বইয়ে দিই না হয়! পোড়ার দেশের একটু মুখ পুড়লে আর ক্ষতি কি? তেলা মাথায় তেল দিলে বিশেষ ফারাক তো আর হয় না!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ হামাস আর ইজরায়েলের কাটাকুটি খেলায় গাজার যে সব নিরীহ শিশুগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে তাদের জন্য দু ফোঁটা জলও ফেলতে পারছি না! কি জানি আমিও যদি ফেসবুক সমাজতাত্ত্বিক হয়ে গিয়ে নিজের দায়িত্ব ভুলে যাই! তবু এই হানাহানি বন্ধ হোক এই প্রার্থনা করি! কাঁওয়ার বাবুরা যদি কেউ গিয়ে হরিদ্বারে এমন কিছু চায়? আহা নিজের জন্য না চাইলে কিন্তু তৃতীয় নয়ন খোলেন তিনি! চাহিদা পূরণ হতেও সময় লাগে না! বিশ্বাসে মিলায় বস্তু ফিসফাসে বহুদূর…

(১০৪)


জাকির হুসেনের জন্মের পরে পরেই আল্লারাখা উস্তাদ তার কানে তবলার বোল তুলে দিয়েছিলেন। আমার কানে ক্যানেস্তারা কে বাজায়েছিল গা? গলাখানা যা বাজখাই হল। ছেলে বেলা থেকেই গান আমার কান মন প্রাণ তৈরী করে দিয়েছিল। খুব ছোটবেলায় বাবা মা রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে বসত। আর আমি বসতাম ল্যাক্টোজেনের কৌটো নিয়ে- ধা ধিন ধিনতা না তিন তিনতা!

তারপর ভাগীরথী দিয়ে জল গড়িয়েছে কত। আমার কানও গুপ্ত মৌর্য স্বর্ণযুগ পেরিয়ে পৌঁছেছে জীবনমুখীর ঘাটে- হেমন্ত না সুমন, সুমন না হেমন্ত? সুরের আকাশে তখন রঙমশাল। নীল দিগন্তে ম্যাজিক। বাংলা গান ভাঙছে গড়ছে গড়ছে ভাঙছে। স্বপ্ন দেখছে সবাই স্বপ্নে দেখছে গানে গানে, বন্ধন যাক টুটে।

উনিশশো একানব্বই। রবীন্দ্রনাথ কি ছাড়া পেলেন? না লক্ষ্মীছাড়া শ্রী ছাঁদে ধরা রইলেন! বারন্দায় রোদ্দুর ছায়া ঘনায় বনে বনে। মিঠে কড়া পরীক্ষা নিরীক্ষা বেয়ে বাংলা গান গলা ছাড়ছে তখন। ছাড়ছি আমিও। ‘আমার প্রতিবাদের ভাষা দ্বিগুণ জ্বলে’- চোখ জ্বলে বুক জ্বলে- নিঃশ্বাস নেব কিসে? কেনো গানের শিস আর ধানের শীষ মাখা মাখি হয়ে গেল গলা দিয়ে নেমে আসে সুর অসুর।

তখন আমিও গাইছি, ‘পুকারতা চলা হুঁ ম্যায়’ গঙ্গার ধারে ‘প্যাহলি পেয়ার কি খুশবু’, ‘তুমি রবে নীরবে’ ‘আজি বিজন ঘরে’! আমি গাইছি, ইউনিভার্সিটি ইন্সটিউটে, ‘হেই সামালো ধান গো’ গলার বাড়ছে ধার, কাস্তেয় পড়ছে শান! আমি গাইছি, ‘হৃদমাঝারে রাখব, ছেড়ে দেব না’। কলামন্দিরে শুনছি, ‘গান তুমি হও গরমকালের সন্ধ্যেবেলার হাওয়া’, ‘পেটকাটি চাঁদিয়াল’, ‘গানওলা- আমার আর কিচ্ছু করার নেই’! সারা রাত জেগে জেগে শুনছি ধূসর নীলাভ এক তারার গল্প। শুনছি ‘নীলাঞ্জনা’ শুনছি ‘আকাশমুখী সারি সারি পাশাপাশি বাক্সবাড়ি’!

গান ছড়াচ্ছে তখন, গোকুলে বাড়ছে ব্যান্ড, আমি হারাচ্ছি, আমি হারাচ্ছি জীবিকার ভিড়ে। গান ভালবেসে গান! দেখে যা কি সুখে বেচেছি গান! শহর পাল্টাচ্ছে পাল্টাচ্ছে সময়, গান পাল্টাচ্ছে পাল্টাচ্ছে সুর- অসুর। রবি বারোয়ারী হলেন। মুক্তির আনন্দে লাগাম ছাড়া পাগলপারা রবি আমার। হেমন্ত, মান্না, শ্যামল, তরুণ মানবেন্দ্র- সব আসছে এদিক ওদিক দিয়ে। সুমন যেন কমে গেছে বাজারে? মেটেরিয়া মেডিকার কাব্য? ব্যান্ডে হাত ব্যান্ডেজ ভূত ধরতে পারছি না আর। ডুবে যাচ্ছি, অন্য শহরের প্রেমে ডুবে যাচ্ছি। গান? সে তো মোবাইল আর এফ এম-এ। নতুন কি হচ্ছে নতুন কি হচ্ছে? হাতড়াচ্ছি শুধু অন্ধকারে।

