(১১৫)

জন্মদিন নিয়ে বার তিনেক লিখে ফেলার পর আবার লিখতে গেলে এই ফিসফাসের নাম হতো বোরিং ফিসফাস। কারণ এই যে জীবন শুরু হতে চলেছে বলে বিপণনের যে সব কায়দা তা নিয়ে উন্মুখ হয়ে থাকতেই পারি, কিন্তু সে তো নিতান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমার আনন্দে আমি নিজে তা থই নেত্য করতে পারি কিন্তু তা বলে অন্য লোকেও যে খুশ হোগা সাবাশী দেগা এমন কোন কারণ দেখি না। তবে আজকাল সোশাল নেটওয়র্কের চক্করে চাইলে আসমুদ্র হিমাচল পেরিয়ে শুভেচ্ছা শুভাশিস চলে আসে।

শুভাশিস প্রসঙ্গে বলতে পারি, শুভাশিস নামের এক বন্ধু হয়েছিল বেশ বছর দশেক আগে। বিজয়ার পরে পরেই। তা ছেলেটি প্রথম মোলাকাতে খুব স্মার্টলি আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে হাল্কা ঠোঁট চিপে হেসে বলেছিল, “শুভাশিস”। আর আমি তো জন্ম ত্যাঁদড়, তার দিকে তাকিয়ে, বিগলিত হাসি দিয়ে বলেছিলাম “শুভ বিজয়া”। হজম করতে বেশ সেকেন্ড দশেক লেগেছিল তার। এবং একেবারেই পছন্দ হয় নি এই ধরণের ছ্যাবলামি। তা যাই হোক, ভাল দোস্তির নমুনাই হল প্রথমে ক্যালাকেলি আর পরে কোলাকুলি। তাই স্বাভাবিক ভাবেই তার ভিন রাজ্যে চলে যাবার আগে পর্যন্ত বেশ ভালই বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল।

তবে আমার পার্শ্ববর্তিনীটি মুখে কিছু না বললেও বেশ ভাবনা চিন্তা করে আমাকে একটা স্পেশাল দিন উপহার দিয়েছিলেন বটে। সে আর নিজ মুখে প্রশংসা করি কি করে? এখন এসে কেক টেক কাটা বেশ নজ্জা নজ্জা লাগে বটে। সেই বা কি করা যাবে। যে সমস্ত বিশেষ বিশেষ লোকজন আমাকে বিশেষ ভাবে পছন্দ করে তাদের সেন্টিমেন্টের তো একটা দাম আছে। আর সত্যি বলতে কি মন্দও লাগে না! সে ধেড়ে বয়সটা যতই কানের পাশ দিয়ে সারা মাথা জুড়ে উঁকি মারুক না কেন।

উঁকি বলতে মনে পড়ল আমার দশ মাস বয়সের পুঁটলি বাঈ বেশ উঁকি দিয়ে টুকি টুকি খেলতে শিখে গেছে, উলু দিতে শিখে গেছে আরও কত কি। তবে এসব তো বেশ স্বাভাবিকই। কিন্তু বছর এগারো পরে আবার একই ধরণের অনুভূতিটা ভিতর ভিতর বেশ রোমাঞ্চের সৃষ্টি করছে। একই রকম ভাবে অ অ্যা ক খ বাক্য রচনার দিকে হাঁটছে। পুঁটলিরা তো পোঁটলাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে। আর আমার পূজনীয় পিতৃদেব মাতৃদেবীকে জিজ্ঞাসা করলেই উৎস খুঁজে পেতে দেরী হবে না পুঁটলি পোঁটলারা ল্যাজবিশিষ্ট কি ভাবে হল।

আমার জন্মদিনটা আবার বেশ কয়েকজন বিশেষ ব্যক্তির জন্মদিনের সঙ্গে মিলে গেছে। সবার মধ্যে প্রিয়তম হলেন সলিল বাবু। (সুস্মিতা সেন বলতে পারলে যে মন্দ লাগতো তা নয়। কিন্তু বিধি নাচার)। গতবছরই সলিলবাবুর এক ছাত্র ও ভাবশিষ্যকে নিয়ে একটা আড্ডায় স্মরণীয় গানখেলা হয়েছিল মনে পড়ে গেল।

সলিল হেমন্ত সুমন এসব শুনেই তো পথ চলতে শিখলাম। আইডল। খেলার মাঠেই বলুন আর মিউজিক বা সিনেমার দুনিয়া- আইডল পুজো আমাদের মজ্জাগত। আইডলের সব ভালো, তাদের হাসি কাশি টিকটিকি নিয়ে কেউ প্রশ্ন করতে পারবে না। সে রাধিকারমণই হোক আর রমণীমোহন। কিন্তু আমি একটা ব্যাপার দেখেছি, আমি যাদের আইডল বলে মনে করি তারা কোথাও না কোথাও গিয়ে মানুষ হিসাবে ব্যর্থ হয়ে পড়ে। অবশ্য তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে, আমার সেই আইডল থেকে চাহিদাটা দেবতার প্রসাদের পর্যায়ে চলে গেছে হয় তো। আরে আজহার, বরিস বেকার, অমিতাভ বচ্চন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এরা সকলেই তো রক্ত মাংসের মানুষ। ভাল খারাপ ভুল ঠিক নিয়েই। King can do no wrong কনসেপ্ট নিয়ে ভাবতে বসলে সবার আগেই মনে হয় তুমি কে বাওয়া? তোমার এত চাইবারই বা কি আছে? একি পুরাকালের মেয়ে দেখতে যাওয়া নাকি? চলন বলন রন্ধ্রণ সব দেখে তবে বেছে নেওয়া। তাও ফুলশয্যার রাতে হয়তো দেখা গেল দাঁতটাই ফলস। ব্যাস ফল খাওয়াই মাটি।

আসলে ফিসফাসের দোষই হল গৌড়চন্দ্রিকা। তবে আসলে ঘা খেতে খেতে সত্যি কথাটা স্বীকার করার সময় একটু সময় বেছে নিতে হয় বই কি! সেই যে সেই নিরানব্বইয়ে ম্যাচ ফিক্সিং থেকে শুরু, তার তো শেষ দেখি না। শেষ মেশ জন জাগরণের নেতা কবীর বাবুও সেই লাইনেই পড়লেন। তা আর কি করবেন? ভুলভাল কাজ কম্ম কল্লেই তার অজুহাতের পাহাড় জমে যায়। আর পরবর্তীকালে অর্ধসত্য অর্ধ মিথ্যা মিলিয়ে মিথ হয়ে চলে যায়। সেই ভাবেই দেখুন, বয়স হয়েছে, অসুস্থতা- সব মিলিয়ে মাথা ঠিক রাখতে পারেন নি! ক্ষ্যামা ঘেন্না করে দিন না হয়! গান গান, গান বাঁধেন তো গান শুনুন আর বাদ বাকি? দু কানের মধ্যে একটুও কি ফাঁকা জায়গা রাখেন নি?

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ তা বলে বাপু ক্রিকেটের ভগবানে এই এতদিন ধরে রাগ পুষে রাখাটাও ঠিক নয়। বই বেচার জন্য তাঁকেও মানুষের পর্যায়ে নামতে হল, কি বলেন?

প্র পু ১ গতবারের জন্মদিনটা অন্যরকম ছিল, মানে সেই শেষবার তার গলাটা শুনেছিলাম- লাইভ- ফোনে হলেও। তারপর তো এখন স্মৃতিটুকু থাক হয়ে গেছে। ভাইটা এখন কোথায় আছে কে জানে?

