(৯৭)

ফিসফাস বলতেই তো ঘনঘটা ভরা জীবনকাহিনী লেবুর আচার, কাঁচা সরষের তেল আর নুন লঙ্কা পেঁয়াজ দিয়ে মেখে খাওয়া। কিন্তু যারা জীবনের কথা বলে তাদের কথা বললে তো ফিসফিসিয়ে বলা যায় না! গম গম করে মাইক না বাজালে আর সার্থকতা কোথায়! আসলে আজকের স্বঢোলক বাজনদারদের যুগে কোথায় যেন মাটির কাছাকাছি কথাগুলো চাপা পড়ে যায়। সে ফেসবুকের পাতাই হোক, ব্লগের আয়নাই হোক বা মঞ্চের মূল অধিষ্ঠান ।

যাই হোক পাঠক/ পাঠিকারা, অনেক ভেবেচিন্তে আমার স্বল্প লব্ধ জীবন দর্শন আর নব্য লব্ধ স্বচক্ষু দর্শনের পাঠলিপিই আপনাদের সামনে রাখবার চেষ্টা করছি! হয়তো কিছুদূর যাব, হয়তো তা যথেষ্ট নয়! তবু শুরু তো কোথাও না কোথাও করতেই হয়?

সত্যি বলতে কি আমি জীবনে একবার শান্তিনিকেতনে গেছি, বার কয়েক বীরভূম বর্ধমান বাঁকুড়া আর দুইবার কাঠফাটা পুরুলিয়ায় গিয়ে পুড়ে হেজে একসা হয়েছি! কিন্তু শহুরে মনন নিয়ে বঙ্গ সংস্কৃতির ফুল চচ্চড়ি নিয়ে চড়বড়িয়ে গরম ভাত মেখে খেতে তো জুড়ি নেই। তাই আর পাঁচজন অগ্রজ বঙ্গবাজনদারদের মতই হেব্বি বোদ্ধা হয়ে গেছি এই ভাব নিয়ে কেশর ফুলিয়ে ঘুরে বেরাই। মাটি আর চটির মধ্যে যে ধীরে ধীরে বেশ কিছুটা ফাঁক তৈরী হয়ে যাচ্ছে তার হদিশ নেই!

হুঁশ ফেরে টালমাটাল হলেই! তা গত কয়েক মাস ধরে দিল্লীর বঙ্গকৃষ্টির মেশিনের তেল গায়ে মাথায় মাখতে গিয়ে এখন বুঝতে পারছি! টালমাটাল না হলে মানুষ কি আর হাঁটতে শেখে! পড়বি আর উঠবি ঘোড়ার মতো ছুটবি!

শুরু হয়েছিল পূজোর সময়! বাঙালীর দুগগা পুজো মানে তো ধুতি পাঞ্জাবী চাপিয়ে অঞ্জলি সুখ নিয়ে ঢাকের বাদ্যি আর ধুনুচির ধোঁয়া শরীর মনে নিয়ে সংস্কৃতির লিমেরিক লেখা! যেখানে প্রথম দুই আর শেষ লাইনটি বরাদ্দ রঙ মেলান্তি পরিচিত মুখেদের জন্য আর দুয়োরাণীর ঘরে মাঝের দুই লাইন থেকে যায় তথাকথিত বঙ্গ সংস্কৃতির মাটির প্রতিমা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য।

খেলাটা সেই মাঝের দুই লাইন নিয়েই! ঘুরে ঘুরে এজেন্ট ধরে খোঁজ খবর নিয়ে এসে বাংলা মায়ের বুকের নির্যাস তুলে আনতে হয়! তারপর আর কি! প্রবাসী নতুনত্বের পূজারী বাঙালী নতুন মোড়কে পুরনোকেই আহবান করে দুই বাহু খুলে! সঞ্জয় মণ্ডল ও তার ক্রিয়েটিভ ওয়েস্ট আর্ট সেন্টার হল সেই রকমই একটি দল! ফেলে দেওয়া রঙের ড্রাম, ফেরুল পাইপ, খালি বোতল, পাথরকুঁচি, আর কি না কি নিয়ে অ্যাফ্রো অ্যামেরিকীয় কায়দায় অভিনব ব্যাণ্ড। ঢাকের বাদ্যি আর শাঁখের বোল একজায়গায় উঠে এসে একদম জমজমাট কাণ্ড, আর তার সঙ্গে যদি যুক্ত হয় আধুনিক মঞ্চ সজ্জার ম্যাজিক আর আলোর কারিকুরি! তব তো কেয়া বাত মিয়াঁ।

মজাটা হল অন্য জায়গায়, যখন আমি কোলকাতায় গিয়ে ওদের সঙ্গে দেখা করলাম! তখন দেখলাম ঠিক কি প্রচণ্ড পরিশ্রম এবং অধ্যাবসায় নিয়ে সুরতাললয় মিলিয়ে রামধনু গড়ে তুলছে ছেলেগুলো! টিভি চ্যানেলগুলো আসে নিজেদেরকে মসিহা প্রমাণ করতে! লোককে ডেকে ডেকে দেখায় দেখ এদের ট্যালেন্ট- আমরাই তুলে এনেছি! আর তারপর? সময় ফুরলেই স্লামডগ মিলিয়নিয়ারের বাচ্চাগুলোর মতো বাস্তবের জমিতে আছড়ে ফেলে দেয়! তখন প্রকাশিত আলোকেই বার বার হাত তুলে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেবার প্রচেষ্টা! কখনও সফল বা কখনও অন্ধকারই সম্বল। তবুও বিশ্বাস হারায় না! পারতে যে হবেই!

পারেও তারা, দাদারা দিদিরা নতুন ঢং দেইখ্যা দুই পয়সা দেয়! আবার আবার কইর্যাত ডাক পাঠায়! আয় আয় আয়! এভাবেই চলে নতুন দিনের সংগ্রাম! আর আমরা রসসিক্ত অবস্থায় বেশী দিন থাকতে পারি না বলে নতুন মনোরঞ্জনের খোঁজ পড়ে। বঙ্গ সংস্কৃতি, তোমার ভাসান যাবার দিনেও যেন ঠাকুরের নাক আর চোখ ভেসে থাকে!

সেই সূত্র ধরেই খুঁজে খুঁজে পাই নাটুয়া, ছৌ, কবিগান আর রায়বেঁশেদের! এর মধ্যে ছৌ অধিক পরিচিত- আজকের দিনে বাংলার মুখ দেখিতে গেলেই দেখা যায় কার্তিকের মুখোশ! যা তারা মাটির লেপের উপর কাগজ কাপড় চাপিয়ে শেষে মাটির প্রলেপ দিয়ে সালঙ্কারা করে তৈরী করে নিয়মিত কষ্টসাধ্য অভিনয়য়/ পারফরম্যান্সের জন্য! আমরা অবাক বিস্ময়ে দেখি হাততালি দিই, আর তারপর মুখ থেকে মুখোশ টেনে খুলে ফেলে ড্রয়িং রুমে টাঙিয়ে দিয়ে সমবেত হর্ষোল্লাসে মেতে উঠি।

কবিগান তো সেই পুরাকালের অ্যান্টনী ফিরিঙ্গি আর হালের জাতিস্মরেই সীমাবদ্ধ, ভোলা ময়রা, হরু ঠাকুর, ঠাকুর সিংহ নামগুলোর সঙ্গে সঙ্গে গানগুলোও তো স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে রয়েছে। কিন্তু ১৮৩০-এর পরেও তো পৃথিবী এগিয়েছে! কবিগান কোথায় গেছে? সে তো সেই শহরের গণ্ডী পেরিয়ে নদীয়া, বর্ধমান, বীরভূম বাঁকুড়াতেই গেছে আটকে! ট্র্যাডিশন আছে কিন্তু ট্র্যাজেডির অংশীদার হয়ে! মাঝে সাঝে হয়তো ডাক পড়ে! সরকারী বেসরকারি অনুষ্ঠানে! বাইরে থেকে আসে ডাক! তখন লোটা কম্বল গুটিয়ে এক সন্ধ্যার বাদশা! “আরে ওয়াহ! এ তো দারুণ” “খুব ভালো লেগেছে!” ব্যাস এই পর্যন্তই! ক্ষীর খেয়ে যায় খয়ের খাঁরা!

গল্পের শেষভাগে এসে পড়ে নাটুয়ার দল আর ব্রতচারী গ্রামের রায়বেঁশে নাচ! নাটুয়ার আবার একটি পৌরাণিক ইতিহাস আছে! নটরাজ বিবাহে নন্দী ভৃঙ্গী নাকি নেচেছিলেন এই নাচ! রাম সীতার বিয়েতে চন্দ্ররাজ নেমে এসেছিলেন মর্তে নাটুয়া নাচতে!

আর গুরুসদয় দত্তের ব্রতচারীগ্রামের রায়বেঁশে নাচের সঙ্গে তো আধুনিক বাংলার গর্বের ইতিহাস জড়িত! বাঁশের উপর উঠে সাইকেল চালানো নাগরদোলায় ঝুলিয়ে দুপায়ে ঘোরানো! বা মিলিটারি টাট্টুর মতো দেহ সৌষ্ঠব! এই নিয়েই রায়বেঁশে এই নিয়েই অ্যাক্রোব্যাটিক বাঙালীর আন্তর্জাতিক বিকাশ! মাঝে মধ্যে পুরস্কারও জোটে বটে! হাজার হোক! কষ্টসাধ্য সাধনার ফল! তাকে তো মানব বিকাশ- সংস্কৃতি রক্ষার নামে মাঝে সাঝে সামনেও আনতে হয়! কিন্তু তারপর আমরা ভেবেও দেখি না এরা কোথায় যাচ্ছে! কি খাচ্ছে কি পরছে আর কিই বা পড়ছে! কাজের বেলায় কাজী কাজ ফুরলেই না জি!

তাই মুর্শিদাবাদের পুরস্কার প্রাপ্ত আবুহোসেন নিজের ট্র্যাডিশন বাঁচিয়ে রাখার কথা চিন্তা করে রায়বেঁশে আকাদেমি খুলতে চায়! প্রতিশ্রুতির বন্যা বয়ে যায় হাততালির মাঝখানে! কিন্তু সত্যিই বা কটা সাহায্য এসে পৌঁছয় মাটির কাছে?

