(১০৫)


(১০৫)
“বাবা তারকনাথের চরণে সেবা লাগি…………”
একটা সময় সন্ধ্যা রায়ের এই সিনেমাটি সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে আবেগের বান ডেকে এনেছিল মনে আছে? আর তারপর সারা ছেলেবেলা জুড়ে তারকেশ্বরে বর্ষা নামার ধূম। আহা বৃষ্টি ভেজা কোলকাতার রাস্তা দিয়ে খালি পায়ে, বাঁশের বাঁখারি কাঁধে ঘড়া ভরা জলের উপর মাটি লেপে আর প্লাস্টিকের ত্রিশূল ম্যুরাল চাপিয়ে, ছেলেগুলো বাবা তারকনাথের মাথায় জল ঢালতে চলেছে, যদি বাবা মাথা ঠাণ্ডা হয়। যদি একটু আধটু জোগাড় টোগার হয় একটু হিল্লে হয়ে যায় আর কি। আজ বছর পঁয়ত্রিশ পরে এসে এর হিসাব নিতে গেলে আবার ভক্তির ভাঁড়ারে টান পরে যেতে পারে। তার চেয়ে বরং স্বীকার করে নিই যে দূরবীনে চোখ রাখব না। বরং জিন্দেগী না মিলেগি দোবারার নায়কের মতো খোলা মাঠে ঘোড়ার নৃত্য দেখি আর আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিই। কি বলেন পাঠক পাঠিকারা?

এ তো গেল ফ্ল্যাশব্যাক! এবারে আসুন ফিরে আসি বাস্তবের গল্পে, এই পচা শহরের পচা গরমের পরিমণ্ডলে বৃষ্টির বরাভয় আসতে আসতে সময় হয়ে গেছ শ্রাবণ মাস। কিন্তু তাতে কি? প্রথম বৃষ্টি আর প্রথম প্রেম কি কখনও পুরনো হয়? যখনই এসেছিল ঝমঝমিয়ে ভিজিয়ে দিয়ে যায়। ছেলেটাও, “মা ভিজতে যাচ্ছি!” বলে ছাদের উপর উপর হয় সমবয়সীদের সঙ্গে। যত পোড়া কালঘাম, ঘামাচি আর দুর্ভাবনা নর্দমার পথে তেপান্তরে পাড়ি লাগায়।

আমিও ক দিন ধরে বেণী ভেজাব না পণ করে ছাতা হাতে চলেছি সুদূর আইএসটিএম-এ। সরকারী চাকুরেরা যাতে অ্যাসেম্বলী লাইন চাকর বাকরে পরিণত না হয় তার জন্য দক্ষতাবৃদ্ধির বরাদ্দ ইনস্টিটিউটখানিতে ঘানি ঘুরিয়ে উত্তম গুণমানের নির্যাস বার করা হয়। তাতে কেউ কেউ স্লিম ট্রিম ফিট ফাট হয়ে যায়। আর কেউ কেউ শুধু ছিবড়ে হয়ে পড়ে থাকে ডাস্টবিনের আশায়।
তা আমিও গত এক বছরের পদোন্নতিকে পোক্ত করার জন্য আবশ্যিক প্রশিক্ষণের কারণে বর্ষামঙ্গলে সপ্তাহের পাঁচ দিন ভিজিয়ে চলেছি।

তা আছি মন্দ না বুঝলেন! বুড়ো বয়সে পড়াশুনো চাপের হতে পারে কিন্তু ইনস্টিটিউটের সুন্দর ব্যবস্থাপনায় কনসেপ্ট পেপার প্রেজেন্টেশন, স্টেট অ্যাটাচমেন্ট স্টাডি ট্যুর আর মড্যিউল পরীক্ষার যাঁতাকলকেও শিমূল তুলোর পাশবালিশ বলে মনে হচ্ছে। তার সঙ্গে জুটেছে বিভিন্ন চরিত্রের সহকর্মী বা সহপাঠীরা। আরে রোজ রোজ বাড়িতে চিকেন চচ্চড়ি খেতে খেতে রেস্টুরেন্টে সামান্য নুডলস আর চিলি পনিরও মুখে অমৃতের দই আর দ্বারিক ঘোষের আমসত্ত্ব সন্দেশ মনে হয়।

তা গন্তব্যটা বেশ কাছাকাছি নয় বুঝলেন! কমফোর্ট জোনের বাইরে বার করে নিয়ে তবে জ্ঞান প্রবেশ করাবে! তা ভাল, তবে কিনা সাতটার সময় ত্রিশ কিমি গাড়ি চালিয়ে আবার সন্ধ্যা আটটায় ফিরে এসে বই মুখে বসতে ধক লাগে। বাড়ির চাতক পাখীগুলোর দিকে চাওয়া যায় না। তা কি আর করব। পেটে খেলে পিঠে সয়!

তাই রোজ সকালে উঠে গোপাল বড় সুবোধ ছেলের মত, পিঠে ব্যাগ আর হাতে জলের বোতল নিয়ে গুটগুটিয়ে গাড়িতে উঠে বসি! আর নিঃস্বর্গের বিসর্গ বাদ দিয়ে ছাঁকনিতে ছেঁকে নেওয়া তলানিটুকু দেখতে দেখতে পৌঁছে যাই পঠনের পথে।

এখন তো আবার শ্রাবণ বা শাওনের সময়। শাওন যে তোর বাঁধন মানে না- ভাসান দিয়ে যা রে শাওন ভাসান দিয়ে যা…

শাওনে কাঁওয়ারদের ভিড় বাড়ে। তা এই পোড়ার দেশে তারকেশ্বর আর কোথায় পাবে, তাই তারা গাঁ উজিয়ে ছুটে যায় হরিদ্বারে, হরের মাথায় জল ঢালতে। হরিদ্বার বলতে সেই দুহাজার চারের কথা মনে পড়ে গেল। আমি আর আমার এক বন্ধু সপরিবারে সেথা গিয়েছিলাম শ্রাবণের ধারার মাঝেই। তা একদিন হর কি পৌরিতে ঘোরাঘুরির সময় উভয়েরই বেগ সঙ্কট এসে উপস্থিত। উঠেছিলাম ভারত সেবাশ্রম পেরিয়ে কাটিয়া বাবার আশ্রমে। সে প্রায় সেখান থেকে আধ ঘণ্টার পথ। লট বহর নিয়ে সেখানে ফিরে যাবার থেকে দুজনেই মনস্থ করলাম যে হালকা হবার শুদ্ধ স্থান কাছাকাছি কোথাও খুঁজে বের করব। কিন্তু আমরা তো শহুরে সচেতনবাদী। পরিবেশ এবং দৃশ্যদূষণে বেজায় বিরাগ। তাই সহধর্মিনীদের “এই একটু আসছি” বলেই সোনার হরিণের খোঁজে গরু খোঁজা করে যখন প্রাণ যায় যায় অবস্থা তখনই বিষ্ণু ঘাটের কাছের এক ধরমশালায় ভুজুং ভাজুং দিয়ে পতিতোদ্ধারিণী গঙ্গের স্পর্শ লাভ।
আহা গোপাল ভাঁড় বড়ই সত্যবাদী ছিল হে। তা ততক্ষণে স্টুডিওর ঘড়ির কাঁটা দেড় ঘণ্টার পথ অতিক্রম করেছে। আর মোবাইলের অস্তিত্বও তখন বাঙালীর পকেটের ইতিউতি উঁকি ঝুঁকি শুরু করে নি। অতএব বাস্তবের জমি বড়ই কঠোর ছিল হে পড়ুয়া পাবলিক। সহধর্মিনীদের না বলিয়া কোন কাজ করিলে রাখাল বালকের দশা হয়। তখন পালে বাঘ পড়লেও নট নড়ন চড়ন।

সে যাই হোক, মোদ্দা কথা হল কাঁওয়ার আর কাঁওয়ারি! এ কিন্তু উচ্চারণের ফেরে কাওয়ারি হয়ে যাওয়া নয়। কাওয়ারি আপনার বাড়ির আবর্জনা কিনে নেয়। আর কাঁওয়ারি তার মনের আবর্জনা কৃচ্ছসাধনের মাধ্যমে বইয়ে দেয় গঙ্গার জলে। তা সে যাই হোক শাওন মানেই কাঁওয়ারি মরসুম শাওন মানেই কাঁওয়ার কাঁধে পথ চলার ধুম। কিন্তু সেটা তো নতুন কিছু নয়। নতুন হল তার ইনস্টিটিউশনালাইজড প্রফেশনালাইজেশন বা সংস্থাগত ব্যবসায়িকরণ।

সারা পৃথিবীর উত্তর ভারতীয় রাজনীতিবিদরা কাঁওয়ারিদের যাতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা না হয় তাই জাতীয় সড়ক পথের ধারে ধারে “নমস্কার ডানদিকে” মার্কা পোস্টার লাগিয়ে ঘাঁটি বানিয়ে দিয়েছেন।
নমস্কার ডানদিকে জানেন না? গাইড ফিল্মের দেব সাহাবকে মনে আছে? মুখ ঢেকে যায় নমস্কারে, তা দেব সাহাবের মুখ বিমুখ হলে তো চলবে না! তিনি তো আর মনোজ কুমার নয় যে হাত ঢেকে মুখের ডায়লগের চব্বিশ শতাংশ ইনফ্লেশনের ঘুর্ণিতে হারিয়ে দেবেন। তাই তিনি আবিষ্কার করলেন “নমস্কার ডানদিকে” মানে নমস্কার করবেন কিন্তু ডান দিকে, যাতে মুখ দেখা যায়। আর কি সেই মান্ধাতা আমল থেকে আজকালকার রাজনেতারাও শিখে গেছে সেই ট্রিক। মোদী বাবু অবশ্য সবেতেই নতুন পথের দিশারী! তিনি আবার বাহু মূলে হাওয়া লাগিয়ে মাথার উপরে ঘোরা ফেরা করা মশা মারেন পট পট।