(১১৪)

মতি নন্দীর সেই উপন্যাসগুলো? সেই হারতে হারতে ঘুরে দাঁড়ানো মানুষগুলো? স্ট্রাইকার, স্টপার, কোনি, শিবার ফিরে আসা? এরা আমাদের এত প্রিয় কেন বলুন তো? সাফল্যের গণ্ডীর মধ্যে খুব কম লোকেই ঢুকতে পারে বলে? গড়পড়তা গবাদির আম জনতা সাফল্য আর ব্যর্থতার মাঝখানের ত্রিশঙ্কুর তেঁতো স্বাদ চাখতে চাখতে গল্পের মধ্যেই বাস্তব খুঁজে পায় তাই? নাকি নিজের মতো কেউ জিতে গেল এই আত্মশ্লাঘায় আরাম বোধ করে?

অনেকগুলো প্রশ্ন, উত্তর নিজে নিজে খুঁজে নিতে হয়। আপনারাই ঠিক করবেন হার জিতের সংজ্ঞা কি হবে। আজকের রেসের মাঠের ঘোড়াগুলো পোডিয়ামে না উঠতে পারলেই কি গুলির সম্মুখীন হবে? নাকি হার জিত তো হোতাই রহতা হ্যায়, যো টিকতা হ্যায় ও হি বিকতা হ্যায়? কথায় আছে না যে জীবনে শূন্য করে নি সে ব্যাটই ধরে নি।

মহেশ মঞ্জরেকরের অ্যাহসাস ছবিটি দেখেছেন? অবশ্য সিনেমাটা বিশেষ চলে নি যে আপনাকে দেখতেই হবে। এন্টারটেনমেন্ট তো হারে হয় না দাদা। লাগানেও শেষ বলের ক্যাচটা ছয় হয়ে গেছিল। অ্যাহসাসের মা মরা ছেলেটা বাপের কোচিং-এ লড়াই করতে শেখে কিন্তু রেসে দ্বিতীয় হয়। রুপোর পদকদের কে আর মনে রাখে বলুন? সৌরভের ভারতের থেকে ধোনির ভারত বা কপিলের ভারত ওই এক জায়গাতেই এগিয়ে থাকে। স্কোরবোর্ড কি শুধুই গাধা নাকি, কার্ডাস বাবু? নাকি মার্কশিট দিয়েই জীবন চলে? কিন্তু তাহলে তো বোরোলিনের বিজ্ঞাপনটাই ব্যর্থ হয়ে যায় কি বলেন?

“জীবনের নানান ওঠাপড়া যেন সহজে গায়ে না লাগে…”

আহা এই আপ্ত বাক্যটি যে আমরা কতবার শেখার চেষ্টা করি। মেয়েটা পড়ে গেলে কি ওকে সব সময় কোলেই নিয়ে থাকি? নাকি বলি চেষ্টা করে যা মা, একদিন তোরও হবে। হয়ও তো। হাঁটে বা সাইকেল চালাতে গিয়ে কে আর হুমড়ি খেয়ে পড়ে নি বলুন! সূর্য অস্তাচলে গেলেও তো সেই পরদিন ভোর হয়, সোনার আলোয় ভরে যায় বুক।

কিন্তু ফিসফাসে তো শুধু গৌর চন্দ্রিকা করেই কাটানো নয়, ঘটনা না ঘটলে অলংকারও তো আসে না। তাই ঘটনায় চলে যাই।

বিরেন্দর শেহবাগ সফল কেন বলুন তো? বর্তমানে বাঁচতে জানে বলেই। আগের বলটায় কি হয়েছে তা মনে না রেখে, বর্তমানে চোখ রাখে তাই। কিন্তু বর্তমান যদি অসহনীয় হয়? যদি মনেই হয় এই তেপান্তরের পথ শেষই হচ্ছে না। সুসময় তো চট করে ফুরিয়ে যায় কিন্তু দুঃসময়? তখন মনকে সোজা রাখা কি সোজা কাজ? বলা যত সহজ করা তো নয়! ঢের ঢের অধ্যাবসায় দরকার।

কিন্তু কচি বয়স তো ধৈর্যের বয়স নয়। লক্ষ্যের দিক অবিচল এগিয়ে যাবারও বয়স নয়। কিন্তু সত্যি যদি সে রকম ঘটে তাহলে কি একটু ঢাক পেটানো উচিত নয় বলুন? নিজের সন্তান হলেও?

ছেলেটা এমনিতে ছোটাছুটি করতে বেশ পছন্দই করে। শেষবার যবে স্কুলে স্পোর্টস হয়েছিল, বেশ বুদ্ধি করে সেবার বাধা দৌড় জিতেছিল। এবারেও ফেভারিট টেভারিট বলে বেশ আশা টাশা জেগেছে কারণ সাব জুনিয়র অ্যাথলেটিক্সে স্কুলের বাছাই পর্বে সুযোগ টুযোগ পেয়েছে। কিন্তু বিধি তার বাম। আজকাল অবশ্য বামেদের বিধিও ফুটো হয়েই আছে। কারণ তার কপালে পড়েছে বিন্দি রেস। বিন্দি রেসে কিছু দূর ছুটে গিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা টিপের প্যাকেট থেকে টিপ খুলে নাকে মুখে কানে মোট পাঁচটি টিপ লাগিয়ে ছুটে গিয়ে রেস শেষ করতে হবে।

ওদের স্কুলে আবার এই ব্যাপারটা আছে সবাইকে দৌড়োবার সুযোগ দেয়। যারা ভালো দৌড়য় তাদের জন্য বাধা দৌড় আর বাকিদের ফ্ল্যাট রেস।

তা হুইসল বাজার সঙ্গে সঙ্গে সবাই উৎসাহের সঙ্গে ছুটে গেল বিন্দির দিকে। ক্যামেরার লেন্সও ভিডিওয় দেখছে যে ছেলেটাই সবার আগে গিয়ে পৌঁছেছে বিন্দির কাছে। উত্তেজনা উত্তেজনা! কিন্তু এ কি? ছেলেটা তো আটকেই আছে। বিন্দির প্যাকেট থেকে বিন্দি খুলতেই পারছে না। চেষ্টা করেই যাচ্ছে। একে একে সবাই পৌঁছে গেল শেষ বিন্দুতে- কিন্তু ছেলেটা বিন্দিতেই আটকে। তাও সে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দর্শকাসনে বসে থাকা বাবা মারা তখন বয়স ভুলে গিয়ে এন্টারটেনমেন্টের সামগ্রী হিসাবে দেখছে ছেলেটাকে। হাহা হাসি টিটকিরি চলছে। ক্যামেরার ভিডিওও চোখ বন্ধ করেছে ততক্ষণে। কিন্তু ছেলেটা অবিচল। শেষ পর্যন্ত বোধহয় সফল হল পাঁচটা টিপ পরতে। ছুটে গিয়ে দৌড় শেষ করে মাথা উঁচিয়ে চলে গেল ড্রেসিংরুমের দিকে। বাবামা সান্ত্বনার ভাষা খুঁজছে। একজন খালি তার মধ্যেই বলে উঠলেন, “উসনে মাগর হিম্মত নহি হারি, রেস খতম কিয়া!”