দু হাজার ছয়, একরাশ তাজা হাওয়া নিয়ে এল সে! বাংলা গান তো বদলে গেছে গো! শোন না কি কি হচ্ছে। ধীরে ধীরে আপ টু ডেট হচ্ছি। জ্ঞান বাড়ছে, শিখছি কত কিছু। ব্লুজ, জ্যাজ, কান্ট্রি মিউজিকে কান পাকাচ্ছি, মন পাকাচ্ছি। কলমে কবিতা গলায় গান। নতুন লেখা ভাষা কথা সুর মিলে মনন তৈরী হচ্ছে আমার মধ্য যৌবন পেরনো মনন। ভাঙছে গড়ছে সময় ভাঙছে গড়ছে জীবন ভাঙছে গড়ছে গান। বাংলা গান বাড়াচ্ছে রাস্তা। পথ খুঁজে কোন পথে গেল গান। জীবনে নতুন গান, গানে গানে গড়ছে জীবন। নতুন তারকারা গানের জগত আলো করে উজলে উঠেছে। ঢেউ উঠেছে কারা টুটেছে। তারপর? তার পর আর কি তার ছিঁড়ে গেল কবে, একদিন কোন হাহারবে… শুধু রয়ে গেল তার স্মৃতি! ল্যাপটপ ভর্তি গান! ছবি আর গান নিয়েই রয়ে গেল সে আমার ভাই আমার সহোদর আমার নবীন সঙ্গীতশিক্ষক। ‘মেঘ জমে আছে মন কোণে’ ‘বৃষ্টি বিদায়’ আর ‘বরষণ মন্দ্রিত অন্ধকারে’- যখন আলো নিভে যায় তখন ল্যাপটপটা খুলে বসি, জমে থাকা গান জমে রাখা জল ধীরে ধীরে বেরিয়ে যায়। জমতে থাকে মনে, প্রাণে বসন্ত বাতাসটুকুর মতো। চলে গেছে সে মাস সাতেক। বাঁধনহীন হয়ে গান শুনিয়ে গেছে সে। কান দিয়ে প্রাণ দিয়ে গান দিয়ে গেছে সে। আমার ভাই… আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা। প্রজন্ম প্রজন্ম গান আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা।

“গান তুমি হও আমার মেয়ের ঘুমিয়ে পড়া মুখ
তাকিয়ে থাকি- এটাই আমার বেঁচে থাকার সুখ…”
—-
(আদরের নৌকায় প্রকাশিত)

(১০৩)


আরে কি বলছেন? অর্কুট সেপ্টেম্বরে বিদায় নেবে? তো আমি কি করব? সে তো আমিও পনেরো বছর আগে নিজের শহরের পাট চুকিয়ে বিচ্ছিন্ন উপদ্বীপে এসে বসবাস করতে শুরু করলাম। তো আমি কি আর আমি নেই? ওহ ওই সব অর্কুট ফর্কুট অনেক দেখেছেন? শুনুন মহায় একটা সিধা কথা বলে রাখি, অর্কুট ছিল বলে এই যে আমার মতো নিজখ্যাত (নিজের কাছেই খ্যাত আর কি) লোকের গোদা অক্ষরে বাংলা লেখা আপনি ভাগ্যি করে পড়তে পারছেন।

সে সেই দু হাজার পাঁচ টাঁচ হবে, ওয়ানটুথ্রিইণ্ডিয়া, ইন্ডিয়াটাইমস পেরিয়ে এলাম গুগলের দরবারে। আরে কোন এক অর্কূট বুন্দিকুটকুটি না কে তার গার্লফ্রেন্ডকে খুঁজে পেয়েছে বলে গুগলকে এই চিন্তাভাবনাটা বেচে দিয়েছে। তা বেশ করেছে, আমার তো আর গার্লফ্রেন্ড হারায় নি যে তাকে নিশ্চিন্দিপুরে নোটিশ পাঠাতে হবে? তাইলে? তাইলে আর কি? বিদেশ বিভূঁইতে রাবণ বর্জিতভাবে বসে আচি একটু বন্দু টোন্দু হলে মন্দ হয় না? তা বেশ কথা দিল্লিতে বাঙালীদের মাছ খাবার আড্ডা থেকে শুরু করলাম অর্কূট যাত্রা। তা সে লেখা টেখা তখন কোথায়? তখন তো খালি আড্ডা আর মিট আর ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্প শহর কাঁপিয়ে সমাজচর্চা। নোবেল পাবই পাবো!