সে যাই হোক, সেই সব রাজনেতারা বিভিন্ন রাজনৈতিক রঙে রাঙিয়ে (সংখ্যাগরিষ্ঠ যে কে তা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না) যে সব বিশ্রাম স্থল করে দিয়েছেন তার তারস্বরে চোঙা লাগিয়ে চিল্লিয়ে বাজি মাত করছেন। তবে গানগুলো সবই ভক্তিগীতি! মানে চলতি হিন্দি গানের নকলনবিশি। বর্তমানে হিন্দিগানের বাজারটার কথা পাঠক পাঠিকারা ভালই জানেন। যে গুলো এখন মুম্বইয়ের কারখানা থেকে বেরোচ্ছে সেগুলো হিন্দি গানা না ইংরাজি গান তা তারাই ভাল বলতে পারবেন। অবশ্য জনগণ যদি বারুদ মুখে নিয়ে বসে থাকে তাহলে আর মুখ পুড়িয়ে পকেট ভরালে তাদেরই বা দোষ দিই কেমনে বলুন! অতএব সুদীর্ঘ তিন কিলোমিটার জুড়ে কানের দফা রফা থেকে বাঁচাচ্ছি কিভাবে তা ভগাই জানেন।

অবশ্য শুনতে সক্ষম না হলেও চোখের ব্যায়াম মন্দ হচ্ছে না। কাঁওয়ারিরা সব দলীয় জার্সি গায়ে ভজন সাধন করছেন। কারুর জার্সিতে সামরিক ছোঁয়া আবার কারুর জার্সির রং কমলালেবুর কোয়া। বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে শিবের খোঁয়ারি একেবারে শিকেয় উঠেছেন। মাথা গরম হবে তারপর জল ঢেলে ঠাণ্ডা করতে হবে! এতে আর নতুন কি! সেই ছেলেবেলায় দেখা পরেশনাথের প্রশেশন! আহা চমকিলা ভড়কিলা আলোর মালায় গরু ঘোড়া যন্ত্রচালিত কাঁওয়ারদের গাড়ি পেরিয়ে যেতে যেতে বেলা বয়ে চলে যাচ্ছে বটে। কিন্তু মজা মন্দ লাগে না। খাবি যদি হাওয়া খাবি ঢেঁকুর তুলবি কেমনে! আহা রাজনীতি আর ধর্মের নামে যে টাকা ছড়ানো হয় তা যদি শিক্ষা ও স্বাস্থে ছড়ানো যেত, তাহলে ভারতের উন্নতির পথটাই আজকের দিনে মসৃণ হয়ে যেত, বাজার অর্থনীতি আর বিদেশী বিনিয়োগকে হেঁচকি তোলানো গাল পেড়ে খামোখা আমাদের জিন্দেগী খারাব হতো না।

তা সে যাক গে গিয়া। এসব ফালতু ব্যাপারে চিন্তা করে করব কি বলুন, বোকো হারেম আর গাজাতেই তো মন মজে পড়ে আছে। বিদেশ কথাটার মধ্যেই তো দেশ লুকিয়ে! বিশ্বনাগরিক হয়ে সেখানেই মন্তব্যের বন্যা বইয়ে দিই না হয়! পোড়ার দেশের একটু মুখ পুড়লে আর ক্ষতি কি? তেলা মাথায় তেল দিলে বিশেষ ফারাক তো আর হয় না!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ হামাস আর ইজরায়েলের কাটাকুটি খেলায় গাজার যে সব নিরীহ শিশুগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে তাদের জন্য দু ফোঁটা জলও ফেলতে পারছি না! কি জানি আমিও যদি ফেসবুক সমাজতাত্ত্বিক হয়ে গিয়ে নিজের দায়িত্ব ভুলে যাই! তবু এই হানাহানি বন্ধ হোক এই প্রার্থনা করি! কাঁওয়ার বাবুরা যদি কেউ গিয়ে হরিদ্বারে এমন কিছু চায়? আহা নিজের জন্য না চাইলে কিন্তু তৃতীয় নয়ন খোলেন তিনি! চাহিদা পূরণ হতেও সময় লাগে না! বিশ্বাসে মিলায় বস্তু ফিসফাসে বহুদূর…

(১০৪)


জাকির হুসেনের জন্মের পরে পরেই আল্লারাখা উস্তাদ তার কানে তবলার বোল তুলে দিয়েছিলেন। আমার কানে ক্যানেস্তারা কে বাজায়েছিল গা? গলাখানা যা বাজখাই হল। ছেলে বেলা থেকেই গান আমার কান মন প্রাণ তৈরী করে দিয়েছিল। খুব ছোটবেলায় বাবা মা রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে বসত। আর আমি বসতাম ল্যাক্টোজেনের কৌটো নিয়ে- ধা ধিন ধিনতা না তিন তিনতা!

তারপর ভাগীরথী দিয়ে জল গড়িয়েছে কত। আমার কানও গুপ্ত মৌর্য স্বর্ণযুগ পেরিয়ে পৌঁছেছে জীবনমুখীর ঘাটে- হেমন্ত না সুমন, সুমন না হেমন্ত? সুরের আকাশে তখন রঙমশাল। নীল দিগন্তে ম্যাজিক। বাংলা গান ভাঙছে গড়ছে গড়ছে ভাঙছে। স্বপ্ন দেখছে সবাই স্বপ্নে দেখছে গানে গানে, বন্ধন যাক টুটে।

উনিশশো একানব্বই। রবীন্দ্রনাথ কি ছাড়া পেলেন? না লক্ষ্মীছাড়া শ্রী ছাঁদে ধরা রইলেন! বারন্দায় রোদ্দুর ছায়া ঘনায় বনে বনে। মিঠে কড়া পরীক্ষা নিরীক্ষা বেয়ে বাংলা গান গলা ছাড়ছে তখন। ছাড়ছি আমিও। ‘আমার প্রতিবাদের ভাষা দ্বিগুণ জ্বলে’- চোখ জ্বলে বুক জ্বলে- নিঃশ্বাস নেব কিসে? কেনো গানের শিস আর ধানের শীষ মাখা মাখি হয়ে গেল গলা দিয়ে নেমে আসে সুর অসুর।

তখন আমিও গাইছি, ‘পুকারতা চলা হুঁ ম্যায়’ গঙ্গার ধারে ‘প্যাহলি পেয়ার কি খুশবু’, ‘তুমি রবে নীরবে’ ‘আজি বিজন ঘরে’! আমি গাইছি, ইউনিভার্সিটি ইন্সটিউটে, ‘হেই সামালো ধান গো’ গলার বাড়ছে ধার, কাস্তেয় পড়ছে শান! আমি গাইছি, ‘হৃদমাঝারে রাখব, ছেড়ে দেব না’। কলামন্দিরে শুনছি, ‘গান তুমি হও গরমকালের সন্ধ্যেবেলার হাওয়া’, ‘পেটকাটি চাঁদিয়াল’, ‘গানওলা- আমার আর কিচ্ছু করার নেই’! সারা রাত জেগে জেগে শুনছি ধূসর নীলাভ এক তারার গল্প। শুনছি ‘নীলাঞ্জনা’ শুনছি ‘আকাশমুখী সারি সারি পাশাপাশি বাক্সবাড়ি’!

গান ছড়াচ্ছে তখন, গোকুলে বাড়ছে ব্যান্ড, আমি হারাচ্ছি, আমি হারাচ্ছি জীবিকার ভিড়ে। গান ভালবেসে গান! দেখে যা কি সুখে বেচেছি গান! শহর পাল্টাচ্ছে পাল্টাচ্ছে সময়, গান পাল্টাচ্ছে পাল্টাচ্ছে সুর- অসুর। রবি বারোয়ারী হলেন। মুক্তির আনন্দে লাগাম ছাড়া পাগলপারা রবি আমার। হেমন্ত, মান্না, শ্যামল, তরুণ মানবেন্দ্র- সব আসছে এদিক ওদিক দিয়ে। সুমন যেন কমে গেছে বাজারে? মেটেরিয়া মেডিকার কাব্য? ব্যান্ডে হাত ব্যান্ডেজ ভূত ধরতে পারছি না আর। ডুবে যাচ্ছি, অন্য শহরের প্রেমে ডুবে যাচ্ছি। গান? সে তো মোবাইল আর এফ এম-এ। নতুন কি হচ্ছে নতুন কি হচ্ছে? হাতড়াচ্ছি শুধু অন্ধকারে।

দু হাজার ছয়, একরাশ তাজা হাওয়া নিয়ে এল সে! বাংলা গান তো বদলে গেছে গো! শোন না কি কি হচ্ছে। ধীরে ধীরে আপ টু ডেট হচ্ছি। জ্ঞান বাড়ছে, শিখছি কত কিছু। ব্লুজ, জ্যাজ, কান্ট্রি মিউজিকে কান পাকাচ্ছি, মন পাকাচ্ছি। কলমে কবিতা গলায় গান। নতুন লেখা ভাষা কথা সুর মিলে মনন তৈরী হচ্ছে আমার মধ্য যৌবন পেরনো মনন। ভাঙছে গড়ছে সময় ভাঙছে গড়ছে জীবন ভাঙছে গড়ছে গান। বাংলা গান বাড়াচ্ছে রাস্তা। পথ খুঁজে কোন পথে গেল গান। জীবনে নতুন গান, গানে গানে গড়ছে জীবন। নতুন তারকারা গানের জগত আলো করে উজলে উঠেছে। ঢেউ উঠেছে কারা টুটেছে। তারপর? তার পর আর কি তার ছিঁড়ে গেল কবে, একদিন কোন হাহারবে… শুধু রয়ে গেল তার স্মৃতি! ল্যাপটপ ভর্তি গান! ছবি আর গান নিয়েই রয়ে গেল সে আমার ভাই আমার সহোদর আমার নবীন সঙ্গীতশিক্ষক। ‘মেঘ জমে আছে মন কোণে’ ‘বৃষ্টি বিদায়’ আর ‘বরষণ মন্দ্রিত অন্ধকারে’- যখন আলো নিভে যায় তখন ল্যাপটপটা খুলে বসি, জমে থাকা গান জমে রাখা জল ধীরে ধীরে বেরিয়ে যায়। জমতে থাকে মনে, প্রাণে বসন্ত বাতাসটুকুর মতো। চলে গেছে সে মাস সাতেক। বাঁধনহীন হয়ে গান শুনিয়ে গেছে সে। কান দিয়ে প্রাণ দিয়ে গান দিয়ে গেছে সে। আমার ভাই… আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা। প্রজন্ম প্রজন্ম গান আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা।