পাঠক পাঠিকা এসব তো অলিম্পিকে ঘটে, এশিয়ান গেমসে, ওয়র্ল্ড অ্যাথলেটিক মিট! পা মচকে পড়ে গিয়ে অ্যাথলেটের চার বছরের পরিশ্রম জলে, তাও সে যখন দৌড় শেষের জন্য ঘসতে ঘসতে যায় তখন হাততালি পদকের থেকেও বড় দেখায়। কিন্তু এ তো টিভির পর্দা নয় বাবু মশায়, ইয়ে জিন্দেগী কা রঙ্গমঞ্চ হ্যায় অউর হাম সব কাঠপুতলী। কতজন পারি ব্যর্থতাকে মাথায় করে, ন্যুব্জ না হয়ে ফিরে আসতে?

আশীর্বাদ করুন ছেলেটা যেন এই ভাবেই জীবনের লড়াই লড়তে পারে। হারুক জিতুক কিচ্ছু এসে না যায়, যেন হার না মানে! তাতেই নিজে না জিতলেও শেষ পর্যন্ত জীবন জিতে যায়। তাই না?

জিজ্ঞেস করেছিলাম, বাড়ি আসার আর অনেক আদর দেবার ফাঁকে, হ্যাঁ রে বুক কাঁপে নি? উত্তর দিল টিপগুলো বাজে ছিল প্লাস্টিক থেকে খোলা যাচ্ছিল না, কি করব শেষ তো করতেই হতো। খারাপ তো লাগছিলই। কিন্তু শেষ তো করতেই হতো।

মাঝপথে পালানো যায় নে হে হোরাশিও। আমেন

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ এত প্রশ্ন কেন? আরে জীবন তো মাঝে মাঝে প্রচুর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, কি বলেন?

এ বারের বইমেলায় ফিসফাস ২


সেই যে সেই ৪ঠা ফেব্রুয়ারী, ২০১৩তে মুখ দেখালো তারপর রোলস রয়েসের গতিতে বাধাবিপত্তি পেরিয়ে বেস্ট সেলার হয়ে গেল। পাঠক/ পাঠিকারা তো প্রশ্ন করে করে হেদিয়ে যাচ্ছেন, “আহা পরেরটা কবে হবে গা?” তাই এই হয়ে গেল, প্রকাশক আর লেখক চাপ খেয়ে এই বইটিকে প্রথমটির থেকেও উন্নত করার চেষ্টা করবেন সে আর নতুন কথা কি? সিক্যুয়াল তো তখনই বানানো উচিত যখন তা প্রথমটির থেকে উন্নত হবে। তা পাঠক/ পাঠিকারা, এই যে এতদিন ধরে মইটা ধরে আছেন, তাঁদের ধন্যবাদ দিয়ে টিয়েই না হয় ছোলা গাছের উপরই বাড়ি বানাই। ভিতের কাজটা তো আপনাদের হাতে, যত পড়বেন, যত চর্চা করবেন, যত উপহার দেবেন, ততই ভিত শক্ত হবে এই ফিসফাস-২য়ে।

বলতেই পারেন এ আর আলাদা কি? ব্লগটাই তো আছে। উত্তর খুঁজে নিন বইয়ের ভাঁজে ভাঁজে- তৌসিফের অলঙ্করণ আর রোহণের উদ্যম সর্বপোরি লেখকের টাচ ব্লগতুতো বইটিকে একটা আলাদা মাত্রা দিয়েছে। মুচমুচে করে ভাজা, কিন্তু খেলে একটুও অম্বলের অপেক্ষা নেই।

মুখে দিলে গলে যাবে আহারেতে পুষ্টি
রকমারি স্বাদ নিয়ে জিভে আনে তুষ্টি।

মন ফুরফুরে করতে হলে ফিসফাস-২ কিনুন, পড়ুন ও উপহার দিন। লেখক ও প্রকাশক তো কৃতজ্ঞ থাকবেনই সঙ্গে আপনারাও জানতে পারবেন আয়না না দেখেও যে ঠোঁটের কোণের হাসিটা ফিসফাসের সূত্রে একটু চওড়া হল কি না।
মনখারাপের অব্যর্থ ওষুধ ফিসফাস-২।

(১১৩)

নাহ ফিসফাস যাতে জ্ঞানের ফিরিস্তি না হয়ে যায় সে বিষয়ে পাঠক/ পাঠিকাদের প্রতি একটা দায়িত্ব আছে বই কি! তবে বেশী নয় ছোট দুটো ঘটনা আপনাদের সামনে রেখে দেব। সিদ্ধান্ত বা মতামত আপনাদের নিজস্ব। আমার কাজ খালি তুলে ধরা।

গতকাল মেট্রো করে এয়ারপোর্ট থেকে ফিরছিলাম। এই নতুন রুটটি আমার এক বন্ধু শিখিয়ে দিয়েছে। লাগেজ টাগেজ আছে? অফিস টাইম? কোন অসুবিধা নেই দশ মিনিট না হয় বেশীই লাগল। কিন্তু এয়ারপোর্ট মেট্রো লাইন ধরে চলে যাও উলটো দিকে তারপর ব্লু লাইনের মেট্রো ধরে শান্তিতে বসে বাড়ি এস। সে যাই হোক এক ঘন্টা কি আর ঘুমিয়ে কাটানো যায়? বিশেষত মোবাইলের ব্যাটারি যেখানে তল ছুঁয়েছে।

তাই চোখ এদিক ওদিক চলেই যাচ্ছিল। পাঠক পাঠিকারা আমাকে ওই রকম ভাববেন না যে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি অদম্য আকর্ষণে চোখ উলটো সিধে জায়গায় চলাচলকারি ফিলান্ডারার। যদি সুন্দরকে কার না ভাল লাগে বলুন। তবে আমি একটু অন্য চোখে দেখি। মানে গল্প খুঁজে বেড়াই। হাজার হোক ফিসফাসের পাঠক পাঠিকাদের প্রতি একটা দায়িত্ব আছে তো!

তা গল্প পেয়েই গেলাম বুঝলেন? দ্বারকার হাজার একটা স্টেশন থেকে এক দম্পতি তাদের বছর আটেকের কন্যা সন্তানকে নিয়ে উঠেছে। মেয়েটি মিষ্টি কিন্তু প্রজাপতির মতো চঞ্চল। পোল ধরে ঘুরে হ্যাণ্ডেল লাফিয়ে ধরে উৎসবের মরসুম নিয়ে এল মেট্রোতে। মা বাবার অবশ্য অন্য গল্প চলছে। যদিও কান পেতে শোনা খুব খারাপ, তবুও পুরো স্টোরিলাইনটা সিনেমাটিক বলে ফেলতে পারলাম না। মা বাবার মধ্যে টেনশনটা স্পষ্ট।