সে যাই হোক ফিসফাসের পাতায় তো আর বিষোদ্গার করা যায় না! হাজার হোক এরও একটা ট্র্যাডিশন তৈরী হচ্ছে! তাই সেই বয়স্ক ব্যক্তির কথা দিয়েই পাঠক পাঠিকারা আজকের এই অন্যরকম খবুরে ফিসফাস শেষ করি! নববর্ষের শুভেচ্ছা দিতে উঠে তিনি বললেন, “বঙ্গ সংস্কৃতি মানেই তো আমরা শহুরেরা রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, অতুল প্রসাদ বা হালফিলের ব্যাণ্ডেই আটকে যাই! একটু বাইরে বেরোলে হয়তো দেখতে পাব পরিধিটা আরও বড়!” বড়ই তো! তাও তো ভাদু, ভাটিয়ালি, কীর্তন, বাউল, ঝুমুর, লঘুড় নাচ, রণপা নৃত্য, মন্দিরা গম্ভীরা নৃত্য ইত্যাদির কথা বললাম না!

দুই পা ফেলে ঘর হতে বেরিয়ে দেখুন বন্ধুরা, শিশির বিন্দুরা আজও ধানের শিষের উপর সসম্মানে বর্তমান! শুকনো বাণিজ্যায়নের প্রখর দাবদাহতে তা শুকিয়ে যায় নি!

(৯৬)


এক একটা দিন উঁচু নীচু
কেউ নিলে পিছু
টোকা দিলে চুপিসাড়ে কোণের দরজায়-

সেই রকম কালকের দিনটা ছিল বটে। মানে দেখতে গেলে কিস্যুটি না আবার না দেখলে অনেক কিছু। এই যেমন ধরুন অফিসের মিটিং-এ যাব বলে উর্ধ্বতন অধস্তন মিলিয়ে জনা চারেক তৈরী হয়ে অফিসের গাড়িতে চড়ে বসেছি। প্রস্তুতি বেশ ভালই হয়েছে। একেবারে “ফাটায়ে দেসো” শোনার জন্য তৈরী হয়ে যেই বেরিয়েছি ওমনি কোথাও কিছু নেই একখান সাইকেল রিকশা সম্পূর্ণ উল্টো দিক থেকে ছুটে এসে আমাদের গাড়িটাকে আক্রমণ করল।

সরকারী গাড়ি এমনিতেই ভীতু টাইপের হয়, তাই কুমীর তোমার জলকে নেমেছি করে নামতে গিয়েই ব্রেক মেরে দিয়েছিল বলে জাটিঙ্গা রিকশাটা তো গেল বেঁচে, কিন্তু একটা কান নড়ানো “চড়াক” করে আওয়াজ হল বটে। অফিসের গেট থেকে গার্ড দৌড়ে এল। এসেই গাড়ির দিকে না গিয়ে রিকশার দিকে চলে গেল এবং আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে রিকশার চাকার স্পোকগুলি থেকে কুড়কুড় করে আমাদের গাড়ির নম্বর প্লেটটা তুলে নিয়ে এসে খ্যা খ্যা করে হাসতে লাগল।

আমাদের গাড়ির ড্রাইভারটি একদম সজ্জন ব্যক্তি। সরকারী ভাষায় একদম “গৌ হ্যায় গৌ”। সে নিঃশব্দে দাঁত বার করে নম্বর প্লেট এবং তত সংলগ্ন কুড়নো বাড়ানো টুকরোগুলি তুলে নিয়ে এসে ডিকিতে রেখে দিয়ে আবার হাসিমুখেই আমাদের নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে দিল রওনা।

তারপর আর কি? মিটিং টিটিং উইদাউট ইটিং চলল বেশ কিছু দূর। আমাদের জয়েন্ট সেক্রেটারী ভদ্রলোকটি মাত্র গত বছর ইউপির মতো বিভূঁই থেকে এয়েচেন। ব্রিটিশ মানসিকতা ছাড়তে পারেন নি তাই মিটিং-এর নামে বাজার বসাতে জুড়ি নেই। তায় আবার কাল ছিল ফ্লাইট ধরার তাড়া। তাই সেই এলাটিং বেলাটিং মিটিং শেষ হতে হতে বিকাল চারটে।

কাজের নামে অষ্টরম্ভা তায় আবার চিচিং ফাঁক আর হরকরকম্বা…। আগে খুব অসুবিধা হত, পেটের ভিতর ভূমধ্যসাগর থেকে আগত শঙ্খধ্বনি শোনা যেত। আমার আবার খিদে পেয়ে গেলে মাথা খারাপ হয়ে যায়। সেই পরিস্থিতিতে মাথা ধরে গিয়ে বিগড়ে গিয়ে কি যে সব কাণ্ড হত তা ছাতা আদ্ধেক বুঝতেই পারতাম না। এখন অনেক বেশী সেয়ানা হয়ে গেছি। মাঝে কড়ে আঙুল যাবার নাম করে বেরিয়ে টুক করে মুখে দু চারটে রুটি আর তরকারি গুঁজে চলে আসি।

সে যাই হোক। মিটিং সম্পন্ন করে বাক্স প্যাঁটরা সহযোগে ফিরে আসছি অফিসের উদ্দেশ্যে এমন সময় ঘটল ঘটনাটা। এমনিতেই জাত্যাভিমানী বাঙালী নিজের পশ্চাতে চপেটাঘাত করার অভিযোগে ফিসফাসকে অভিযুক্ত করেছেন এবং তার উপর এর পরের এপিসোডে যা কহতব্য তার পর না আমায় দিল্লী থেকেই বার করে দেয়।

ভাগ্যিস অধিকাংশ জাঠ বাংলা পড়তে পারে না! (ফিসফাস এতটা ফেমাস হয় নি যে যে কয়েকজন নখে গোনা জাঠ বাংলা পড়তে পারেন তারাও পড়ে ফেলে আমাকে পেড়ে ফেলবেন!) তাই সাহস করে লিখে ফেলছি।

দিল্লীতে এখন ঝাঁটতুতো নেতা আর জাঠতুতো পুলিশের খুব রমরমা। আপনি কি বলছেন তাতে বিন্দুমাত্র কর্ণপাত না করে নিজস্ব প্রোপাগাণ্ডার হারমোনিয়ামে বেলো টিপে যাবে।

তা হল কি- মাণ্ডি হাউস থেকে তিলক ব্রিজের দিকে এসে যেই পথ ঘুরেছি অমনি তিনটে মুসকো জোয়ান জাঠ বেরাদর পুলুশ বাবা বেরিয়ে এসে গাড়ি থামিয়েছে। শুরুতে কিছু বলি নি! ড্রাইভারকে লাইসেন্স বার করতে বলে দেখি হাবিজাবি লিখতে শুরু করেছে! তখন আমি তাকে ডেকে বললাম, “ব্রাদার, ইয়ে সরকারি গাড়ি হ্যায়! সুবহ সুবহ এক সাইকেল রিকশা নে চুম্মি লেকে চলা গয়া। নম্বর প্লেট তো সাথ মে রাখা হ্যায়। লাগানে কি টাইম মিলতেই লাগা লেগা!” তা জাঠ বুদ্ধি, বলে কি না, “সরকারি গাড়ি হ্যায় তো কেয়া নিয়ম তোড়েগা?”

ব্যাস যায় কোথা। আমার ডেপুটি সেক্রেটারিকে বললাম “হটিয়ে! উতরনে দিজিয়ে!” নেমেই সে ব্যাটা সাড়ে ছে ফিটকে গিয়ে জিগালাম, “হাঁ ভাই কেয়া সমস্যা হ্যায়?” সে তো ঘোড়ার ঠুলি পড়েই পৃথিবীতে এয়েচে। সেও বলে যে গাড়ির নাম্বার প্লেট নেই তাই নিয়ম ভেঙেছে! কথা প্রসঙ্গে বলে বসে, “আপ ওর্দিপে পুলিশবালে কি সাথ বহেস কর রহে হো!” আর যায় কোথা! এতক্ষণ তবু টুপুর টুপুর আরব সাগরের ঢেউ ছিল, এবারে তো সুনামি! আমি ঠাণ্ডা মাথায়, গলা চড়িয়ে বললাম, “যাও পহলে তুম কেস ঠোকো! ফির ম্যায় বতা রাহা হুঁ বহেস অউর বত্তমিজিকি পরিভাষা কেয়া হোতি হ্যায়!” সে বলে কি না, “ভাই আওয়াজ থোড়া নীচে!” আমার ভিতরে তখন দিল্লীর সবকটা চিৎকৃত নেতা ভর করেছে। বলেই দিলাম, “পহলে আপ আওয়াজ নীচে করকে বাত করো ফির হাম শোচেঙ্গে!”

বেগতিক দেখে একটু বয়স্ক এক কনস্টেবল এসে বলল, “স্যর ঠাণ্ডে দিমাক সে ভি বাত হো সকতে হ্যায় না!” আমায় তখন রোখে কে, তাকেও দিলাম জ্ঞানের কথা শুনিয়ে, “আরে ভাই আপ জ্যায়সে বাত কর রহে হো ওয়সে বাতচিত হোনে সে তো ম্যায় হাত জোড়কে বাত করতা! আপনা কলিগ কো তমিজ শিখাও!” সেও তখন তার কনিষ্ঠ কলিগটিকে একটু স্নেহের বকাবকি করে দিল। কিন্তু কুকুরের লেজ তো সোজা হয় না! সেই জাঠ তরুণ তারপরেও কিন্তু পরন্তু করছিল বটে। আমি আমাদের ড্রাইভারকে বললাম, “চলো হিঁয়াসে!” সেও সেই দাঁত বার করেই গাড়ি নিয়ে এগিয়ে গেল অফিসের উদ্দেশ্যে!

যাবার পথে আমার থ হয়ে যাওয়া সিনিয়র ও জুনিয়রকে জ্ঞান দিতে ছাড়লাম না! “নরম পড় যাওগে তো রোব ঝাড় দেগা!” তারাও দেখলাম মাথা নেড়ে আমার সঙ্গে সহমত হল! “হাঁ জি আপনে ঠিকই কিয়া!” ব্যাস সমগোত্রীয়দের সম্মতি পেয়ে গেলে আর কি চাই!

কিন্তু ক্যারাটা বোধহয় লেগেই রইল। নইলে আর রাত্তিরের ঘটনাটা ঘটে?

