(১১০)


লেখাটা লিখতে একটু দেরী হয়ে গেল বলে পাঠক পাঠিকারা মার্জনা করবেন। আসলে একটু অন্যরকম করে শুরু করব ভেবেছিলাম। হয়তো একটা কবিতা টবিতা। সৃষ্টির আদিকালে আমি খান কতক কবিতা পাড়ার চেষ্টা করেছিলাম বটে, কিন্তু সেটা খচ্চরের ডিমের থেকে বেশী দূর এগোয় নি। তাই লিখেতে বসে,

মেঘের আদর
গোলাপি চাদর
আমিও বাঁদর
তুমিও বাঁদর

এর বেশী এগোন গেল না। তাই আর কি এট্টু দেরী হয়ে গেল। আসলে বাঁদর সেই রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্রের কাল থেকে বাংলা সাহিত্যের মানবর্দ্ধন ও মানভঞ্জন করে আসছে। সেই যে কবিগুরুর অমোঘ উক্তি- ‘এই ঘরে একটি বাঁদর (বাঁ দোর) আছে’ সেই থেকে শুরু। তারপর সেই ‘হুলা হুলা গান আর ট্যাঙো ট্যাঙো নাচ’। প্রেমেন মিত্র। এ ছাড়া বিশেষ পড়েছি কি না মনে পড়ছে না। পাঠক পাঠিকারা একটু স্মরণ করিয়ে দিলে বাধিত থাকব।

সংস্কৃত সাহিত্যে তো বাঁদরদের গুরুত্ব অপরিসীম, তারা তখন রাম নাম লিখতে পারত রাবণকে ল্যাজে বেঁধে তিন ভুবনের পারে আলুকাবলি খাওয়াতে পারত। প্রযুক্তি বিদ্যাতেও তাদের গুণগান ছিল। প্রথম উল্লেখযোগ্য সেতু বন্ধন বাঁদর ইঞ্জিনিয়ারের হাতেই হয়েছিল। আর হনুমানের কথা তো বললামই না। এতই প্রতিভাবান ছিল যে উপযুক্ত পাত্রী পাওয়া গেল না। সারাজীবন হরিমটর আর রামকথাতেই চালাতে হল।

সে যাই হোক, আমাদের মধ্যেও একটা বাঁদরামির প্রবণতা কম বেশী দেখা যায় বলে বদনাম আছে নাকি আমরা বাঁদরের বংশধর। তবে কি না বাঁদর না হলে তো আর মানুষ হিসাবে গণ্যও করা যায় না। তা আমি খান দুই বাঁদরামির গল্প বলব। আপনারা ধৈর্য ধরে শুনতে পারেন।

প্রথমটি গত বুধবার সংঘটিত হল! এর সঙ্গে বাঁদরের প্রত্যক্ষ কোন যোগাযোগ নেই, কিন্তু বাঁদরামির আছে। মানে বাঁদরদের মতো সক্ষমতা তো মানুষের থাকে না, আমরা খালি চেষ্টা করতে পারি। আর্বান রানিং বলে একটা বস্তু হয়েছিল যেটা অক্ষয়কুমার থামস আপের বিজ্ঞাপনে প্রভূত প্রচার করেছিলেন। সে কিছু না, জানলার কার্নিশ, সিঁড়ির রেলিং, ম্যাজেনাইন ফ্লোর, ঝুলন্ত বাদুড় ইত্যাদি ছুঁয়ে লাফিয়ে গড়িয়ে বালীগঞ্জীয়ে নিজের শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানো।

তা এক কালে সে সব আমারও খুব মজাই লাগত। খুব যে করতে পারতাম তা নয় তবুও চেষ্টার তো কমতি ছিল না। বর্তমানে কোমর বেড়ে ৩৫, ফিটনেসের অবস্থাও খুব দারুণ কিছু না আর চটকানো হাঁটু তো আছেই। তো সে সব দিকে খুব যে মাড়াই তা নয়। আরে বাবা বয়সটাকে তো বোতলবন্দি রাখা যায় না।

কিন্তু মাঝে মাঝে উপায়ান্তর থাকে না যে। দুর্গাপূজা নিকটবর্তী হতে যত আরম্ভ করেছে। রিহার্সালের বহরও ততই বাড়ছে। তো বুধবার সপরিবারে রিহার্সাল বেড়াতে বেরোচ্ছিলাম। কিন্তু আমার পার্শ্ববর্তিনী কিছুতেই আর নীচে এসে পৌঁছতে পারছেন না। অন্যান্য বহু মহিলার মতো ওনার সাজুগুজুর প্রতি জেন্ডার বায়াস নেই বলে বেশ নিশ্চিন্তেই থাকি। তাই লিপস্টিকে যে সময় নষ্ট হচ্ছে না সে বিষয়ে নিশ্চিত। ফোনও এনগেজড। তাইলে?

এলেন তিনি মিনিট দশেক পর। এসে জানালেন, যে সামনের বাড়ির ছোট মেয়েটি বাড়ির ভিতর লোহার দরজা বন্ধ করে আপাত ঘুমোচ্ছে। বড় মেয়েটি প্রথমে আর তার পর তার মা এসে ফোন করে করে বেল বাজিয়ে বাজিয়ে হদ্দ হয়ে পড়ছে। পার্শ্ববর্তিনীর ফোনটিও এতক্ষণ উদ্ধারকার্যে মগ্ন ছিল।

এসব শুনলে কোন বিবেকবান বা রবীন্দ্রবান পুরুষই কি চুপ করে থাকতে পারে? আর আমার তো বনের মোষ তাড়াবার প্রবল তাড়না। ছুটলাম উপরে। গিয়ে পত্রপাঠ তিন তলার সিঁড়ির জানলা দিয়ে শরীর গলিয়ে কার্নিশের উপর পা রাখলাম। ঘুরঘুট্টি অন্ধকার, কার্নিশের উপর খুলে রাখা একটা জানলার গ্রিল সামনের বাড়ির ব্যালকনিটি ফুট চারেক দূরে। নীচে মেয়ের কান্না আর পিছে সামনের ফ্ল্যাটের ভদ্রমহিলার ক্রমাগত সাবধান বাণী। সব মিলিয়ে বেশ দোলাচলে।

আসল কথাটা হল ফিটনেস! বছর দুয়েক আগে হলেও এসব নিয়ে ভাবতাম না। কিন্তু এখন তো ওজন এবং বয়স পাল্লা দিয়েই বেড়েছে। ভদ্রমহিলাও দেখলাম বলছেন, “সিনহা জী, ছোড় দিজিয়ে! ও সো রহি হ্যায়। নিন্দ টুটনে কি বাদ হি খুলেগি!” আমি ভাবলাম হিরোগিরি দেখাবার সুযোগ কেই বা ছাড়ে। এক হাতে জানলার পাল্লার গোড়াটা শক্ত করে ধরে অপর হাত বাড়িয়ে চার ফুট দূরের ব্যালকনির কার্নিশে রাখা টবের চুলের মুঠি ধরে তুলে আনলাম অতীব সাবধানে। তারপর হস্তান্তরিত করলাম ভিতরে। খোলা গ্রিলটাও পায়ের তলা থেকে সরিয়ে একই গন্তব্যে পাঠালাম। তারপর যা থাকে কপালে বলে ষাট ডিগ্রি কোণাকুণি এক পায়ে লাফ মারলাম। ডান হাঁটুর শুবানাল্লাহ অবস্থার জন্য লাফ টাফ একটু সাবধানেই মারতে হয়। সেই হরিদার অমোঘ উক্তি, “সাবধানের বাবার মুখ ভর্তি দাড়ি আছে, সাবধানের মার নেই।” তাই এক পা।

নেমেই নিজেকে এবং নীচে দাঁড়ানো বাক্স প্যাঁটরাকে জানিয়ে হাঁক দিলাম, “পৌঁছ গয়ে।”

তারপর শুরু কসরত। দুটো দরজার লোহার আবরণ বন্ধ। কিন্তু ছোট ঘরের জানলাটা খোলা। সেখান দিয়ে ওয়াইপার দিয়ে প্রথমে কাঠের দরজার ছিটকিনি এবং তার পর লোহার দরজার আবরণ সরিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। ভিতরে সেই হাচ-এর কুকুরটা “খ্যাউ খ্যাউ” করে তেড়ে এল। আমি ওসবে বিশেষ পাত্তা টাত্তা না দিয়ে এগিয়ে গেলাম বেডরুমের দিকে। দেখি ভর সন্ধ্যা বেলায় গান চালিয়ে এসি চালিয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে ত্রয়োদশী কন্যাটি পাড়ি দিয়েছেন মালাবার হিলের ওপাড়ে।

বেশী না ঘাঁটিয়ে সদর দরজা খুলে দিয়ে “হেঁ হেঁ” হাসি নিয়ে গাড়ির পানে ছুটলাম। পিছনে ম্যাণ্ডেটরী ‘থ্যাঙ্কু ট্যাঙ্কু’র বহমানতাকে উপেক্ষাই করে নিলাম। রিহার্সালে দেরী করা আমার নিয়ম বিরুদ্ধ। গুরুর বারণ আছে।

দ্বিতীয় ঘটনাটি পরশু অফিসের। এমনিতে মোদীবাবুর আগমনে সরকারী বাবুগিরির আলতামাসি আরামের দিন কেটে পড়েছে। তার উপর বায়োমেট্রিক, ফিঙ্গার প্রিন্ট আই বল ম্যাচিং ইত্যাদিন হাইটেক ব্যাপার স্যাপার নিয়ে একদম ২২১ বেকার স্ট্রিট। তার উপর তিনি আবার বাউণ্ডারী সীমানা বেঁধে দিয়েছেন ১০০ দিন।

দাও ব্যাটা ১০০ দিনে কে কত গাল গল্প লিখেছ তার হিসাব কিতাব। তা গল্প উপন্যাস লিখতে আমার প্রতিভা তো অপরিসীম মূলো। যখন তখন গুঁজে দেওয়া যায়। তাই যুগ্ম সচিবের ঘরে নিজের ডিভিশনের হাল হকিকত পৌঁছতে যেতেই তিনি যুতে দিলেন অর্ধপক্ক ব্যঞ্জনের সঙ্গে। এখানে যাও সেখানে যাও শেষে সচিবের কাছে যাও। সচিব মহোদয়া অত্যন্ত মিশুকে এবং এক্সপ্রেসিভ। সব কিছুই ওনার মুখে চলে আসে। গুরু গম্ভীর মিটিং-এ বসে কোন মহিলা সহকর্মী যদি পুরুষ সহকর্মীর প্রায় গায়ের উপর পড়ে যাবার মতো অবস্থা হয় তাতেও তিনি ফুট কাটতে ছাড়েন না, “আরে দাস সাহাব, কোই সুন্দর লড়কি (পড়ুন পঞ্চান্ন বছরের মহিলা) আপকি উপর গির রহি হ্যায়, থোড়া তো হাস দিজিয়ে।”