মা বোধহয় বাপের বাড়ি চলেছেন। মেয়েও তা জানে, তা সে জিজ্ঞাসা করে ফেলল, “পাপা হামারে সাথ কাঁহা যা রহে হো?” মা উত্তর দিলেন, “সাথ যা রহে হয়ে বেটা!” বাবা উত্তর দিলেন, “নানি কে ঘর!” উত্তর দেবার সময় মায়ের চোখ থেকে চোখ সরালেন না! মা যেন একটু হাসলেন মনে হল? মেয়েটা খুশীতে উচ্ছল হয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “মেরি পাপা ইজ দ্য বেস্ট!” মা বাবা দুজনেই একটু লজ্জা পেলেন। তারপর দুজনেই একটা একটা সিট খালি দেখেও বসতে গেলেন না। চোখে চোখে আড় চুপে হালকা মান অভিমানে কথা চলতে লাগল আর মেয়েটি উলটো দিকের দরজার গায়ে নিজেদের ব্যাগটার উপর বসে মা আর বাবার হাত ধরে বলে উঠল, “মেরি মাম্মি… মেরি পাপা!” সিনেমাগুলোও কি এর থেকে বেশী নাটকীয় বা জীবন্ত মনে হয় বলুন? নরনারীর প্রাথমিকতম সম্পর্কের উর্ধে মানব মানবীর সম্পর্ক হল বাবা মায়ের সম্পর্ক। সন্তানের মুখ চেয়ে আমরা কত আনোনা তরকারি মুখে দিয়ে ফেলি, কত শ্বশুরবাড়ি নিয়ে খোঁটা সহ্য করে নি, কতই স্বপ্নভঙ্গের বেদনা ঢোঁক গিলে হজম করে ফেলি বিনা প্রতিবাদে। বাটি ঘটির ঠোকাঠুকি না থাকলে তো সংসারে শব্দই থাকে না। শব্দই যে ব্রহ্ম! সন্তানদের বেড়ে ওঠা নিশ্চিন্ত করতে এটুকু তো সবাই আমরা করতে পারি বলুন? পরিবার কথাটার অপর মানেই তো অঙ্গে ধারণ করা। তা গরলই হোক বা অমৃত!

যাই হোক চট জলদি অপর ঘটনাটায় যাই। উত্তম নগরের কাছে এসে একটু ভিড় হল ট্রেনটি। আমার উলটো দিকে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত সীট। সেখানে দুটি ছেলে বসেছিল। দুই মহিলা আস্তেই উঠে দাঁড়ালো, কিন্তু নিমরাজি হয়ে! বলেই ফেলল, “আপ লোগোকে লিয়ে তো কামরা হ্যায়! ওঁহা তো যা সকতে হ্যায়!” মহিলাদের একজন বললেন, “আপ বয়েঠ যাইয়ে।” ছেলেটি বসল না কিন্তু আপত্তি জাহির করতেই থাকল। আমি আর থাকতে না পেরে বললাম, “এক কে মুকাবলে পাঁচ! মহিলাও কে লিয়ে আরক্ষণ ঠিক হ্যায় না?”

যদিও ছেলেগুলো খুব অভদ্র ছিল না আর আমিও ভয়ানক ক্লান্ত ছিলাম বলে আলোচনা বেশী দূর চলল না। তবুও একবার ভেবে দেখতে হয় যে আরক্ষণ কেন করতে হয়। সে চাকরীর পদেই হোক আর বাস বা ট্রেনের সীটেই হোক। আরক্ষণ কাউকে অন্যায় সুবিধা দেবার জন্য নয় কিন্তু। যদিও আজকের রাজনীতিবিদরা সে গল্প ভুলে আরক্ষণের নামে পিছিয়ে পড়াদের পিছিয়েই রাখেন। তবুও আরক্ষণ যাবতীয় অসুবিধা দূর করার জন্যই। মহিলাদের আরক্ষণ করার প্রয়োজন কেন পড়ছে সে নিয়ে আর বেশী কথা বলে কি করব? সবই তো জানেন! তবে একটা কথা বলতেই পারি, মহিলারা যদি পিছিয়ে থাকে তাহলে দেশ তো এগোয় না। মহিলারা যদিও পিছিয়ে নেই, তবে পিছিয়ে রাখার চেষ্টার কোন খামতি নেই! সেই অসুবিধাগুলো নিয়ে আমরা একটু ভাবি বরং! নারী বিরোধী বা নারী বাদী না হয়ে মানববাদী হয়েই ভাবি কথাগুলো। আগামী প্রজন্মকে আমরা কি পৃথিবী দিয়ে যাব?

(১১২)


নবমী নিশি পোহাইল… পূজা মণ্ডপের ধূমধাম থেকে ফেরার পথে দেখতে পেলাম একটি ধূসর ওয়াগন আরের প্রশস্ত ছাদে দুটি ডেলকেশিয়ান ভাবলেশহীন ভাবে জিভ বার করে বসে আছে। হিংসে হল, মানব জনম লইয়া বিধি বাম থেকে ডানে যেতে পারে না কো! গণ্ডী গণ্ডী তদুপরী গণ্ডি!

আরে আরে আরে হলটা কি ফিসফাসের, এসব সিরিয়াস কাব্য বরং তোলা থাক অন্য কোথাও অন্য কোন খানের জন্য। ফিরে আসি কাজের কথায়।

অষ্টমীর দিন মোদীবাবু রসগোল্লা খাওয়াবার জন্য ডেকেছিলেন! আহা বচ্ছরকার দিনে একটা মাত্র অষ্টমী তাতেও শপথ টপথের বাড়াবাড়ি। যা ভাই খুব হয়েছে অফিস যাব তো কি হয়েছে? পুজো আছে না? চলাও পানসি ধুতি পাঞ্জাবী। লোকজন তো এক্কেরে থ! মায় সেক্রেটারি সাহেবা বলে ফেললেন, “সৌরাংশু, ফ্যান্সি ড্রেসমে কিউ?” আমিও সপাট উত্তর, পূজা ম্যাডাম! “আরে তুম বাঙ্গালী হো কেয়া? পুরা বাঙ্গালী? তো মিঠাই কিউ নেহী খিলাতে হো!” যাই হোক সে সব তো গেল এর পর এল শপথের কথা।স্বচ্ছ ভারত অভিযান চালু হবে! ভাল কথা! গান্ধীজীর জন্মদিনে সম্মান প্রদর্শন করে শপথ গ্রহণ! তাও ভাল কথা! নিজে শপথ নিয়ে আরও একশো জনকে শপথ নেওয়ানো! ইয়ে মানে সেতো আরও ভাল কথা! কিন্তু শপথটি কে লিখেছে হে? এত খুনখারাবিভাবে ড্রাফট করা শপথ আমি জিন্দেগীতে দুটো দেখি নি।

সে যাই হোক! তারপর আরেক নাটক। সেক্রেটারী ম্যাডাম জানালেন যে রাজপথে মোদী বাবু সবাইকে বগলে হাওয়া লাগিয়ে শপথ বাক্য পাঠ করিয়েছেন। তাই এখানেও সকলকে হাত তুলে জোড়হাতে শপথ পাঠ করতে হবে! ইল্লি আর কি! গলার কাছের কি যেন একটা বিদ্রোহ করে উঠল। করবই না! আমার ডিওডোর্যা ন্ট কি অতই সস্তা? যে যাকে তাকে গন্ধ উপহার দিয়ে বেরাব? তারপর এক ঘণ্টা ধরে ভারত ভাগ্য বিধাতা করে তারপর ছাড়ান। ইল্লি ততক্ষণে হোয়াটসঅ্যাপে বন্ধুদের খিল্লিতে পরিণত হয়ে গেছে। তবে জয় গুরু! ধুতি পাঞ্জাবী ইজ্জত বাঁচিয়ে দিল! যদি শুভ কাজে সুপোশাকে ও সুমনে আসা যায় তো কেয়া বাত হ্যায়!