“গান তুমি হও আমার মেয়ের ঘুমিয়ে পড়া মুখ
তাকিয়ে থাকি- এটাই আমার বেঁচে থাকার সুখ…”
—-
(আদরের নৌকায় প্রকাশিত)

(১০৩)


আরে কি বলছেন? অর্কুট সেপ্টেম্বরে বিদায় নেবে? তো আমি কি করব? সে তো আমিও পনেরো বছর আগে নিজের শহরের পাট চুকিয়ে বিচ্ছিন্ন উপদ্বীপে এসে বসবাস করতে শুরু করলাম। তো আমি কি আর আমি নেই? ওহ ওই সব অর্কুট ফর্কুট অনেক দেখেছেন? শুনুন মহায় একটা সিধা কথা বলে রাখি, অর্কুট ছিল বলে এই যে আমার মতো নিজখ্যাত (নিজের কাছেই খ্যাত আর কি) লোকের গোদা অক্ষরে বাংলা লেখা আপনি ভাগ্যি করে পড়তে পারছেন।

সে সেই দু হাজার পাঁচ টাঁচ হবে, ওয়ানটুথ্রিইণ্ডিয়া, ইন্ডিয়াটাইমস পেরিয়ে এলাম গুগলের দরবারে। আরে কোন এক অর্কূট বুন্দিকুটকুটি না কে তার গার্লফ্রেন্ডকে খুঁজে পেয়েছে বলে গুগলকে এই চিন্তাভাবনাটা বেচে দিয়েছে। তা বেশ করেছে, আমার তো আর গার্লফ্রেন্ড হারায় নি যে তাকে নিশ্চিন্দিপুরে নোটিশ পাঠাতে হবে? তাইলে? তাইলে আর কি? বিদেশ বিভূঁইতে রাবণ বর্জিতভাবে বসে আচি একটু বন্দু টোন্দু হলে মন্দ হয় না? তা বেশ কথা দিল্লিতে বাঙালীদের মাছ খাবার আড্ডা থেকে শুরু করলাম অর্কূট যাত্রা। তা সে লেখা টেখা তখন কোথায়? তখন তো খালি আড্ডা আর মিট আর ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্প শহর কাঁপিয়ে সমাজচর্চা। নোবেল পাবই পাবো!

যে ছেলেটা সেই রাজ্যপাটের মালিক ছিল (সবাই রাজার দেশে একলা রাজা হয় না, মালিক হয়) তার অদ্ভুতভাবে রোহণের সঙ্গে মৌখিক মিল। কিন্তু কাজে কম্মে তো সে রোহণ নয়, তাই ভাঙা গড়ার ভিতর দিয়েই এগিয়ে চলতে চলতে হঠাৎ একটা ছেঁদো কবিতা লিকে ফেললাম! তা বাঙালী মাত্রেই ছেঁদো কবিতা লিখে নিজেকে জীবনানন্দের প্রপৌত্র হিসাবে দাবী করে, আর আমি পনেরো বছর দিল্লিতে থেকে আর বাঙালী নেই। কিন্তু কবিতাতে যে ফুটো হয়ে যায়, চল ভাই গল্প লিখি। এমন গল্প কেউ কোত্থাও লেখে নি। যে গল্প লিখলে কুড়ি বছর পরে আনন্দ পুরষ্কার একদম বাঁধা।

তাই ভাই এমন গল্প লিখব কোথায়? আরে কূট আছে না? অর্থাৎ কূট সাহিত্য? আরে মশাই হাতে লেখার হাতে খড়ি সেখানেই। ছিলও বটে লোকজন, একটু আন্টু বান্টু লেখা লিখলেই জেজে ট্যাগ ঝুলিয়ে দিত। ওহ জেজে জানেন না? ঝুলস্য ঝুল মহায়! তা মহায় দশটা লেখার মধ্যে নটা জেজে হলে একখান তো কুলস্য কুল হবে না কি? ধামাধরা পাঠক সমালোচকরা যে নাকে চশমা এঁটে বসে আছে। তো চালাও পানসি উত্তমাশা অন্তরীপ।

বাংলালাইভ ছুঁয়ে এদিক ওদিক হয়ে ফিসফাস। আরে মশায় শুধু অনলাইন সাহিত্য চচ্চা কল্লেই চলবে? কে তুমি শিবাজী বাওয়া খোমা দেখাইবে নি?
চলল গেট টুগেদারের পালা! আহা, এই তো সেই, মামণি টাইপের মেয়েগুলো হ্যাণ্ডসাম ছেলে দেখে চিল্লিয়ে ওঠে আর ছেলেগুলো মহা খচ্চর। মিটিমিটে চাউনি দিয়ে তারিয়ে তারিয়ে চাখতে থাকে, পদ্যভরা চোখে গদ্যভরা চাখা। কিন্তু দাদা ম্যাগাজিনও তো প্রকাশ করে ফেললাম। করব কি? আরে করবে কি? গান পারলে গান কর কবিতায় কবিতা যদি পিয়ানো বা টেবিল টেনিস পারো তাহলে বাপু সে নিজের বাড়িতে কর।

এরপর এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, আরে বাবা ফেসবুক না কি একটা আছে না? তার সঙ্গে নাকি অর্কুট টিকে উঠছে না। তা উঠছে না তো বেশ করছে। ফেসবুক যত অহমসর্বস্ব স্বার্থপরদের জায়গা। আড্ডা মারতে হলে অর্কুট। ফেসবুক হল ফ্ল্যাটবাড়ি যেখানে গ্রুপ বা পেজ খুলে তিন মিনিটের ফেম হয়, প্রেম হয় না। অর্কূট হল আমার দালানবাড়ি, মুড়ি চানাচুর লেবু চা সহযোগে বিন্দাস আড্ডা। সেখানে পাঁচটা ঘর সব সময় ওপর তলায় থাকে। ফেসবুকের মত গড়গড়িয়ে লিফট চড়ে নেমে পড়ে না। কালকের সুগন্ধি বেলফুলের ছোঁয়া আজকেও থেকে যায়। কিন্তু করবটা কি, যত কাণ্ড কাঠমাণ্ডুতেই, পেলিং জলঢাকায় কেউ আর আসে না। এমন দিন এল, ব্রাউজারে অর্কুটকে উপরে রাখার জন্য অর্কূটেই বার চারেক ফালতুকা ক্লিক মেরে চলে আসতাম।

কিন্তু কর্তার ইচ্ছায় কর্ম আর আপনি বাঁচাই ধর্ম। আমিও চামড়া পালটে স্বার্থপর হয়ে গেলাম। গুগল প্লাসেও হয় না। ফেসবুকের মধ্যে নিজ গণ্ডিতেই আটক, নতুন পরিচিতি, প্রেম পথ চলা। তারপর দেখি ও মা, অর্কূটের সুবীরদা, বাসুদা, হরিদা, সুসদি, রাজা, নেপু, সোমা, কোহলি, ইন্দ্রাণী, পিউ, পুপুল, সঞ্জয়, লেলো, বক্সি, শুদ্ধ, পাহাড়ি পানুদের সঙ্গে আরও অনেকে জুটে গেছে। আহা ঘর দিয়ে কি আর মানুষ গড়া যায়? মানুষ যেখানে যায় সেটাই তো আমার ঘর! আমি বিশ্বনাগরিক।

তাই আর কি, একটা রজনীগন্ধার মালা লটকে দিয়ে জমা রাখা পোস্ট, ছবি টবি সব ডাউনলোড করে ফেসবুকের পর্দায় মুখ দেখাতে থাকি। তবে কি না দিনগুলো বেশ ভাল ছিল গা? মানে আমি সবসময় এক পয়সার চাল আর পেলে মারাদোনা না করলেও অর্কূটটা ভোকাট্টা হবার সময় বুকের বাঁদিকে একটু গিটারের গৎ বাজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। ফেসবুক পরিচিতি বাড়ায় কিন্তু অর্কূট তো পরিবার বাড়িয়েছিল। যার জোরে এখনও এখানে টিকে আছি, দ্বিতীয়-তৃতীয়- চতুর্থ পরিবার।

“যদি পুরাতন প্রেম ঢাকা পড়ে যায়…
তবু…………”

(১০২)

‘বন্ধু বিনে প্রাণ বাঁচে না
আমি রব না রব না গৃহে…’

বন্ধু কারে কয়? কারুর পেটে সয় কারুর পিঠে সয়। এসব ডেফিনেশন সংজ্ঞার মধ্যে না গিয়ে বরং আমরা গল্পের মধ্যে ঢুকে চলে যাই। নগর কলকাতা ছেড়েছি সেই কবে রামচন্দ্রের আমলে। কিন্তু বার বার ফিরে ফিরে যাই। খুঁটে নিই তিল তিল করে পড়ে থাকা ভালোলাগা ভালোবাসাগুলো। আর একটা উদ্দেশ্য থাকে বন্ধুবাসন। কোন মতে সবাই মিলে একত্রিত হতে পারলেই হল। দেশ কাল স্থান পাত্র ভুলে মহোল্লাসে মোচ্ছব।