তা তিনি দেখলাম তাঁর এবং যুগ্ম সচিবের পি এসের উপর মাথার উপর দাঁড়িয়ে হাঁউ মাউ করতে শুরু করেছেন আর পি এস যুগল বেচারা ১০ লাখের জায়গায় ১৫ কোটি লিখতে গিয়ে হোঁচট বিষম আর খাবি একসঙ্গে খাচ্ছে। আমাকে দেখেও তিনি বেশ বকা ঝকা করে দিলেন। আমি ওনাকে কিছু বলার আগেই। তারপর বলে দিলেন, “শরম আনে চাহিয়ে তুম লোগোকো, ইতনে ইয়ং অউর ইনটেলিজেন্ট হো মাগর কাম নেহি করতে হো অউর আভি হাস রহে হো।” ব্যাখ্যা করতে গেলাম না যে আমার কাজটা আমি করেই দিয়েছি। যার সমন্বয়ের কাজ তিনি দূর থেকে তখন গুলতির টিপ প্র্যাকটিস করছিলেন। মুখ দিয়ে বেরলো অমোঘ বাণী, “শরম তো আ রহি হ্যায় ম্যাডাম, ইসিলিয়ে আপনে আপ পে হাস রহা হুঁ।” এর পর আর কোন কথা হয় না।

যাই হোক কাজে লেগে পড়লাম, কিন্তু সন্ধ্যা ছটা নাগাদ পেটের ছুঁচো একটু নড়ে চড়ে বসলে চাড্ডি মুড়ির বন্দোবস্ত করতে সেকেন্ড ফ্লোরে গেছিলাম। গোলমালটা বাঁধল ফেরার সময়। স্বাভাবিক উদর বৃদ্ধি রোধ করতে এবং সক্ষমতা বজায় রাখতে আমি এলিভেটরের ব্যবহার করি না। সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছিলাম ষষ্ঠ তলে তৃতীয় তলেই দেখলাম অফিস সময় পেরিয়ে গেছে বলে ল্যাজ বিশিষ্ট বানর কূলের কনসার্ট শুরু হয়ে গেছে। বছর চারেক আগে এক উচ্চ পদস্থ অফিসারকে এই বানরকূলই বাথরুমের মধ্যে বন্ধ করে রেখেছিল ঘণ্টা চারেক। শেষে কেয়ারটেকার কয়েক জনকে নিয়ে এসে তারপর উদ্ধার করে।

আমার বরাবরের স্ট্র্যাটেজী, যা ফিসফাস-১এর পাঠক পাঠিকারা জানেন, তা হল ‘ইগনোর কর, ইগনোর কর মনা’। এখনও করছিলাম। কিন্তু দেখলাম তিনখানা বাঁদর আমার সহযাত্রী হল। পঞ্চম তলে গিয়ে দেখি আরও চারটে বসে এবং তার মধ্যে খান দুই বেশ বাছুরের সাইজের। ষষ্ঠ তলের দিকে পা বাড়াতে যাব, হঠাৎ নীচ থেকে উঠে আসা একটি বিচ্ছু বাঁদর কপাৎ করে লাফিয়ে আমার ঘাড়ে চড়ে ফেলল। আর আরেকটি ধেড়ে আমার পিঠে একটা আলতো করে থাবড়া লাগালো। আরেকটি তখন আমার পায়ের ডিম ম্যাসেজ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

পাঠক পাঠিকারা, সত্যি বলছি। মেরুদণ্ড বেয়ে ঠাণ্ডা স্রোত নেমে আসছিল। কিন্তু ডর কে আগে জিত হ্যায় না? তাই কোন রকম প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সোজা পঞ্চমতলের দরজায় ঢুকে গেলাম। তার একটু নিশ্বাস নিয়ে ভাবলাম নাহ, ঘাবড়ালে চলবে না। বাঁদরগুলো বোধহয় মাটি পরীক্ষা করছিল। কিন্তু এ মাটি বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি, বাঁদরের চাঁটি, চলো যাই হাঁটি। ফিরে এলাম ফেলে আসা পথে। বানরকূল সসম্ভ্রমে রাস্তা ছেড়ে দিল। বিচ্ছুটির হয়তো ইচ্ছা ছিল আমাকে পথ দেখাবে। কিন্তু বড়রা বারণ করল বোধহয়। যে পথে যুধিষ্ঠির করেছে গমন সে পথ কখনই নয় যে কমন। ফিরে এলাম এক বুক নিশ্বাস আর বিজয় গর্ব সঙ্গে করে। জিজ্ঞাসা করলে বললাম, হাঁ ঝপকি তো লাগায়া থা! মাগর উসকো রিয়্যাক্ট নেহি করনা! সবাই বেশ চোখ বড় বড় করে শুনলো বানর বিজয় কাহিনী আর আমি আবার ছুটলাম সচিব এবং যুগ্ম সচিবের হৃদয় জয় করতে। যা সে দিন রাত দশটা পেরিয়ে পরের দিন চারটেয় শেষ হল বটে। কিন্তু সে আরেক হিমালয় ডিঙোবার গল্প।

স্প্রাইট কিন্তু সত্যিই একটা দারুণ ক্যাচফ্রেস বানিয়েছে। ডরের পরে জিত অবশ্যই আছে। অবশ্যম্ভাবী…

(১০৯)

সেই হাড়জিরজিরে ব্যারামের মতো আমার সৎ হবার ব্যায়রাম আছে। মানে মাঝে মাঝে কিছু কিছু স্পেলে আমার অন্তরাত্মা টিকটিক করে ওঠে, আর বলে সব ঠিক সব ঠিক। মানে তখন আমি মেয়েদের দিকে অন্যচোখে(তৃতীয় নয়ন?) তাকাই না, পরীক্ষার খাতায় টুকলি করি না, রেডলাইট লাফাই না, দোকানদারের পয়সা মেরে দিই না ইত্যাদি এবং প্রভৃতি। সে এক ক্যাটাভরাস কাণ্ড। যে দেখে সেই কয়, এ ছেলে বাঁচলে হয়।

সেই আদ্যিকালের গোরুপোড়া দিনে কোচিং সেন্টারে বান্ধবীর দিকে না তাকাতে সে আমার প্রেমে পড়ে গেছিল। মানে সে ‘এক্সকিউজ মি!’ বলে রুমে ঢুকেছে আর আমি মন দিয়ে নোট টুকছি। সেই ক্যাড়াটা তখন হয়েছিল আর কি। আর সে কিনা সুন্দরী মহিলা পিতৃজন্মে এমন ছেলে দেখে নি যে তার দিকে তাকায় না। আর কি ক্যাচ কট কট। তারপর ভাগীরথী দিয়ে কত জল বয়ে গিয়ে এখন এসে দাঁড়িয়েছি অলকনন্দায়। মানে অলকনন্দা অ্যাপার্টমেন্ট- আমার বর্তমান বাসস্থান। কিন্তু তা বলে কি খিটকেলী ক্যাড়া আমাকে ছেড়ে যেতে পারে?

এই তো গত পরশুর কথা। ইণ্ডিয়ান অয়েল পেট্রোল পাম্প থেকে বেরিয়ে এসএমএস পেলাম যে আপনার এত টাকা এই পেট্রল পাম্পে কাটা হয়েছে। তার দশ মিনিট পরেই পেলাম যে আপনার তত টাকা সেই পেট্রল পাম্প থেকেই ফেরত এসেছে। এইসব ক্ষেত্রে, আমজনতা যারপরনাই উল্লসিত হয়ে পার্টি ফার্টির ব্যবস্থা করবে, আমিও করতাম। কিন্তু তখনই আমায় পেয়ে বসেছে ক্যাড়ামশাই। তাই আর কি সেদিন রাত্রে বেমালুম ভুলে গিয়ে পরের দিন গিয়ে হাজির হলাম পেট্রল পাম্পে। অ্যাটেণ্ড্যান্টগুলো তো চর্মচক্ষে বিশ্বাসই করতে পারছে না যে এরকম মদন মানুষ বর্তমান এবং তারা ভাগ্যবান যে এমন কাউকে দেখছে। খুব খাতির টাতির করল বটে কিন্তু ফ্রি পেট্রল দিল না! আরে বাবা সরকারী চাকুরে তো, ফ্রিতে বিষ পেলেও খেয়ে ফেলি। কিন্তু সেটা হল আজকেই

সততা দেখাতে গেলে আপনাকে কোন কিছু একটা ভুলে যেতে হবে এবং যার সঙ্গে ভুলে যাচ্ছেন তারও যেন মনে না থাকে যে আপনি ভুলে যাচ্ছেন। না না গোদা বাংলায় বলিঃ If you forget something with someone then let him/ her also forget that you have forgotten! কিছু উদ্ধার করা গেল না, না? জিলিপি পাকিয়ে লাভ নেই ঘটনায় আসুন।

হয়েছে কি, গত শনিবার এক কফিশপে পার্শ্ববর্তিনীকে নিয়ে গিয়ে দু কাপ কফি আর এক প্লেট পনির স্যান্ডউইচ পিটিয়ে (অবশ্যই চিকেন ছিল না বলে! না হলে কে আর হবিষ্যি খেতে যায়!) আলবেয়ার থেকে মুখার্জী সব কামু-র গুষ্টির তুষ্টিপুজো করে বেমালুম ভুলে চলে এসেছিলাম ঘরের ছেলে ঘরে। কফিশপের ছেলেটি পরিচিত ছিল। তার উপর আগের দিন কাপের বদলে হ্যাণ্ডেলহীন গ্লাসে কফি পরিবেশন করে পার্শ্ববর্তিনীর কাছে কড়া আর আমার কাছে মিঠে করে বকু খেয়েছে। তাই সেও বোধহয় জোর করে ভুলে গেছিল যে দাম দেওয়া হয় নি বা দিতে হবে। সে তো নম্বর বাড়াবার চক্করে গদগদ।

তা যাই হোক, আজ গিয়ে কথাটা পাড়লাম, যে দেখ ভাই দেখ, আমি পয়সা দিতে ভুলে গেছিনু। আর সেই দিন থেকে ঘুম নেই কারও চোখে। তা সে ছেলেটির ডিউটি ছিল না আজ। কিন্তু যার ছিল, সে এতটাই ক্ষীর হয়ে গেছিল যে, আজকের খাওয়া কফিটাও ফ্রিতে দিয়ে দিল। মানে আগেই খেয়ে নিয়েছিলাম, দামটা নিল না। আর আমিও ভাবতে শুরু করলাম পৃথিবীতে সবুজ ভাব যেন এই অকাল বর্ষণের ফলে বেড়ে গেছে। বেড়েই গেছে।