যাই হোক এবারের পুজোটা এপার ওপার খেয়া বেয়ে নেয়ে দেয়ে বেশ কেটে গেল। কিন্তু গতবারের সপ্তমীর কথা মনে পড়লে এখনো গায়ে কাঁটা দেয়। ষষ্ঠীর রাত থেকেই সহস্র ধারা শুরু! সপ্তমীতে যখন মণ্ডপে গিয়ে পৌঁছালাম তখন তা এঁদো ডোবায় পরিণত হয়েছে। শুরু হল মাটি কেটে জল ছাঁচার খেলা! এক দুই তিন চার পেরিয়ে পাঁচ ঘণ্টা অক্লান্ত পরিশ্রমের পর এবার মাটি ফেলা শুরু হল! সেও চলল প্রায় ঘণ্টা তিনেক। অনুষ্ঠান শুরু সাড়ে সাতটায়। ঘড়ি এগোচ্ছে আর জল শুকিয়ে বেঞ্চিও এগোচ্ছে। শেষে দশ মিনিট দেরীতেই শুরু করে ফেলা গেল ম্যাজিক শো! ম্যাজিকের মতো! পুরষ্কার তো বনতা হ্যায়! যারা মেহনত করল তাদের জন্য। কালী পুজোর দিন সকলকে ডেকে ডেকে স্মারক তুলে দেওয়া হল! কি দুর্দশাই না হত তা না হলে।

পুজো আসে পুজো যায়! কিছু টুকরো টুকরো গল্প রেখে যায় আমাদের জন্য! নাটক, আগমনী, রিহার্শাল, নাচ গান টিকটিকি আড্ডা খাওয়া দাওয়া! আপনার আমার গল্প! সেই গল্পগুলোই সারা বছরের খোরাক দিয়ে যায়! হাসি মুখে মার থাকা না থাকা ফিরে ফিরে আসে। আসছে বছর আবার এসো মা! আঁচল পেতে বসে থাকব আমি! আমেন!

(১১১)


আরে নিজে একটা ব্লগ লিখি বলে নিজের হিরোগিরির গল্প ফাটাবার একটা চেষ্টা করব না বলুন? সাহসিকতা বলতে গেলে রাস্তাঘাটে নিজের সততা বজায় রাখার চেষ্টা বলতে পারেন। আফটার অল দুই বাচ্চার বাপ। এটুকু তো করাই উচিত।

তা এসব গল্প বলতে গেলে ফিরে যেতে হয় নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে, তখনো কোলকাতা শহরটা আমায় দেশান্তরে পাঠায় নি। চাকরি বাকরি আর প্রেম উভয়ই চুটিয়ে চলেছে। সন্ধ্যায় আলিপুর থেকে বাসে করে টি বোর্ড তারপর বান্ধবীর অফিস থেকে হাঁটা পথে মানিকতলা। সরষে দানার তো অভাব ছিল না।

এমনই এক দুরন্ত দিনে সেন্ট্রাল মেট্রো স্টেশনের সামনের রাস্তা পার করার সময় একটা টাটা সুমো হঠাৎ গতি বাড়িয়ে প্রায় চাপা দিয়ে দেয় আর কি। রক্ত আর আবহাওয়া উভয়ই গরম থাকায় কিছু একটা মুখ থেকে বেরিয়ে যায়, যা আজ আর মনে নেই। কিন্তু তাতে সুমো গাড়িটা হঠাৎ সামনে গিয়ে ক্যাঁচ করে ব্রেক মেরে দুটি ছেলে নেমে আসে এবং অশ্রাব্য তর্পন চলাকালীন আমার তলপেট লক্ষ্য করে জুতোর সোলের দাগ নেমে আসে। প্রথমে একটু হকচকিয়ে গেলেও হাত আমিও চালাই। কিন্তু পিছন থেকে একজন ধরে ফেলে আর সামনে লোকটি কোমরের কাছে ফুলে থাকা কিছুতে হাত দিয়ে আমার বান্ধবীকে বোঝাতে শুরু করে, যে আমার বেঁচে থাকার জন্য তার আমাকে বোঝানো কতটা জরুরী- “সমঝাও ইসে, জান গওয়া বয়ঠেগা”। তা এহেন সময়েও দিগ্বিদিক হারাই নি। আমায় ছেড়ে গাড়িটা কলেজ স্ট্রিটের দিকে বাঁক নেবার সঙ্গে সঙ্গে আমি ছুটে যাই একশো মিটার দূরে দাঁড়ানো পিসিআর ভ্যানে অভিযোগ জানাতে। যদিও তাদের আর পাওয়া যায় নি আর বান্ধবীর প্যাল্পিটেশন সে রাতের মতো থামে নি।

কিন্তু স্বভাব কি কখনো অভাবে যায়। কাট টু কাট ফিরে আসি দিল্লীর বুকে। তখন থাকি আশ্রম বলে এক জায়গায়। একদিন অফিস থেকে স্কুটারে সওয়ার হয়ে ফেরার পথে হঠাৎ দেখি একটা রিক্সা রেলব্রীজের তলা দিয়ে ঢালু জমিতে নামতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয় সামনের স্যান্ত্রোর গায়ে পড়েছে। আর সে স্যান্ত্রো চালক কথা বার্তা কিছু বিশেষ না বলে গাড়ি থেকে নেমে এক ঘুষিতে দিয়েছে রিক্সাওলার ঠোঁট ফাটিয়ে। আহা বিবেক বাবাজী তো র্যােম্পে হাঁটতে উদ্যত, সে কি আর চুপ থাকতে পারে। নেমেই ড্রাইভারের কলার চেপে মস্তানি, “মারা কিঁউ? গরীব বোল কি ইজ্জত নহি হ্যায় কেয়া?” সে যা হোক পুলিশ ডেকে গাড়ির আসল মালিক ডেকে রিক্সাওলার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিয়ে তারপর শান্তি। আহা সমাজ কল্যাণে যা ন্যাজ মোটা হয় না! কি যে বলব?

সেই রকমই একটা কিছু ঘটল আজ। এমনিতে মহালয়ার সকালে আলোর বেণুপথ বেয়ে গেছিলাম মুম্বই। তা তার তো ভীষণ বদনাম, আবহাওয়া সব সময় ছিঁচকাঁদুনে বলে। কিন্তু কেন জানি না, মা জননী আসবেন বলে সমস্ত কায়নাৎকে মাসাআল্লাহ বানিয়ে রেখে দিয়েছিলেন। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরেই তাই ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে গেলাম একটু ময়ূর বিহারের পথে। তা প্রায় গন্তব্যে পৌঁছব পৌঁছব করছি। শেষ চৌমাথায় দেখি একটা ট্রাক ট্যারা হয়ে দাঁড়িয়ে আর তার সামনে থেকে একটা বাইকের সিট কেউ তুলে নিয়ে সাইডে গেল। কোন রকমে পেরিয়ে আস্তে গিয়ে দেখি মারমুখী জনতার রোশে ট্রাকবাহনের শোলের ম্যাকমোহনের মতো অবস্থা। নিজের গাড়িটাকে ধারে দাঁড় করিয়ে ছুটে এসে দেখি। কয়েকটি তাজা তাজা দেশের ভবিষ্যৎ মুখে ভুরভুরে গন্ধ আর অকথ্য সম্ভাষণ সহ বেড়ে বেড়ে গিয়ে ট্রাক ড্রাইভারটাকে মারার চেষ্টা করছে।