হয়েছে কি, আমার একই অঙ্গে এত রূপ যে কি বলব! মানে যেই আমি সিরিয়াস সিনেমা দেখি, সেই আমি গোবিন্দার ফিলিম দেখে উদ্বাহু হই! যেই আমি ডায়বেটিস মার্কা বলিউডি রোমান্স দেখে নাট সিঁটকোই, সেই আমি অ্যানিমেশন আর সুপার হিরো ফিল্ম দেখে বগলে ফোঁড়া নিয়ে ঘুরে বেরাই। তা সেই এক সুপারহিরো ফিল্ম এসেছে কদিন আগে আর লোকমুখে শুনেছি যে জিনিসটা মন্দ হয় নি!

ছেলেকে সারপ্রাইজ দেব বলে ধরে নিয়ে কাল রাতে টিকিট কাটতে বসলাম আজ অর্থাৎ আট তারিখের জন্য। তা দেখি কি সব কটা শো সন্ধে বেলায় আর একটা তো ভর রাত্তির দশটা চল্লিশে! তা ভেবে দেখলাম আজকের ছুটির সদ্ব্যবহার করতে গিয়ে কাল রাত্তিরেই দেখে নেওয়াটা হবে বুদ্ধিমানের কাজ! তা ফিল্মি ওয়েবসাইট গুলো সময় দেয় মোটে সাত মিনিট। তারপর আমার আড়াই মাসের কন্যারত্নটির দৌলতে আমাদের বাড়িতে মাঝে মধ্যেই এম এস সুব্বালক্ষ্মী আর লতা মঙ্গেশকর একসঙ্গে রেওয়াজ করেন (তৃতীয় লিঙ্গের দলবলও ভয়ে এসে উঠতে পারে নি এত দিনে)। তা কাল ছিল সে রকমই এক সন্ধ্যা। সুরের মূর্ছনার ঠেলায় দিন গেলাম ভুলে আর টিকিট কেটে বসে রইলাম আজকের।

কিন্তু বেকুব বনে গেলাম যেই টিকিট নিয়ে ছেলেকে সারপ্রাইজ দিতে যাব। নিত্যানন্দ হয়ে মোবাইলটা খুলে দেখাতে গিয়ে দেখি যে তারিখে সাতের জায়গায় আট লেখা! লে হালুয়া। রাত দেড়টায় ফিল্ম শেষ হবে তারপর সকাল সাড়ে পাঁচটায় উঠেই স্কুল নিয়ে কুস্তি! বাপরে সে তো চটকে চুয়াত্তর ব্যাপার হবে! তা বেগতিক দেখে ফোন করলাম বুক মাই শোকে! সে শোকে অশোকে ইনিয়ে বিনিয়ে জানিয়ে দিলে যে হবে নি কো! যদি না ধরে করে হলের ম্যানেজারকে কোন ব্যবস্থা করতে পারি!

অগত্যা আবার একটি টিকিট কেটে রওনা দিলাম হলের উদ্দেশ্যে! এই অঞ্চলে বাড়ি থাকার সুবাদে টুক করে পাড়ার দোকান থেকে বিস্কুট আনছির মতো করে সিনেমা হলে পৌঁছে যাওয়া যায়! তা পিভিআর বিশাল বড় হনু মাল্টিপ্লেক্স তারা আমায় বুঝিয়ে বলে দিল যে সেটি সম্ভব নয়! তার থেকে যেন আমি কাউকে দান ধম্ম করে দি টিকিট দুটো! তা আমি আবার মুখ কাঁচুমাচু করে জিজ্ঞাসা করলাম যে “হ্যাঁ ভাই, আমি যদি তোমাদের হলের সামনে আমার দুইখান টিকিট কাল বেচে দি তাহলে আমাকে ব্ল্যাকার বলে পুলুশে দেবে না তো! মামাদের কাছে আমার একটা আলাদা রেপুটেশনা আচে না?” তা তারা তখন বরাভয় মূর্তি দেখাল!

আর আমিও বাড়ি ফিরে এলাম সিনেমা দেখতে যাবার তোরজোড় করতে। কি মনে হল ফেসবুকে লিখে দিলাম যে আমার কাছে দুইখান টিকিট আছে কেউ যদি দেখতে চাও তো দেখতে পার! লিখেই বুঝলাম চিত্তির! তাই আবার ডিসক্লেমার দিলাম, “বন্ধুগণ, এটিকে ডেটের আহবান ভেবো নি কো! আমি দুইখান টিকিটই গতহস্ত করব!” ব্যাস প্রথমে যারা নির্বিকল্প ছিল তারাও হইহই করে উঠল! আর খিল্লি খেউর চলতে লাগল!

সে যাই হোক সিনেমাটিক প্যারাডক্স-এর একটা অসম্ভব সুন্দর নিদর্শন দেখে কাল রাত আড়াইটেয় বাড়ি ফিরেছি! (প্যারাডক্স নয়? ক্যাপ্টেন আমেরিকা নাম্নী একটি সুপারহিরো বলছেন যে ব্যক্তিগত তথ্য সম্ভার কোন সংস্থার কাছে রেখে দেওয়া মানে ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং কোন একটি সংস্থাকে অসম্ভব শক্তিশালী করে দিয়ে ভারসাম্যহানী করা! ভাবা যায়? আজকের উইকিলিক্স আর আড়িপাতার যুগে, আমেরিকার অ্যানিমেশন যুগপুরুষ এ রকম উল্টো গানা গাইছে শুনলে, ওবামাবাবু মামাবাড়ি পালাতেও পথ পাবেন না!)

আজ সেই কাঙ্ক্ষিত দিন, এখনো ঘণ্টা পাঁচেক আছে বাকি! আশায় আশায় বসে আছি যদি সেই দুইখান অব্যবহৃত টিকিটের যদি কিছু হিল্লে হয়! নাহলে? নাহলে আর কি? সেই নির্বাক রাত্রে দুইখানি টিকিট নিয়ে আমি দাঁড়িয়ে থাকব সিনেমা হলের গেটের সামনে! ডবল অর নাথিং- ডবল অর নাথিং- ডবল অর নাথিং… নাথিং!!

(৯৫)

হলুদ ক্যাম্বিস ছেড়ে লাল বল ধরেছি তা বেশ কিছুদিন হল। তখনই আলাপ হল মহম্মদ আজহারউদ্দিন নামক একজন রোগাপাতলা শিল্পীর সঙ্গে। আলাপ বলতে তার কাজকর্ম আর কি! সবুজ ক্যানভাসে পাতলা তুলির মোচড়ে একই বিন্দুকে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট থেকে ফাইন লেগ বাউন্ডারির সুতো ছোঁয়ানো আঁচড়। ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট বা স্লিপ বা কভারে ক্ষুধার্ত চিতাবাঘের মত বলকে পাখির চোখ করা ফিল্ডিং। কত কিছুই তো ভারতীয়দের কাছে রোমান্সের মত নতুন স্বপ্ন নিয়ে এসে হাজির করেছিলেন। তারপর খ্যাতি তাঁকে নিয়ে কি করেছিল সেই হৃদয়ভঙ্গের ইতিহাসে গেলে এখনও গলার কাছটা টনটন করে।

তারপর তো ছিলই পরাধীন ভারতের আমার সবথেকে প্রিয় রেবেলিয়াস চরিত্র হায়দার আলি! যার নামে এই শহরের নাম। গদ্দাররা তাতে রাজ করেও নামটাকে মুছে ফেলতে পারে নি ইনশাল্লাহ!

সে যাই হোক, অতিরিক্ত ধানাই পানাই মূল বক্তব্যটির ক্ষতি করে। তাই সোজা কথায় আসি। দেড় দশক ধরে আজহার বাবুর শিল্পী সত্তায় ম্যারিনেটেড হয়ে এমনিতেই মজে ছিলাম তার পরে যোগ হয় ছিয়ানব্বইয়ের হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানির তড়কা আহা সে কি জিনিস ছিল বলে আর বোঝাই কাকে!

সেই ছিয়ানব্বইয়ের চারমিনারের পাশের নূরজাহান রেস্তোরাঁর ডিমের আকারের বাটিতে চুরচুর হলুদ সাদা ভাতের উপর অর্দ্ধেক হওয়া সিদ্ধ ডিমের উপুড় হয়ে আঁচ পোহানো, এ ডাল সে ডাল হয়ে উঁকি ঝুঁকি মারা চিকেনের লালচে হলুদ টুকরো আর ধোঁয়া ওঠা সুগন্ধের ভিতর দিয়ে দারুচিনিএলাচলবঙ্গ পিস্তাবাদামকাজু এবং আদাজুলিয়েনপুদিনাপাতার ফুলঝুরি রংমশাল। প্রতিটি গ্রাসে আপনি স্বর্গের নন্দন কাননে দোদুল দুলতে শুরু করবেন। আহা আঠারো বছর ধরে সযত্নে লালন করে এসেছি সেই প্রেম। হায়দারের প্রেম, হায়দ্রাবাদের প্রেম, আজহার-লক্ষ্মণের প্রেম, হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানির প্রেম।

আমার অতি প্রিয় দুই চরিত্র টাটকা টাটকা হায়দ্রাবাদবাসী। তাদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ তো ছিলই তার সঙ্গে ছিল পুরনো প্রেম ঝালিয়ে নেবার লোভ। তাই ঝোপ বুঝে কোপ মেরে টোপ গিলে নিলাম অফিসের কাজে নিজামি শহরে আসার অফারটা। এমনিতেই অবশ্য এই শহরটা গত বেশ কয়েকটা বছর ধরে ঘটি বাঙাল যুদ্ধ করে ক্লান্ত। যে যার ভাগ বুঝে নেবার জন্য একটা অকৃত্রিম রাজ্যের উপর দিয়ে র্যাঁেদা চালিয়ে দিয়েছে। সে যা হোক রাজনীতি তো সকলের পছন্দের স্যুপ হয় না তাই। সোজাসুজি মেন কোর্সে।

ভোরবেলা সাতটায় বেরোতে হবে, এই ভেবে যথা সময়ে অ্যালার্ম দিলাম বটে কিন্তু নবাগতা অতিথি দিলেন সব চটকে! ক দিন ধরে এমনিতেই বেশ ছুটোছুটি হচ্ছিল বটে, তাই কন্যারত্নটির ট্যাঁ টুঁ সামলে, রাত্রি তিনটেয় যখন ঘণ্টা আড়াইয়ের জন্য শুতে গেলাম তখন গত আড়াই সপ্তাহের ঘুম চুমো খেয়ে চলে গেল চোখে। ফলস্বরূপ ঘুম ভাঙল সকাল সাতটা কুড়িতে।