আরেকটা গল্প বলি আসুন। হয়েছে কি, আমি এমনিতে ক অক্ষর গোমাংস। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সরকারী চাকুরী করার ফলে একটা অদ্ভুত সুন্দর জলের মতো গ্রহণযোগ্যতা তৈরী হয়েছে। মানে একটু সময় আর যা কিছু দিলেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যা কিছুও জলবৎ তরলং হয়ে যায়। তা পেট্রলে ইথানল মিশ্রণই বলুন আর সাধারণ প্রশাসনিক রুটিন কারবারই বলুন। যা দেবেন সবেতেই সারেগামাপা বাজিয়ে দেব।

তা আর পরীক্ষার মুখ্য পর্যবেক্ষক বা উত্তরপত্র পরীক্ষকই বা কি এমন ইয়ে? হয়েছে কি দৃষ্টিহীনদের জাতিয় ইনস্টিটিউট থেকে আর্জি এল যে তাদের রিসার্চ অফিসার, অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এবং প্রশাসনিক আধিকারিক ইত্যাদি প্রথম শ্রেণীর পদের নিয়োগ পরীক্ষায় পর্যবেক্ষকের ভূমিকা নিতে হবে এবং প্রশাসনিক আধিকারিকের খাতাও পরীক্ষা করতে হবে। এমিতেই আমার বিজ্ঞ বিজ্ঞ হাবভাবে তাদের ধারণাই ছিল যে আমি অনেক কিছু জানি! তার উপর আবার দু মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরেছি। শুধু তারা কেন? আমার সংযুক্ত সচিবেরও ধারণা হয়ে গেছে যে আমার দুটি পাখা একটি শিং এবং একটি সুকেশী ল্যাজ গজিয়েছে।

তাই কাল আমার দায়িত্ব পড়েছিল ইউনিকর্ণের ডিমটি প্রসব করতে। এমনিতে তো কিছু না- পদবলে হুম হাম সহযোগে হাঁকডাক করা আর লিখে রাখা নির্দেশগুলি হিন্দি ও ইংরাজিতে স্পষ্ট করে বলে কেউকেটা হাব ভাব নিয়ে ঘুরে বেরানো। তা শেক্ষপীরই তো বলে গেছেন সমস্ত দুনিয়া মঞ্চ আর আমরা সবাই ভায়রাভাই! তা সে কাজ তো করেই ফেললাম।

কিন্তু গোলমাল বাঁধল খাতা চেক করার সময়! বুক ধুকপুক ধুকপুক করছিল। এই বুঝি শিয়ালের আসল রঙ বেরিয়ে পড়ল। পরীক্ষার্থীরা সব এমবিএ এবং ন্যুনতম পাঁচবছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। কিন্তু যেই অবজেক্টিভ টাইপে চোখ গেল তখনই আত্মবিশ্বাসটা বাঁধাকপির পোশাক ছেড়ে রোদ্দুরে সপাট দাঁড়ালো। গোলাপ, ডেইজি, ফুলের কুঁড়ি এবং টিউলিপের মধ্যে টিউলিপই হল ভীন গ্রহের জীব। কারুর মৃত্যুর পর বইয়ের রিভিউ প্রকাশিত হলে তাকে মরণোত্তর প্রকাশন বলে। যত দেখছি ততই জ্ঞান বৃদ্ধি হচ্ছে।
কোন আইনের অধীনে প্রতিবন্ধীদের সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে তা চল্লিশ শতাংশই লিখতে ভুল করেছে অথচ তার ঠিক দুটি প্রশ্ন নীচেই প্রশ্ন আছে, “পার্সন্স উইদ ডিস্যাবিলিটি আইন, ১৯৯৫” অনুসারে দৃষ্টিহীনদের জন্য সংরক্ষণ কত শতাংশ।

বিবরণধর্মী প্রশ্নে গিয়ে তো আরও খারাপ অবস্থা। সাধারণ অর্থনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী ক্যাপিটাল গুডস ব্যবহারের অযোগ্য হলে তা বাতিল করার পন্থা বিস্তারিত বলতে গিয়ে সীতা কার পিতা তার গল্প করা হয়েছে। ব্যবহারের অযোগ্য হলে তা কি করে যোগ্য করে তুলতে হবে তার ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শেষ মেষ যদি সত্যিই তা ব্যবহার না করা যায় তাহলে সাধারণ অর্থনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী না কি তাকে বাতিল করতে হবে। সত্যি বলতে কি বিবরণধর্মী প্রশ্নে কুড়িতে চারের বেশী কাউকে দিতে পারলাম না!

প্রতিষ্ঠানের ডাইরেক্টর প্রায় কেঁদে ফেলেন আর কি- “সৌরাংশুজি সব কো ফেল করা দিজিয়ে! নহি তো ইনি …সে হামে কাম করওয়ানা পরেগা!” কিন্তু সরকারী নির্দেশ! যোগ্যতামান নীচে করে অন্তত চারজনকে ইন্টারভিউয়ের যোগ্য ঘোষণা করিয়ে তবেই ছুটি পেলাম।

স্টুডিয়োর ঘড়িতে ছোট কাঁটা তখন সাত ছুঁই ছুঁই। কিন্তু মনের মধ্যে এতদিন ধরে পুষে রাখা এমবিএ করতে না পারার দুঃখটা যে সন্ধ্যার সূর্যের মতই দিগন্তে বিলীন হয়ে গেছে।
“লেখা পড়া করে যে/ অনাহারে মরে সে/ জানার কোন ‘সেস’ নাই জানার চেষ্টা বৃথা তাই/ যায় যদি যাক প্রাণ হীরকের রাজা ভগওয়ান!”

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ মোদী সাহাব শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষক দিবসে গুরুপূর্ণিমা পালন করবেন, আপনারা পারলে স্কুলে সরাসরি সম্প্রচার করবেন- মানব কল্যাণ দফতরের এই আপাত নিরীহ অনুরোধটাকে বহু স্কুলেই দেখছি মোজেসের প্রথম নির্দেশের মতো অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার জন্য এবং আপামর শিক্ষার্থীকূলকে মান্য করানোর জন্য হামলে পড়েছে! সত্যিই বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়!!

(১০৮)


বহুদিন চুপচাপ থাকার পর ফিসফাসের পোকাটা একটু নড়ে উঠল। আসলে আলসেমি করতে কার ভাল লাগে বলুন? তা বলে আমি কি আর আলসেমি করছিলাম? নরেন্দ্র ভাইয়ের ‘লেস গবর্মেন্ট, মোর গভর্নেন্স’-এর চক্করে নাকে দড়ি দিয়ে হিল্লি দিল্লি করছিলাম। তবে ঘাঘু মাল, একটু পরেই দড়ি আলগা করার ফিকির শেখা হয়ে যায়। সরকারী চাকুরেদের অ্যাডাপ্টেবিলিটি ঐতিহাসিক।

যাই হোক, দিন চারেক আগে গাড়ি চালিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ, ৯১.১ এফ এমের কাঁটায় শুনতে পেলাম আলোচনা চলছে বাচ্চাদের খেলার জায়গার অভাব নিয়ে। অবশ্য দিল্লিতে এমনিতে সবুজের অভাব নেই। জঙ্গলের বুক চিরে বানানো শহরে গাছপালা আর বাঁদরদের যত্রতত্র অধিষ্ঠান। কিন্তু কথা হল প্রকৃত খেলার মাঠ আছে কি?

কোলকাতায় যেমন ময়দানকে শহরের ফুসফুস বলা হয়, তেমনই দিল্লীতে এতটা বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ঠিক কোন খেলার জায়গা নেই বললেই চলে। যদিও দুটি বহু দেশীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হওয়ার সুবাদে একটা মাল্টিপারপাস স্টেডিয়াম, একটা ক্রিকেট স্টেডিয়াম, একটা সুইমিং পুল, একটা একটা ফুটবল আর হকি স্টেডিয়াম আর খান তিনেক ইন্ডোর স্টেডিয়াম দিল্লির বুকে রয়েছে। আর অনতিদূরেই রয়েছে আন্তর্জাতিক রেসিং ট্র্যাক। কিন্তু সত্যি বলতে কি শিশু কিশোরদের খেলাধুলা করার জায়গা যে অপ্রতুল তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এই নিয়ে আমার অভাব অভিযোগ বহুদিনের। তাই এই সম্পর্কে যখন বার্তালাপ চালু হল তখন কান তো গণেশ ঠাকুরের মতো লম্বা করতেই হল। গিনি বলে যে আরজে খেলার ছলে আলোচনা করছিলেন, তিনি এই নিয়ে দেখলাম বেশ প্যাশনেট।

তা মূল বক্তব্য হল, যে সব খেলার মাঠ বা পার্ক ছিল সেগুলো হঠাৎ করে সৌন্দর্যায়নের প্যাঁচে পড়ে গেছে। গাছ পালা লাগিয়ে বাড়ির বাগান করার শক জনসাধারণের ব্যবহারিক স্থানে উঠে এসেছে। কুড়ি মিটার জায়গা পেলেই তার মাঝখানে বসার বেঞ্চি লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর হয়েছে ঢোকা মাত্রই একটি জাব্দা নীল কালো সাইন বোর্ডের আমদানী। যে সাইনবোর্ডটি গোটা গোটা অক্ষরে স্পষ্টের থেকেও জোরদার ভাষায় জানাচ্ছে যে, ক্রিকেট খেলা এবং কুকুর নিয়ে বেরানো বারণ। সত্যিই তো, ক্রিকেট খেলা তো কুত্তা ঘুমানার সমগোত্রীয়ই। তার জন্য সরকারের উচিত ভিন্ন জায়গা করে দেওয়া যাতে সাধারণ যারা বয়স্ক ব্যক্তিরা আছেন তাদের ঘোঁট পাকাবার জায়গার অভাব না হয়।

একটু ভিতরে ঢুকতেই জানা গেল যে এগুলো সব এলাকার আরডব্লিউএ-দের ফরমান। কিভাবে ডিডিএ বা জিডিএ পার্কের অধিকার আরডব্লিউএ-র হাতে চলে গেল, এবং কি ভাবেই বা স্পোর্টস গ্রাউণ্ডগুলো আধিকারিকের নকশায় রাতারাতি বদলে গিয়ে প্রমোদকাননে পরিণত হল, সে সব কথা আর কপচিয়ে কি করব। বুদ্ধিমান পাঠক/ পাঠিকারা ইতিমধ্যেই জেনে গেছেন যে এসব ম্যাজিক করতে পি সি সরকারের শরণাপন্ন হতে হয় না। প্রমাণ সাইজের ভুঁড়ি আড়ালেই কালো কালো থলিগুলি লুকিয়ে থাকে যারা এই সব ব্ল্যাক ম্যাজিক করে ফেলতে পারে।