আমার স্কুলের বন্ধুদের একটা খাসবুনোট গ্রুপ আছে যা ইণ্ডিয়াটাইমস চ্যাট আউটলুক অর্কুট পেরিয়ে এসে ফেসবুকে বহাল তবিয়তে বাসা বেঁধেছে। ফি বছর আমরা কোন না কোন অছিলায় একত্রিত হই আর বাজার খুলে বসে মিস্ত্রি মালিক খরিদ্দারের নামগান করে কলতানে মুখরিত করে তুলি আকাশ বাতাস। আমি কেমন করে জানি না বড় গেট টুগেদারগুলো ফসকে যাই প্রতিবার। তাই আমার জন্য পড়ে থাকে ছড়ানো ছিটানো। সত্তর আশির জায়গায় বড় জোর দশ পনের। তাই ইনস্টলমেন্টে আমার স্কুলজীবন বেরানো সমাধা হয়।

এবারো অন্যথা নয়। বার তিনেকের প্রচেষ্টার পরেও ফাঁক থেকে যায়। তাই বাকিটা ফেসবুকের ‘রামা হৈ’ দিয়ে ভুলিয়ে থাকা। যারা বহুদিন ধরে দূরে তাদেরও লস্যি টস্যি খাওয়া হয়ে যায়। তা এসব থেকেই গল্প উঠে আসে আর আমি সুবিধাবাদী ফিসফাস শিকারী, সেখান থেকেই তুলে নিই খান দুই তিন যা থাকে কপালে।

এক সদ্য চশমালব্ধ বন্ধু ক্লাস নাইনে পড়ার সময় ক্রিকেটে সহজতম ক্যাচ ফেলে অজুহাত দিয়ে ফেলে, ‘বুঝলি তো আসলে, চশমাটা অপটিকাল আর বলটা স্ফেরিকাল! তাই ম্যাচ না করতে পেরে ক্যাচ ফেলে দিয়েছি!’ সব কিছুই ঘুরে ফিরে আসে।

বললে বিশ্বাস করবেন না। আমিও প্রাকযৌবনকালে খুব মনোযোগ দিয়ে মাঠচর্চা করেছিলাম। একটু আধটু হাত ঘোরানো আর ব্যাট হাঁকড়ানো। তাই দিয়ে ফার্স্ট ডিভিশনটা হয়ে গেছিল বটে কিন্তু জীবনের যুদ্ধে ফেল না করে ফেলি বলে অন্য কিছু আঁকড়ে ধরেছিলাম। তবে কি না জানেন তো যা থাকার তা থাকে যা। যাবার তা যায়। খেলা থেকে চলে গেলেও খেলা আমায় ছাড়ে নি। দিল্লিতেও এই সেদিন পর্যন্তও ছিল গায়ের সঙ্গে লেগে। হাঁটু ঘুরিয়ে ব্যাণ্ডেজ ভূত হয়ে যাবার পরেও। তাই মাঠের বন্ধুদের সঙ্গেও ভরা বিশ্বকাপের বাজারে ঝিঁ ঝিঁ চর্চা করে গালবাদ্য বাজাই। আর নেটতুতো সাহিত্যতুতো বন্ধুরা তো আছেই। তারা আবার ডেকে রান্না করে খাওয়ায় আর বাইক করে বাড়িতেও পৌঁছে দিয়ে যায়।

কিন্তু বন্ধুত্বের একটি সুন্দরতম নিদর্শন আমার আশেপাশেই ঘোরাফেরা করছে গত বছর দুই ধরে। আমি দেখে দেখে আশ্চর্য হই। আজ মনে হল আপনাদেরও দেখানো দরকার। আসলে ভাল জিনিস একা খাই কি করে বলুন। হাজার হোক ফিসফাসের পাঠকপাঠিকারাও তো আমার পরিবার- আমার দ্বিতীয় বা তৃতীয় পরিবার।

আমার ছেলের একদম ছোট্টবেলার একটা বন্ধু ছিল। তার নাম ছিল রাজা। তখন থাকতাম দিল্লির আশ্রম বলে একটি জায়গায়। এটা নিয়ে একটা গল্পও আছে- মানে ওই আশ্রম নিয়ে। দুহাজার দুই নাগাদ ট্রেনে করে কোলকাতায় আসছি (এখন হলে বলতাম কোলকাতা যাচ্ছি! কিন্তু তখনও কোলকাতায় যাওয়াটা ‘আসছি’ই ছিল!) একা, একদল বয়স্ক লোকজন সহযাত্রী। একজন জিজ্ঞাসা করলেন, “কোথায় থাক বাছা!” “আশ্রম” শুনে চিন্তিত হয়ে পড়লেন তাঁরা- এত কম বয়সেই আশ্রমে? আহা! তা তাঁদের ধারণা বদলাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। সে যাক ফিরে আসি ছেলের কথায়। তা গাজীয়াবাদে চলে আসার পরে তারাও ফরিদাবাদের কোথায় যেন চলে যায়। খুঁজে পেতেও পাওয়া যায় নি। ছেলে আমার দুঃখজাগানিয়া- বলে না কিছুই। কিন্তু বন্ধুত্বের জন্য জান দিতে তৈরী থাকে।

ওর প্রাণের এক সহপাঠী হঠাৎ বাবার বদলির সূত্রে ত্রিবান্দম চলে গেল না বলেই। বেজেছিল তার বুকে। তাই বন্ধুত্বের খাতিরে নিঃস্বার্থ কাঙালপনা। বছর খানেক আগে আমার আদি শ্বশুরবাড়ি জামশেদপুরে যখন এসেছিলাম তখন আলাপ হয়েছিল তার বিট্টুর সঙ্গে। বিট্টুর গল্পটা আর পাঁচজনের থেকে আলাদা। ছেলেটা শুধুমাত্র পড়াশুনো করবে বলে বাবা মাকে ছেড়ে আমার শ্বশুরবাড়িতে থেকে গেছে। ক্লাস সেভেনে পড়তে পড়তেই সামান্য আয়োজন দিয়ে টর্চ বানিয়ে ফেলে।

এমনিতে হয়তো বলা উচিত নয়, তবে উদ্ভাবন আমার ছেলেরও মধ্যনাম। তাই আমে দুধে বেশ মিশে গেছিল তখন। ফোন বা হাতে লেখা চিঠিতেও যোগাযোগ ছিল ওদের। গতকাল এসে পৌঁছেছি জামশেদপুরে। আর গতকাল থেকেই জোড়া হেডলাইট আমাদের আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দুই বন্ধুকে আলাদাই করা যাচ্ছে না। আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে।

তার উপর গতকাল নিকটবর্তী এক মেলায় দুজনে মিলে আমায় নিয়ে গেল। মেরিগোরাউন্ড আর জায়েন্ট ঢেঁকির মধ্যে বসে আমিও ফিরে গেলাম শৈশবে। সেই সুভাষমেলা আর চড়কের মেলা। সেই ঝুলন্ত ঘুর্ণি, সেই চাঁদমারি করে মোমবাতির আগুন নেভানো। ছেলেবেলাগুলো বড় ভাল হয় হে কত্তা। বুড়ির মাথার পাকাচুল আর আলো ঝলমলে লাট্টু, প্যারাসুট আর পপকর্ন- আহা মাল্টিপ্লেক্সের এসিসম্বলিত সজ্জাও ম্লান হয়ে যায় এর নির্মলতার কাছে। কালকে সাময়িক বিচ্ছেদের সময় পরও যার রেশ থেকে যাবে নতুন কোন স্মৃতি, নতুন কোন অঙ্গীকারের মাধ্যমে। সুন্দর থাকুক ওরা।

ছেলের কথা যখন এল তখন মেয়েও না হয় একটু থাকুক। আজকাল বাপের কান তার বড়ই পছন্দের হয়েছে। আর কে না জানে বাপ, কান টানলে মাথা আসে। আরে বস ছেলে মেয়ে পার্শ্ববর্তিনীদের জন্য তো জান হাজির। প্রকৃত বন্ধুদের জন্যও।

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ বন্ধুত্বের ডাকনামের এক একটা ইতিহাস থাকে। আমাদেরই এক বন্ধু ছানাকে নিয়ে গল্প করছিল! ‘ছানা’ আমাদের ক্লাসমেট কি ভাবে ছানা হল নাম সেটা আন্দাজই করে নিন। কিন্তু ডাকনাম আবার মাঝেমাঝে আসল নামের থেকে ভয়ঙ্কর হয়ে দাঁড়ায়। মুছে দেয় অন্য পরিচিতি। ‘পেলে’ বা ‘নেতাজী’ বা ‘বাপুজী’ মনে করুন। তা আমাদের সেই বন্ধু কোন এক রাস্তায় ট্যাক্সিসফর করার সময় রেডলাইটে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ‘ছানা’কে দেখতে পায় অল্প বয়সী একটি মেয়ের সঙ্গে রাস্তা পার হতে। সে এখন অবস্থার গুরুত্ব বুঝেও আসল নামটা কিছুতেই মনে না করতে পেরে ডেকে ওঠে, ‘ছানা! এই ছানা!’ স্বাভাবিকভাবেই প্রেস্টিজের পুলটিশ বাঁচাবার জন্য ছানা আড়চোখে দেখেও দেখে না। কিন্তু বিপদ বাড়ে, যখন আমাদের খোট্টা ট্যাক্সি চালকটিও পরোপকারের চক্করে ট্যাক্সি থেকে নেমে বিশুদ্ধ বিহারী বাংলায় কঁকিয়ে ওঠে- ‘ছেনা! আরে ও ছেনা বাবু!’ প্রেস্টিজ তখন বোধহয় নিজের লেবেল মুছে ফেলে মাটিতে মিশে যেতে পারলেই বাঁচে।

পরে কে কাকে কি বলেছিল সে নিয়ে আর কিছু বলছি না। তবে মেয়েটি ছানার একদম নিজের রেজিস্টার্ড শালী ছিল বটেক। তার নির্ভেজাল চরিত্র- পাঠকপাঠিকারা অন্য কিছু ভেবে না বসে বরং দুটো সন্দেশ খেয়ে জল খান। ছানার সন্দেশ হলেই সবথেকে ভাল। পেট ঠাণ্ডা থাকবে!