যে ছেলেটা সেই রাজ্যপাটের মালিক ছিল (সবাই রাজার দেশে একলা রাজা হয় না, মালিক হয়) তার অদ্ভুতভাবে রোহণের সঙ্গে মৌখিক মিল। কিন্তু কাজে কম্মে তো সে রোহণ নয়, তাই ভাঙা গড়ার ভিতর দিয়েই এগিয়ে চলতে চলতে হঠাৎ একটা ছেঁদো কবিতা লিকে ফেললাম! তা বাঙালী মাত্রেই ছেঁদো কবিতা লিখে নিজেকে জীবনানন্দের প্রপৌত্র হিসাবে দাবী করে, আর আমি পনেরো বছর দিল্লিতে থেকে আর বাঙালী নেই। কিন্তু কবিতাতে যে ফুটো হয়ে যায়, চল ভাই গল্প লিখি। এমন গল্প কেউ কোত্থাও লেখে নি। যে গল্প লিখলে কুড়ি বছর পরে আনন্দ পুরষ্কার একদম বাঁধা।

তাই ভাই এমন গল্প লিখব কোথায়? আরে কূট আছে না? অর্থাৎ কূট সাহিত্য? আরে মশাই হাতে লেখার হাতে খড়ি সেখানেই। ছিলও বটে লোকজন, একটু আন্টু বান্টু লেখা লিখলেই জেজে ট্যাগ ঝুলিয়ে দিত। ওহ জেজে জানেন না? ঝুলস্য ঝুল মহায়! তা মহায় দশটা লেখার মধ্যে নটা জেজে হলে একখান তো কুলস্য কুল হবে না কি? ধামাধরা পাঠক সমালোচকরা যে নাকে চশমা এঁটে বসে আছে। তো চালাও পানসি উত্তমাশা অন্তরীপ।

বাংলালাইভ ছুঁয়ে এদিক ওদিক হয়ে ফিসফাস। আরে মশায় শুধু অনলাইন সাহিত্য চচ্চা কল্লেই চলবে? কে তুমি শিবাজী বাওয়া খোমা দেখাইবে নি?
চলল গেট টুগেদারের পালা! আহা, এই তো সেই, মামণি টাইপের মেয়েগুলো হ্যাণ্ডসাম ছেলে দেখে চিল্লিয়ে ওঠে আর ছেলেগুলো মহা খচ্চর। মিটিমিটে চাউনি দিয়ে তারিয়ে তারিয়ে চাখতে থাকে, পদ্যভরা চোখে গদ্যভরা চাখা। কিন্তু দাদা ম্যাগাজিনও তো প্রকাশ করে ফেললাম। করব কি? আরে করবে কি? গান পারলে গান কর কবিতায় কবিতা যদি পিয়ানো বা টেবিল টেনিস পারো তাহলে বাপু সে নিজের বাড়িতে কর।

এরপর এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, আরে বাবা ফেসবুক না কি একটা আছে না? তার সঙ্গে নাকি অর্কুট টিকে উঠছে না। তা উঠছে না তো বেশ করছে। ফেসবুক যত অহমসর্বস্ব স্বার্থপরদের জায়গা। আড্ডা মারতে হলে অর্কুট। ফেসবুক হল ফ্ল্যাটবাড়ি যেখানে গ্রুপ বা পেজ খুলে তিন মিনিটের ফেম হয়, প্রেম হয় না। অর্কূট হল আমার দালানবাড়ি, মুড়ি চানাচুর লেবু চা সহযোগে বিন্দাস আড্ডা। সেখানে পাঁচটা ঘর সব সময় ওপর তলায় থাকে। ফেসবুকের মত গড়গড়িয়ে লিফট চড়ে নেমে পড়ে না। কালকের সুগন্ধি বেলফুলের ছোঁয়া আজকেও থেকে যায়। কিন্তু করবটা কি, যত কাণ্ড কাঠমাণ্ডুতেই, পেলিং জলঢাকায় কেউ আর আসে না। এমন দিন এল, ব্রাউজারে অর্কুটকে উপরে রাখার জন্য অর্কূটেই বার চারেক ফালতুকা ক্লিক মেরে চলে আসতাম।

কিন্তু কর্তার ইচ্ছায় কর্ম আর আপনি বাঁচাই ধর্ম। আমিও চামড়া পালটে স্বার্থপর হয়ে গেলাম। গুগল প্লাসেও হয় না। ফেসবুকের মধ্যে নিজ গণ্ডিতেই আটক, নতুন পরিচিতি, প্রেম পথ চলা। তারপর দেখি ও মা, অর্কূটের সুবীরদা, বাসুদা, হরিদা, সুসদি, রাজা, নেপু, সোমা, কোহলি, ইন্দ্রাণী, পিউ, পুপুল, সঞ্জয়, লেলো, বক্সি, শুদ্ধ, পাহাড়ি পানুদের সঙ্গে আরও অনেকে জুটে গেছে। আহা ঘর দিয়ে কি আর মানুষ গড়া যায়? মানুষ যেখানে যায় সেটাই তো আমার ঘর! আমি বিশ্বনাগরিক।

তাই আর কি, একটা রজনীগন্ধার মালা লটকে দিয়ে জমা রাখা পোস্ট, ছবি টবি সব ডাউনলোড করে ফেসবুকের পর্দায় মুখ দেখাতে থাকি। তবে কি না দিনগুলো বেশ ভাল ছিল গা? মানে আমি সবসময় এক পয়সার চাল আর পেলে মারাদোনা না করলেও অর্কূটটা ভোকাট্টা হবার সময় বুকের বাঁদিকে একটু গিটারের গৎ বাজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। ফেসবুক পরিচিতি বাড়ায় কিন্তু অর্কূট তো পরিবার বাড়িয়েছিল। যার জোরে এখনও এখানে টিকে আছি, দ্বিতীয়-তৃতীয়- চতুর্থ পরিবার।