আনন্দময়ী মা আমার নিরানন্দ তুমি কবেই বা করেছ? ঝটাপট পার্শ্ববর্তিনীকে ডেকে তুলে দিয়ে নিজে বাথরুমে গিয়ে দেখি লোডশেডিং। গিজার পিরামিড বন্ধ! গরম জলের স্নানের মধুরেণ অবলুপ্তিপ্রাপ্তং। সে যা হোক বাড়িশুদ্ধু লোকের সমবেত সহযোগিতার মধ্যে বাদ বাকি জিনিসপত্র ভুলে না ভুলে প্রাতরাশের ধারে কাছ দিয়ে প্রায় না হেঁটে বেরোলাম! তবে ক্যাব ট্যাব না ডেকে সরাসরি নিজের গাড়ি এক্সিলারেটরে চাপ দিলাম যখন তখন স্টুডিওর ঘড়িতে সাতটা চল্লিশ।

গাড়ি গড়াতে শুরু করল আর আমার মস্তিষ্ক শুরু করল হিসেব নিকেশ। একটা রেডলাইট নব্বই সেকেণ্ড তো ওদিকে হাতে দেড় মিনিট কমল। এই ভাবে পৌঁছে গেলাম শাস্ত্রী ভবনে- গিয়ে গাড়িটিকে সঠিক স্থানে পার্ক করেই মার দৌড় অটো। সাধারণ ক্ষেত্রে আমি এখান থেকে শিবাজী স্টেডিয়াম এয়ারপোর্ট মেট্রো স্টেশনে গিয়ে মেট্রো ধরি। কিন্তু আমার মস্তিষ্কের ঘড়ি বলছে যে তাতে ব্যালেন্সের দড়িটা বড় বেশী সরু হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। অগত্যা চালাও পানসি ধৌলাকুঁয়া। সক্কাল সক্কাল খালি রাস্তা ধরে অটো যতক্ষণে ধৌলাকুঁয়া নিয়ে যাবে ততক্ষণে মেট্রো পৌঁছতে পারবে না!

মেট্রোতে যখন চড়ে বসলাম তখন বাজে আটটা পঁয়ত্রিশ। এদিকে ক্রমাগত যথাক্রমে দিল্লী ও হায়দ্রাবাদে ধারাবিবরণী চলছে। ‘চড়ে পড়েছি- টাইমে ঢুকে যাব!’ ইত্যাদি আর কি! এদিকে পেট চুঁই চুঁই- ছুঁচো ইঁদুর সবাই শারীরিক কসরৎ ছেড়ে কেতরে পড়ে আছে। ঘড়ি বলছে হয়তো হবে হয়তো হবে না! মন বলছে গেছি রে!

যাই হোক পৌঁছে সিকিউরিটি চেকিং টেকিং করে একটা ফিলে ও ফিশে যেই কামড় বসিয়েছি অমনি ফাইনাল কল কানে এসে পৌঁছল। ব্যাস মেয়োনিজের মাথা ও কফি যথাক্রমে ঠাণ্ডা ও গরম রেখে উপস্থিত হলাম আমার প্লেনের দুয়ারে। ফোন চলে গেল যথাক্রমে দিল্লী ও হায়দ্রাবাদে- শেষপর্যন্ত যথাক্রমে যাচ্ছি এবং আসছি।

এবং নির্দিষ্ট সময়ের মিনিট দশেক আগেই এসে পৌঁছলাম প্রেমের শহর হায়দ্রাবাদে। হ্যাঁ সেই ছিয়ানব্বইতেও দেখেছিলাম যে সন্ধ্যায় হুসেন সাগর লেকের ধারের বেঞ্চিতে বসে কপোতকপোতিরা কত সহজে নিজেদের দুনিয়ায় হারিয়ে যেতে পারে এবং তাতে পাড়াপ্রতিবেশী বা ছ্যাতাপড়া সমাজের কিচ্ছুটি যায় আসে না।

হায়দ্রাবাদ আমাকে স্বাগত জানালোও রৌদ্রোজ্জ্বল পরিবেশে এক মুখ হাসি নিয়ে। ব্যাস তারপর আধুনিক শহরের শিরাউপশিরা জুড়ে তৈরী হওয়া ফ্লাইওভার ধরে চল্লিশ কিমি দূরে যমজ শহরের আমার গন্তব্যে গিয়ে হাজির হলাম এবং কাজকর্ম সময় মতই শেষ করে আমার স্বজনদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করে বেশ মজে ছিলাম বটে। কিন্তু মন সেই পড়েছিল, পুরনো প্রেম হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানীতেই।

হায়দ্রাবাদ নাকি বিরিয়ানী বানাতেই ভুলে গেছে? এমন কথা শুনলেও পাপ লাগবে! আরে একটা গোটা ক্যুজিন আমার খানদানের পাতার রকমারি ছবি সাঁটাবার জন্য প্রিয়তম হবি তৈরী করে দিল রন্ধ্রণকে, আর সেটা ভুলে গেলে চলে?

তাই শেষ দিনের সকালে সময় টময় বার করে ছুট লাগালাম ওল্ড সিটি- চারমিনারের সুখটানে! তা সে টান আর কি টান বলব। কোন শহরের দিল আছে কি না বুঝতে গেলে তার ভরকেন্দ্রে পৌঁছতে হয়। আর হায়দ্রাবাদ যতই আজ আধুনিকতার স্বপ্নবিলাসে মুড়ে যাক তার চ্যাহেল প্যাহেল আর শোরগোল তো সেই চারমিনার এবং তৎসংলগ্ন ওল্ড সিটিতেই। মক্কা মসজিদ ছুঁয়ে বাজার সরকারি দুলকি চালে হাজির হলাম সাদাব-এ। প্রোটিন সহ সুগন্ধি চালের রোমান্স জিইয়ে রাখার সেরা বাজি। হুকুম করলাম কাচ্চি বিরিয়ানী এবং চিকেন সিক্সটি ফাইভ। ঠিক আঠারো বছর আগে যা খেয়েছিলাম।

কিন্তু স্বপ্ন কি সবসময় পূরণ হয়? কাচ্চি বিরিয়ানী যাও বা টেনেটুনে পাশ করল চিকেন সিক্সটি ফাইভটা মার্ডার করে দিয়ে চলে গেল। খুনি পাঞ্জায় খাবার পরেও বহু ঘণ্টা ধরে রক্তের মত গানপাউডারের দাগ লেগে রইল। কিন্তু দিলটাই তো খান খান হয়ে গেল। বেরহম সময় রোমান্সের পৌনে তেরটা বাজিয়ে ছেড়ে দিল। শেষ পাতে খুবানি কি মিঠা তাও একটু মুখ রক্ষা করল বটে, কিন্তু ততক্ষণে ট্রেন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলে গেছে।
আমি দেখেছি যার উপর যত আশা করে থাকবে সে তত বেশী ঝটকা দেবে। সে মানুষই হোক বা জায়গা, স্মৃতিই হোক বা ভোজন। বারে বারে তো একই রূপে এসে হাজির হয় না।

বৃন্দাবন গার্ডেন নিয়েও আমার এরকমই চোখ বড় বড় করা রোমান্স ছিল যা এক ঝটকায় ভূপতিত হয়েছিল ছ বছর পর ট্রেনিং-এর সময় দু হাজার একে এসে। দুহাজার নয়ে আবার গিয়েও সেই পুরনো তুমিকে খুঁজে পাই নি! শচীন কত্তা কি কষ্টেই না গেয়ে গেছেন গো ‘তুমি আর নেই সে তুমি’।

সে যাই হোক গে গিয়া, দিল ছোটা না করো বেটা। ও সুবহা কভি তো আয়েগি। ইসবার নহি তো আগলি বার সহি অউর তব ভি নহি তো আপনা হাত জগন্নাথ। নিজের হাতেই নিজের স্বপ্নের মহল গড়ে নেব নিজের রান্না ঘরে।

মন ঘুরিয়ে নিয়ে ইতিউতি বৈচিত্রের সান্নিধ্যে ডুব দিলাম। ওল্ড সিটির রোমান্স থেকে বেরিয়ে গিয়ে হাই রাইজের ঝলকানিতে চোখ রাঙিয়ে নিলাম। মনে হল, শহরটায় জান এখনো আছে হে। কিছু কিছু নব্যমহানগরীর মতো একেবারে কংক্রিটের বর্ম পরে হৃদয় বিদীর্ণ করে নেয় নি সে এখনো। তাই তো তেলেঙ্গানা আর অন্ধ্র নিয়ে টেনশনেও এর রক্তচলাচল বন্ধ হয়ে যায় না। শুধু সার্বিক অবিশ্বাসের বাতাবরণ আশা আশঙ্কার দোলায় ভাসতে ভাসতে পুরনো পৃথিবীর তেহজিবের ওড়না ঢেকে স্বাগত জানায় ভবিষ্যতের বৈভবকে। ট্র্যাডিশন আর মডার্নাইজেশন হাত ধরাধরি করে ছড়িয়ে দিতে থাকে শহরটাকে।

নাহ কিছু কিছু প্রেমকাহিনী ঠিক জীবনের মতই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চাওয়া পাওয়া পালটে নিতে হয়। তাহলেই দেখবেন জীবনের গাড়ি গড়গড়িয়ে চলতে থাকে হাইওয়ে ধরে। কলকাত্তাইয়া দিল দিল্লীর পাকওয়ানে ডুব দিয়ে বুঁদ হয়ে থাকলেও তা এই শহরটার জন্য কখনও না কখনও এক আধবার ধকধক করবেই। হাজার হোক প্রেম যেখানে সহনশীলতা শেখায়, যেখানে এগিয়ে চলতে শেখায়। সেখানে কি আর দেবদাসী দিল মরে যেতে পারে? আবার আসব আর সেই কাঙ্ক্ষিত স্বাদ গ্রহণ করব এই অঙ্গীকারেই ছোড় চলে হায়দ্রাবাদ নগরী। আদিউ~~

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ দুই প্রিয় চরিত্র বলে উল্লেখ করার জন্য আমার ঘাড় যেতে বসেছিল বটেক। তাই নাম উল্লেখ করাটা অ্যাভয়েড করা গেল না। পিয়ালী সিং চক্কোরবক্কোর আর বড়ি সিং বকরবকর! হায়দ্রাবাদ বোধহয় এদের জন্যই এখনও প্রাণবন্ত আছে।

(৯৪)