(১০১)


আলটিমেটলি নেহি নেহি করতে করতে মৌসুমী বায়ু প্রবেশ করেই ফেলল বলুন? তার উপর ছুটি কাটাতে কোলকাতায় বসে বসে মৌসুমী আকাশের স্মৃতিমেদুরতা, ইলশেগুঁড়ির চাদর, তাপমাত্রার হালকা ভাব, ছাতায় ছাতা মহানগরের রংহীন সৌন্দর্য্য, আর সবুজ সবুজ আর সবুজ। সব মিলিয়ে গত শতাব্দীর দিনগুলোতে ফিরে যাচ্ছি যেন। সেই কোন সুদূর কালে আমিও তো এই শহরেরই ছিলাম। আজ রোমিং-এর বাসিন্দা হবার পরেও এখনো টান খুঁজে ফিরে ফিরে আসি।

রোমিং বলতে মনে পড়ল, আমার ফোনটি গিয়াছে। মানে গিয়াছিল… আজকের হাইটেক যুগে সবই তো ফিরে আসে নতুন রূপে নতুন বেশে। তবুও প্রথমবার যখন বিদায় নেয় তখন বুকের নীচে একটা ছ্যাঁত করে আওয়াজ তো হয়ই।

শহরে এখন নতুন ট্যাক্সি, নো রিফিউজাল। হাজার খানেক নো রিফিউজাল ট্যাক্সি বাজারে ছাড়া হয়েছে, যার লাইসেন্স ফি মকুব করে দেওয়া হয়েছে। তার মানে আর বাকি হলুদ রঙ-এর বা হলুদ কালো কচ্ছপগুলো সারা শহর জুড়ে ঘুরে বেরায় যার সংখ্যা হাজার তিরিশেক সেগুলো কি রিফিউজ করার লাইসেন্সপ্রাপ্ত? ট্যাক্সি মানেই কি নো রিফিউজাল হওয়া উচিত নয়? কলেজে পরার সময় এক স্টুডেন্ট লীডারকে প্রশ্ন করেছিলাম, “এই যে তুই যে সব কাজগুলো ইউনিয়ন করেছে বলে গলা ফাটাচ্ছিস, সে কাজগুলো করাই কি ইউনিয়নের কাজ নয়? তাহলে আলাদা করে মাইলেজ নিচ্ছিস কেন?” সেদিনও উত্তর ছিল না আজও নেই।

যাই হোক, এবার নগর কোলকাতায় আমি দুইখান জিনিস ট্যাক্সির বুকে হারিয়ে এসেছি। একটি আমার পিতৃদেবের প্রাচীন প্রবাদের মতো মিশকালো ছাতা যেটি সল্টলেক সিটি সেন্টার যাবার পথে ট্যাক্সিতে ফেলে বেরিয়ে এসেই ফের ধাওয়া করে ধরতে গিয়ে দেখলাম সব ট্যাক্সিকেই এক রকম লাগছে। আর অপরটি আমার মোবাইল। সখ করে আমার পার্শ্ববর্তিনীর দেওয়া চলমান মুঠোফোনটিকে হঠাৎ বৃষ্টিতে মেয়েকে ছাতায় মুড়ে নিয়ে আসতে গিয়ে ট্যাক্সিতে ফেলে চলে এলাম গত সোমবার। তারপর অ্যান্টি থেফট সিস্টেম চালু করেও সারা দিল না সে। সব শুনে আমার এক বন্ধু বলল কাল, “এই জন্যই তো বিল নেওয়া উচিত ট্যাক্সি থেকে!” হ্যাঁ, যেন আগে থেকে জেনে বসে আছি তো যে ‘এই সেই ট্যাক্সি যেখানে আমি আমার মোবাইল হারাবো!’ (ভার্জিন মোবাইল বলে একটা মোবাইল পরিষেবা ছিল না?)

যাই হোক, সকাল হতেই কাগজপত্র গোছাগুছি করে চললাম স্থানীয় থানায়। যে থানায় সেই পনেরো বছরেরও বেশী আগে গেছিলাম চাকুরীর শুরুর ভেরিফিকেশনের ফিকিরে। এতদিন পরেও বাহ্যিক রূপ থানাটার পালটায় নি। সঙ্গে ছেলে ছিল, সে এখন কদিন ধরে ফেলুদা পড়ছে। থানায় ঢুকে বেশ একটা রহস্য রোমাঞ্চ অনুভব করতে শুরু করল। আমায় ফিসফিস করে বললও, “লাইফে ফার্ষ্ট টাইম থানায় ঢুকেছি”।

তা ছোটবাবু আমায় স্বভাবমতো চাটতে শুরু করলেন। “মোবাইল হারিয়েছেন? কাগজপত্র এনেছেন?” এও সেই ট্যাক্সির বিলের মতো কথা বলে রে! আরে মশাই আমি শহরে এসেছি কি মোবাইল হারাব ধরে? “না আমাদের উপর নির্দেশ আছে!” নাছোড়বান্দা তিনি, আমিও। মেজবাবুকে ধরে বোঝাতে, সে তরুণ তুর্কী বুঝে গেল। আমি তাকে বললামও আপনাকে মোবাইল খুঁজে দিতে হবে না। খোঁজার হলে সে আপনিই আমায় মেল করবে। (অ্যান্টি থেফট প্রযুক্তি বলে কথা) শুধু ডাইরি করে নম্বরটা দিন আমার সিমকার্ডটা উদ্ধার করি। অতঃপর দ্রুতই পুলিশের ছাপমারা কাগজ নিয়ে ছুট লাগালাম ম গা রোডের এয়ারটেল পরিষেবা কেন্দ্রের পানে।

ভাস্কর বলে একটি খুব মিষ্টি ছেলে আমায় অনেক হ্যাঁচড় প্যাঁচড় করে বলল যে, পার্ক স্ট্রীটের পরিষেবা কেন্দ্রে দিল্লির পোস্টপেড সিম কার্ড আছে। পার্ক স্ট্রীটের কাছেই তো ভারতীয় যাদুঘর!

গেলাম- পরিচয় পত্র, ঠিকানা, ছবি সব নিয়ে বাবু কহিলেন, ‘বুঝেছ উপেন, আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে তোমার ফোন চ্যাঁ ভ্যাঁ করতে শুরু করবে। সিমকার্ডটি পকেটে পুড়ে গেলাম ছেলে বগলে লালবাজার। তুমুল বৃষ্টির মধ্যে গাবা মোবাইল স্টোরের ভুজুং ভাজুং পেরিয়ে একই মোবাইল বগলদাবা করে বাড়ি ফিরলাম। ধীরে ধীরে নম্বরগুলো গুগল মেঘ থেকে উদ্ধার করা গেল। ফোন ছুটতে শুরু করল ইতিউতি, “এটা নতুন নম্বর?” “ওমা সিম হারিয়ে গেলে তো নতুন নম্বরই হয়!” না না নতুন সিমে পুরনো নম্বর পুনরুদ্ধার করা হয়! “যাঃ তা হয় নাকি?” ইত্যাদি এবং প্রভৃতি।

দুদিন এদিক ওদিক কাজে অকাজে কেটে গেল! কাঙ্ক্ষিত সময় আর আসেই না। যতবারই মোবাইল খুলি, “পরিষেবায় অনুপস্থিত”-এর পোঁ বেজেই চলে। শেষে বাহাত্তর ঘণ্টার মাথায় আবার ফিরে গেলাম ম গা রোডের কেন্দ্রে।

ভাস্কর খুব মাই ডিয়ার ছেলে। সঙ্গে সঙ্গে নিজের ল্যাপটপ খুলে দেখিয়ে দিল যে আপনার আবেদন না মঞ্জুর হইয়াছে। আপনার ঠিকানার প্রমাণ পত্র পঠনযোগ্য নয়। আহা এই কথাটি আমাকে আগে জানালে না বাবা? উচিত হয় নি! আমি তাকে বোঝাতে বসলাম- আমার তো পোস্টপেড। ঠিকানা নিয়ে কি করবে বাবা। পরিচয় নিশ্চিত কর! আমিই সেই ব্যক্তি কি না! যে হারানো নম্বরটি ব্যবহার করে! ছেলেটি বুদ্ধিমান চট করে বুঝল। তারপর বলল আপনার লাইসেন্স এনেছেন? হ্যাঁ অফ কোর্স! তবে ইউ পির লাইছেন কি না? জালিয়াতি এড়াতে এরা এমবস করিয়ে বানায়। ফটোকপি করা সম্ভব হয় না। স্ক্যান করে দিচ্ছি! বিকালে চার ঘণ্টা পরে ফোন করবেন প্লিজ।

দুপুর গড়িয়ে বিকেলে, ফোন- ও হ্যাঁ, স্যার আপনার সিম কার্ডটায় সমস্যা আছে। আপনাকে আবার পার্ক স্ট্রীটে ফিরতে হবে। অগত্যা, মৌসুমী পুলওভার আর ইলশেগুঁড়ি চাদরে মুড়ে গেলাম মেট্রো চড়ে পার্ক স্ট্রীটে ফিরে। হাতে হাতে সিম। রাত দশটার মধ্যে কাজ করতে শুরু করবে।

আমি ফিরে এলাম গিরীশ পার্কে। ইন্টেন্সিটি বেড়েছে সিটিটার, বৃষ্টির অন্ধকারের মানুষের সকলের। ঘরে ফিরতে গিয়ে দেখি না বাস না অটো ওঠার মত অবস্থাতে কেউই নেই! রাস্তাই নেই এগিয়ে যাবার। ঢিকির ঢিকিরে বাবা আমার চিরকালীন অ্যালার্জি। এই পথ যদি না শেষ হয়।মার হাঁটা। মানিকতলা পর্যন্ত আসার পর শরীরের স্বেদও ফুরিয়ে যায়। ফাঁকা অটোর আগমনে ব্যাঘ্রলম্ফে প্রথম সীটটি দখল করে ফিরে এসে দেখি, যে সকল বাস আমি পিছনে ফেলে হাঁটতে শুরু করেছিলাম সেগুলো পিছনে পিছনেই আসছে।

