(২৪)


একানব্বই সালে একবার দিল্লী এসেছিলাম- নরোত্তম পুরীর স্পোর্টস কুইজে অংশ গ্রহন করতে। ফেরার সময় আসানসোলের একটু আগে লাইনে ইলেক্ট্রিকের পোল পড়ে গিয়ে যা তা অবস্থা- বিকাল পাঁচটায় পৌছবার কথা- পৌছলো রাত সাড়ে তিনটেয়- পরের দিন আবার বেঙ্গল আন্ডার নাইন্টিন ট্রায়াল। ভাগ্যিস আমার একজন বিশাল মনের বাবা আছেন। রাত সাড়ে তিনটেতেও হাসি মুখে স্টেশনে হাজির।
নিরেনব্বুইতে আবার এসেছিলাম সরকারী চাকুরীর কতদূর কি হলো তার তদবির করতে আর সঙ্গে হবু বউএর সঙ্গে একটু ফষ্টি নষ্টি করতে ( সে আগেই চলে এসেছে) ফেরার পথে গাড়ি ছাড়লই ৭ ঘন্টা লেট করে। পরের দিন রাতে বেলানগর ষ্টেশন-এ দাঁড়িয়ে ট্রেন অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে- সিগনাল গেছে খারাপ হয়ে- ঝাড়া দেড় ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে ষ্টেশন মাষ্টারের কাছ থেকে লিখিত সিগনাল নিয়ে গাড়ি এগলো, এসে পৌঁছলো সাড়ে বারোটায়। কোনোরকমে শেয়ার ট্যাক্সি করে বেশী ভাড়া দিয়ে বাড়ি।
দুহাজার দশ-এ আবার দিল্লী থেকে কলকাতা যাচ্ছি- এবার এ সি টু টায়ারে প্রথম বার- একটু রোমাঞ্চ হচ্ছিল বটে, কিন্তু সেটা মিটে যেতে একটুও সময় লাগলো না! শেষ মুহুর্তে কনফার্ম হওয়া টিকিটে সিট পেলাম সাইড আপার! আর নিচে আর এ সি! কোনো রকমে ১৭ ঘন্টা কাটিয়ে দেব ভাবছি! রাতে ঘুম খুব বেশী হলে ৪০ মিনিট একটানা হচ্ছে- তারপরেই মনে হচ্ছে দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পাঁচ ফুট এগারোর শরীরটাকে ছ ফিটের বার্থ-এ ফিট করানোটা বহুত হ্যাপা! পেশাদার দর্জি ছাড়া আর কারুর কম্ম নয়!
রাত দেড়টা ঘুম ভাংলো একবার। দেখি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। সে তো দাঁড়াতেই পারে এদিক ওদিক ঘুরে এসে শুয়ে পড়লাম!
রাত আড়াইটে, ঘুম ভাংলো আরেকবার। দেখি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। সে তো একটু বেশী দাঁড়াতেই পারে। আরো একবার জরুরী অবস্থার অবসান ঘটিয়ে শুয়ে পড়লাম