আমার পুত্রটি যখন আরও একটু ছোট ছিল, তখন আমাদের এলাকার একটা খেলার মাঠ আর একটা পার্ক এভাবেই কেমন যেন বরপণের সঙ্গে ছোটদের হাত থেকে চলে গেছিল। যেমন ছোট ভাই বোনেদের দিদিদের হয়। হঠাৎ একদিন দেখে যে যে দিদি একান্ত আপন ছিল সে ঘোমটা গয়না চড়িয়ে পরের ঘর করতে চলে গেছে।

এতটা গলার, পেশীর বা ব্যাক পকেটের জোর কোন কালেই ছিল না যাতে এর প্রতিবাদ সামনে দাঁড়িয়ে করে ফেলতে পারি। আসলে নিজভূমে পরবাসের মতই দেখতাম, যে জায়গাটাকে সেই ২০০৫-এ নিজের বলে মনে করে আপন করে নিয়েছিলাম, তারই রকম সকম চাল চলন পালটে গেল। এত সবুজ এত সবুজ যে সবুজ পোশাকেও তা আঁটে না। আঁটবে কি করে? বাচ্চা বুড়োদের খেলাটা বন্ধ করাই তো মূল লক্ষ্য ছিল! তাহলেই তো নিজের বাড়ির কাঁচ ফুলের টব আর ডালের বাটি সুরক্ষিত থাকে।

সন্ধ্যায় একটু প্যাঁচ পয়জার করার জন্য শুধুমাত্র একতা কাপুরের আশ্রয় নিতে হয় না। কুটকাচালী, কিটি আড্ডা আর পিএনপিসি দেদার চলতে পারে মশার রাজত্বে হানা দিয়ে কালচে সবুজের বুকে! সত্যিই তো, খেলাধুলো করে কটাই বা শচীন আর বিরাট কোহলি বেরিয়েছে। পি টি ঊষা তো দূর অস্ত। ছেলেমেয়েরা পড়াশুনো করুক, না হলে মানুষ হবে কি করে? আসলে মানুষ তো নিজের বুদ্ধির জোরেই জীবনে সুখ স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে এসেছে। প্রযুক্তির আবির্ভাব তো উন্নতির লক্ষণ। তাই ভিডিও গেমস টিভি গেমস পেরিয়ে এসে মোবাইল গেমস।

কচি কচি বোকাবাক্সগুলোতে কচি কচি শৈশব কৈশোর বিলীন হয়ে যাচ্ছে, আর আমরা বড়রা বড়াই করছি এই বলে যে, “আমার ছেলের সময় কাটাবার জন্য অযথা সময় নষ্ট করে না” “আমার মেয়ে তো কম্পুটার এক্সপার্ট!” “আরে টুটুল তো আমার মোবাইলটা ব্যবহার করতে আমার থেকে অনেক ভাল জানে!” বাংলায় লিখলাম বটে, কিন্তু এই সমস্যা বিশ্বজনীন। বিশেষত দিল্লির মতো কসমোপলিটান শহরে যেখানে বৈদ্যুতিক বা ইলেক্ট্রনিক প্রযুক্তিবিদ্যা চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। সেখানে যুগের সঙ্গে চলতে গিয়ে ছোটাছুটি খেলাধুলো তো বিসর্জন দিতেই হবে। আমাদের তো রিমোট আছে, অনলাইন শপিং আছে। ইনস্ট্যান্ট মিক্স আছে। কে আর কষ্ট করে কসরত করে গতর খাটায়?

সমস্যাটা দেখবেন অন্যত্র! এমনিতেই এখন আণবিক পারমাণবিক পরিবার আর পরিবার নিয়ন্ত্রণের পাল্লায় পড়ে সমবয়সীদের সঙ্গে বেড়ে ওঠার গল্প কমে গেছে। তার উপর প্রযুক্তির প্রকোপ। দুই সমবয়সীকে সামনাসামনি বসিয়ে দিন না! দেখুন, “কেমন আছ”, “কোথায় আছ” “কি করছ”-র গণ্ডি পেরিয়ে তারা কথা খুঁজে পায় না। শেষমেশ গ্যাজেট গুরুর চরণে নিজেদের বাকি সময় সমর্পন করে বাঁচোয়া।

তারা এখন সোশাল মিডিয়া- ফেসবুক টুইটার হোয়াটসঅ্যাপে স্বচ্ছন্দ। প্রযুক্তির বিকাশ। কিন্তু এর শিকড়টা লুকিয়ে আছে অন্যত্র। আমাদের ফাস্ট লাইফস্টাইলের চক্করে পরে বছর তিরিশের মধ্যেই সকালে উঠে হাঁটতে শুরু করা আর জিম জয়েন করা এখন ফ্যাশন ফ্যাড হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাচ্চারাও হরেদরে জিম জয়েন করছে। ভাবতে পারেন, শিশুরা ঘাসে নিঃশ্বাসে মিশে না গিয়ে শরীরের যত্ন নেবার জন্য জিম জয়েন করছে? এর ফল স্বরূপ হয় সোফা কাউচে বা রোবোটিও গ্রীক ঈশ্বরে পরিণত হবে। আর লাইফস্টাইল সম্পর্কিত সবরকম রোগ বাঁধিয়ে বসবে। প্রকৃতির বুকে টিকে থাকার জন্য তারা তো তৈরীই হচ্ছে না। তাদের তৈরীই করা হচ্ছে রেসের মাঠের ঘোড়া হিসাবে।

সহমর্মিতা, সংবেদনশীলতা, উষ্ণতা, নির্মল আনন্দ, কলরব, এসব কথাগুলো ধীরে ধীরে এলওএল, আরওএফএল, টিসি, আরআইপি এই সব ক্ষুদ্রনামের চাপে ফসিল হয়ে যাচ্ছে। দায়িত্ব কি আমরাও এড়াতে পারছি। আরডব্লিউএ-র মাথায় যে সকল শুভবুদ্ধিহীন বয়স্ক ব্যক্তিরা বসে আছি, তারা তো আমাদেরই সিস্টেমের ফসল। চল্লিশ পেরিয়ে চালসে, পঞ্চাশ পেরিয়ে পানসে, ষাট পেরিয়ে গেঁটে বাতের ধাক্কায় বাহাত্তুরে ধরতে আমাদেরই তো বেশী সময় লাগছে না। প্রতিবাদ করব? সময় নেই! একসঙ্গে আলোচনা করব? সময় নেই। সামাজিকতা করব? সময় নেই! বাচ্চাদের নিয়ে নিজেরা খেলতে যাব? সময় নেই। অগ্রগতির চাকা তো আমাদের বুকের ওপর কুরুক্ষেত্রের কর্ণের চাকার মতো ধীরে ধীরে জাঁকিয়ে বসছে, সে খেয়াল আছে?

ন্যুনতম শুরুটা তো আমাদেরকেই করতে হবে! কাউন্সিলরের সঙ্গে দেখা করে, স্থানীয় এনজিওগুলির সঙ্গে আলোচনা করে। সর্বোপরি আধিকারিকের কাছে বিষয়টি নিয়ে যেতে হবে। আমাদেরকেই। মনে করে দেখুন তো কোন পৃথিবীতে আমরা এসেছিলাম আর কি রেখে যাব? মুকদ্দর কা সিকন্দর তো সেই হয় যে হাসতে হাসতে এই পৃথিবী থেকে যেতে পারে। উন্নতির কালো ধোঁয়ায় তো মুখ ঢেকে যাচ্ছে। আসুন না। আমরাই আগামী প্রজন্মকে সবুজ চেনাই।

সকালের সোঁদা গন্ধওলা ঘাসের উপর খালি পায়ে হাঁটার আনন্দ চেনাই। ঘামের মধ্যে দিয়ে স্ফুর্তির পুর্তি উপভোগ করাই। দায়িত্ব তো থেকেই যায় আমাদের উত্তরপুরুষদের জন্য। আমেন।

(১০৭)


কি বলি বলুন তো? এমনিতে আমি বিশেষ ধম্ম কম্মের ধার দিয়ে যাই না… মানে আমি মনে করি যে ধর্ম ভীষণ ব্যক্তিগত বিষয়, কারুর কোথাও নাক গলাবার অধিকার নেই। কিন্তু কোন কিছুরই কি অতি ভালো? অগতির গতি অনাথের নাথ সবি তো থিক কিন্তু যদি প্রতি পদক্ষেপে মন্দির আর সেই মন্দিরের বন্দনার গল্প তৈরী হয় তাহলে কি আর কাজ করা সম্ভব হয়? এই যে আমি তামিলনাড়ুর ভিল্লুপুরমে এসে গ্রামীণ উন্নয়ন বিষয়ক একটি রিপোর্ট তৈরী করছি আরও বেশ কিছু সমপদভুক্ত অধিকারীর সঙ্গে সেখানে ভগবানের উপস্থিতি মাঝে সাঁঝে হলে মন্দ না। তবে বেশী খেলে বিরিয়ানী কেন ডালভাতও পেটে সয় না। ভগবান তো মনের জিনিস মনজিনিস।

তা কি হয় কাকা? নাইতে নেমে চুল ভেজাব না, নাচতে নেমে বাঁকা উঠোন এসব বললে ভবি ভোলে নাকি? এসেছ মন্দিরের রাজ্য তামিলনাড়ুতে, যেখানে প্রতিটি গ্রামে একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়য়, একটা অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র, একটা জনবন্টন ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গে একটা করে মন্দির উপস্থিত। তার তার মধ্যে তো কিছু কিছু জায়গায় ঢুকতেই হবে, না হলে ঘাড় শক্ত হয়ে যায়।
ভিন্ন ভিন্ন ব্যাকগ্রাউণ্ডের ব্যক্তিদের দলনেতার কাছে দাবী অনেক। সমতা ক্ষমতা এবং মমতা দুমদাম করে জায়গা বদল করে নেয় আর তখন হাতে পড়ে থাকে পেনসিল।