সত্যি বলতে কি পাঠক পাঠিকারা, মায়া হল খুব! আহা ড্রাইভারটা না হয় গড়বড়িয়ে ফেলেছে! তা বলে অবেলায় তার জান চলে যাবে? পাবলিকের মধ্যে থেকেও তো আমরা মানুষ! সবার আগে তাই সবুজ টি শার্ট পরিহিত যে ছেলেটি গ্লুকোজ টেনে ফুটছে তাকে আটকালাম। গালাগালির গতিপথ আমার দিকে পরিবর্তিত হল। আমি নরমে গরমে সামলে দেবার চেষ্টা করছি। সমানে বলছি, “মারো মত পুলিশকো দে দো!” কিন্তু সমর্থন বিশেষ যেন পাচ্ছি না। আর ওদিকে নব্য যুবকের দল তাকে খুনই করে ফেলবে। আমি তখন বেগতিক দেখে বললাম “উসকো ম্যায় উতার রাহা হুঁ- মগর মার না নহি!” ছেলেগুলো কি বুঝল কে জানে একটু থমকে গেল। কিন্তু কেউ আমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না, বাইকচালকের কি হয়েছে। যাই হোক ড্রাইভারটা ভবিষ্যতের হাতে নিজেকে সঁপে দেবার প্রস্তুতি নিয়ে নেমে এল। আর উন্মত্ত জনতা মঙ্গলবার দিন মানুষের মাংসের লোভে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপর। জনতা বলতে জনা চারেক পাঁচেক ছোকরা আর দুটো মুসকো লোক। পরে বোঝা গেল তারাই বাইকে ছিল এবং মরেই যেত। যদিও অনেক খুঁজেও তাদের গায়ে আমি বিশেষ আঁচড় টাচ-ওর দেখতে পাই নি। তবে কি না মরে যেত বলে কথা।

কি জানি আমার ভিতরে তখন কি যেন একটা ভর করেছিল। শান্ত গলায় দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে শুরু করলাম, “মুঝে মারনা হ্যায় তো মার দো, মগর ঈশ গরীবকো মারনে নহি দুঙ্গা!” শুকনো মুখে ফিরে যেতে হবে দেখে উৎসাহীরা আমার দিকে ফিরল। কিন্তু কেন জানি না যুত করে মারতে পারছিল না আমায়। কেন তা বলতে পারব না, তবে কলার ধরা খান দুয়েক চড় চাপড়ের মধ্যেও আমি বলে যেতে লাগলাম, “বাইকওয়ালা কিধার হ্যায়? প্যাহলে বতাও! মারো মাত!” সত্যি হয়তো মজা ঠিক হচ্ছে না দেখে তারা সরে যেতে লাগল। আর এই সময়ই দেবদূতের মতো হাজির হল এক কনস্টেবল। ব্যাস তখন আম জনতা মস্তানদের দিকে আঙুল তুলতে শুরু করল। আর আমি পেলাম পূর্ণ চন্দ্রকলা হাতে। হেব্বি কনফি নিয়ে ছুটে গেলাম ছোকরা মস্তানদের দিকে।

কনস্টেবলটাও করিৎকর্মা! সে গিয়ে ছোকরাদের গাড়ির মধ্যে স্যাট করে সেঁটিয়ে গিয়ে বার করে আনল বিয়ারের বোতল। ছোকরারা তখন জনতার মধ্যে মিশে গেছে। শুধু ধরা পড়েছে সেই গাড়ির ড্রাইভার বাবাজী। ট্রাকের ড্রাইভারটা ভদ্রলোকের মতো ট্রাকটাকে ধারে নিয়ে ফিরে আসছিল। কনস্টেবলটির কথায় তার টিকি নাকি স্থানীয় থানায় বাঁধাই আছে। বাইক চালক ও তার সহযাত্রীকে আমি বেশ ঘ্যাম নিয়েই বললাম যে ১০০ নম্বরে ফোন করে অভিযোগ জানাতে, যে তারা মরতে বসেছিল। কিন্তু ট্যাঙ্কি তো ঠনঠন গোপাল। তাই তারা বলল না তারা এসব নিয়ে আর এগোতে চায় না। তখন চড়ল আমার গলা, “মাজাকি পায়া হ্যায়? আভি আপ লোগোকা জান যা রাহা থা বোলকে আপ দুসরো কো ইন্সটিগেট করকে ড্রাইভারকি জান লেনে পে তুলে হুয়ে থে!” সে আমতা আমতা করতে শুরু করেছে। কনস্টেবলের সঙ্গীরাও এসে গেছে। তারা তখন সেই গাড়ির (স্যান্ত্রো) ড্রাইভারকে নিয়ে পড়েছে। সে তো স্মার্টলি বলতে শুরু করেছে, সে তো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মোমো খাচ্ছিল। ছেলেগুলোকে কাউকে চেনে না। আমি তখন প্রবল পরাক্রমশালী প্রতাপাদিত্য মহারাজ। বললাম, “ঝুট বোল রহা হ্যায়! থানে পে লে যাকে দো চার হনুমান চালিশাকা শ্লোক শুনা দো!” পুলিশগুলোও দেখলাম সহমত হল।

এক ভদ্রলোক খালি এসে ইংরাজিতে বলল- বাইক চালক যখন অভিযোগ করছে না তখন ছেড়ে দেওয়া হোক না। ইংরাজরা প্রায় সত্তর বছর হল চলে গেছে এ দেশ ছেড়ে কিন্তু ভাষার যা ওজন দিয়ে গেছে কি আর বলি। আমিও দেখলাম সারা দিনের শেষে এসব নিয়ে ন্যাকামো করে লাভ নেই। সমবেত জয়ধ্বনি ও করতালির মধ্যে দিয়ে দু চার বাণী জ্ঞানগর্ভ ভাষণ দিয়ে রওনা হলাম গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। এখনো মেপে দেখি নি। কিন্তু ঠিক জানি ছাতি এখন মদনলাল হয়ে গেছে। ফিরে আসার সময় সেই ট্রাক ড্রাইভার ছেলেটার চোখে চোখ পড়ল। এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে সে। ভাষা পড়ার দরকার পড়ল না।

এই হল গিয়ে আমার হিরোগিরির গল্প। ভাগ্যিস ফিসফাস ছিল! তা বলি কি পাঠক পাঠিকারা, ফিসফাস-২ বই হয়ে বেরোবে বলে প্রকাশক আশা দিয়েছেন। আমিও বুক বেঁধে আছি, যে আপনারা উৎসাহ দিতে থাকবেন আর আমিও কমন অব আ পাওয়ার ম্যান দেখাতে থাকব। পাঠক আছে বলেই তো কলম বেঁচে থাকে। আর পাঠিকাদের জন্য কলমধারী। জয় হিন্দ, জয় মহারাষ্ট্র, জয় বাংলা।

(১১০)


লেখাটা লিখতে একটু দেরী হয়ে গেল বলে পাঠক পাঠিকারা মার্জনা করবেন। আসলে একটু অন্যরকম করে শুরু করব ভেবেছিলাম। হয়তো একটা কবিতা টবিতা। সৃষ্টির আদিকালে আমি খান কতক কবিতা পাড়ার চেষ্টা করেছিলাম বটে, কিন্তু সেটা খচ্চরের ডিমের থেকে বেশী দূর এগোয় নি। তাই লিখেতে বসে,

মেঘের আদর
গোলাপি চাদর
আমিও বাঁদর
তুমিও বাঁদর

এর বেশী এগোন গেল না। তাই আর কি এট্টু দেরী হয়ে গেল। আসলে বাঁদর সেই রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্রের কাল থেকে বাংলা সাহিত্যের মানবর্দ্ধন ও মানভঞ্জন করে আসছে। সেই যে কবিগুরুর অমোঘ উক্তি- ‘এই ঘরে একটি বাঁদর (বাঁ দোর) আছে’ সেই থেকে শুরু। তারপর সেই ‘হুলা হুলা গান আর ট্যাঙো ট্যাঙো নাচ’। প্রেমেন মিত্র। এ ছাড়া বিশেষ পড়েছি কি না মনে পড়ছে না। পাঠক পাঠিকারা একটু স্মরণ করিয়ে দিলে বাধিত থাকব।