ছাড়ুন সে সব কথা, কোষ্টা রিকা ইতালির ঘাড় মটকাচ্ছে। শেষ দশ মিনিট ঘড়িতে এগারো ছাড়িয়েছে কিন্তু আমার মোবাইল বাক্যহীন। ফোন লাগালাম পরিষেবায়, প্রিপেড ঘুরে পোস্ট পেডে যেতে লাগল পাক্কা সাত মিনিট। টোটকা নিয়ে ফিরে এসে দেখলাম কার্যোদ্ধার হয় নি। আবার ফোন লাগালাম। পারদ চড়ছে। একজন স্পষ্ট বলে দিল যে দিল্লির সিম এখানে অ্যাক্টিভেট করা সম্ভব নয়। গলা চড়ালাম। মাজাকি পায়া হ্যায়? সাত কাণ্ড রামায়ণের পর সীতার শ্বশুর ধৃতরাষ্ট্র! লাইনে এল পোস্ট পেড বাবাজী। তার হাজারো ল্যাঠা, নামের বানান ঠিকানার বানান শেষে বিকল্প নম্বরের বানান জিজ্ঞাসা করতে আমি একটু তোতলালাম! অত কি আর মনে থাকে ছাতা দশ বছর আগে কি নম্বর দিয়েছিনু! সে আমায় চার্জ করে! আপনি বিকল্প নম্বর বলতে পারছেন না তাহলে কি করে হবে বলুন! এবার সত্যিই নর্মদায় জল এল! ভাকড়ায় ভাঙন! আপনি পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করুন আমি আমার বায়োডাটা আপনাকে সবিস্তারে দিচ্ছি কিন্তু তারপর যদি আমার মোবাইলের আওয়াজ না শুনতে পাই তো আপনি কাল ভোরের সূর্য দেখবেন না! (মাস্টারমশাই, আপনি কিন্তু কিছু দেখেন নি!)

সারা বিশ্বের পরিষেবা অধিকারীদের দোষ হল, মধুর ভাষণ না শুনলে তারা বিশেষ পাত্তা টাত্তা দেয় না! আহা আপনাকেও তো সঠিক পরিষেবা কোড ব্যবহার করতে হবে! প্রয়োজনে তা দু অক্ষর থেকে চার অক্ষর পেরিয়ে ছয়েও যেতে পারে। আমি অবশ্য ভিন্ন কোড ব্যবহার করলাম। ভাষার কোড। বাঙালী হয়ে নিজের শহরে ফিরেও দিল্লির দোহাই দিয়ে আমি ফোন ব্যবহার করতে পারব না? কাজ হল ম্যাজিকের মতো। সে সব দেখে শুনে বলল, যান আপনার কাজ হয়ে গেছে! অফ করে অন করুন! ম্যাজিক সত্যিই! প্রায় চার দিন পরে আবার আমি নিজের মুঠোফোন পরিচিতি ফিরে পেয়েছি। এ যেন বিশ্বকাপ জেতার সুখ। আহা গোবরের পদ্মফুল যেন।

আজ তবে এই পর্যন্তই থাকুক! তবে কি না একটা কথা বলব পাঠকপাঠিকারা মাথায় রাখবেন! কলকাতায় দেখছি শুদ্ধ হিন্দি বললে বাংলাভাষীর থেকে বেশী কদর পাওয়া যাচ্ছে। বলতে গিয়ে মনে পড়ে গেল কদিন আগের কেকেআরের সরকারি সেলিব্রেশনের স্যাটায়ারখানা! শহরের ভাষা পাল্টাচ্ছে- ভাষা পাল্টাচ্ছে! বাঙালী এখন কলকাতায় সংখ্যালঘু! নগরবাসীরা একটু ভেবে দেখুন! মাথা বিকিয়ে গেলেও রোজকারের রোজগেরে জীবনের ফিকিরে যেন ভাষাটা সরস্বতী নদী না হয়ে যায়!

(১০০)


(১০০)
ছাব্বিশ নিয়ে আজকাল বেশ ঠাট্টা মশকরা চলছে নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ছাব্বিশে মে শপথ নেবার পর থেকেই। ছাব্বিশে ডিসেম্বর সুনামি, ছাব্বিশে নভেম্বর মুম্বইয়ে উগ্রপন্থী হানা আর সবকিছুর মতই অক্টোবর ছাব্বিশ, ২০০৯-এ যখন ফিসফাস শুরু করেছিলাম তখন কেউ কেন আমিই ভাবতে পারি নি যে ফিসফাস সেঞ্চুরী করবে। বস্তুত শচীন তেন্ডুলকরও খেলা শুরুর সময় শচীন হবে বলে খেলা শুরু করে নি। আর আমি তো কোন ছাড়।

গত সাড়ে চার বছরে ফিসফাস বই হয়ে বেরনো থেকে শুরু করে ফিসফাস লেখকের জীবনে অনেক কিছুই ঘটে গেল যার সাক্ষী পাঠক পাঠিকারা রয়ে গেলেন। আজ ফিরে দেখার পালা, অথবা এগিয়ে চলার পালা।

শুরুর দিকের ফিসফাস পড়ে একজন সুহৃদ বলেছিলেন যে তারাপদ রায়ের ছায়া আছে। সত্যিইতো তারাপদ রায় যে ছায়া দিয়েছেন তা পরশুরাম আলী সাহেব আর সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ে চুবিয়ে নিয়েই তো আমাদের ভেসে যাওয়া। অন্ধকার রাতেও যদি লাইটহাউসগুলো ঠিক ঠাক আলো দেয় তাহলে তো লক্ষ বিচ্যুতিতেও লক্ষ্যচ্যুত হবার সম্ভাবনা থাকে না।

প্রথমে ভেবেছিলাম লিখবটা কি? রম্যরচনা তো হাজারে হাজারে পাতে পড়ে। পরে ভেবে দেখলাম, শেক্ষপীর বলে গিয়েছেন জীবনটাই রঙ্গ মঞ্চ। ঠিক ঠাক স্ক্রিপ্ট থাকলে রম্যরচনার অভাব হবে না। তাই হরলিক্স।

ফিসফাস নিরেনব্বুইতে বারবার ফিরে এসেছে মামা ভাগ্নে সংবাদ। সেই যে সেই অমর পঙক্তি “ওগো আমার পুলিশ আমায় আলতো করে তুলিস”। একঘেয়ে না হয়ে যায় বলে কত কত মামাসংবাদ যে ছেড়ে দিয়েছি।

এই তো দু দিন আগে। ছেলেকে নিয়ে ক্রিকেট কোচিং থেকে ফিরছি। ইউটার্ণ বন্ধ সাইনটা গাছের আড়ালে চলে গিয়ে দেখাই যায় না। ঘুরতেই ধরলেন। মামা ধরলে তো শুধু রিপোর্ট কার্ড দেখেই সন্তুষ্ট থাকেন না। মলাট ঠিক আছে কি না, পেনসিল ছোলা আছে কি না রবার ময়লা কি না হাজারো প্রশ্ন। শেষে একটু উষ্মা প্রকাশ করতেই বড়মামার কাছে নিয়ে গেল। মিনিট দুয়েক আলাপের পরেই তাঁর মনে হল আমাকে নাজেহাল করা ঠিক নয়। কিন্তু ছেলে দেখছে যে গাড়ির জানলা দিয়ে শরীর বার করে, ফক্কিবাজী তো চলবে না। তাই বললাম না চালান কাটতেই হবে। না হলে ছেলে কি শিখবে? (যত্ত ড্রামা) তখন কি খুশীই না হলেন সেই ফোঁটা কাটা বড় মামা যে কি বলব। যতক্ষণ লাগলো আমার নূন্যতম চালান কাটতে ততক্ষণে তাঁর হাঁড়ির হালহকিকত আমার নখ দর্পণে। আহা মামারাও তো মানুষ। কংসকে মনে পড়ে?

দিল্লি শহরটার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ঠিক কালোজিরে আর কাঁচালংকা-র (আরে অনেক তো হল সেই কাঁচকলা আর আদার গল্প এবার একটু অন্য রেসিপিতে যাই না বাপু)। মানে আলাদা থাকলেও ক্ষতি নেই আবার একসঙ্গে হলেও মনের শান্তি প্রাণের আরাম। পনেরো বছর পরেও শহরটা যেমন আমায় গিলে খেতে পারে নি, তেমন এত দিন ধরে সহবাস করতে করতে, শহরের নাক ডাকা বা ‘ব্যাঁও’ শব্দে ঢেঁকুর নিক্ষেপ সহ্যের সিলেবাসে ঢুকে গেছে। তাই আটচল্লিশেও আছি আবার মাইনাসেও আছি। নো নড়ন চড়ন। দিল্লিও বেশী ঘামায় না, জানে এই এক জান আছে যাকে জাঁতাকলে ফেললেও যা তা বলে বদনাম করবে না। তাই তুমিও ঠিক আমিও ঠিক। শহরটা বাড়ছে নিজের মত করে, কে জানে, আর বছর দশেক পরে হাতে হাত রেখে রজতজয়ন্তী সেলিব্রেট করব না আমরা?

প্রথম প্রেমিকাকে মনে আছে? সেই তন্বী ষোড়শী বা অষ্টাদশী যখন সদ্য যৌবনের প্রস্ফুটনে দমকা হাওয়ার মতো দুলে দুলে ফুলে ফুলে ঢলে পড়ত তখন হৃদয়ে হিল্লোল উঠত কি না এই প্রশ্ন ঘোর বাস্তববাদী তার্কিককে করলেও উত্তরে চোখ উদাস করা মুচকি হাসি ছাড়া কিছু পাবেন না। তা সে যতই এখন ডাল পালা এয়ার কন্ডিশন, এলসিডি সহযোগে আশি কেজির অ্যামেরিকান টুরিস্টারের জাবদা খাতা হয়ে যাক না কেন। প্রথম আলোয় ফিরে এলেই যেন প্রতিদিন সূর্য ওঠা সফল করে তোলে তার মুখ। সেই হল আমার কোলকাতা, কোন সে গত শতাব্দীর শেষ প্রান্তে শ্বশুরবাড়ি বাপেরবাড়ি খেলতে খেলতে প্রবাসী হয়ে যাবার পরেও, গত পনেরো বছরে চরিত্রের আমূল চিত্রোতপাটনের পরেও রোমান্সটা কিন্তু একই থেকে যায়। সেই ময়দান ছুঁয়ে, প্রিন্সেপ বাবু ঘাট ছুঁয়ে, বইপাড়ায় ঘুরে ঘুরে বাসা বাঁধে বুকের মাঝে। আমার কোলকাতা আমার সেই সদ্য যৌবনের প্রথম প্রেম। আমার প্রথম আলো- আলোড়নের সাথী। কলসীর কানাতেও তো প্রেম লেখা থাকে কি না?