“যদি পুরাতন প্রেম ঢাকা পড়ে যায়…
তবু…………”

(১০২)

‘বন্ধু বিনে প্রাণ বাঁচে না
আমি রব না রব না গৃহে…’

বন্ধু কারে কয়? কারুর পেটে সয় কারুর পিঠে সয়। এসব ডেফিনেশন সংজ্ঞার মধ্যে না গিয়ে বরং আমরা গল্পের মধ্যে ঢুকে চলে যাই। নগর কলকাতা ছেড়েছি সেই কবে রামচন্দ্রের আমলে। কিন্তু বার বার ফিরে ফিরে যাই। খুঁটে নিই তিল তিল করে পড়ে থাকা ভালোলাগা ভালোবাসাগুলো। আর একটা উদ্দেশ্য থাকে বন্ধুবাসন। কোন মতে সবাই মিলে একত্রিত হতে পারলেই হল। দেশ কাল স্থান পাত্র ভুলে মহোল্লাসে মোচ্ছব।

আমার স্কুলের বন্ধুদের একটা খাসবুনোট গ্রুপ আছে যা ইণ্ডিয়াটাইমস চ্যাট আউটলুক অর্কুট পেরিয়ে এসে ফেসবুকে বহাল তবিয়তে বাসা বেঁধেছে। ফি বছর আমরা কোন না কোন অছিলায় একত্রিত হই আর বাজার খুলে বসে মিস্ত্রি মালিক খরিদ্দারের নামগান করে কলতানে মুখরিত করে তুলি আকাশ বাতাস। আমি কেমন করে জানি না বড় গেট টুগেদারগুলো ফসকে যাই প্রতিবার। তাই আমার জন্য পড়ে থাকে ছড়ানো ছিটানো। সত্তর আশির জায়গায় বড় জোর দশ পনের। তাই ইনস্টলমেন্টে আমার স্কুলজীবন বেরানো সমাধা হয়।

এবারো অন্যথা নয়। বার তিনেকের প্রচেষ্টার পরেও ফাঁক থেকে যায়। তাই বাকিটা ফেসবুকের ‘রামা হৈ’ দিয়ে ভুলিয়ে থাকা। যারা বহুদিন ধরে দূরে তাদেরও লস্যি টস্যি খাওয়া হয়ে যায়। তা এসব থেকেই গল্প উঠে আসে আর আমি সুবিধাবাদী ফিসফাস শিকারী, সেখান থেকেই তুলে নিই খান দুই তিন যা থাকে কপালে।

এক সদ্য চশমালব্ধ বন্ধু ক্লাস নাইনে পড়ার সময় ক্রিকেটে সহজতম ক্যাচ ফেলে অজুহাত দিয়ে ফেলে, ‘বুঝলি তো আসলে, চশমাটা অপটিকাল আর বলটা স্ফেরিকাল! তাই ম্যাচ না করতে পেরে ক্যাচ ফেলে দিয়েছি!’ সব কিছুই ঘুরে ফিরে আসে।

বললে বিশ্বাস করবেন না। আমিও প্রাকযৌবনকালে খুব মনোযোগ দিয়ে মাঠচর্চা করেছিলাম। একটু আধটু হাত ঘোরানো আর ব্যাট হাঁকড়ানো। তাই দিয়ে ফার্স্ট ডিভিশনটা হয়ে গেছিল বটে কিন্তু জীবনের যুদ্ধে ফেল না করে ফেলি বলে অন্য কিছু আঁকড়ে ধরেছিলাম। তবে কি না জানেন তো যা থাকার তা থাকে যা। যাবার তা যায়। খেলা থেকে চলে গেলেও খেলা আমায় ছাড়ে নি। দিল্লিতেও এই সেদিন পর্যন্তও ছিল গায়ের সঙ্গে লেগে। হাঁটু ঘুরিয়ে ব্যাণ্ডেজ ভূত হয়ে যাবার পরেও। তাই মাঠের বন্ধুদের সঙ্গেও ভরা বিশ্বকাপের বাজারে ঝিঁ ঝিঁ চর্চা করে গালবাদ্য বাজাই। আর নেটতুতো সাহিত্যতুতো বন্ধুরা তো আছেই। তারা আবার ডেকে রান্না করে খাওয়ায় আর বাইক করে বাড়িতেও পৌঁছে দিয়ে যায়।

কিন্তু বন্ধুত্বের একটি সুন্দরতম নিদর্শন আমার আশেপাশেই ঘোরাফেরা করছে গত বছর দুই ধরে। আমি দেখে দেখে আশ্চর্য হই। আজ মনে হল আপনাদেরও দেখানো দরকার। আসলে ভাল জিনিস একা খাই কি করে বলুন। হাজার হোক ফিসফাসের পাঠকপাঠিকারাও তো আমার পরিবার- আমার দ্বিতীয় বা তৃতীয় পরিবার।