“আমার প্রতিবাদের ভাষা আমার প্রতিরোধের আগুন…”
গানটা সেই বাচ্চা বয়েস থেকে গেয়ে এসেছি তুমুল বিক্রমে। এখন সলিল, জর্জ, গণনাট্য, বাসুদা সব মিলিয়ে আমার ইতিহাসে ঢুকে চলে গেছে। কোলকাতার প্রতিবাদের ভাষা ব্রিগেড পেরিয়ে মেট্রো চ্যানেলে এসে দাঁড়িয়েছে। পুরাকালে মেট্রো চ্যানেল নাম্নী তথ্য ও সম্প্রচার দপ্তরের একটি ট্যাঁশগরু ছিল বটে, যা আমাদের সুপারহিট মুকাবলা ইত্যাদি পৃথিবীর সপ্তম থেকে অষ্টম আশ্চর্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়েছিল। কিন্তু সে তো খৃষ্টের জম্মের আগের ঘটনা। মিলেনিয়াম পরবর্তী সময়ে মেট্রো চ্যানেল হল এসপ্ল্যানেড মেট্রোর সামনের একটুকরো জমি- যা স্বপ্নদেখিয়েদের একটুকরো আকাশ হয়ে দাঁড়ায়।

দিল্লী অবশ্য আকাশ দেখার বিষয়ে কোলকাতার থেকে বরাবরই যোজন এগিয়ে থাকে। পরিকল্পিত শহর হবার সুবিধা আর কি। সব কিছুর জন্যই নির্দিষ্ট স্থান আছে। ট্যাঁশ হতে চাও তো জনপথ থেকে জেএনইউ, হিপ হতে চাইলে সাউথ এক্স থেকে খান মার্কেট, চিপ হতে চাইলে সদর থেকে সরোজিনী সবই পেয়ে যাবেন এই ভুলভুলাইয়ার সবপেয়েছির আসরে। প্রতিবাদের আকাশও!

আরে বাবা দেশের রাজধানী বলে কথা, দেশের কেষ্টবিষ্টু ইষ্টুকুটুমদের কাছে আমার ভিতরের গোঙানি পৌঁছয় কি করে? তাই চলো দিল্লী! তা বলে যেখানে সেখান ফেলে ছড়িয়ে নোংরা করতে তো দেওয়া যায় না! তাই হ্যামলিনের বাঁশীওয়ালারা অনেক ভেবেচিন্তে একটুকরো আকাশ তৈরী করে দিয়েছেন, যার নাম যন্তর মন্তর। যন্তর চীজ বাওয়া! রামলীলা ময়দানে গরুর কাটার মতো ঘাস নেই তো যন্তর মন্তর, রাজপথে সরকার পথে বসলে যন্তর মন্তর, পার্লামেন্টে গোলাগুলি চললে যন্তর মন্তর, ওবামা-পুটিন কাটাকুটিন খেললে যন্তর মন্তর, বাবাজীকা ঠুল্লা হলেও যন্তর মন্তর! এই শেষ ব্যাপারটা নিয়ে একটু পরে ফুট কাটব! তার আগে ঘটনায় ঢুকে পড়ি।

যন্তর মন্তরের প্রতিবাদী রাস্তাটার উপর একটা সাউথ ইন্ডিয়ান খাবার দাবারের দোকান আছে! যেটা দিল্লীর নিরামিষ ভোজনের পীঠস্থান হিসাবে পরিচিত! তা সেখান থেকে ভেজ কুর্মা আর সেট দোসা কিনতে যাব বলে মনস্থ করে গাড়ি ঘুরিয়েছি। কিন্তু গন্তব্যের অনেক আগেই থেমে যেতে হল। রাস্তার সিকিভাগও বাকী নেই মঞ্চের চাপে আর তারস্বরে বাংলায়- হ্যাঁ পাঠক পাঠিকাগণ ঠিকই শুনেছেন, বিশুদ্ধ দিশি বাংলায় বক্তৃতায় বঙ্গ ললনারা আকাশ বাতাস কাঁপাচ্ছেন। বাংলার ম্যাঙ্গো পিপুলরা পেটে কিছু না পড়লেও চেঁচিয়ে পাড়া মাত করতে জুড়িহীন। কিন্তু তাই বলে দিল্লীতে?

এপাশ ওপাশ দিয়ে মেসি রোনাল্ডোর মতো এগিয়ে যেতে যেতে শুনলাম মিড ডে মিলের কর্মীদের দুঃখের কথা! তাদের সারা বছর কাজ করিয়ে মাত্র ১০ মাসের মাইনে দেওয়া হয়। কারণ দু মাস নানা কারণে স্কুল ছুটি থাকে যে। ছুটি থাকলেই কি? পেট তো ছুটি নেয় না! তাই কেন্দ্রের বঞ্চনার প্রতিবাদে আকাশ বাতাস মুখরিত। সকলের মুখেই তখন বঙ্গের বিদ্যুৎলতার ভাষা! কিন্তু আমাকে তো উদ্দেশ্য ভুললে চলবে না! সেট দোসা যে তখনও মুখগহ্বরের স্বাদকণিকাগুলিকে রসসিক্ত করে চলেছেন।

এগোতে এগোতে দেখলাম আরও রকমারি ঝকমারি প্রতিবাদী মঞ্চের সারি। কিন্তু ঝটকাটা তখনই খেলাম। হ্যাঁ সন্দেহ নেই যে ভারত বাবাজি প্রধান দেশ। এত চাপ পলাশীর প্রান্তরের খাপ বুদ্ধুর বাপ সব মিলিয়ে বাবাজিদের পোয়াবারো। কিন্তু তা বলে কোন প্রতিবাদী মঞ্চ যদি হয় এই বলে যে ভারতবর্ষে পরিকল্পিতভাবে সাধুসন্তদের (বাবাজি) টার্গেট করা হচ্ছে, তাহলে সত্যিই ভাবতে হয়। নিত্যানন্দ শঙ্করাচার্য আশারাম এরা তো সব সেই হিন্দিতে বলে না? “গাউ হ্যায় গাউ” কুছু নাহি জানতা হ্যায়! সব ঝুট হ্যায়! ও তো ভগবান কা জীব আউর জিভ হ্যায়!

তবে ভাববার মতো ব্যাপার হল আরও বেশী যখন আমি মঞ্চের নীচের ভক্তদের মধ্যে নজর বোলালাম! উচ্চ থেকে উচ্চ মধ্যবিত্ত গৃহিণী ও ফ্যাশনদুরস্ত কামিনীদের সংখ্যা এতটাই চোখে পড়ার মতো যে সত্যিই ভাবতে হয় এই যে সব নিত্যানন্দ আশারামরা সারা জীবনের ব্যবসা ফেঁদে বসেছে মানুষের বিশ্বাসের ফায়দা লুটে তাদের কুকীর্তিগুলি কি সত্যিই বাবাজীকা ঠুল্লা? বিশ্বাসে যেমন মিলায় তেমনই লীলাও তাদের অপার! সে তো বাবাজী- তাঁর অপকর্মগুলি তো বিভূতি!

তিনি এই ধরাধামে এসে তাঁর লোমশ রক্ত চোষা হাত দিয়ে অকহতব্য স্থান একটু চুলকে নিয়েছেন তাতেই আমরা কৃতার্থ! তিনি ‘ব্যাঁও’ বলে ঢেঁকুর তুললে আমরা উদ্বাহু হয়ে গড়াগড়ি দিই। (বললাম বটে, কিন্তু সত্যিই কাজটা করে দেখবেন! বেশ অসম্ভব প্রকৃতির ব্যাপার!) তাই শত শত যৌন হেনস্থার অভিযোগ আসা কুকুরগুলোর এহ বাহ্য চাটতে, পাঞ্জাবীবাগ বা পিতমপুরার পশ বিউটিপার্লার চর্চিত বিউটিদের এতটুকুও কুন্ঠাবোধ হয় না! তাঁদের মনেও পড়ে না যে বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে কত কত নাবালদের কণ্ঠরোধ করে দেওয়া হয়!

যাই হোক, অনেক গুরুগম্ভীর কথা হয়ে গেল পাঠকপাঠিকারা, ক্ষমা করে দেবেন! তবে কি না জানেন তো, ফিসফাস তো শুধুমাত্র শেষ বসন্তের ফুসকুড়ি নয় যে একুট সুড়সুড়ি দিয়েই কেটে পড়বে! ফিসফাস জীবনবোধের গল্প, থাক না তাতে দু আনা নির্মল গুড়ের ফোঁটার মতো মিষ্টত্ব! তবু জীবনবোধই যদি বোবা হয়ে যায় তাহলে ফিসফাসের গল্পগুলির সঙ্গে দেওয়ালের ক্যালেন্ডারের কোন ফারাকই থাকবে না! সকালে উঠে খালি দেখে যাব যে আজ রোববার! ব্যাস তার পরেই ঝাঁপ দিয়ে পড় কালো নীড়ে।

ভেবে দেখবেন, আমাদের এই ভীরু অক্ষম জীবনটাতেও যদি আপন আচরণ দিয়েই প্রতিবাদের দুয়ে দুয়ে মিলিয়ে দিতে পারি তাহলে সাপের পাঁচ পা কখনই আমাদের জাপটে ধরতে পারে না।

যাই হোক গল্পে ফিরে যাই। আরও একটু দূরেই সেই আনন্দ ধাম! দোসা আর কুর্মার দোকান। এগোতে লাগলাম আর বিচিত্র এবং বিহ্বল করা মঞ্চগুলি চমৎকৃত করতে লাগল। এমনিতেই যন্তরমন্তরকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছিলেন আন্না এবং ততপরবর্তীকালের চিত্তচঞ্চলম শ্রীমান কেজরিওয়ালবাবু। কিন্তু চন্দন কাঠের পরেও তার আশে পাশের গাছগুলি গন্ধ নেবার জন্য মরিয়া হয়ে ফেলে যাওয়া পথের শরিক হতে গড়াগড়ি খায়! তেমনই গড়ে ওঠে ধর্ষণ বিরোধিতার নামে রাজনৈতিক জ্যাবরং, কিষাণ সভার নামে অর্থনৈতিক বিষোদ্গার এবং আরও না জানি নাম না জানা কি সব সভার নামে অনৈতিক মিডিয়ায় মুখ দেখাবার অদম্য ইচ্ছা। তাই মঞ্চ দেখি “সনসনিখেজ খুলাসা”-র যেখানে একজন বিদগ্ধ ব্যক্তি দিবানিদ্রায় সুইজারল্যাণ্ড ভ্রমণে ব্যস্ত থাকেন। তাই মঞ্চ দেখি রাগা আর নমোর পরস্পর বিরোধী বন্দনার আর তাই আমার উদ্দিষ্টের অর্ডারকালে, সমস্ত অধর্মীয়- ধর্মীয় জিগির মিলে মিশে এক হয়ে যায়- রাহুল বাবাকো… এক প্লেট সাদা ইডলি দো! মোদীজি আয়েঙ্গে তো … উত্থাপ্পাম খায়েঙ্গে কেয়া? কেজরিওয়াল জওয়াব দো কি… মেরা সেট দোসা বন গয়া কি নেহি! সব মিলিয়ে একদম পাগল পাগল অবস্থা!