সংস্কৃত সাহিত্যে তো বাঁদরদের গুরুত্ব অপরিসীম, তারা তখন রাম নাম লিখতে পারত রাবণকে ল্যাজে বেঁধে তিন ভুবনের পারে আলুকাবলি খাওয়াতে পারত। প্রযুক্তি বিদ্যাতেও তাদের গুণগান ছিল। প্রথম উল্লেখযোগ্য সেতু বন্ধন বাঁদর ইঞ্জিনিয়ারের হাতেই হয়েছিল। আর হনুমানের কথা তো বললামই না। এতই প্রতিভাবান ছিল যে উপযুক্ত পাত্রী পাওয়া গেল না। সারাজীবন হরিমটর আর রামকথাতেই চালাতে হল।

সে যাই হোক, আমাদের মধ্যেও একটা বাঁদরামির প্রবণতা কম বেশী দেখা যায় বলে বদনাম আছে নাকি আমরা বাঁদরের বংশধর। তবে কি না বাঁদর না হলে তো আর মানুষ হিসাবে গণ্যও করা যায় না। তা আমি খান দুই বাঁদরামির গল্প বলব। আপনারা ধৈর্য ধরে শুনতে পারেন।

প্রথমটি গত বুধবার সংঘটিত হল! এর সঙ্গে বাঁদরের প্রত্যক্ষ কোন যোগাযোগ নেই, কিন্তু বাঁদরামির আছে। মানে বাঁদরদের মতো সক্ষমতা তো মানুষের থাকে না, আমরা খালি চেষ্টা করতে পারি। আর্বান রানিং বলে একটা বস্তু হয়েছিল যেটা অক্ষয়কুমার থামস আপের বিজ্ঞাপনে প্রভূত প্রচার করেছিলেন। সে কিছু না, জানলার কার্নিশ, সিঁড়ির রেলিং, ম্যাজেনাইন ফ্লোর, ঝুলন্ত বাদুড় ইত্যাদি ছুঁয়ে লাফিয়ে গড়িয়ে বালীগঞ্জীয়ে নিজের শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানো।

তা এক কালে সে সব আমারও খুব মজাই লাগত। খুব যে করতে পারতাম তা নয় তবুও চেষ্টার তো কমতি ছিল না। বর্তমানে কোমর বেড়ে ৩৫, ফিটনেসের অবস্থাও খুব দারুণ কিছু না আর চটকানো হাঁটু তো আছেই। তো সে সব দিকে খুব যে মাড়াই তা নয়। আরে বাবা বয়সটাকে তো বোতলবন্দি রাখা যায় না।

কিন্তু মাঝে মাঝে উপায়ান্তর থাকে না যে। দুর্গাপূজা নিকটবর্তী হতে যত আরম্ভ করেছে। রিহার্সালের বহরও ততই বাড়ছে। তো বুধবার সপরিবারে রিহার্সাল বেড়াতে বেরোচ্ছিলাম। কিন্তু আমার পার্শ্ববর্তিনী কিছুতেই আর নীচে এসে পৌঁছতে পারছেন না। অন্যান্য বহু মহিলার মতো ওনার সাজুগুজুর প্রতি জেন্ডার বায়াস নেই বলে বেশ নিশ্চিন্তেই থাকি। তাই লিপস্টিকে যে সময় নষ্ট হচ্ছে না সে বিষয়ে নিশ্চিত। ফোনও এনগেজড। তাইলে?

এলেন তিনি মিনিট দশেক পর। এসে জানালেন, যে সামনের বাড়ির ছোট মেয়েটি বাড়ির ভিতর লোহার দরজা বন্ধ করে আপাত ঘুমোচ্ছে। বড় মেয়েটি প্রথমে আর তার পর তার মা এসে ফোন করে করে বেল বাজিয়ে বাজিয়ে হদ্দ হয়ে পড়ছে। পার্শ্ববর্তিনীর ফোনটিও এতক্ষণ উদ্ধারকার্যে মগ্ন ছিল।

এসব শুনলে কোন বিবেকবান বা রবীন্দ্রবান পুরুষই কি চুপ করে থাকতে পারে? আর আমার তো বনের মোষ তাড়াবার প্রবল তাড়না। ছুটলাম উপরে। গিয়ে পত্রপাঠ তিন তলার সিঁড়ির জানলা দিয়ে শরীর গলিয়ে কার্নিশের উপর পা রাখলাম। ঘুরঘুট্টি অন্ধকার, কার্নিশের উপর খুলে রাখা একটা জানলার গ্রিল সামনের বাড়ির ব্যালকনিটি ফুট চারেক দূরে। নীচে মেয়ের কান্না আর পিছে সামনের ফ্ল্যাটের ভদ্রমহিলার ক্রমাগত সাবধান বাণী। সব মিলিয়ে বেশ দোলাচলে।

আসল কথাটা হল ফিটনেস! বছর দুয়েক আগে হলেও এসব নিয়ে ভাবতাম না। কিন্তু এখন তো ওজন এবং বয়স পাল্লা দিয়েই বেড়েছে। ভদ্রমহিলাও দেখলাম বলছেন, “সিনহা জী, ছোড় দিজিয়ে! ও সো রহি হ্যায়। নিন্দ টুটনে কি বাদ হি খুলেগি!” আমি ভাবলাম হিরোগিরি দেখাবার সুযোগ কেই বা ছাড়ে। এক হাতে জানলার পাল্লার গোড়াটা শক্ত করে ধরে অপর হাত বাড়িয়ে চার ফুট দূরের ব্যালকনির কার্নিশে রাখা টবের চুলের মুঠি ধরে তুলে আনলাম অতীব সাবধানে। তারপর হস্তান্তরিত করলাম ভিতরে। খোলা গ্রিলটাও পায়ের তলা থেকে সরিয়ে একই গন্তব্যে পাঠালাম। তারপর যা থাকে কপালে বলে ষাট ডিগ্রি কোণাকুণি এক পায়ে লাফ মারলাম। ডান হাঁটুর শুবানাল্লাহ অবস্থার জন্য লাফ টাফ একটু সাবধানেই মারতে হয়। সেই হরিদার অমোঘ উক্তি, “সাবধানের বাবার মুখ ভর্তি দাড়ি আছে, সাবধানের মার নেই।” তাই এক পা।

নেমেই নিজেকে এবং নীচে দাঁড়ানো বাক্স প্যাঁটরাকে জানিয়ে হাঁক দিলাম, “পৌঁছ গয়ে।”

তারপর শুরু কসরত। দুটো দরজার লোহার আবরণ বন্ধ। কিন্তু ছোট ঘরের জানলাটা খোলা। সেখান দিয়ে ওয়াইপার দিয়ে প্রথমে কাঠের দরজার ছিটকিনি এবং তার পর লোহার দরজার আবরণ সরিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। ভিতরে সেই হাচ-এর কুকুরটা “খ্যাউ খ্যাউ” করে তেড়ে এল। আমি ওসবে বিশেষ পাত্তা টাত্তা না দিয়ে এগিয়ে গেলাম বেডরুমের দিকে। দেখি ভর সন্ধ্যা বেলায় গান চালিয়ে এসি চালিয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে ত্রয়োদশী কন্যাটি পাড়ি দিয়েছেন মালাবার হিলের ওপাড়ে।