আমার ছেলের একদম ছোট্টবেলার একটা বন্ধু ছিল। তার নাম ছিল রাজা। তখন থাকতাম দিল্লির আশ্রম বলে একটি জায়গায়। এটা নিয়ে একটা গল্পও আছে- মানে ওই আশ্রম নিয়ে। দুহাজার দুই নাগাদ ট্রেনে করে কোলকাতায় আসছি (এখন হলে বলতাম কোলকাতা যাচ্ছি! কিন্তু তখনও কোলকাতায় যাওয়াটা ‘আসছি’ই ছিল!) একা, একদল বয়স্ক লোকজন সহযাত্রী। একজন জিজ্ঞাসা করলেন, “কোথায় থাক বাছা!” “আশ্রম” শুনে চিন্তিত হয়ে পড়লেন তাঁরা- এত কম বয়সেই আশ্রমে? আহা! তা তাঁদের ধারণা বদলাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। সে যাক ফিরে আসি ছেলের কথায়। তা গাজীয়াবাদে চলে আসার পরে তারাও ফরিদাবাদের কোথায় যেন চলে যায়। খুঁজে পেতেও পাওয়া যায় নি। ছেলে আমার দুঃখজাগানিয়া- বলে না কিছুই। কিন্তু বন্ধুত্বের জন্য জান দিতে তৈরী থাকে।

ওর প্রাণের এক সহপাঠী হঠাৎ বাবার বদলির সূত্রে ত্রিবান্দম চলে গেল না বলেই। বেজেছিল তার বুকে। তাই বন্ধুত্বের খাতিরে নিঃস্বার্থ কাঙালপনা। বছর খানেক আগে আমার আদি শ্বশুরবাড়ি জামশেদপুরে যখন এসেছিলাম তখন আলাপ হয়েছিল তার বিট্টুর সঙ্গে। বিট্টুর গল্পটা আর পাঁচজনের থেকে আলাদা। ছেলেটা শুধুমাত্র পড়াশুনো করবে বলে বাবা মাকে ছেড়ে আমার শ্বশুরবাড়িতে থেকে গেছে। ক্লাস সেভেনে পড়তে পড়তেই সামান্য আয়োজন দিয়ে টর্চ বানিয়ে ফেলে।

এমনিতে হয়তো বলা উচিত নয়, তবে উদ্ভাবন আমার ছেলেরও মধ্যনাম। তাই আমে দুধে বেশ মিশে গেছিল তখন। ফোন বা হাতে লেখা চিঠিতেও যোগাযোগ ছিল ওদের। গতকাল এসে পৌঁছেছি জামশেদপুরে। আর গতকাল থেকেই জোড়া হেডলাইট আমাদের আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দুই বন্ধুকে আলাদাই করা যাচ্ছে না। আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে।

তার উপর গতকাল নিকটবর্তী এক মেলায় দুজনে মিলে আমায় নিয়ে গেল। মেরিগোরাউন্ড আর জায়েন্ট ঢেঁকির মধ্যে বসে আমিও ফিরে গেলাম শৈশবে। সেই সুভাষমেলা আর চড়কের মেলা। সেই ঝুলন্ত ঘুর্ণি, সেই চাঁদমারি করে মোমবাতির আগুন নেভানো। ছেলেবেলাগুলো বড় ভাল হয় হে কত্তা। বুড়ির মাথার পাকাচুল আর আলো ঝলমলে লাট্টু, প্যারাসুট আর পপকর্ন- আহা মাল্টিপ্লেক্সের এসিসম্বলিত সজ্জাও ম্লান হয়ে যায় এর নির্মলতার কাছে। কালকে সাময়িক বিচ্ছেদের সময় পরও যার রেশ থেকে যাবে নতুন কোন স্মৃতি, নতুন কোন অঙ্গীকারের মাধ্যমে। সুন্দর থাকুক ওরা।

ছেলের কথা যখন এল তখন মেয়েও না হয় একটু থাকুক। আজকাল বাপের কান তার বড়ই পছন্দের হয়েছে। আর কে না জানে বাপ, কান টানলে মাথা আসে। আরে বস ছেলে মেয়ে পার্শ্ববর্তিনীদের জন্য তো জান হাজির। প্রকৃত বন্ধুদের জন্যও।

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ বন্ধুত্বের ডাকনামের এক একটা ইতিহাস থাকে। আমাদেরই এক বন্ধু ছানাকে নিয়ে গল্প করছিল! ‘ছানা’ আমাদের ক্লাসমেট কি ভাবে ছানা হল নাম সেটা আন্দাজই করে নিন। কিন্তু ডাকনাম আবার মাঝেমাঝে আসল নামের থেকে ভয়ঙ্কর হয়ে দাঁড়ায়। মুছে দেয় অন্য পরিচিতি। ‘পেলে’ বা ‘নেতাজী’ বা ‘বাপুজী’ মনে করুন। তা আমাদের সেই বন্ধু কোন এক রাস্তায় ট্যাক্সিসফর করার সময় রেডলাইটে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ‘ছানা’কে দেখতে পায় অল্প বয়সী একটি মেয়ের সঙ্গে রাস্তা পার হতে। সে এখন অবস্থার গুরুত্ব বুঝেও আসল নামটা কিছুতেই মনে না করতে পেরে ডেকে ওঠে, ‘ছানা! এই ছানা!’ স্বাভাবিকভাবেই প্রেস্টিজের পুলটিশ বাঁচাবার জন্য ছানা আড়চোখে দেখেও দেখে না। কিন্তু বিপদ বাড়ে, যখন আমাদের খোট্টা ট্যাক্সি চালকটিও পরোপকারের চক্করে ট্যাক্সি থেকে নেমে বিশুদ্ধ বিহারী বাংলায় কঁকিয়ে ওঠে- ‘ছেনা! আরে ও ছেনা বাবু!’ প্রেস্টিজ তখন বোধহয় নিজের লেবেল মুছে ফেলে মাটিতে মিশে যেতে পারলেই বাঁচে।

