(২৩)


সবাই তো আর শচীন তেন্ডুলকরের মতো প্রতিভাবান হয় না, যে মিকি মাউসের মতো গলা নিয়েও জগতবিখ্যাত হতে পারে! ‘রেশমা অউর শেরা’ ছবিতে অমিতাভ বচ্চনকে কথা বলতে দেয় নি- ছবি বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়েছিল।সত্যজিত রায়ের বিশ্বখ্যাত ব্যারিটোনের দৌলতে ভূতের রাজাও অমর হয়ে যায়। মানুষ, বিশেষ করে পুরুষ মানুষের জিন্দেগীতে তার গলার গমক অনেকটাই পথ এঁকে দেয়। রাস্তা ঘাটে, বাসে ট্রামে, সিনেমা হল রেল স্টেশনে সর্বত্র সুন্দর মুখেরই মতো গমকী গলার দাপট।
কালকেই তার উদাহরণ হাতে নাতে পেলাম। বাবা মা ফিরে যাচ্ছেন কলকাতায়, স্বল্প দিনের দিল্লী ভ্রমণ সাঙ্গ করে- সঙ্গে আমার পুত্রটি(বাবা মা-ও অবশ্যই আমার)। ভাই গেছে প্ল্যাটফর্ম টিকিট কাটতে- সে গেছে তো গেছেই ফেরার নাম নেই। ফোন লাগালামঃ
-কোথায়?
– এই তো লাইন তো এগোচ্ছেই না…।
– কোথায়?
– আগে যেখানে ছিলাম তারই কাছাকাছি…।
ধৈর্য থাকল না গিয়ে হাজির হলাম সেখানে। গিয়ে দেখি যা ভেবেছি ঠিক তাই-ই-সকলেই আগে কে বা প্রাণ করিবেক দান তারই লাগি কাড়াকাড়ি… লাইন একটা আছে তো কি হয়েছে? সব মজা তো কাউন্টারের কাছেই- কোন হতচ্ছাড়া আর লাইনে দাঁড়িয়ে মজা লোটা থেকে বঞ্চিত হয়? হয়, হয়- কতিপয় ভালো মানু্ষের পো হয়- আমার ভাইটা যেমন(Of course আমার বাবা ভালো মানুষ- তবে আমি নই!)
এদিকে সময় বয়ে যাচ্ছে- তাড়াতাড়ি কিছু একটা করতে হবে ভেবে এগিয়ে গেলাম! পাঠক পাঠিকাগণ, অমিত বাবু বা মানিক বাবু কারুর মতন গলার গমক আমার নেই কিন্তু চমকটা যে আছে সেটার সাক্ষ্য পাড়া প্রতিবেশীরা নির্দ্বিধায় দিয়ে দেবে। তো সেই গলা নিয়ে জোড়ে ডেকে উঠলাম(সিংহই হোক আর গাধা, ডাকতে পারলে কে আর ছাড়ে?), “কেয়া হো রাহা হ্যায়? লাইন মে আও সব!” ব্যাস, মন্ত্রের মতো কাজ হলো- নিমেষে কাউন্টারের আশে পাশের ভীড় ফাঁকা হয়ে গেল- দু চার জন এগিয়ে এসে দু চার রকমের প্রশ্নও করল, “স্যর, কাটিহার যানে কা টিকিট কাঁহা মিলেগা?” “ইঁহা পে খালি প্ল্যাটফর্ম টিকিট হি মিলতা হ্যা ক্যা?” খুব ধৈর্য নিয়ে উত্তর দিলাম সব প্রশ্নের আর বেশ বুঝতে পারলাম জনগন বেবাক আমায় রেলের চেকার টেকার ভেবেছে। গলায় সরকারী পাট্টাটা আরো বিশ্বাসটাকে দৃঢ় করেছে। আমার বুদ্ধিমান ভাইও বুঝতে পেরে আমকে চিনতে পারলো না- আর আমি তো ওকে দেখিই নি।

দু চারজন অতীব সাহসী তাও চেষ্টা করেছিল সম্পূর্ণ উপেক্ষা করতে- তাদের ঘাড় ধরতেই নিজেরাই সুড়সুড় করে বেড়িয়ে এল। ওদের মধ্যে একটা বেঁটে মতোন ছেলে নিজেকে বেশ চালাক ভাবছিল হয়তো- সুড়ুত করে মহিলাদের লাইনে গিয়ে টিকিট ভিক্ষা করতে লাগল- “আন্টি এক টিকিট লে দিজিয়ে গা…” দেখতে পেয়েই ঠান্ডা দৃষ্টিতে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বাম হাতের তর্জনী হেলিয়ে বললাম , “মাত করো!” ছেলেটা তেমনই টেঁটিয়া বলে “আপ হ্যায় কৌন?”

ভাবলাম মরেছে, গেল বোধহয় ফাঁস হয়ে। আড়চোখে তাকিয়ে দেখি ভাই প্রায় কাউন্টারের কাছাকাছি। যা থাকে কপালে ভেবে ধীর পদক্ষেপে গেলাম এগিয়ে- নাকের ডগায় দাঁড়িয়ে বললাম, “ইয়ে লাইন দেখা?” পাঠক পাঠিকাগন আমার উপর বোদহয় সেলিম জাভেদের কৃপাদৃষ্টি হয়েছিল, মুখ দিয়ে কেটে কেটে বেড়িয়ে এলো, “ম্যায় কৌন হুঁ জাননে সে পহলে ইয়ে লাইন মে খড়ে হর এক কো দেখো- অউর ফির সোচো কে তুম কৌন হো?” প্রশ্নটার মানে ছাতা নিজেই বুঝলাম না কিন্তু কাজ হলো উত্তর আধুনিক কবিতার মতো- বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়তে নাড়তে ছেলেটি লাইনের শেষে গিয়ে দাঁড়ালো। আমি দেখলাম ভাই টিকিট কাউন্টারে হাত ঢুকিয়ে দিয়েছে। নিজেকে বললাম, “এবার অভিনয় সাঙ্গ হলো- মানে মানে কেটে পড়ো” উপরে গিয়ে দাঁড়ালাম কিছুক্ষণ পরে ভাই এসে হাজির হলো- মুখে হালকা হাসি! চোখাচুখি হলো কথা হলো না- আমি বললাম “চল”।
সমঝদারও কে লিয়ে ইশারা হি কাফি হ্যায়।

Advertisements

One thought on “(২৩)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s