কোন রকমে আমার উদ্দিষ্ট খাবারটি নিয়ে অফিস ফিরে যেতে মনস্থ করে! এডউইন মোজেসের মতো হার্ডল ডিঙোতে ডিঙোতে ফিরে আসতে আসতে কানে এসে পৌঁছয় মিড ডে মিলের মঞ্চ থেকে উচ্চারণ, “আমরা এখানে উপস্থিত আমাদের মা বোনেদের মুখে খাবার তুলে দিতে পারছি না বলে, সমবেত অনশনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি!” কি নিদারুণ অভিব্যক্তি! কি মানবিক উপলব্ধি! পেট না চললে মনের গেট খোলে কি করে বলুন তো? আমাদের মত সাধারণ মানুষ কাগজের পাতায় আর টিভির পর্দায় একটু আহা উহু করেই গেটের কথা ভুলে সেট দোসায় মন নিবেশ করে! পথে নেমে পথ চলার থেকে ড্রয়িং রুমের কাউচে মদ্যপান ও কিঞ্চিত বাদাম চিবানো সহযোগে ভাঁট বলায় মন ভাসিয়ে রাখি! কথায় আছে না অধিকন্তু ন দোষায়!! উদরপূর্তি সেট দোসায়ও!!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ “বাবাজী কা ঠুল্লা” কথাটা একটি অপব্যক্তি! যার অর্থ ‘কিস্যু না’ অথবা ‘Floccinaucinihilipilification’!

(৯৩)


পাঠক পাঠিকারা, জানেন তো আমরা তথাকথিত ভদ্রলোকরা আপাত ভদ্রতাবোধের আড়ালে অনেক অপ্রিয় কথা চেপে গিয়ে জগৎ সংসারের বেশ অপকারই করে থাকি। দিনের পর দিন ধরে সহধর্মিনীর আনোনা রান্না মিষ্টি হাসি সহযোগে গলাধঃকরণই হোক বা সশ্রুমাতার নিজ পুত্র সম্পর্কে হ্যালোজেন চোঁয়ানো ধারণাই হোক বা বসের বুকনিই হোক আর রাষ্ট্রনেতা বা নেত্রীদের “ছাতের ওপর কাক- আমি দেখে পুঁইশাক” টাইপের সৃষ্টিই হোক। অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে ছেঁদো হেসে পেট ফুলিয়ে যাই আর ক্রমিক অন্তরালে জেলুসিল সহযোগে পরবর্তী বোমাটির জন্য প্রস্তুত হই।

মধ্যবিত্ত জীবনের ট্র্যাজেডি হল বুকের ভিতরে প্রতিবাদ আর ইমান ধরম গজগজ করতে থাকে কিন্তু বাইরের ফুলকাটা পাঞ্জাবীটার মোহও ত্যাগ করতে পারি না। চোখের সামনে ছুরি নাচালেই চুক চুক করে ন্যাজ নেড়ে ছুঁড়ে দেওয়া রুটি চেটে বাহুমূলকেত্তন সহযোগে দিনগুজরান বোধহয় আমরা জন্মের সময়ের মুখের চামচে নিয়েই সারা জীবন কাটিয়ে দিই।

সেই যে বিদ্যাসাগর বলে গেছেন না? কানাকে কানা খোঁড়াকে খোঁড়া এবং অশ্রাব্যকে অশ্রাব্য বলিও না? সেটিই আমাদের জীবনের পরম পাথেয়, বেদবাক্য, আল কুরাণ, গীতা, বাইবেল আর সিথির সিঁদুর।

আমি যদিও মনে করে সাহিত্য সংস্কৃতির সার্বিকভাবে সকলের পছন্দ হবে এমন কোন কথা নেই! এদের ঠিক ভাল বা খারাপের মানদণ্ড হয় না! আপনার শাহরুখ খানকে পছন্দ হতেই পারে কিন্তু আমার জনি ডেপের প্রেমে অন্ধ হয়ে থাকা থেকে আপনি আমাকে আটকাতে পারবেন না! পারা উচিতও নয়, স্বাধীন দেশের স্বাধীন বাসিন্দাকে স্বাধীনভাবে শাহরুখ খানকে ভালবাসা থেকে আপনি কেন আমিও আটকাতে পারি না। কিন্তু তা বলে পচা গলা মাংসপিণ্ডটিকে শুধুমাত্র বিনি পয়সায় খাচ্ছি বলে “ইদম অমৃতম” সহযোগে উদ্বাহু হয়ে নেত্য করাটাও বোধহয় সমীচীন নয়। সাত হাজার লোক কালোকে সাদা, ঘোড়াকে গাধা, খোলাকে বাঁধা আর আশারাম বাপুকে রাধা বলে চিৎকার করলেই তো আর তা হয়ে যাবে না। তা হলে তো প্লেবিসাইট করিয়ে কাশ্মীর কবেই কন্যাকুমারীর থেকে আরও দূরে দূর দেশে চলে যেত আর তার সঙ্গে হায়দ্রাবাদও বিচ্ছিন্ন বদ্বীপের মতো ভিন দেশের বাসিন্দা হত আর আপনিও হায়দ্রাবাদি পরমান্ন খাবার স্বর্গীয় সুখ থেকে বঞ্চিত হতেন।

তাই বলি কি রাখ ঢাক ভালো ঢাক পেটানোও ভালো! কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে নিজের মন, মত এবং অমতকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত! যা ভাল নয় তা সত্যিই ভাল নয়- অন্তত আপনার জন্য! এটা ভাবা বেশ জরুরী!

কালকের ঘটনাটাই বলি। দিল্লীর বুকে বঙ্গ সংস্কৃতি উৎসব মরুভূমিতে গোলাপের সমান না হলেও বেসময়ের বাদলে বর্ষার মতই ঘটনা। তাই আমরা আয়োজকরা ঝাঁপিয়ে পড়ে হাত পেতে আঁকচিয়ে পেটে বন্দুক ঠেকিয়ে টাকা পয়সা জোগাড় করে শিবরাত্তিরের সলতের মতো গঙ্গাপাড়ে ফেলে আসা সংস্কৃতির ঢাক যমুনার ধারে তেরে কেটে তাক তাক বাজাতে শুরু করে দিই। দুটো ভাল গান দুটো ভাল উচ্চারণ শোনার জন্য বিদ্যাসাগরের মতো উত্তাল দামোদরের বুকে ঝাঁপ দিয়ে ঝড় জল উপেক্ষা করে ছুটে চলি উৎসব মণ্ডপের দিকে!

বাংলার সোঁদা গন্ধ পাবার তাগিদে, ইলিশের বিরিয়ানী ফিস চপ ও ঘুগনি সহযোগে শনিবারের সন্ধ্যায় অবগাহন করি লোকসংস্কৃতির স্রোতে।

হরপার্বতীর বিবাহের সময় বাদ্য ছিল না বলে জয়ঢাকের আমদানী হয় আর সানাইয়ের সহযোগে উল্লাস নৃত্যের মাধ্যমে নববধূর আনয়ন করেন মহাদেব, নটরাজ বেশে। সেই নাচই রাম সীতার বিবাহে চন্দ্রদেবের অঙ্গ বেয়ে আধুনিক ভারতের বিস্মৃত এক নাচের আঙ্গিক রূপে আমাদের সামনে এসে হাজির হয়- নাটুয়া। পুরুলিয়াতেই এর বসবাস বলে ছৌ নাচের সঙ্গে বেশ মিল, সেই যে চন্দন গাছের পাশে থাকা গাছেও সুগন্ধ ম ম করে না?
তা নাটুয়ার আন্তরিকতায় মজে থাকতে থাকতেই দেখবেন যে দিল্লীর বঙ্গ সংস্কৃতি সাম্রাজ্যের আব্বল নম্বরের সঙ্গীত সহযোগীরা তবলায় ঠুকঠাক আর সিন্থেসাইজারের টাপুর টুপুর নিয়ে হাজির স্টেজে। অষ্টমীর সন্ধ্যা সাড়ে সাতশো লোক আর স্টেজ আলো করে আছেন মিউজিশিয়ানরা তার মধ্যেই আবির্ভাব হয় বঙ্গবাসী আবৃত্তি নক্ষত্র এবং ক্ষীনদেহী তিনি-র।

অবশ্য তার আগেই নাটুয়ার নৃত্যে ‘ইন্সপায়ার্ড’ হওয়া তিনির উনি ইঁট রঙের শেরওয়ানী আর সাদা রঙের নাগরাই পরে স্টেজের উপর ইতিউতি নেচে নিলেন। এক বন্ধুর মন্তব্য, “কিনে ফেলেছিল কোথাও কিন্তু পরার সুযোগ হয় নি! অকেশন দেখে মাঞ্জা দিয়ে নিয়েছে!”

আবৃত্তি নক্ষত্র শুরু করলেন আমাদের রবীন্দ্রনাথ দিয়ে। আর তারপরেই তিনি আড়মোড়া ভাঙলেন আপাত নজরুলগীতি দিয়ে! আরে মাইরি, সে যেন কুম্ভকর্ণের ঘুমভাঙা- যুগপৎ আটাশিটা ঘোড়া এবং বত্রিশটি গাধা দিগ্বিদিক থেকে ত্রাহি ত্রাহি রবে হুলা হুলা গান আর ট্যাঙো ট্যাঙো নাচ জুড়ে দিয়েছে। আমি পিছনে বসে ভাল মানুষের মত মুখ করে সত্তর টাকার রাধাবল্লভী দিয়ে বিনিপয়সার আলুদ্দম চিবুচ্ছিলাম! এক পরিচিত মহিলা আমার দিকে সবেগে ধাবমান হলেন! আমি যেই ভেবেছি মারবে নাকি আমায়? আয়োজকদের একজন চুনোপুঁটি বলে কথা। তা তিনি এসেই জিজ্ঞাসা করলেন এর মানে কি? তা আমি কি আর তোতাপাখি নিয়ে বসেছি! আশঙ্কা যে ছিল না তা নয়! তবে সেটা যে এত বড় ডঙ্কা হয়ে বাজিবে বুকে কে জানিত!