পরে কে কাকে কি বলেছিল সে নিয়ে আর কিছু বলছি না। তবে মেয়েটি ছানার একদম নিজের রেজিস্টার্ড শালী ছিল বটেক। তার নির্ভেজাল চরিত্র- পাঠকপাঠিকারা অন্য কিছু ভেবে না বসে বরং দুটো সন্দেশ খেয়ে জল খান। ছানার সন্দেশ হলেই সবথেকে ভাল। পেট ঠাণ্ডা থাকবে!

(১০১)


আলটিমেটলি নেহি নেহি করতে করতে মৌসুমী বায়ু প্রবেশ করেই ফেলল বলুন? তার উপর ছুটি কাটাতে কোলকাতায় বসে বসে মৌসুমী আকাশের স্মৃতিমেদুরতা, ইলশেগুঁড়ির চাদর, তাপমাত্রার হালকা ভাব, ছাতায় ছাতা মহানগরের রংহীন সৌন্দর্য্য, আর সবুজ সবুজ আর সবুজ। সব মিলিয়ে গত শতাব্দীর দিনগুলোতে ফিরে যাচ্ছি যেন। সেই কোন সুদূর কালে আমিও তো এই শহরেরই ছিলাম। আজ রোমিং-এর বাসিন্দা হবার পরেও এখনো টান খুঁজে ফিরে ফিরে আসি।

রোমিং বলতে মনে পড়ল, আমার ফোনটি গিয়াছে। মানে গিয়াছিল… আজকের হাইটেক যুগে সবই তো ফিরে আসে নতুন রূপে নতুন বেশে। তবুও প্রথমবার যখন বিদায় নেয় তখন বুকের নীচে একটা ছ্যাঁত করে আওয়াজ তো হয়ই।

শহরে এখন নতুন ট্যাক্সি, নো রিফিউজাল। হাজার খানেক নো রিফিউজাল ট্যাক্সি বাজারে ছাড়া হয়েছে, যার লাইসেন্স ফি মকুব করে দেওয়া হয়েছে। তার মানে আর বাকি হলুদ রঙ-এর বা হলুদ কালো কচ্ছপগুলো সারা শহর জুড়ে ঘুরে বেরায় যার সংখ্যা হাজার তিরিশেক সেগুলো কি রিফিউজ করার লাইসেন্সপ্রাপ্ত? ট্যাক্সি মানেই কি নো রিফিউজাল হওয়া উচিত নয়? কলেজে পরার সময় এক স্টুডেন্ট লীডারকে প্রশ্ন করেছিলাম, “এই যে তুই যে সব কাজগুলো ইউনিয়ন করেছে বলে গলা ফাটাচ্ছিস, সে কাজগুলো করাই কি ইউনিয়নের কাজ নয়? তাহলে আলাদা করে মাইলেজ নিচ্ছিস কেন?” সেদিনও উত্তর ছিল না আজও নেই।

যাই হোক, এবার নগর কোলকাতায় আমি দুইখান জিনিস ট্যাক্সির বুকে হারিয়ে এসেছি। একটি আমার পিতৃদেবের প্রাচীন প্রবাদের মতো মিশকালো ছাতা যেটি সল্টলেক সিটি সেন্টার যাবার পথে ট্যাক্সিতে ফেলে বেরিয়ে এসেই ফের ধাওয়া করে ধরতে গিয়ে দেখলাম সব ট্যাক্সিকেই এক রকম লাগছে। আর অপরটি আমার মোবাইল। সখ করে আমার পার্শ্ববর্তিনীর দেওয়া চলমান মুঠোফোনটিকে হঠাৎ বৃষ্টিতে মেয়েকে ছাতায় মুড়ে নিয়ে আসতে গিয়ে ট্যাক্সিতে ফেলে চলে এলাম গত সোমবার। তারপর অ্যান্টি থেফট সিস্টেম চালু করেও সারা দিল না সে। সব শুনে আমার এক বন্ধু বলল কাল, “এই জন্যই তো বিল নেওয়া উচিত ট্যাক্সি থেকে!” হ্যাঁ, যেন আগে থেকে জেনে বসে আছি তো যে ‘এই সেই ট্যাক্সি যেখানে আমি আমার মোবাইল হারাবো!’ (ভার্জিন মোবাইল বলে একটা মোবাইল পরিষেবা ছিল না?)