রাত তিনটে- দেখি গাড়ি দাঁড়িয়েই আছে- এটা একটু বাড়া বাড়ি হয়ে যাচ্ছে মনে হচ্ছে। উঠলাম- চটিটা পায়ে গলিয়ে নেমে গিয়ে দেখি মুগলসরাই থেকে কিমি দশেক দূরে এক অচিনপুরের ষ্টেশনে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। কি যে হয়েছে কিসসু বোঝা যাচ্ছে না! বড়ই কিরমিংকিল কেস। একজন বক্তিমবাজকে সঙ্গে নিয়ে অন্ধকারে ইঞ্জিনের দিকে রওয়ানা দিলাম। ড্রাইভার দেখি নিদ্রা গিয়েছেন- একটু ঠেলাঠেলি করে ওঠাতে চোখ কচলে বলল- বেশ কিছু দূরে লাইনের উপর ইলেকট্রিক পোল (আবার??) পড়ে গেছে- তোলার চেষ্টা হচ্ছে। ঘুম টুম গেলো গয়াতে(তখনও পৌছই নি) তর্পণ করতে। আলাপ আলোচনা জটলা অন্ধকারে তীর ও ঢিল ছোঁড়া সবই চলছে। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে- পাঁচটা- আকাশের কোণটা একটু যেন কমলি হলো। আবার গেলাম ড্রাইভারের কাছে-বলল আগের ষ্টেশনের ষ্টেশন মাষ্টার ফোন তুলছে না! সর্বনাশের একশেষ। বাড়ি গিয়ে রোববারের জন্য বিরিয়ানীর বাজার করতে হবে- সব ঘেঁটে ঘুঁটে পঁয়তিরিশ। যা থাকে কপালে বলে ফিরে গেলাম কামরায়- আসার পথে দেখলাম প্যান্ট্রিতে দু হাতে ডিম ভাজা চলছে ব্রেকফাষ্টের প্রস্তুতি হিসাবে-স্লারপ স্লারপ জীভের জল টানতে টানতে কামরায় গিয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুম!
ঘুম ভাংলো ছটায়- বলাই বাহুল্য গাড়ী দাঁড়িয়েই আছে। এবার তো একটু নড়ে চড়ে বসলাম! দল বল নিয়ে চললাম ষ্টেশন মাষ্টারের কাছে- লাইন ডিঙ্গিয়ে। অনেক রকম প্রস্তাব নিয়ে- যেমন “কি হয়েছে আসলে?” “কতক্ষন লাগবে?” “একটু পিছিয়ে নিয়ে গিয়ে অন্য লাইন দিয়ে বার করে দিচ্ছেন না কেন?” “সামনে কোনো জংশন নেই?” ইত্যাদি এবং ইত্যাদি! লোকটা একে সারারাত জেগে! তবুও লাল চোখ নিয়ে খুব শান্ত হয়ে উত্তর দিল যে ‘ষাট কিলোমিটার দূরে একটি ইলেক্ট্রিক পোল পড়ে গেছে লাইনের উপর সেটা অন্ধকারে সড়ানো যাচ্ছিলো না এখন কাজ শুরু হয়েছে! সাতটার মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে’।
ফিরে এলাম হাসি মুখে এক্ষুনি গাড়ি ছাড়বে তো- জনে জনে ডেকে বলতেও থাকলাম! তক্ষনি দেখি গুড়ি সুড়ি মেরে জী নিউজের সংবাদদাতা আসছে- এসেই আমায় ধরল ‘বাইট’ দিন বলে- একে সারা রাত ঘুম নেই তার পরে গাড়ীর ছাড়ার ঠিক নেই- তারও পরে খিদেয় পেট চোঁচোঁ করছে সত্যিই বাইট দিতে ইচ্ছা করছিল- অনেক কষ্টে নিজেকে সংবরন করে পথ দেখিয়ে দিলাম ভিতরে বাচ্চাকাচ্চা না খেয়ে আছে তাদের বাইট খান থুড়ি নিন।
সাতটা ততক্ষনে বেজে গেছে গাড়ী নড়ে না চড়ে না। এবার এগোলাম প্যান্ট্রির দিকে গিয়ে দেখি কোচ এটেন্ড্যান্ট আর গার্ড সাহেবে মিলে জটলা করে মিটিং করছে- বাঙালীর স্বভাব- যাবে কোথায়। আন্দোলন আর আন্দোলন। গেলাম- খোঁচা খুঁচি করে জানতে পারলাম যে- যে আর কি কি ভয়ানক ব্যাপার- তিনটি মোষ- ঠিক পড়েছেন তিনটি মোষ ট্রেন লাইনে বসে গুলতানি দিচ্ছিল। আর পাইলট ইঞ্জিন- যেটা রাজধানীর সামনে পাইক বরকন্দাজের মতো যায় সেটা গিয়ে মেরেছে ধাক্কা- মানুষ টানুশ হলে কথা ছিল- কে আর পাত্তা দেয়। কিন্তু মোষ বলে কথা- স্বয়ং যমরাজের বাহন। সে আর এমনি এমনি ছেড়ে দেবে কেন? দিয়েছে এক গা ঝাড়া তাতে মোষ বাবুরা তাদের মনীবের কাছেই পৌছে গেছেন বটে কিন্তু পাইলট ইঞ্জিন- গিয়ে ধাক্কা মেরেছে ইলেকট্রিক পোল-এ। আর যায় কোথা একদম নেড়ে ঘেঁটে চচ্চড়ি কেস। তা এই রকম Divine intervention সামলাতে জাগতিক মানুষদের তো একটু সময় লাগবেই।
কিন্তু ততক্ষণে অন্য চিন্তা মাথা চাড়া দিয়েছে- অন্য মানে অন্ন, অন্নচিন্তা- হাজার লোকের খাবার দাবার বানানো তো মুখের কথা নয়!
ইতিমধ্যে আটটা বেজে গেছে! গুজুর গুজুর ফুসুর ফুসুর শুরু হয়ে গেছে! কেউ কেউ আবার বলছে মাওবাদীদের কাজ( common অজুহাত- এখন তো কলে জল না এলে, লাইট চলে গেলে মায় বউ বাপের বাড়ী চলে গেলেও মাওবাদীদের টেনে আনা হয়!)
বেগতিক দেখে গার্ড মশাই বললেন আমাদের সঙ্গেই নাহয় দুটো চালেডালে খেয়ে নেবেন! আমি বললাম একদম চিন্তা করবেন না। রেল তো জনগনের সম্পত্তি! তাই তাকে রক্ষার কর্তব্যও জনগনের! কেউ ট্যাঁ ফোঁ করবে না। ফিরে এসে লোকজনদের বলে দিলাম যে ভাই একটু co- operate করবেন সবাই। সবাই হ্যাঁ হ্যাঁ করে সায় দিলো- তারই মাঝে এক সর্দারজি আবার তার পত্নী বিল্লো, বাচ্চা টমি, খুশি পাম্মি আর কুত্তা শের সিংকে ফার্ষ্ট ক্লাসে স্নান করিয়ে নিয়ে এসে এক কেচ্ছা! জল ফুরিয়ে যাবে তো রে। তখনো বারোটা বাজে নি তাই সর্দারকে বোঝাতে বিশেষ কষ্ট করতে হলো না।
ঠিক সাড়ে আটটায় গাড়ী চলতে শুরু করল! কোলকাতায় ঢুকলাম পাঁচটায়! বাকীটা তো ইতিহাস- অর্কুটের পাতায় প্রোথিত হয়ে আছে মানে ফোটো এলবামে আর কি…

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s