তবু দু একটা জায়গার কথা তো বলতেই হয়। এই যেমন কালকেই গেছিলাম চিদাম্বরমে। মানে আমাদের বিগত অর্থমন্ত্রীর দেশ আর কি! চিদাম্বরমের নটরাজ মন্দিরের অবশ্য ব্যাপারই আলাদা। কথিত আছে যে, এই নটরাজ মন্দির থেকেই ভারতনাট্যমের যাত্রা শুরু। মন্দিরের গোপুরমের চৌকাঠ পেরবার সঙ্গে সঙ্গেই যেন সম্পূর্ণ গল্প বদলে গেল।

তখন সন্ধ্যা হব হব করেছে কি হয় নি! সিন্দূরই আকাশের ছোঁয়া বেয়ে যখন চিদাম্বরম শহরটাতে প্রবেশ করছি তখন সারাদিনের পরিশ্রমের শেষে, তখন শরীর বেয়ে ক্লান্তির ধারা। আশা আকাঙ্ক্ষার বিন্দুমাত্র বাকি ছিল না, পথচলতি মন্দিরে মন্দিরে হতাশার বোঝা বয়ে বেড়ানো ছাড়া তো কিছুই পাই নি।

গোপুরমটি বেশ সুন্দর এবং সমস্ত দক্ষিণই মন্দিরের মতই দশাসই। কিন্তু চমকটা ছিল দু কদম দূরেই। মন্দিরে প্রবেশের দরজায় যথারীতি বিধিবদ্ধসতর্কীকরণ, ক্যামেরা এবং মোবাইল প্রয়োগ নিষিদ্ধ। কিন্তু অন্যান্য অসহিষ্ণুদের মতো বিদেহসীদের প্রতি কোন নিষিদ্ধিবার্তা নেই। আশ্চর্য! এমনিতে দক্ষিণভারতীয় মন্দিরগুলিতে বিদ্বেষভাবের জন্য আমার অসূয়ার অন্ত থাকে না। প্রত্যেক মন্দিরেই সাধারণ দর্শনার্থী, বিশেষ দর্শনার্থী এবং বিশেষ বিশেষ দর্শনার্থীদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থা। আরে ভগবানের কাছে ভক্তের আবার শ্রেণীবিভাগ হয় না কি রে পাগলা? তাও আবার অর্থের বিনিময়ে কিনে নেওয়া ভক্তের ভালবাসা! তার উপর বিদেশী দেখলেই নিষেধাজ্ঞা- যেন বিদেশীদের মধ্যে হিন্দু আর স্বদেশীদের মধ্যে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হয় না।

যাই হোক নটরাজে ফিরে আসি। আরও দু কদম এবার মন্দিরের দরজা দিয়ে ঢুকতেই যেন এক ধাক্কায় সময়টা পিছিয়ে গেল একেবারে দুশো তিনশো বছর। সন্ধ্যার আলোটাতেও কেমন যেন নস্টালজিয়ার ছোঁয়া। মন্দিরের গায়ে গায়ে কষ্ঠিপাথরের কারুকার্য আর ভরতনাট্যমের মুদ্রা। আহা ঘণ্টার আওয়াজ তো নয় যেন যুগের ঘড়ি ঢং ঢং করে সময়কে বুকের মধ্যে আগলে রেখে দিয়েছে।

এদিক ওদিক বিষ্ণু পার্বতীর মন্দির ছুঁয়ে সবার অলক্ষে ঢুকে গেলাম গর্ভগৃহে। নাহ হে নটরাজ আমি সত্যিই হেরে গেলাম! মন সরিয়ে ঢুকে রাখতে গিয়েও কেমন যেন রোমাঞ্চ অনুভব করলাম। এই কি সেই গদাধরের বক দর্শন?

চুপচাপ আরতির সময় হেঁটে হেঁটে বেরিয়ে এলাম বাম দিকের পুষ্করিণীর পাড়ে। দূরে আকাশে নীল কমলা মেঘ সূর্যের মাখামাখির মধ্যে দিয়ে চারদিকের চারটে গোপুরম মাথা উঁচু করে রয়েছে আর দিঘির শ্যাওলা ধরা জলে তার টলমলে ছায়া। আবীর লেপে দিয়েছেন তিনি আকাশ ভরে। পুকুরের ওপারে বোধহয় শ্যুটিং চলছে। প্রদীপ আর পদ্ম ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাঁ দিকের মন্দিরের গা বেয়ে ভেসে আসছে ঘণ্টার শব্দ আর আরতির গন্ধ। কেউ কোত্থাও নেই। মোবাইলও অবস্থা অনুধাবন করে বাসের খোপে আশ্রয় নিয়েছে। অতীত বর্তমান আর অনাদৃত ভবিষ্যৎ মিলে মিশে একাকার হয়ে বসে আছে। বসে আছি আমিও অনন্তের অপেক্ষায়।

আরও একটু পিছিয়ে যাই, আরও একটা দিন। অনেক কসরত করে তবেই অরোভিলের মাতৃমন্দিরে ঢুকতে পারলাম। শব্দহীন বর্ণহীন আড়ম্বরহীন প্রবেশ। ভক্তের বেশ ছেড়ে মানব বেশে প্রবেশ। প্রার্থনা গৃহে স্ফটিক গোলকের মধ্যে দিয়ে আমার ফেলে আসা দিনগুলি ফিরে ফিরে আসছে। নিচের তলার কলকল শান্ত জলের মধ্যে দিয়ে বিলীন হচ্ছে মহাশূন্যে।

হারিয়েছি যত তা সত্যিই কি হারিয়ে গেছে? সামান্য মোবাইল থেকে শুরু করে, চটি ছাতা ওয়াটার বোতল এমন কি মানুষও। ছেলেবেলার যারা সব ছিল তারা কি আর কোথাও নেই! নাকি সময়ের অন্তরালে তারা আমার আশেপাশেই অবস্থান করছে। অরোভিলের কেন্দ্রের বিশাল বটগাছের বিশালত্বের মধ্যেও অনুভূতি হয়, মানব সম্ভাবনার কথা। ভিতর পানে একটু ঝাঁপাও দেখি মন! ডুবে দে ডুবে দ্যাখ দিকি। কি সৌন্দর্য্য ছড়িয়ে রয়েছে সেখানে।
আমার রুমমেট ঝাজী আমায় বললেন সকলের মধ্যেই তিনি বাস করেন। তাকে খুঁজে পেতে নিজের নিজের পথ ধরতে হয়, তার জন্য ভিতরে তাকালেই চলে, খুড়োর কলের দরকার পরে না।

মনে পড়ে গেল সেই ছিয়ানব্বইতে প্রথমবার অরোভিলে আসার সময় আমার ভাইটাও সঙ্গে ছিল। এখনো আছে বোধহয় আনাচে কানাচে! চোখের জল যে মিথ্যা বলে না…!

(১০৬)


শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সেই অমোঘ পঙক্তিটি মনে পড়ে যায়- ‘ধর্মেও নয় জিরাফেও নয়’। মাথা উঁচু করে চলতে চলতে হঠাৎ আবিষ্কার করি যে অর্ধেক লেফটে এবং অর্ধেক রাইটে চলে গেছে আর বাকিরা আমার পিছনে। ফিসফাসের পাঠক পাঠিকারা ভাবতেই পারেন যে হঠাৎ কাব্যি করার চেষ্টা করছি কেন? আসলে গভীরতা মাপার ফিতে দিয়ে তো মন মাপা যায় না। তাই বলদ শ্রেণীর প্রাণী হয়েও সেখানেই খেয়ে দেয়ে শিবের গাজন গাওয়া সবার ধাতে নেই। সহ্যও যে হয় তা আর বলছি না।

কর্মক্ষেত্রে যখন ল্যাদ আসতে আরম্ভ করে তখনই বুঝতে হবে যে সঠিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন আছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা ল্যাদ ভুলে গিয়ে উদ্যমী কর্মশক্তিতে পরিণত হয় বলেই তাবড় তাবড় প্রবন্ধন গুরুর বক্তব্য। সেই অনুসারে আমাদেরও পাঠানো হয় সিঁড়ি ভাঙা অঙ্কের হিসাব মেলাতে প্রশিক্ষণ শিবিরে।

লিডারশিপ কারে কয়? নেতা টাইপের ব্যক্তিত্বরা যখন হুম হাম সহযোগে দলীয় ভাবনাকেই মদীয় ভাবনা মেনে নেন এবং তা সমাপন করতে যারপরনায় উদ্যোগী হয়ে ওঠেন তখনই নেতৃত্বের পূর্ণতা। তা প্রশিক্ষণ শিবিরে নেতৃত্ব বা লিডারশিপের উপরেও পরিমিত জ্ঞান প্রদান করা হয়।

এমনিতেই সরকারি সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাঝারি স্তরের অধিকারীদের কর্ম সম্পর্কিত বহু অভাব অভিযোগ থাকে। তার উপরে যদি তার পরিশ্রম করার ক্ষমতা এবং কর্মের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে আধিকারিক কার্মিক প্রশিক্ষণ সংস্থার প্রধান প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে হ্যাঁচড় প্যাঁচড় করে জ্ঞান বিতরণ করতে থাকেন এবং মঞ্চে আসীন প্রশিক্ষকরা বিব্রত এবং ঘুমন্ত হয়ে পড়েন, তাহলে সত্যকারের নেতার কি কাজ? বুক চিতিয়ে শব্দভেদী বান বুকে নেওয়া? মঞ্চে আসীন প্রশিক্ষকদের পদানুসরণ করে মন্ত্রের সাধন এবং অবশেষে দিবানিদ্রা গমন করা? নাকি চলন্ত ট্রেনকে দুম করে চেন টেনে হ্যাঁচকা মেরে থামিয়ে দেওয়া? সুনেতার কর্তব্য হল শেষটি।

আরে বিশেষ কিছু নয় লিডারশীপ ক্যাম্প শেষ হবার পর আই এস টি এমের মুখ্য আধিকারিক এসে ‘তোমরা দেশের ভবিষ্যৎ’ ‘তোমাদের হ্যানা করা উচিত তেনা করা উচিত’ বলে হরির লুটের মত জ্ঞান বিতরণ করছিলেন। কেউ কিস্যু করতে পারছেন না। মঞ্চে বসে থাকা প্রশিক্ষকরা সারা দিনের পরিশ্রমের শেষে যা তা রকমের ক্লান্ত। কোর্স ডাইরেক্টর বিব্রত এই সময় উপায় না দেখে যদি ‘ধন্যবাদ মহাশয়, আপনার উদ্দীপক বক্তৃতার জন্য। আমাদের কর্ম জীবনে এমন বক্তৃতাই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে’ বলে যদি দুম করে ব্রেক মেরে গাড়ি বন্ধ করে গ্যারেজের চাবি যদি শিকেয় তুলে দিই তাহলে তাকে কি জনসেবা বলা যাবে? ভেবে দেখার বিষয়।

প্রশিক্ষণের আবার একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হল ক্লাসে বসে পড়াশুনো। আরে বাবা সেই রামও নেই আর নেই সে অযোধ্যাও! দোল দোল দুলুনি চোখ জুড়ে ঢুলুনি! সামলাবি কেমনে পাগলা খাবি কি? জল খা! জল খা, হাওয়া খা, কপালে হাত ঘস, উঠে ঘুরে আয়! কিন্তু এসব করেই যদি চোখে টুথপিক লাগাতে হয়? তাহলে আর কি স্বীকার করেই নে! ঘুমনে গয়া থা! আব ওয়াপস! সব শুনেছি অবচেতনে! বলব আপনি শেষ বাক্য কি বলেছেন? আহা এ সব তো তরিবৎ শিল্প!