যাই হোক, সকাল হতেই কাগজপত্র গোছাগুছি করে চললাম স্থানীয় থানায়। যে থানায় সেই পনেরো বছরেরও বেশী আগে গেছিলাম চাকুরীর শুরুর ভেরিফিকেশনের ফিকিরে। এতদিন পরেও বাহ্যিক রূপ থানাটার পালটায় নি। সঙ্গে ছেলে ছিল, সে এখন কদিন ধরে ফেলুদা পড়ছে। থানায় ঢুকে বেশ একটা রহস্য রোমাঞ্চ অনুভব করতে শুরু করল। আমায় ফিসফিস করে বললও, “লাইফে ফার্ষ্ট টাইম থানায় ঢুকেছি”।

তা ছোটবাবু আমায় স্বভাবমতো চাটতে শুরু করলেন। “মোবাইল হারিয়েছেন? কাগজপত্র এনেছেন?” এও সেই ট্যাক্সির বিলের মতো কথা বলে রে! আরে মশাই আমি শহরে এসেছি কি মোবাইল হারাব ধরে? “না আমাদের উপর নির্দেশ আছে!” নাছোড়বান্দা তিনি, আমিও। মেজবাবুকে ধরে বোঝাতে, সে তরুণ তুর্কী বুঝে গেল। আমি তাকে বললামও আপনাকে মোবাইল খুঁজে দিতে হবে না। খোঁজার হলে সে আপনিই আমায় মেল করবে। (অ্যান্টি থেফট প্রযুক্তি বলে কথা) শুধু ডাইরি করে নম্বরটা দিন আমার সিমকার্ডটা উদ্ধার করি। অতঃপর দ্রুতই পুলিশের ছাপমারা কাগজ নিয়ে ছুট লাগালাম ম গা রোডের এয়ারটেল পরিষেবা কেন্দ্রের পানে।

ভাস্কর বলে একটি খুব মিষ্টি ছেলে আমায় অনেক হ্যাঁচড় প্যাঁচড় করে বলল যে, পার্ক স্ট্রীটের পরিষেবা কেন্দ্রে দিল্লির পোস্টপেড সিম কার্ড আছে। পার্ক স্ট্রীটের কাছেই তো ভারতীয় যাদুঘর!

গেলাম- পরিচয় পত্র, ঠিকানা, ছবি সব নিয়ে বাবু কহিলেন, ‘বুঝেছ উপেন, আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে তোমার ফোন চ্যাঁ ভ্যাঁ করতে শুরু করবে। সিমকার্ডটি পকেটে পুড়ে গেলাম ছেলে বগলে লালবাজার। তুমুল বৃষ্টির মধ্যে গাবা মোবাইল স্টোরের ভুজুং ভাজুং পেরিয়ে একই মোবাইল বগলদাবা করে বাড়ি ফিরলাম। ধীরে ধীরে নম্বরগুলো গুগল মেঘ থেকে উদ্ধার করা গেল। ফোন ছুটতে শুরু করল ইতিউতি, “এটা নতুন নম্বর?” “ওমা সিম হারিয়ে গেলে তো নতুন নম্বরই হয়!” না না নতুন সিমে পুরনো নম্বর পুনরুদ্ধার করা হয়! “যাঃ তা হয় নাকি?” ইত্যাদি এবং প্রভৃতি।

দুদিন এদিক ওদিক কাজে অকাজে কেটে গেল! কাঙ্ক্ষিত সময় আর আসেই না। যতবারই মোবাইল খুলি, “পরিষেবায় অনুপস্থিত”-এর পোঁ বেজেই চলে। শেষে বাহাত্তর ঘণ্টার মাথায় আবার ফিরে গেলাম ম গা রোডের কেন্দ্রে।

ভাস্কর খুব মাই ডিয়ার ছেলে। সঙ্গে সঙ্গে নিজের ল্যাপটপ খুলে দেখিয়ে দিল যে আপনার আবেদন না মঞ্জুর হইয়াছে। আপনার ঠিকানার প্রমাণ পত্র পঠনযোগ্য নয়। আহা এই কথাটি আমাকে আগে জানালে না বাবা? উচিত হয় নি! আমি তাকে বোঝাতে বসলাম- আমার তো পোস্টপেড। ঠিকানা নিয়ে কি করবে বাবা। পরিচয় নিশ্চিত কর! আমিই সেই ব্যক্তি কি না! যে হারানো নম্বরটি ব্যবহার করে! ছেলেটি বুদ্ধিমান চট করে বুঝল। তারপর বলল আপনার লাইসেন্স এনেছেন? হ্যাঁ অফ কোর্স! তবে ইউ পির লাইছেন কি না? জালিয়াতি এড়াতে এরা এমবস করিয়ে বানায়। ফটোকপি করা সম্ভব হয় না। স্ক্যান করে দিচ্ছি! বিকালে চার ঘণ্টা পরে ফোন করবেন প্লিজ।