এক ভদ্রলোক এসে তো রীতিমতো শাসিয়ে গেলেন যে সাউণ্ড কে এনেছে এরকম বাজে সাউণ্ড যেন কখনই আর নেওয়া না হয়! তাঁকে বোঝাতে গেলাম যে আরে আবৃত্তিটা খারাপ হচ্ছে নাকি কিন্তু পাগলা ষাঁড়ের মুখে সিন্নি তুলে দিয়ে বাটি কাঁচিয়ে দেওয়াটা একেবারেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আমি বাধ্য হয়েই মোবাইল খুলে গেম খেলতে শুরু করলাম। আর তিনি ধরলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত! পুপুল বিশ্বাস কর, হাবুল দুপ্রি-ও এর থেকে বেটার গান! রবীন্দ্রসঙ্গীত! এ তো গান নয় কামান! দুম দাম গোলা ছুটছে আত্মসমর্পণ করে যে জান বাঁচাব তারও উপায় নেই!

এক বন্ধুকে ডেকে বললাম, “আয় আমরা নেত্য করি! সেই যে সেই শাহরুখ আর কাজল বৃষ্টিতে ভিজে আঙুল নাড়িয়ে মিউজিক ধরিয়ে নাচতে শুরু করে, “তুম নেহি সমঝোগে অঞ্জলি কুছ কুছ হোতা হ্যায়” সেই রকম! পাগলা ক্ষেপা সকল ভুলে যে রকম নাচে সেই রকম! তা সে খালি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল!

আমি দেখলাম লোকে ঘামছে, মাথা চুলকোচ্চে আরও কত কি! গান শেষ হতেই “তিনি” ছুটে গেলেন সাউণ্ডের কারিগরকে বকে দিতে! আমরাও আশ্বস্ত হলাম এর পর নিশ্চয় ভালো কিছু হবে! তা সে হল, আবৃত্তি নক্ষত্র তাঁর সমগ্র অনুভব এবং হৃদয় দিয়ে উচ্চারণ করলেন বাংলা মায়ের কথা! আর “তিনি” আবার ঘাড় নেড়ে উঠলেন, “কে যেন গো ডেকেছে আমায়”! কেউ ডাকেনি মামণি! শের শাহ ঘোড়ার ডাকের প্রচলন করেন এবং তার আগে ঘোড়া ডাকত না!

মধ্যযুগের ইউরোপে যখন প্লেগ হয়েছিল তখন তার চিকিৎসা কিছুই ছিল না। বাধ্য হয়ে গদি বাঁচানোর রাজনীতি ডাইনির প্রকোপ বলে কেজি কেজি নারীমুণ্ড ঘচাং ফু করত।

আর সাধারণ মানুষ? তারা তখনও প্রার্থনা করত, এখনও করে, “ও সুবহা কভি তো আয়েগি!!” আবৃত্তিকার বললেন যে সময় বিশেষ নেই, তাই শেষ হবে “তিনি”র গান দিয়ে! এবার আর দর্শক চুপ করে থাকল না! আম আদমি গর্জে উঠল, “না না আপনি বলুন! আমরা আর নরক যন্ত্রণা নিতে পারছি না!” উনি বললেন, কিন্তু তিনিকে বেশীক্ষণ আটকে রাখা যায় না তাই তিনিই শেষ করবেন বলে শুরু করলেন “ইস্টিশানের রেলগাড়িটা”।
এতক্ষণ পর্যন্ত তাও তালে তালে রযািশপাচ্ছিলেন কিন্তু এবার আর কিছুই রাখা সম্ভব হল না! তাল টোকিওয় সুর সান ফ্রান্সিস্কোয় আর দর্শকের কান পামীর মালভূমিতে বালির মধ্যে গড়াগড়ি খেতে লাগল! তিনি এক কান চেপে গাইতে লাগলেন! যেন আরেক হাতে মাইক না থাকলে তিনি সেই কানও চাপতেন! কাঁহাতক আর ক্যাকোফোনি সহ্য করা যায়! সৃষ্টিকত্রীরও বিবমিষা হতে পারে।

তারপর কেউ হয়তো চেন টেনেই রেলগাড়িটা থামিয়ে দিয়ে থাকবে! আমি শোনা বা জানার মতো অবস্থায় ছিলাম না! উদ্যোক্তাদের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না! তাদের দেখেই যেন ১৮৯৪তে স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর জলদমন্দ্র স্বরে বলে উঠেছিলেন, “বল, বল, সমগ্র বিশ্ববাসী আমার ভাই!” হ্যাঁ ভাই পাঠক পাঠিকারা, টাকা তো আর গাছে ফলে না! এক এক পাই পয়সার হিসাব করেও যারা আমরা বিভূঁইতে বসে বাংলা পান করতে চাই! তাদের কাছে বিখ্যাত কণ্ঠগুলিকে শুনতে গেলে যে মাশুলটা দিতে হয় সেটা মাঝে মাঝে বিষপানের সমান হয়ে দাঁড়ায়! তখন তাদের সত্যিই কেউ দেখার থাকে না!

আমিও সংগঠকদের একজন বলেই বলছি না, তবুও নক্ষত্রদের তাঁদের কথাও একবার ভাবা উচিত! শুধুমাত্র পারফর্ম করতে পারব বলেই হ্যাঁচকা চেন টেনে বিপথগামী ট্রেনে না উঠলেও চলে। আর তিনির উনি? দাদা আপনার প্রচুর টাকা- দান খয়রাত না করতেই পারেন, আপনার ইচ্ছে- তার থেকে বাড়ির ছাদে উঠে সব টাকা পুড়িয়ে দিন! পরিবেশ দূষণ হবে, কিন্তু তার প্রভাব এসব জীব জন্তুর ডাকের হিম ধরানোর ভয়ের প্রভাবের থেকে ক্ষণস্থায়ী।

ফিসফাসের রিভিউ উত্তরবঙ্গ সংবাদের ১৬ই ফেব্রুয়ারী, ২০১৪ সংখ্যায়

1957792_10152188004635659_274543580_o


সত্যি কথা বলতে কি একটা বই বার করব প্রকাশকের পরিশ্রমে আর তা ঠিক মত বেচব না। কিন্তু মনে মনে চাইব প্রচুর বিক্রি হোক, এটা সেই ঘোমটার তলায় খেমটা হয়ে যায়। তাই এ ডাল সে ডাল করে শেষে ধরলাম আমার এক বাল্যবন্ধুকে। তা সে তো দরাজ দিলখোলা! বলল, “সমালোচনা দরকার? এই নে” বলে খসখস করে দিল লিখে। যদিও বলা ছিল যে ভাই যা মনে হয় সেটা লিখবি! কিন্তু সে তো ধরতাই! একে ফিসফাস, তায় বন্ধুর লেখা! খারাপ লেখে কি করে? তবে এতটা ভাল হবে ভাবতে পারি নি! ব্যাস পাঠক পাঠিকারা, আর কি! এবার তো ছাপার অক্ষরেও দেখে নিচ্ছেন যে বইটা বেশ হয়েছে! তা দয়া করে সংগ্রহ করার চেষ্টা করবেন! ৫-৯ই মার্চ, ২০১৪ দিল্লী বইমেলায় সৃষ্টিসুখের স্টল তো রয়েছেই, এ ছাড়াও অন্যত্র যাতে পাওয়া যায় সেই বন্দোবস্ত হচ্ছে। তাহলে ওই কথাই রইল! বইটা পড়ুন আর এই ব্লগে এসে নিজের মতামত দিন!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ পষ্ট কথা পষ্ট করে বলেছি। কোন ছল চাতুরি নেই কিন্তু! এটার তো মান রাখতেই হয়! কি বলেন?
http://uttarbangasambad.com/page14.php?p_no=14

(৯২)

দিল্লীতে গত শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসেই মাস তিনেক ছিলাম ব্যানার্জী লজের মেসে। এই মেসটা সত্যিই mess ছিল এতে কোন সন্দেহ নেই। পৌনে দুই খানি খুপরি, একখান জানালা এক খান কাঠের সিঁড়ি এবং ছাদের উপর স্নানাগার নিয়ে আজব অজায়বঘর। সকালে এক কাপ চা অফিসের আগে ভাতরাশ বা rush এবং রাত্রের ভোজন দিয়েই উদ্ধার করে দিত মালিক পক্ষ। (এই মালিক পক্ষ জিনিসটাই এরকম হয়! আচ্ছা শুরুতে তো তারা বলেন নি যে আমাদের রোজ কুক্কুট মাংস ভক্ষণ করাবেন বা রাজসিংহাসনে বাতানুকূল যন্ত্র সহযোগে আরাম ফরমায়েশ করাবেন। সম্পূর্ণ সজ্ঞানে আমি ওই কুটুরীতে ঢুকেছিলাম আর এখন গাল পাড়ছি!)
বিশেষতঃ সকালের খাবারটায় রাশ থাকত না কিন্তু rush থাকত বলে শাক সব্জি বা মাছের উপর জল ঢেলে তেলের আস্তরণ দিয়ে সাজিয়ে থালায় দিয়ে দিত।

ছোটবেলায় সুনাম বা দুর্নাম ছিল যে জল চিবিয়ে লোহা গিলে হজম করে ফেলতাম। একশো বছর আগে জন্মালে বোধহয় বায়না করে বরযাত্রী নিয়ে যেত। কিন্তু এই মেসের মেস্মেরাইজিং খাবার তিনমাস খাবার পর এমন অবস্থা হল, যে বেশীক্ষণ খালিপেটে থাকলেই চোঁয়া ভাঙে। তাই এ জন্মে আর ধম্ম কম্ম করা হল না- কি করে করব? উপোষ রাখতে পারি না যে।

যাই হোক মোদ্দ্দা কথা হল, বেশীক্ষণ না খেলে যেমন অ্যাসিড হয়ে যায়, তেমনই বেশীদিন ফিসফাস না লিখলেও নিজেকে মঙ্গল গ্রহের জীব বলে মনে হয়, তিনটে সিং গজায় যার দুটো মাথায় চোখ দুটো এক হয়ে যায় এবং ইত্যাদি ও প্রভৃতি।

তাই ফিসফাস। একটা বেশ পুরনো জিয়া নস্টালি গল্প দিয়ে শুরু করি, ক্লাস সিক্স থেকে আমার এক প্রাণের বন্ধু ছিল, যে এখনো আছে বলেই আমার এবং তারও বিশ্বাস! যদিও আমাদের প্রায় আড়াই বছর দেখা হয় নি। তবুও প্রাণের তার তো ইথারেই বাঁধা। যাই হোক, সে তখন বেলুড় বিদ্যামন্দিরে পড়ে ইকো জিও ম্যাথ নিয়ে। আমি তখন মৌলানায় নাকাল হচ্ছি। বললে হয়তো সে একটু বাড় খেয়ে যাবে (প্রস্থে হলে বোধহয় কোন একটা সময় ফেটেই যাবে, তাই দৈর্ঘ্যই সই) কিন্তু দর্শনে সুদর্শনই ছিল বটে আর আমি তো তখন রাজহাঁসের বাচ্চা! গ্ল্যামার তখনো নাকের ডগায় পৌঁছয় নি!