সেই প্রাচীনকালে যখন কেরিয়ার শুরু করি জুটমিলের পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট বিভাগে, তখন চাকুরীর পরীক্ষা আর মেটিয়াবুরুজের যাত্রায় ঘুমের আনাগোনা খুব কম হত। তাই জাব্দা লেজার এক হাতে এক পাশে ধরে অপর হাতে পেন নিয়ে স্থির ঘুম বেশ আয়ত্ব ছিল। পারফেকশন! পারফেকশন! এতদিনের অভ্যেস একটু টান মারলেই ফিরে আসে। সাইকেল চালানো আর সাঁতার কি কেউ ভোলে হে?

যাই হোক, প্রশিক্ষণের একটি বিশেষ অঙ্গ হিসাবে এবারে আছে রাজ্য সংযুক্তি আব স্টেট অ্যাটাচমেন্ট। অর্থাৎ কি না, ভারতের কোন একটি অঙ্গ রাজ্যে গিয়ে সকলে মিলে দিন চোদ্দর মোচ্ছব করা আর রাজ্যে কেন্দ্রীয় সরকারী বিভিন্ন স্কিমগুলি খাচ্ছে না মাথায় মাখছে তার খবরদারি করে রিপোর্ট তৈরী করা।

চেন্নাইতে আমি এর আগে বার চারেক এসেছি। কিন্তু এবারের আসাটা যেন অন্য রকম। বাক্স প্যাঁটরা ছেড়ে এত দিনের জন্য সত্যিই কোথাও থাকি নি। পার্শ্ববর্তিনীর কথা ছেড়েই দিলাম চোদ্দটা দিন যেন ছেলে মেয়ে দুটো হুশ হুশ করে বড় হয়ে যাচ্ছে ফোনের ওপারে।

যাই হোক কাজে তো মন দিতেই হয়, নাহলে তো হাতে থেকে যায় পেন্সিল। প্রথম দিনের ব্রিফিং এবং জরুরী আলোচনা শেষে আমাদের দলকে দুই ভাগ করে পাঠানো হবে ভিল্লুপুরম এবং কুড্ডালোর জেলায়। যা হয় আর কি, ডানপিটে বাঁদর ছেলেগুলোকে তুলে পাঠানো হয় শুকনো এলাকায়, আর বাকিদের মনোরম স্থানে। আমরা মানে আমাদের ছোট নদী যাব ভিল্লুপুরম।

কিন্তু ঈদ তো মাশাল্লাহ। তাই ছুটি কাটাতে ছোট কাছে পিঠের নিরালায়। নিরালায় বলে নিরালায়? কাঞ্চিপুরম, জীবনে পার্শ্ববর্তিনীদের খুশী রাখতে সব পুরুষকেই অফিসের কাজে কিছু কিছু স্থানে তীর্থ করতে যেতে হয়। যেমন বেনারস, যেমন জয়পুর, যেমন কাঞ্চিপুরম। কিন্তু সঙ্গের সঙ্গীসাথীরা বিশেষত যিনি আমাদের স্থানীয় সঞ্চালক তিনি যদি তা লিটারালি নিয়ে ফেলেন? তাহলে আর কি? যাও হে পবননন্দন অনন্তধামে।

এমনিতেই তামিলনাড়ুর মন্দির শহর, আর কাঞ্চির তো কথাই নেই। শিব মন্দির বিষ্ণু মন্দির শঙ্করাচার্য মন্দির। ছয় কেন একশোলাপেও শেষ হবে কি না কে জানে। তার উপর সোনায় সোহাগা শঙ্করাচার্য দেবেন্দ্র সরস্বতীর দর্শন। আহা এত পুণ্য এক জীবনে পাব কোথায়? না হয় ধর্মে আর জিরাফে মেল খায় না। কিন্তু আঁটি পড়ে থেকে থেকে দেখে যায় আমরসের কাব্য।

আড়াই ঘণ্টা ধরে এই মন্দির সেই মন্দির। এমনিতে বিখ্যাত প্রখ্যাত ধর্মস্থানগুলিতে পরধর্ম অসহিষ্ণুতা, ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি এবং বৈষম্য বড়ই চোখ টানে। Natives and Dogs are not allowed, আর As per Hindu belief and tradition, foreigners are not allowed beyond this point এই দুটির মধ্যে গুণগত মানের কি কোন পার্থক্য আছে? কে জানে তর্কে যাব না। বরং ঘুরে ঘুরে শিল্প স্থাপত্য দেখে কাটাই। আমার প্রাণের ঠাকুর আমার প্রাণেই থাকুক। তাকে না হয় সকল পানেই দেখি। চোখ বন্ধ করলেই কি মন বন্ধ হয় রে পাগলা?

অবশেষে স্থানীয় সঞ্চালকের সহায়তায় গিয়ে হাজির হই শাড়ির দোকানে। আহা ভানুরেখা গনেশন তো ঘরে ঘরে হে ঠাকুর। লক্ষ্মী যখন আসবে… তখন কোথায় তারে দিবি রে ঠাঁই। দ্যাখ রে চেয়ে আপন পানে, পথ দুটি নাই পথ দুটি নাই। পূজার তো প্রসাদ হয়। প্রণামীও। লক্ষ্মী পূজোয় প্রণামী সওগাত কাঞ্জিভরমের ভারিক্কি সম্ভার। কিন্তু যে দোকানে নিয়ে গেল সে তো ত্রিশঙ্কুর স্বর্গ। না পারি গিলতে না পারি ফেলতে। অতঃপর, টুক করে বেরিয়ে গিয়ে সরকারি দোকানে দর দস্তুর করে বাকিদের খবর দিই। ইধার আও বাওয়া, স্বর্গ এখানেই কিন্তু জিপিএসে থোড়া গড়বড় হো গঈল বা। তবু ভুল ঠিক করতে কতক্ষণ। দরদাম দরদাম ধূম ধাম আহা গোলক ধাম।

তেরো বছর আগে কাঞ্চিপুরমে আরেকটি প্রশিক্ষার্থী দলের সঙ্গে এসে একই শাড়ি কিনেছিলাম আমি অপর এক প্রশিক্ষার্থীর অর্ধেক দামে। আরে বাবা ৪০% ছাড় দিচ্ছে তো কেয়া হুয়া? একটু দর দাম করে দেখিই না। চল্লিশ তো তখনও অনেক দূর ছিল, তবু ষাটেই রফা হয়েছিল। তাই নিয়ে কি চাপান উতোর। আরে হামে পতা হোতা তো হাম ভি বারগেনিং করতে। তুম ক্যায়সে কর লিয়া। এ দুনিয়ায় জিতে যাওয়াটাও পাপ। কাঁকড়ারা শুধু বাঙালীই হয় না।

যাই হোক, শেষে ফেরার পথে ফিরে এসে আবার দুপুরে গন্তব্য হয় মহাবলীপুরম। দক্ষিণ ভারতের আমার অন্যতম প্রিয় স্থান। যেখানে মন্দির আছে, কিন্তু ধর্মের ধ্বজাধারীরা নেই। সুন্দর আছে কিন্তু অনিত্যের পূজারীর স্থান নেই। সব তো এক দিনে হয় না। কিন্তু সময় তো বাধ্য না। অ্যায় যাতে হুয়ে লমহো যরা ঠ্যাহরো… ম্যায় ভি তো চলতা হুঁ, যরা উনসে মিলতা হুঁ! যো এক বাত দিল মে হ্যায় উনসে কহুঁ…… তো চলু! কথায় কথায় যে রাত হয়ে যায়। তাই সমুদ্রের বিচ পাশেই পরে থাকে। এক মুহুর্তের ভালবাসা নিয়ে ফিরে আসি, কাঁকড়া চিবোতে চিবোতে! এ কিন্তু সে নয়, এ আসল তাজা স্ফুর্তিলা রসিলা কাঁকড়াভাজা। চাটুতে দিয়ে চটর পটর করে মুখে! তবে সাবধানে, এত তার তাজা রস ছিটকে যেতে পারে এদিক ওদিক। দিন ফুরোয়ে।

পরের দিন যাত্রা করি চ্যালেঞ্জের পথে। চ্যালেঞ্জের নাম ভিল্লুপুরম। সবই আছে কিন্তু কিছুই নেই। সেই স্বর্ণ চতুর্ভূজ প্রকল্পের পর থেকেই রাষ্ট্রীয় বা রাজ্য রাজমার্গগুলি একদম ঝাঁ চকচকে ইউরোপীয় উন্নত দেশগুলির রাস্তার মতো হয়ে গেছে। পথে অনলি কফিতে শুধু কফি কাপে চুমুক দিয়ে মন তাজা প্রাণ তাজা। এসে পৌঁছই জেলা সদরালয়ের কাছে আমাদের অস্থায়ী বাসস্থানে।

ভিল্লুপুরম জেলাটি ১৯৯৩ সালে গঠিত হয়, অনগ্রসর অঞ্চলের উপর নজর দেবার জন্য। তামিলনাড়ুতে কিন্তু সরকারি কার্যে কোন ঢিলেমি নেই। সে আম্মাই হোক বা প্রবীণ চিত্রনাট্যকার। নিজের ঢাক পেটাতে গিয়ে কিন্তু খালি ঢাকের বোলেই কান ভরায় না। তাই কাজে লেগে যাও! দিনমান পেরিয়ে যায় কাজের চক্করে, রাতে একটু খোলা হাওয়া একটু ফরাসী বাতাস, একটু সমুদ্র সন্ধান। পুঁদিচ্চেরী ত সেই টেনিদার আমল থেকেই ফ্যাশনদুরস্ত। তাই মন লাগিয়ে প্রাণ লাগিয়ে একটু অন্ধকারের উৎস সন্ধান, একটু ভূরিভোজন বা ভুঁড়িভোজন। তারপর? তারপর আর কি? ফিরে চল বাওয়া অস্থায়ী বাসস্থানে। পর দিন থেকেআবার কাজ শুরু! সাত দিনের মধ্যে জেলার হালহকিকত নিয়ে রিপোর্ট পেশ। বাস্তব অভিজ্ঞতা! আর তার পরেই, ডাস্টবিনের দাসত্ব। সে উঠে আসুক পরের কিস্তিতে! আজ যাই? আহা যাই কি বলতে আছে? বল আসি! আসি আসি আসি!!