দুপুর গড়িয়ে বিকেলে, ফোন- ও হ্যাঁ, স্যার আপনার সিম কার্ডটায় সমস্যা আছে। আপনাকে আবার পার্ক স্ট্রীটে ফিরতে হবে। অগত্যা, মৌসুমী পুলওভার আর ইলশেগুঁড়ি চাদরে মুড়ে গেলাম মেট্রো চড়ে পার্ক স্ট্রীটে ফিরে। হাতে হাতে সিম। রাত দশটার মধ্যে কাজ করতে শুরু করবে।

আমি ফিরে এলাম গিরীশ পার্কে। ইন্টেন্সিটি বেড়েছে সিটিটার, বৃষ্টির অন্ধকারের মানুষের সকলের। ঘরে ফিরতে গিয়ে দেখি না বাস না অটো ওঠার মত অবস্থাতে কেউই নেই! রাস্তাই নেই এগিয়ে যাবার। ঢিকির ঢিকিরে বাবা আমার চিরকালীন অ্যালার্জি। এই পথ যদি না শেষ হয়।মার হাঁটা। মানিকতলা পর্যন্ত আসার পর শরীরের স্বেদও ফুরিয়ে যায়। ফাঁকা অটোর আগমনে ব্যাঘ্রলম্ফে প্রথম সীটটি দখল করে ফিরে এসে দেখি, যে সকল বাস আমি পিছনে ফেলে হাঁটতে শুরু করেছিলাম সেগুলো পিছনে পিছনেই আসছে।

ছাড়ুন সে সব কথা, কোষ্টা রিকা ইতালির ঘাড় মটকাচ্ছে। শেষ দশ মিনিট ঘড়িতে এগারো ছাড়িয়েছে কিন্তু আমার মোবাইল বাক্যহীন। ফোন লাগালাম পরিষেবায়, প্রিপেড ঘুরে পোস্ট পেডে যেতে লাগল পাক্কা সাত মিনিট। টোটকা নিয়ে ফিরে এসে দেখলাম কার্যোদ্ধার হয় নি। আবার ফোন লাগালাম। পারদ চড়ছে। একজন স্পষ্ট বলে দিল যে দিল্লির সিম এখানে অ্যাক্টিভেট করা সম্ভব নয়। গলা চড়ালাম। মাজাকি পায়া হ্যায়? সাত কাণ্ড রামায়ণের পর সীতার শ্বশুর ধৃতরাষ্ট্র! লাইনে এল পোস্ট পেড বাবাজী। তার হাজারো ল্যাঠা, নামের বানান ঠিকানার বানান শেষে বিকল্প নম্বরের বানান জিজ্ঞাসা করতে আমি একটু তোতলালাম! অত কি আর মনে থাকে ছাতা দশ বছর আগে কি নম্বর দিয়েছিনু! সে আমায় চার্জ করে! আপনি বিকল্প নম্বর বলতে পারছেন না তাহলে কি করে হবে বলুন! এবার সত্যিই নর্মদায় জল এল! ভাকড়ায় ভাঙন! আপনি পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করুন আমি আমার বায়োডাটা আপনাকে সবিস্তারে দিচ্ছি কিন্তু তারপর যদি আমার মোবাইলের আওয়াজ না শুনতে পাই তো আপনি কাল ভোরের সূর্য দেখবেন না! (মাস্টারমশাই, আপনি কিন্তু কিছু দেখেন নি!)

সারা বিশ্বের পরিষেবা অধিকারীদের দোষ হল, মধুর ভাষণ না শুনলে তারা বিশেষ পাত্তা টাত্তা দেয় না! আহা আপনাকেও তো সঠিক পরিষেবা কোড ব্যবহার করতে হবে! প্রয়োজনে তা দু অক্ষর থেকে চার অক্ষর পেরিয়ে ছয়েও যেতে পারে। আমি অবশ্য ভিন্ন কোড ব্যবহার করলাম। ভাষার কোড। বাঙালী হয়ে নিজের শহরে ফিরেও দিল্লির দোহাই দিয়ে আমি ফোন ব্যবহার করতে পারব না? কাজ হল ম্যাজিকের মতো। সে সব দেখে শুনে বলল, যান আপনার কাজ হয়ে গেছে! অফ করে অন করুন! ম্যাজিক সত্যিই! প্রায় চার দিন পরে আবার আমি নিজের মুঠোফোন পরিচিতি ফিরে পেয়েছি। এ যেন বিশ্বকাপ জেতার সুখ। আহা গোবরের পদ্মফুল যেন।

আজ তবে এই পর্যন্তই থাকুক! তবে কি না একটা কথা বলব পাঠকপাঠিকারা মাথায় রাখবেন! কলকাতায় দেখছি শুদ্ধ হিন্দি বললে বাংলাভাষীর থেকে বেশী কদর পাওয়া যাচ্ছে। বলতে গিয়ে মনে পড়ে গেল কদিন আগের কেকেআরের সরকারি সেলিব্রেশনের স্যাটায়ারখানা! শহরের ভাষা পাল্টাচ্ছে- ভাষা পাল্টাচ্ছে! বাঙালী এখন কলকাতায় সংখ্যালঘু! নগরবাসীরা একটু ভেবে দেখুন! মাথা বিকিয়ে গেলেও রোজকারের রোজগেরে জীবনের ফিকিরে যেন ভাষাটা সরস্বতী নদী না হয়ে যায়!