যাত্রা পথের শরিক আমার, দুই এবং চার চাকা সাথী আর সঙ্গে থাকুক মেট্রো, ট্রেন ও উড়ো জাহাজের গল্প। এ গল্প তো শেষ হবার নয়। বারে বারেই ফিরে আসে টুকি দিয়ে টি দিয়ে যায় চাঁদমামা। ফিসফাসের মুক্ত হাওয়া তো পথে ঘাটেই লেখা। তাই এবারও কোলকাতা আসার সময় এয়ার স্টুয়ার্ড যখন তার বিমান সেবিকা দুই সাথীকে খাবার পরিবেশনের সময়, আরোপিতে ইংরাজিতে বলে ওঠেন, “আই উইল ডু ইট ফ্রম দ্য ফ্রন্ট, ইউ টু ওয়াচ দ্য ব্যাক” আর উত্তরও পান, “ভেরি ওয়েল, নো প্রবলেম”, তখন সে সব ঈশ্বরের অমোঘ বাণীর মতো স্থান পেয়ে যায় ফিসফাসের পর্দায়। অমরত্বের প্রত্যাশাহীন গল্পগাথায়।

খেলার মাঠের গল্প খুব বেশী আসে নি এখানে। আসলে কোথাও একটা জ্বালা থেকে গেছে- সফল না হবার জ্বালা। খুব কম বয়সেই মাঠকে সলাম নমস্তে করে দেবার জ্বালা। সেই জ্বালাগুলো তাই আমার গল্পে যতটা উঠে আসে, আমার গল্পগুলো মাঠে ততটা থাকে না। তবুও এই ময়দান, কল্যাণী, নৈহাটি শ্যামনগর লালগোলার সবুজ, দিল্লির ধুসর আমার ফুসফুস। চুপিসারে দুটান মেরে দিয়ে সারা জীবনের অক্সিজেন সঞ্চয়।

পথদুর্ঘটনায় হাঁটু মুড়িয়েও তাই ডবল ব্যাণ্ডেজ আর নিক্যাপের আড়ালে ফিরে ফিরে যাই, গালিতে দাঁড়িয়ে ব্যাটসম্যানের জীবনী শুষে নিতে বা অনায়াস ফ্লিকে অফ মিডলের বলটা মাঠের বাইরে ফেলতে গিয়ে ব্যাটের রামকাহিনীতে আর আর্মারের জোরে অ্যাবডোমেন গার্ড ফাটিয়ে দেবার আস্ফালনে। এখানে আমার গল্প কম কিন্তু রাংতার মোড়ক ঝকমকিয়ে ওঠার সেই ছোট্ট ছোট্ট আনন্দ বুক ভরিয়ে দেয়। এক টুকরো জাফরানে এক হাঁড়ি বিরিয়ানীর বর্ণ গন্ধ বদলানোর মতো।

বিরিয়ানীর কথা বলতেই মানেকা গান্ধীর পশুপ্রেমের মতোই আমার খানদান মনে পড়ে। অর্কুট ফেসবুকে যাঁরা আমার সঙ্গে কাটাকুটি করেছেন তাঁরা খানদানের খানদানী অ্যালবাম দেখে জিজ্ঞাসাও করেছেন। হ্যাঁ রে এটা কথা থেকে তুলেছিস? নিজে রান্না? কি জানেন তো? ফুটবল, কবিতা, ওয়াইন বা ছবি আঁকার মতই রান্না একটা আর্ট প্লেজারের চরম পর্যায়ে ঘোরাফেরা করে। শুধু রান্না নিয়েই একটা ব্লগ লিখব বলে একবার খুব পাঁয়তারা কষলাম। কিন্তু সব কথা কি মুখে বলা যায়? সব প্রেম কি চিঠি লিখে বোঝাতে পারেন? বলতে পারেন ঠিক কতটা ভালবাসেন তাকে? পারলে আপনি ঈশ্বর আর আমি সাধারণ কেরানী।

তা কেরানীরও বিরিয়ানীর সখ থাকে, আমারও। সত্যি, বিরিয়ানী যারা পছন্দ করেন না তাঁরা ব্যক্তিগত পছন্দের সঙ্গে আসলি বিরিয়ানীর মিশেলটাই ধরতে পারেন না হয়তো। হ্যাঁ ব্যক্তিগত পছন্দ তো থাকতেই পারে কিন্তু বলুন দিকি চাল, আলু, ডিম, মাংস, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, পুদিনা, ধনেপাতা কাঁচালংকা আর মাথা ঘোরানো সব মশলাগুলোর স্বাদ গন্ধ যদি ঐকতানে বুকের মাঝে সেতারের মুর্ছনাই না তুলল তাহলে সে আর বিরিয়ানি হল নাকি? মাংসের তেলে ভাত ভাজা টাইপের থার্ড ডিগ্রীর খাবার হয়েই থেকে গেল। সে যা হোক ব্যক্তিগত পছন্দ এবং অভিজ্ঞতার কথাই তো। তো আপনি ধরে ধরে উচ্ছে চিবোন না কে বারণ করবে (জনান্তিকে জানাই, আমার প্রিয়তম সবজি কিন্তু সেটিই)।

আচ্ছা, এই বঙ্গ সংস্কৃতিটা খায় না মাথায় মাখে বলতে পারেন? বিদেশ বিভুঁইতে এলে আরও বেশী করে মনে হয় যে আমরা বাংলা মায়ের হ্যাংলা সন্তান। ট্রামে বাসে, বাজারে দোকানে অফিসে কাছারি বিল্ডিং টিং-এ একটু পরিচিত মায়ের ভাষা কানে ওডিকোলনের কাজ করে। প্রাণ ঠাণ্ডা মন ঠাণ্ডা হৃদয়ে গোবিন্দভোগ চালের পায়েসের গন্ধ ম ম করতে থাকে।

কিন্তু যেই সেই সংস্কৃতির চক্করে নিজের শহরটায় ফিরে আসি তখনই দেখি, কনভেন্ট এডুকেটেড বাঙালীদের দুর্ভিক্ষগ্রস্থ উচ্চারণ এবং ভাষাপ্রেম। একরাশ নাকউঁচু ইগোর তলা দিয়ে ফল্গু নদীর মতো সংস্কৃতি ধীরে ধীরে মাটির বুকে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তাই তো কোলকাতার বাঙালী নেমন্তন্ন বাড়িতে দাল মাখনি, নান পরাটা, শাহী পনিরের সমারোহ। পুঁইশাক চচ্চড়ি, ধোঁকার ডালনা, ছানার ডালনা আর কষা মাংসরা সেখানে ব্রাত্য। শিক্ষা ছেড়ে পর্যটনে।

প্রচণ্ড পরিশ্রমের পর বাঙালী ‘থকে’ যায় আর সামনা সামনি কথা প্রসঙ্গে মেয়ে কোথায় তার উত্তরে বলে ফেলি মেয়ে উলটে গেছে। বলে তার উলটি অর্থাৎ বমি পরিষ্কার করার জন্য ওয়েটার ওয়েটার চিৎকার করতে থাকি। আসলে কি জানেন, ভাষাটা বা পরিচিতিটা বা সমগ্র সংস্কৃতিটার রূপ পাল্টাচ্ছে। এক্ষুনি গেল গেল রব না তুলে দেখিই না ভাল না খারাপ। ভোকাবুলারি বাড়লে তো ভাষা সমৃদ্ধই হয়। সে প্রবাসেই হোক বা মিনিবাসে। ভাল ভাষা ভাল বাসা দেখেই ঘর বাঁধে। বললে হবে খচ্চা আছে না?

তা পাঠক পাঠিকারা-

খরচ নাকি খচর মচর?
জ্বলবে ঘামে লাগলে আঁচড়
চিরবিরিয়ে উঠবে পাড়া
মাথায় পড়বে ব্রাহ্মী শাক
স্যাটায়ার আর হিউ মারাতে
আরাম চেয়ার মন সারাতে
উঠবে বেজে ঢোল নাকাড়া
উঠবে বেজে সানাই ঢাক
বাজবে ফিসফাসেরই ঢাক।।

সোজা কথা বাঁকা সুর
চাঁটা মারা মোটা ক্ষুর
রোগা গলা টিংটিঙে
মনে প্রাণে বেদুইন?
যত হাসি তত ফ্যাঁচ
কেন কর ক্যাঁচ ক্যাঁচ
নেট ঘেঁটে পৌঁছাও
ফিসফাস ডট ইন
আহা ফিসফাস ডটইন

ছানা পোনা বউ সোনা
সব আসে ফিসফাসে
বেটা সওয়া বেটি পোয়া
সাজানো বাগান
বসন্ত বসতবাটি
উস্তাদি কালোয়াতি
ফিসফাসে সব আসে
গাও জয়গান
আহা গাও জয়গান

সত্যি কথাটা শেষে এসেই বলি। আসলে কি জানেন তো, অনেক দিন ধরে যদি ধরে রাখি যে একটা তাগড়া ডিম পাড়ব তাই একদম ঢোল কত্তাল চ্যালা চামুণ্ডা জুটিয়ে মোচ্ছব করতে গিয়ে শেষে যদি উটপাখির জায়গায় টিকটিকি বেরোয় তাইলে কি জুত সয়? তা দাদা সেঞ্চুরী করতে গিয়ে যদি আউটগোইং বলে খোঁচা দিয়ে বেঁচে যাই আর বল বাউণ্ডারী না হোক থার্ডম্যানে এক রান হলেও তো চলবে। এই ফিসফাসটাকে সেই রকমই ধরুন আর পচা ছড়াগুলোর জন্য ক্ষেমা করে দেবেন। এন্টারটেনমেন্টকে লিয়ে সব চলতা হ্যায়। হ্যায় না? বোলো বোলো?