(১০৫)


(১০৫)
“বাবা তারকনাথের চরণে সেবা লাগি…………”
একটা সময় সন্ধ্যা রায়ের এই সিনেমাটি সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে আবেগের বান ডেকে এনেছিল মনে আছে? আর তারপর সারা ছেলেবেলা জুড়ে তারকেশ্বরে বর্ষা নামার ধূম। আহা বৃষ্টি ভেজা কোলকাতার রাস্তা দিয়ে খালি পায়ে, বাঁশের বাঁখারি কাঁধে ঘড়া ভরা জলের উপর মাটি লেপে আর প্লাস্টিকের ত্রিশূল ম্যুরাল চাপিয়ে, ছেলেগুলো বাবা তারকনাথের মাথায় জল ঢালতে চলেছে, যদি বাবা মাথা ঠাণ্ডা হয়। যদি একটু আধটু জোগাড় টোগার হয় একটু হিল্লে হয়ে যায় আর কি। আজ বছর পঁয়ত্রিশ পরে এসে এর হিসাব নিতে গেলে আবার ভক্তির ভাঁড়ারে টান পরে যেতে পারে। তার চেয়ে বরং স্বীকার করে নিই যে দূরবীনে চোখ রাখব না। বরং জিন্দেগী না মিলেগি দোবারার নায়কের মতো খোলা মাঠে ঘোড়ার নৃত্য দেখি আর আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিই। কি বলেন পাঠক পাঠিকারা?

এ তো গেল ফ্ল্যাশব্যাক! এবারে আসুন ফিরে আসি বাস্তবের গল্পে, এই পচা শহরের পচা গরমের পরিমণ্ডলে বৃষ্টির বরাভয় আসতে আসতে সময় হয়ে গেছ শ্রাবণ মাস। কিন্তু তাতে কি? প্রথম বৃষ্টি আর প্রথম প্রেম কি কখনও পুরনো হয়? যখনই এসেছিল ঝমঝমিয়ে ভিজিয়ে দিয়ে যায়। ছেলেটাও, “মা ভিজতে যাচ্ছি!” বলে ছাদের উপর উপর হয় সমবয়সীদের সঙ্গে। যত পোড়া কালঘাম, ঘামাচি আর দুর্ভাবনা নর্দমার পথে তেপান্তরে পাড়ি লাগায়।

আমিও ক দিন ধরে বেণী ভেজাব না পণ করে ছাতা হাতে চলেছি সুদূর আইএসটিএম-এ। সরকারী চাকুরেরা যাতে অ্যাসেম্বলী লাইন চাকর বাকরে পরিণত না হয় তার জন্য দক্ষতাবৃদ্ধির বরাদ্দ ইনস্টিটিউটখানিতে ঘানি ঘুরিয়ে উত্তম গুণমানের নির্যাস বার করা হয়। তাতে কেউ কেউ স্লিম ট্রিম ফিট ফাট হয়ে যায়। আর কেউ কেউ শুধু ছিবড়ে হয়ে পড়ে থাকে ডাস্টবিনের আশায়।
তা আমিও গত এক বছরের পদোন্নতিকে পোক্ত করার জন্য আবশ্যিক প্রশিক্ষণের কারণে বর্ষামঙ্গলে সপ্তাহের পাঁচ দিন ভিজিয়ে চলেছি।

তা আছি মন্দ না বুঝলেন! বুড়ো বয়সে পড়াশুনো চাপের হতে পারে কিন্তু ইনস্টিটিউটের সুন্দর ব্যবস্থাপনায় কনসেপ্ট পেপার প্রেজেন্টেশন, স্টেট অ্যাটাচমেন্ট স্টাডি ট্যুর আর মড্যিউল পরীক্ষার যাঁতাকলকেও শিমূল তুলোর পাশবালিশ বলে মনে হচ্ছে। তার সঙ্গে জুটেছে বিভিন্ন চরিত্রের সহকর্মী বা সহপাঠীরা। আরে রোজ রোজ বাড়িতে চিকেন চচ্চড়ি খেতে খেতে রেস্টুরেন্টে সামান্য নুডলস আর চিলি পনিরও মুখে অমৃতের দই আর দ্বারিক ঘোষের আমসত্ত্ব সন্দেশ মনে হয়।

তা গন্তব্যটা বেশ কাছাকাছি নয় বুঝলেন! কমফোর্ট জোনের বাইরে বার করে নিয়ে তবে জ্ঞান প্রবেশ করাবে! তা ভাল, তবে কিনা সাতটার সময় ত্রিশ কিমি গাড়ি চালিয়ে আবার সন্ধ্যা আটটায় ফিরে এসে বই মুখে বসতে ধক লাগে। বাড়ির চাতক পাখীগুলোর দিকে চাওয়া যায় না। তা কি আর করব। পেটে খেলে পিঠে সয়!

তাই রোজ সকালে উঠে গোপাল বড় সুবোধ ছেলের মত, পিঠে ব্যাগ আর হাতে জলের বোতল নিয়ে গুটগুটিয়ে গাড়িতে উঠে বসি! আর নিঃস্বর্গের বিসর্গ বাদ দিয়ে ছাঁকনিতে ছেঁকে নেওয়া তলানিটুকু দেখতে দেখতে পৌঁছে যাই পঠনের পথে।

এখন তো আবার শ্রাবণ বা শাওনের সময়। শাওন যে তোর বাঁধন মানে না- ভাসান দিয়ে যা রে শাওন ভাসান দিয়ে যা…

শাওনে কাঁওয়ারদের ভিড় বাড়ে। তা এই পোড়ার দেশে তারকেশ্বর আর কোথায় পাবে, তাই তারা গাঁ উজিয়ে ছুটে যায় হরিদ্বারে, হরের মাথায় জল ঢালতে। হরিদ্বার বলতে সেই দুহাজার চারের কথা মনে পড়ে গেল। আমি আর আমার এক বন্ধু সপরিবারে সেথা গিয়েছিলাম শ্রাবণের ধারার মাঝেই। তা একদিন হর কি পৌরিতে ঘোরাঘুরির সময় উভয়েরই বেগ সঙ্কট এসে উপস্থিত। উঠেছিলাম ভারত সেবাশ্রম পেরিয়ে কাটিয়া বাবার আশ্রমে। সে প্রায় সেখান থেকে আধ ঘণ্টার পথ। লট বহর নিয়ে সেখানে ফিরে যাবার থেকে দুজনেই মনস্থ করলাম যে হালকা হবার শুদ্ধ স্থান কাছাকাছি কোথাও খুঁজে বের করব। কিন্তু আমরা তো শহুরে সচেতনবাদী। পরিবেশ এবং দৃশ্যদূষণে বেজায় বিরাগ। তাই সহধর্মিনীদের “এই একটু আসছি” বলেই সোনার হরিণের খোঁজে গরু খোঁজা করে যখন প্রাণ যায় যায় অবস্থা তখনই বিষ্ণু ঘাটের কাছের এক ধরমশালায় ভুজুং ভাজুং দিয়ে পতিতোদ্ধারিণী গঙ্গের স্পর্শ লাভ।
আহা গোপাল ভাঁড় বড়ই সত্যবাদী ছিল হে। তা ততক্ষণে স্টুডিওর ঘড়ির কাঁটা দেড় ঘণ্টার পথ অতিক্রম করেছে। আর মোবাইলের অস্তিত্বও তখন বাঙালীর পকেটের ইতিউতি উঁকি ঝুঁকি শুরু করে নি। অতএব বাস্তবের জমি বড়ই কঠোর ছিল হে পড়ুয়া পাবলিক। সহধর্মিনীদের না বলিয়া কোন কাজ করিলে রাখাল বালকের দশা হয়। তখন পালে বাঘ পড়লেও নট নড়ন চড়ন।

সে যাই হোক, মোদ্দা কথা হল কাঁওয়ার আর কাঁওয়ারি! এ কিন্তু উচ্চারণের ফেরে কাওয়ারি হয়ে যাওয়া নয়। কাওয়ারি আপনার বাড়ির আবর্জনা কিনে নেয়। আর কাঁওয়ারি তার মনের আবর্জনা কৃচ্ছসাধনের মাধ্যমে বইয়ে দেয় গঙ্গার জলে। তা সে যাই হোক শাওন মানেই কাঁওয়ারি মরসুম শাওন মানেই কাঁওয়ার কাঁধে পথ চলার ধুম। কিন্তু সেটা তো নতুন কিছু নয়। নতুন হল তার ইনস্টিটিউশনালাইজড প্রফেশনালাইজেশন বা সংস্থাগত ব্যবসায়িকরণ।

সারা পৃথিবীর উত্তর ভারতীয় রাজনীতিবিদরা কাঁওয়ারিদের যাতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা না হয় তাই জাতীয় সড়ক পথের ধারে ধারে “নমস্কার ডানদিকে” মার্কা পোস্টার লাগিয়ে ঘাঁটি বানিয়ে দিয়েছেন।
নমস্কার ডানদিকে জানেন না? গাইড ফিল্মের দেব সাহাবকে মনে আছে? মুখ ঢেকে যায় নমস্কারে, তা দেব সাহাবের মুখ বিমুখ হলে তো চলবে না! তিনি তো আর মনোজ কুমার নয় যে হাত ঢেকে মুখের ডায়লগের চব্বিশ শতাংশ ইনফ্লেশনের ঘুর্ণিতে হারিয়ে দেবেন। তাই তিনি আবিষ্কার করলেন “নমস্কার ডানদিকে” মানে নমস্কার করবেন কিন্তু ডান দিকে, যাতে মুখ দেখা যায়। আর কি সেই মান্ধাতা আমল থেকে আজকালকার রাজনেতারাও শিখে গেছে সেই ট্রিক। মোদী বাবু অবশ্য সবেতেই নতুন পথের দিশারী! তিনি আবার বাহু মূলে হাওয়া লাগিয়ে মাথার উপরে ঘোরা ফেরা করা মশা মারেন পট পট।