তা যাই হোক, হোস্টেলে ফিরে যাবার এক দিন আগে হঠাৎ এসে হাজির- তার বান্ধবীটি নাকি তার সঙ্গে কথা বার্তা বন্ধ করে দিয়েছে, এবং তার বাড়ি থেকেও হুকুম হয়েছে যে বেশী মাখন লাগাতে হবে না। ঘোরতর সমস্যা, এখন ভাবলে হয়ত কিছুই না কিন্তু তখন সেই উদ্ভিন্নযৌবনে এগুলিই ছিল জীবন মরণ সমস্যা।
তা সে বলে দেখা করতেই হবে যে করেই হোক, আমি বলি ফোন? সে বলে মাসি তোলে! গরমের ছুটি বলে এয়েচেন! (কি আপদ)

মিনিট পাঁচেক বুইলেন! তাপ্পর তড়াক করে উঠে জালনার আলনা থেকে শান্তিনিকেতনী ঝোলাটি তুলে তাতে আমাদের প্রাক্তন স্কুলের ম্যাগাজিন “বালুচর” খান তিনেক এদিক সেদিক থেকে ঢুকিয়ে একটা নোট বুক হাতে নিয়ে বললাম চল! সে বলে কোথায়? বললাম চল বৈশালী! (কি আপদ! এ বৈশাখী কাকা! কোলকাতায় সল্টলেকের পাড়ে) তা তার বান্ধবী (যার নাম বৈশাখী কোনমতেই নয়) থাকেন সেখানে! সে আন্দাজ করেই বলল কি করবি সেটা বলবি কি? আমি বললাম এখনও জানি না! কিন্তু বেশী বকিস না! এটাই তোর একমাত্র আশা! এটা না নিলে আশা ভাসা ভাসা হয়ে আবছা হয়ে যেতে সময় লাগবে না।
সে নিমরাজি হয়ে আমার সঙ্গে চলল! কুড়ি বছর পরেও বাসটা মনে আছে… সেই মুর্শিদকুলি খাঁর আমলের লজঝরে ৪৬এ! সেও ঢিকির ঢিকির করে চলে আর আমিও মনের জিলিপিকে নেড়ির ল্যাজের মতো সোজা করতে থাকি! মিনিট তিরিশেক পর বাস গন্তব্যে থামল যখন আমার কাঠিলজেন্স তৈরী হয়ে গেছে।

নেমেই বন্ধুকে বললাম, আমরা বালুচর পত্রিকা থেকে এসেছি। মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের পরবর্তী পদক্ষেপের উপর আলোক ক্ষেপণ করার সমীক্ষা করতে। বেশ খটমট ছিল বলে বিশ্বাস লোক চট পট বেশী প্রশ্ন না করে উত্তর দেবার জন্য রেডি হয়ে যাবে। সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় বন্ধুকে বলে দিলাম যে একদম ট্যাঁ ফোঁ করবি না! পারিস তো বোবা সেজে থাক! না হলে ভুলে যাও প্রেমে পড়েছিলে, খেলাঘর তুমি গড়ে ছিলে, কারও দুই চোখে মরেছিলে, কারও দুই হাত ধরেছিলে ইত্যাদি!
দরজায় কলিং বেল! বার দুই! টিং টং! এক মহিলা দরজা খুলতেই তাঁকে দম ফেলার সময় না দিয়ে গত পনেরো মিনিট ধরে মুখস্থ করা ডায়লগ দিলাম ঝেড়ে! ফল হল সেই উত্তর আধুনিক কবিতার মতই (এটার কপিরাইট নেওয়া আছে! ফিসফাস-১ পড়েছেন তো?)! ও আচ্ছা তাই এই বাবুন এদিকে আয় কি বলছে দেখ তো, তোর ইন্টারভিউ নেবে বোধহয়! দুজন রিপোর্টার এসেছে! আমি আবার কারেক্ট করিয়ে দিলাম, ইন্টারভিউ নয় সমীক্ষা! আহো!

বাবুন তো এসেই যুগপৎ বিস্মিত আনন্দিত প্রসেনজিত বিশ্বজিত হয়ে মুখে মাছি ধোঁকার ব্যবস্থা করে আছে। ‘তুমি’ ‘তোমরা’ এই দুটি কথা বলতে রাখী গুলজার আর অটলবিহারী বাজপেয়ীর সমান সময় নিয়ে নিশ্বাসের ফাঁক দিয়ে কুঁ করে বলল! ৩২ অলআউট! বন্ধুটি এমনিতেই আমার দাবড়ানিতে কাঁচুমাচু! তারপর আবার দুর্ঘটনার সম্ভাবনায় বিব্রত হয়ে চোখ দিয়ে হেসে মুখ দিয়ে কেশে একসা! আমি অবশ্যই তার হাত দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছি “সন্ধ্যা সাতটায় কোয়ালিটিতে” সেটা মুঠোর রুমাল করে প্রশ্ন করা শুরু করলাম! সে কি প্রশ্ন বুঝলেন? বাবুন উত্তর দেবে কি মুখ খুল্লেই খালি ভকভকিয়ে হাসি বেরোচ্ছে! আমি তাকে একবার বকেও দিলাম, মনে হচ্ছে আপনি আপনার ভবিষ্যৎ নিয়ে সিরিয়াস নন! ধুর তার ভবিষ্যতের নিকুচি করেছে, চোয়ালে ব্যথা হয়ে যাচ্ছে এখন হাসতে হাসতে আর তুমি ব্যাটা সিরিয়াসের খেপ খাওয়াচ্ছ।

প্রশ্নোত্তর পর্ব্ব বেশ কিছুক্ষণ চলল মাসিমার নজরের সামনে! তিনিও বেবাক আলোচনায় সামিল হলেন! কিন্তু এবার তো চিরকুট হাতবদল করতেই হয়! অগত্যা মাসিমা মালপো খামু! অবশ্য মালপো অবধি পৌঁছতেই হল না! তিনি নিজেই উঠে গেলেন জল, কাঠগজা আর নিমকি নিয়ে আসার জন্য! এই সুযোগে আমি বাবুনের হাতে তার প্রেমিকের চিরকুট গুঁজে দিলাম “কবুতর জা জা জা” বাবুন তখন হেঁসোরাম হুঁশিয়ারের ডাইরি থেকে উঠে এসেছে! সে হাসতে হাসতেই চিরকুটটা হাতে নিয়েই কলকলিয়ে উঠল, “এটা কি?” মোলো যাঃ! এখুনি মাসিমা এসে পড়বে আর এ মেয়ে দেয়ালা করছে! হাড় হিম করা গলায় বললাম, “মাস্টারমশাই আপনি কিন্তু কিছু দেখেন নি!” মানে “চুপচাপ মাল্টা পকেটস্থ কর এবং পরে দেখে নিও!”

তারপর আর কি? কাজের বেলায় কাজী আর কাজ ফুরলেই রাজী! তেল চুকচুকে মুখ নিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরল আর রাত্রি নটায় বন্ধু এসে হাজির! মজুরী হিসাবে কাঁকুড়গাছির সামান্য এগ মাটন রোলই সই কিন্তু বন্ধুর আনন্দ বোধহয় লাখ টাকার সমান। প্রার্থনা করি সেই আনন্দ যেন বর্তমান থাকে চিরকাল।
আজ তারা ব্যাঙ্গালোরে তাদের ছোট্ট মিষ্টি একটা ফুটফুটে মেয়েকে নিয়ে সুখে শান্তিতে ঘরকন্যা করছে।

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ- ঘর কন্যা বলতে গেলে আমার ঘরের কন্যাটির কথা মনে পড়ে গেল! সে প্রথমবারের জন্য ফিসফাসে পা রাখছে! আপনাদের আশীর্বাদ কাম্য পাঠকপাঠিকারা! আশীর্বাদ করুন সে যেন যোগ্য ফিসফাসের যোগানকারিণী হয়ে উঠতে পারে!
তবে কিনা পা রাখবে আর গল্প করবে না তা কি হয়? তার কারণে আজকাল রাত দিন এক হয়ে যাচ্ছে, ঘুম হয় না- তাই রেড লাইটে হ্যান্ডব্রেক মেরে ঘুমিয়ে নিই সেকেন্ড তিরিশ! যতটা মেকআপ হয় আর কি! আজও ঘুমোচ্ছিলাম কিন্তু পাশের হণ্ডা সিটির চালিকা সাবানা আজমির কি খেয়াল হল কে জানে! নিজের জানলার কাঁচ নামিয়ে আমার জানলায় দুম দুম করে মেরে আমায় জানান দিল, “আপ সো রহে হো!” তিনি বোধহয় বর্ণ পরিচয় পড়েন নি! কানাকে কানা খোঁড়াকে খোঁড়া ঘুমন্ত কে ঘুমন্ত বলে না সেটা তাঁর জানা ছিল না!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ২- ব্যানার্জী লজের অন্ধকূপে খুব যে খারাপ ছিলাম তা কিন্তু নয়! যে সঙ্গটা পেতাম সেটা অমৃতযোগ ছিল! আমার কোয়ার্টার রুমমেট ছিলেন অরবিন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় বেঙ্গল কেমিক্যালের! দাদা যদি ভুল করেও ফিসফাস পড়ে থাকেন তাহলে যোগাযোগ করবেন-আমি এখনো সেই তিমিরেই পড়ে আছি।