(৯৯)

পাঠক পাঠিকারা, ধরা যাক আপনি তালে গোলে মালে অফিস বেরোতে দেরী করে ফেলেছেন এবং সাড়ে নটার সময় নিজের লাল টুকটুকে স্পার্ক চালিয়ে বিকাশ মার্গ এক্সটেনশনের পথে আনন্দবিহার দিয়ে যাচ্ছে এমন সময় ফোন এল আপনার বসের। এমন জায়গায় যে আপনি গাড়ি সাইড করতেও পারবেন না আবার বস বলে ফোন ফেলে দিতেও পারবেন না। অগত্যা না হয় বসের ফোন তুললেন এবং তাকে ভুজুং ভাজুং দেবার সময় দেওনন্দন ঝা নাম্নী এক সাব ইন্সপেক্টর এবং ভূষণ কুমার বলে এক কনস্টেবল হেলমেট পরিহিত অবস্থায় আপনার ডান দিক দিয়ে ওভার টেক করে আপনাকে থামাতে বলল।

তাইলে কি করবেন? সেই বিজ্ঞাপনের ছাতাছেঁড়া ব্যক্তির মত ভাববেন “বড় দেরী করে ফেলেছি ভাই!” নাকি নেমে আমি এর বাচ্চা তার বাচ্চা বলে তাবড় তাবড় নাম ফেলতে শুরু করবেন? গায়ে যদি আবার কমলা হাফ শার্ট থাকে তো কেয়াবাত মিয়াঁ!

নাকি সুবোধ বালকের মত সুর সুর করে ট্যাঁক থেকে লাইসেন্স বার করে মাশুল গুনবেন? সে রকম করতে পারেন কারণ পাপ মাথায় নিয়ে তো আর দিন গুজরান চলে না! তার চাপে বেঁটে হয়ে যাবার সমূহ সম্ভাবনা।

তা না হয় করলেন, কিন্তু তারপর যদি দেখেন দেওনন্দন বাবু আপনাকে আগামী উনত্রিশ তারিখ কারকারডুমা কোর্টে তোলার তাল করছেন তাহলে? তাহলে বরং আপনি ধীরে ধীরে আপনার জাল বিস্তার করতেই পারেন। হাজার হোক আপনি তো ফাইন দিয়ে ‘ইউ আর ফাইন, আই অ্যাম ফাইন’ বলে চলে যেতেই চেয়েছিলেন, খামোকা ব্যাটা আইন দেখিয়ে ফাইনাবস্থার দফারফা করতে গেল কেন? আপনি তাকে অনুরোধ করতেই পারেন যে ভাই ফোনে কথা বলার হাজার টাকা দিতে পারব না আপনি রেড লাইট জাম্পের একশত টঙ্কা জরিমানা করিয়া আপনাকে মুক্ত করে দেয় যেন।

কিন্তু বিধি বাম থাকলে সে আপনাকে পাঁড় অবধি ডিকশনে আরও বোঝাতে বসবে, ‘নহি নহি হামারে জুরিসডিকশন মে খালি লাইসেন্স লেকে কোর্ট ভেজনা হ্যায়!’

আরে মশাই কোর্টের চক্করে পড়লে তো একটা দিনই পুরো বরবাদ। কেন ফোনের হামি খাবার সময় মনে ছিল না তা? আরে বাবা সে তো বিভীষণই বলে গেছে চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। তা জ্ঞান বুদ্ধি বেড়েছে যখন যাও হাওয়া খাও!

না না তা কি করে হয়? আপনি তখন তাকে ভাল করে বোঝাবেন যে নতুন সরকার ২৬ তারিখে শপথ গ্রহণ করলে ২৯ তারিখ আপনি দম ফেলার সময় পাবেন না। সে সেয়ানা বলতেই পারে, “তো ফির কাল আইয়ে!” ভেস্তে যাচ্ছে দেখে আপনি হালকা হালকা করে মন্ত্রালয় বা পদের গল্পের মশলা ফেলে তাতে আবার একটু জল ঢেলে দিতে পারেন এই বলে যে, আমি কি এ সব বলে সুবিধা চাইছি?

তা দেওনন্দন এ সব অনেক দেখেছে। সে আপনার প্রতি পূর্ণ সম্মান বজায় রেখেই আবার বোঝাবে যে তার হাত পা বাঁধা, সেও তো আপনার কাছে কোন উপঢৌকন চাইছে না! তখন আপনি বিকল্প খুঁজবেন, বলবেন, “আরে আগে রাস্তে মে ট্রাফিকবালা খাড়া মিলেগা, চলো সাথ মে যা কে উসে পেমেন্ট করকে আতে হ্যায়।”

তা সে গেঁতো শুনবে কেন? সে জোর করবে, “আরে উনকা জুরিসডিকশন অলগ হ্যায়! আপ কেয়া আপকা মন্ত্রালয় ছোড়কে দুসরে মন্ত্রালয় মে যাকে কাম করকে আওগে?” আপনার বুকে টং করে লাগবে! বল ব্যাটা কি বলবি? তখন আপনিও বলবেন, “আগর জরুরত পড়ে তো ও ভি করনা হো গা!” আপনি যে কালকেই মোদিময় ভাষণ শুনেছেন, “দেশকে লিয়ে কুছ ভি করনা পরে তো পিছে নহি হটনা!” টাইপের ভাষণ।
তারপর, আপনি ঘুরে ফিরে এই ওই তাই বলে বলবেন কোন সা থানা? সে হয়তো বলল, আনন্দবিহার! তা আপনি তখন প্রস্তাব দেবেন যে। “চলো ওহা যা কে ভর কে আতে হ্যায়!” যেন এদিকে রোদ্দুর আসছে চলো ওই ঘুপচিতে গিয়ে বসি!

তা সে দেওনন্দন ঘাঘু মাল, সে আপনাকে বড় ছোট, উঁচু নীচু, ভুল ঠিক, ট্রাফিক পুলিশ খাঁকি পুলিশ ইত্যাদি নিয়ে গল্প জুড়তে আরম্ভ করবে। ব্যাস এই সুযোগটাই তো চাইছিলেন। আপনিও তখন যেন একটু একটু গলে আসছেন এইভাবে আলোচনায় যাবেন, ওদিকে ঘড়ির কাঁটা বয়ে যায় তো যাক। আড়চোখে দেখবেন ভূষণ কুমার উসখুস করছে কি না। করলেই তো ব্যাস ঘড়ি আপনার দিকে ঘুরতে শুরু করেছে।

কিন্তু দেওনন্দন পাতায় চলা পুলুশ! সে তখন আপনার নাম ধাম কাম সব লিখে নিয়ে কোর্টের নোটিশ পাঠাতে তৎপর হয়ে উঠবে। আপনি তখন যেন বাধ্য নাগরিক। বলবেন যে, “কব যানা হ্যায়?” “কাল আইয়ে, ৪ বাজে!” “৪ বাজে? ১১ নহি হো সকতা?” “আরে ম্যাজিস্ট্রেট কেয়া আপকা শকল দেখকে বয়ঠেঙ্গে?” সত্যি তো! তারপর আপনি যেন মেনেই নিয়েছেন বলে লাইসেন্স এগিয়ে দেবেন, কিন্তু আহ্লাদী গলায় বলবেন, “আরে মোবাইল পে বাত কর রাহা থা মত লিখো! লিখো রেড লাইট জাম্প কিয়ে থে!” এই নিয়ে মিনিট তিনেকের চাপান উতোরে দেখবেন ভূষণ কুমার ছটফটিয়ে যাচ্ছে।

শেষে সেই বরাভয় মূর্তি হয়ে আপনাকে অভয় প্রদান করবে, “আরে স্যার আপ যাইয়ে, কোই চালান নহি ভেজেঙ্গে”! আপনি অবশ্য তখনও সৎ নাগরিক, “নহি নহি গলতি কিয়া তো ভুগতনা পড়েগা হি না?” এবারে সেই হাত জোড় করে আপনাকে অনুরোধ করবে, “স্যার আপ যাইয়ে প্লিজ! ভরোসা রাখখিয়ে কোই নোটিশ নহি ভেজেঙ্গে।” এর পর চলে আসবেন মাথা নাড়তে নাড়তে যেন কতই না অন্যায় হোল! তারপর গাড়ি চালিয়ে তাদের পাশ কাটিয়ে যাবার সময় থ্যাঙ্কু বলে নাম জানতে ভুলবেন না! আপনিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচবেন, আর তারা তো বাঁচবেই।

এই যে উপরোক্ত টোটকা দিলাম তা ব্যবহার করতেই পারেন। তবে কি না আক্কেল দাঁত তো সকলেরই গজায়! সেই ভরসায় বলি, আইনকানুন তৈরী হয় যাতে অধিকাংশের সমান অধিকার থাকে। তাই সেগুলো একটু মেনে চলুন। গাড়ি চালাতে চালাতে মোবাইলের হামি খাওয়া বন্ধ রাখুন! আর খুব জরুরী হলে গাড়ি পাশে দাঁড় করিয়ে কথা বলে নিন। কে জানে, বিপদ কোথায় ওঁত পেতে থাকে!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ বসকে কেন দেরী হল, তার ব্যাখ্যা দিতে দেখবেন কোন অসুবিধাই হবে না! মামার পাল্লায় সবাইই এক বা একাধিক বার পড়েছেন। আপনার সহকর্মীরাও সহমর্মী হয়ে উঠবে।