সে যাই হোক, সেই সব রাজনেতারা বিভিন্ন রাজনৈতিক রঙে রাঙিয়ে (সংখ্যাগরিষ্ঠ যে কে তা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না) যে সব বিশ্রাম স্থল করে দিয়েছেন তার তারস্বরে চোঙা লাগিয়ে চিল্লিয়ে বাজি মাত করছেন। তবে গানগুলো সবই ভক্তিগীতি! মানে চলতি হিন্দি গানের নকলনবিশি। বর্তমানে হিন্দিগানের বাজারটার কথা পাঠক পাঠিকারা ভালই জানেন। যে গুলো এখন মুম্বইয়ের কারখানা থেকে বেরোচ্ছে সেগুলো হিন্দি গানা না ইংরাজি গান তা তারাই ভাল বলতে পারবেন। অবশ্য জনগণ যদি বারুদ মুখে নিয়ে বসে থাকে তাহলে আর মুখ পুড়িয়ে পকেট ভরালে তাদেরই বা দোষ দিই কেমনে বলুন! অতএব সুদীর্ঘ তিন কিলোমিটার জুড়ে কানের দফা রফা থেকে বাঁচাচ্ছি কিভাবে তা ভগাই জানেন।

অবশ্য শুনতে সক্ষম না হলেও চোখের ব্যায়াম মন্দ হচ্ছে না। কাঁওয়ারিরা সব দলীয় জার্সি গায়ে ভজন সাধন করছেন। কারুর জার্সিতে সামরিক ছোঁয়া আবার কারুর জার্সির রং কমলালেবুর কোয়া। বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে শিবের খোঁয়ারি একেবারে শিকেয় উঠেছেন। মাথা গরম হবে তারপর জল ঢেলে ঠাণ্ডা করতে হবে! এতে আর নতুন কি! সেই ছেলেবেলায় দেখা পরেশনাথের প্রশেশন! আহা চমকিলা ভড়কিলা আলোর মালায় গরু ঘোড়া যন্ত্রচালিত কাঁওয়ারদের গাড়ি পেরিয়ে যেতে যেতে বেলা বয়ে চলে যাচ্ছে বটে। কিন্তু মজা মন্দ লাগে না। খাবি যদি হাওয়া খাবি ঢেঁকুর তুলবি কেমনে! আহা রাজনীতি আর ধর্মের নামে যে টাকা ছড়ানো হয় তা যদি শিক্ষা ও স্বাস্থে ছড়ানো যেত, তাহলে ভারতের উন্নতির পথটাই আজকের দিনে মসৃণ হয়ে যেত, বাজার অর্থনীতি আর বিদেশী বিনিয়োগকে হেঁচকি তোলানো গাল পেড়ে খামোখা আমাদের জিন্দেগী খারাব হতো না।

তা সে যাক গে গিয়া। এসব ফালতু ব্যাপারে চিন্তা করে করব কি বলুন, বোকো হারেম আর গাজাতেই তো মন মজে পড়ে আছে। বিদেশ কথাটার মধ্যেই তো দেশ লুকিয়ে! বিশ্বনাগরিক হয়ে সেখানেই মন্তব্যের বন্যা বইয়ে দিই না হয়! পোড়ার দেশের একটু মুখ পুড়লে আর ক্ষতি কি? তেলা মাথায় তেল দিলে বিশেষ ফারাক তো আর হয় না!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ হামাস আর ইজরায়েলের কাটাকুটি খেলায় গাজার যে সব নিরীহ শিশুগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে তাদের জন্য দু ফোঁটা জলও ফেলতে পারছি না! কি জানি আমিও যদি ফেসবুক সমাজতাত্ত্বিক হয়ে গিয়ে নিজের দায়িত্ব ভুলে যাই! তবু এই হানাহানি বন্ধ হোক এই প্রার্থনা করি! কাঁওয়ার বাবুরা যদি কেউ গিয়ে হরিদ্বারে এমন কিছু চায়? আহা নিজের জন্য না চাইলে কিন্তু তৃতীয় নয়ন খোলেন তিনি! চাহিদা পূরণ হতেও সময় লাগে না! বিশ্বাসে মিলায় বস্তু ফিসফাসে বহুদূর…

(১০৪)


জাকির হুসেনের জন্মের পরে পরেই আল্লারাখা উস্তাদ তার কানে তবলার বোল তুলে দিয়েছিলেন। আমার কানে ক্যানেস্তারা কে বাজায়েছিল গা? গলাখানা যা বাজখাই হল। ছেলে বেলা থেকেই গান আমার কান মন প্রাণ তৈরী করে দিয়েছিল। খুব ছোটবেলায় বাবা মা রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে বসত। আর আমি বসতাম ল্যাক্টোজেনের কৌটো নিয়ে- ধা ধিন ধিনতা না তিন তিনতা!

তারপর ভাগীরথী দিয়ে জল গড়িয়েছে কত। আমার কানও গুপ্ত মৌর্য স্বর্ণযুগ পেরিয়ে পৌঁছেছে জীবনমুখীর ঘাটে- হেমন্ত না সুমন, সুমন না হেমন্ত? সুরের আকাশে তখন রঙমশাল। নীল দিগন্তে ম্যাজিক। বাংলা গান ভাঙছে গড়ছে গড়ছে ভাঙছে। স্বপ্ন দেখছে সবাই স্বপ্নে দেখছে গানে গানে, বন্ধন যাক টুটে।

উনিশশো একানব্বই। রবীন্দ্রনাথ কি ছাড়া পেলেন? না লক্ষ্মীছাড়া শ্রী ছাঁদে ধরা রইলেন! বারন্দায় রোদ্দুর ছায়া ঘনায় বনে বনে। মিঠে কড়া পরীক্ষা নিরীক্ষা বেয়ে বাংলা গান গলা ছাড়ছে তখন। ছাড়ছি আমিও। ‘আমার প্রতিবাদের ভাষা দ্বিগুণ জ্বলে’- চোখ জ্বলে বুক জ্বলে- নিঃশ্বাস নেব কিসে? কেনো গানের শিস আর ধানের শীষ মাখা মাখি হয়ে গেল গলা দিয়ে নেমে আসে সুর অসুর।

তখন আমিও গাইছি, ‘পুকারতা চলা হুঁ ম্যায়’ গঙ্গার ধারে ‘প্যাহলি পেয়ার কি খুশবু’, ‘তুমি রবে নীরবে’ ‘আজি বিজন ঘরে’! আমি গাইছি, ইউনিভার্সিটি ইন্সটিউটে, ‘হেই সামালো ধান গো’ গলার বাড়ছে ধার, কাস্তেয় পড়ছে শান! আমি গাইছি, ‘হৃদমাঝারে রাখব, ছেড়ে দেব না’। কলামন্দিরে শুনছি, ‘গান তুমি হও গরমকালের সন্ধ্যেবেলার হাওয়া’, ‘পেটকাটি চাঁদিয়াল’, ‘গানওলা- আমার আর কিচ্ছু করার নেই’! সারা রাত জেগে জেগে শুনছি ধূসর নীলাভ এক তারার গল্প। শুনছি ‘নীলাঞ্জনা’ শুনছি ‘আকাশমুখী সারি সারি পাশাপাশি বাক্সবাড়ি’!

গান ছড়াচ্ছে তখন, গোকুলে বাড়ছে ব্যান্ড, আমি হারাচ্ছি, আমি হারাচ্ছি জীবিকার ভিড়ে। গান ভালবেসে গান! দেখে যা কি সুখে বেচেছি গান! শহর পাল্টাচ্ছে পাল্টাচ্ছে সময়, গান পাল্টাচ্ছে পাল্টাচ্ছে সুর- অসুর। রবি বারোয়ারী হলেন। মুক্তির আনন্দে লাগাম ছাড়া পাগলপারা রবি আমার। হেমন্ত, মান্না, শ্যামল, তরুণ মানবেন্দ্র- সব আসছে এদিক ওদিক দিয়ে। সুমন যেন কমে গেছে বাজারে? মেটেরিয়া মেডিকার কাব্য? ব্যান্ডে হাত ব্যান্ডেজ ভূত ধরতে পারছি না আর। ডুবে যাচ্ছি, অন্য শহরের প্রেমে ডুবে যাচ্ছি। গান? সে তো মোবাইল আর এফ এম-এ। নতুন কি হচ্ছে নতুন কি হচ্ছে? হাতড়াচ্ছি শুধু অন্ধকারে।

দু হাজার ছয়, একরাশ তাজা হাওয়া নিয়ে এল সে! বাংলা গান তো বদলে গেছে গো! শোন না কি কি হচ্ছে। ধীরে ধীরে আপ টু ডেট হচ্ছি। জ্ঞান বাড়ছে, শিখছি কত কিছু। ব্লুজ, জ্যাজ, কান্ট্রি মিউজিকে কান পাকাচ্ছি, মন পাকাচ্ছি। কলমে কবিতা গলায় গান। নতুন লেখা ভাষা কথা সুর মিলে মনন তৈরী হচ্ছে আমার মধ্য যৌবন পেরনো মনন। ভাঙছে গড়ছে সময় ভাঙছে গড়ছে জীবন ভাঙছে গড়ছে গান। বাংলা গান বাড়াচ্ছে রাস্তা। পথ খুঁজে কোন পথে গেল গান। জীবনে নতুন গান, গানে গানে গড়ছে জীবন। নতুন তারকারা গানের জগত আলো করে উজলে উঠেছে। ঢেউ উঠেছে কারা টুটেছে। তারপর? তার পর আর কি তার ছিঁড়ে গেল কবে, একদিন কোন হাহারবে… শুধু রয়ে গেল তার স্মৃতি! ল্যাপটপ ভর্তি গান! ছবি আর গান নিয়েই রয়ে গেল সে আমার ভাই আমার সহোদর আমার নবীন সঙ্গীতশিক্ষক। ‘মেঘ জমে আছে মন কোণে’ ‘বৃষ্টি বিদায়’ আর ‘বরষণ মন্দ্রিত অন্ধকারে’- যখন আলো নিভে যায় তখন ল্যাপটপটা খুলে বসি, জমে থাকা গান জমে রাখা জল ধীরে ধীরে বেরিয়ে যায়। জমতে থাকে মনে, প্রাণে বসন্ত বাতাসটুকুর মতো। চলে গেছে সে মাস সাতেক। বাঁধনহীন হয়ে গান শুনিয়ে গেছে সে। কান দিয়ে প্রাণ দিয়ে গান দিয়ে গেছে সে। আমার ভাই… আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা। প্রজন্ম প্রজন্ম গান আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা।

“গান তুমি হও আমার মেয়ের ঘুমিয়ে পড়া মুখ
তাকিয়ে থাকি- এটাই আমার বেঁচে থাকার সুখ…”
—-
(আদরের নৌকায় প্রকাশিত)