বেশী না ঘাঁটিয়ে সদর দরজা খুলে দিয়ে “হেঁ হেঁ” হাসি নিয়ে গাড়ির পানে ছুটলাম। পিছনে ম্যাণ্ডেটরী ‘থ্যাঙ্কু ট্যাঙ্কু’র বহমানতাকে উপেক্ষাই করে নিলাম। রিহার্সালে দেরী করা আমার নিয়ম বিরুদ্ধ। গুরুর বারণ আছে।

দ্বিতীয় ঘটনাটি পরশু অফিসের। এমনিতে মোদীবাবুর আগমনে সরকারী বাবুগিরির আলতামাসি আরামের দিন কেটে পড়েছে। তার উপর বায়োমেট্রিক, ফিঙ্গার প্রিন্ট আই বল ম্যাচিং ইত্যাদিন হাইটেক ব্যাপার স্যাপার নিয়ে একদম ২২১ বেকার স্ট্রিট। তার উপর তিনি আবার বাউণ্ডারী সীমানা বেঁধে দিয়েছেন ১০০ দিন।

দাও ব্যাটা ১০০ দিনে কে কত গাল গল্প লিখেছ তার হিসাব কিতাব। তা গল্প উপন্যাস লিখতে আমার প্রতিভা তো অপরিসীম মূলো। যখন তখন গুঁজে দেওয়া যায়। তাই যুগ্ম সচিবের ঘরে নিজের ডিভিশনের হাল হকিকত পৌঁছতে যেতেই তিনি যুতে দিলেন অর্ধপক্ক ব্যঞ্জনের সঙ্গে। এখানে যাও সেখানে যাও শেষে সচিবের কাছে যাও। সচিব মহোদয়া অত্যন্ত মিশুকে এবং এক্সপ্রেসিভ। সব কিছুই ওনার মুখে চলে আসে। গুরু গম্ভীর মিটিং-এ বসে কোন মহিলা সহকর্মী যদি পুরুষ সহকর্মীর প্রায় গায়ের উপর পড়ে যাবার মতো অবস্থা হয় তাতেও তিনি ফুট কাটতে ছাড়েন না, “আরে দাস সাহাব, কোই সুন্দর লড়কি (পড়ুন পঞ্চান্ন বছরের মহিলা) আপকি উপর গির রহি হ্যায়, থোড়া তো হাস দিজিয়ে।”

তা তিনি দেখলাম তাঁর এবং যুগ্ম সচিবের পি এসের উপর মাথার উপর দাঁড়িয়ে হাঁউ মাউ করতে শুরু করেছেন আর পি এস যুগল বেচারা ১০ লাখের জায়গায় ১৫ কোটি লিখতে গিয়ে হোঁচট বিষম আর খাবি একসঙ্গে খাচ্ছে। আমাকে দেখেও তিনি বেশ বকা ঝকা করে দিলেন। আমি ওনাকে কিছু বলার আগেই। তারপর বলে দিলেন, “শরম আনে চাহিয়ে তুম লোগোকো, ইতনে ইয়ং অউর ইনটেলিজেন্ট হো মাগর কাম নেহি করতে হো অউর আভি হাস রহে হো।” ব্যাখ্যা করতে গেলাম না যে আমার কাজটা আমি করেই দিয়েছি। যার সমন্বয়ের কাজ তিনি দূর থেকে তখন গুলতির টিপ প্র্যাকটিস করছিলেন। মুখ দিয়ে বেরলো অমোঘ বাণী, “শরম তো আ রহি হ্যায় ম্যাডাম, ইসিলিয়ে আপনে আপ পে হাস রহা হুঁ।” এর পর আর কোন কথা হয় না।

যাই হোক কাজে লেগে পড়লাম, কিন্তু সন্ধ্যা ছটা নাগাদ পেটের ছুঁচো একটু নড়ে চড়ে বসলে চাড্ডি মুড়ির বন্দোবস্ত করতে সেকেন্ড ফ্লোরে গেছিলাম। গোলমালটা বাঁধল ফেরার সময়। স্বাভাবিক উদর বৃদ্ধি রোধ করতে এবং সক্ষমতা বজায় রাখতে আমি এলিভেটরের ব্যবহার করি না। সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছিলাম ষষ্ঠ তলে তৃতীয় তলেই দেখলাম অফিস সময় পেরিয়ে গেছে বলে ল্যাজ বিশিষ্ট বানর কূলের কনসার্ট শুরু হয়ে গেছে। বছর চারেক আগে এক উচ্চ পদস্থ অফিসারকে এই বানরকূলই বাথরুমের মধ্যে বন্ধ করে রেখেছিল ঘণ্টা চারেক। শেষে কেয়ারটেকার কয়েক জনকে নিয়ে এসে তারপর উদ্ধার করে।

আমার বরাবরের স্ট্র্যাটেজী, যা ফিসফাস-১এর পাঠক পাঠিকারা জানেন, তা হল ‘ইগনোর কর, ইগনোর কর মনা’। এখনও করছিলাম। কিন্তু দেখলাম তিনখানা বাঁদর আমার সহযাত্রী হল। পঞ্চম তলে গিয়ে দেখি আরও চারটে বসে এবং তার মধ্যে খান দুই বেশ বাছুরের সাইজের। ষষ্ঠ তলের দিকে পা বাড়াতে যাব, হঠাৎ নীচ থেকে উঠে আসা একটি বিচ্ছু বাঁদর কপাৎ করে লাফিয়ে আমার ঘাড়ে চড়ে ফেলল। আর আরেকটি ধেড়ে আমার পিঠে একটা আলতো করে থাবড়া লাগালো। আরেকটি তখন আমার পায়ের ডিম ম্যাসেজ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

পাঠক পাঠিকারা, সত্যি বলছি। মেরুদণ্ড বেয়ে ঠাণ্ডা স্রোত নেমে আসছিল। কিন্তু ডর কে আগে জিত হ্যায় না? তাই কোন রকম প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সোজা পঞ্চমতলের দরজায় ঢুকে গেলাম। তার একটু নিশ্বাস নিয়ে ভাবলাম নাহ, ঘাবড়ালে চলবে না। বাঁদরগুলো বোধহয় মাটি পরীক্ষা করছিল। কিন্তু এ মাটি বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি, বাঁদরের চাঁটি, চলো যাই হাঁটি। ফিরে এলাম ফেলে আসা পথে। বানরকূল সসম্ভ্রমে রাস্তা ছেড়ে দিল। বিচ্ছুটির হয়তো ইচ্ছা ছিল আমাকে পথ দেখাবে। কিন্তু বড়রা বারণ করল বোধহয়। যে পথে যুধিষ্ঠির করেছে গমন সে পথ কখনই নয় যে কমন। ফিরে এলাম এক বুক নিশ্বাস আর বিজয় গর্ব সঙ্গে করে। জিজ্ঞাসা করলে বললাম, হাঁ ঝপকি তো লাগায়া থা! মাগর উসকো রিয়্যাক্ট নেহি করনা! সবাই বেশ চোখ বড় বড় করে শুনলো বানর বিজয় কাহিনী আর আমি আবার ছুটলাম সচিব এবং যুগ্ম সচিবের হৃদয় জয় করতে। যা সে দিন রাত দশটা পেরিয়ে পরের দিন চারটেয় শেষ হল বটে। কিন্তু সে আরেক হিমালয় ডিঙোবার গল্প।

স্প্রাইট কিন্তু সত্যিই একটা দারুণ ক্যাচফ্রেস বানিয়েছে। ডরের পরে জিত অবশ্যই আছে। অবশ্যম্ভাবী…