(৩৭)


পাঠক/পাঠিকাগণের নিশ্চয় গনশাকে মনে আছে আরে যে তার শ্যাম নাম্নী কুত্তাটিকে দিয়ে রাজ্যের এক্সপেরিমেন্ট করায় আর বানর বলে গালাগাল দিয়ে তার সেলফ এষ্টিমটিকে ধূলায়িত করে। ক দিন আগে পথ ভুলে আমার বাড়ি এসেছিল- একটা বেশ কাজের কথা বলে গেল সেদিনঃ
Bengalis are good travelers but worst tourists.

যেখানেই যাবে তিন টাকার মালটাকে আড়াই টাকার ফন্দি ফিকির। পূর্বোত্তর রাজ্যগুলো থেকে ওই কারণেই খেদানি খেয়েছে হয় তো। রাজধানীতে এসেও শান্তি নেই ‘না ঘরকা না ঘাটকা’ হয়ে ঝুলে আছে ত্রিশঙ্কুর স্বর্গে- বাচ্চা বাচ্চা বাঙালী বাচ্চাগুলো বাঙলা পড়তে পারে না- বলতে লজ্জা পায় আর ‘অউর ইয়ার’ অথবা ‘ইয়ো ইয়ো’ করে শিম্পাঞ্জী ও বেবুন আমাদের জ্ঞাতিগুষ্টি এই কথাগুলো মনে পরিয়ে দেয়।

নিজের মুখে আর কতো নিজের বদনাম করি, (তবে জনান্তিকে বলে রাখি আমার পদবী সিংহ হবার জন্য লোকে আমাকে বিহারি এবং দেখতে মালায়লিদের হবার জন্য নির্দ্বিধায় অবাঙালি ভেবে confused হয়) তা গনশার কথার পুনরাবৃত্তি করিঃ

“ঘুরতে গিয়ে যেখানেই যাস না কেন গিনিপিগের মতো বাঙালি দেখবিই দেখবি।”

সেই রকম কিছুই হলো এই রোববার। বহুযুগ পরে (লজ্জার কথা আর কি বলি বলুন, ছেলেকে নিয়ে প্রথমবার, অবশ্য ছেলে আলাদা করে তার দাদু ও স্কুলের সঙ্গে গেছিল)কুতুব মিনার গেলাম।

শীতের দুপুর নক্সিকাটা সূর্যের আলোর মনোরম উপস্থিতির ভিতর দিয়ে কোনোক্রমে উট এবং ষাঁড়ের বর্য পদার্থ বাঁচিয়ে গাড়ি পার্ক করে এগিয়ে গেলাম পঙ্গপালের দলে সামিল হবার জন্য। এবং যথারীতি, “পিন্টু এদিকে এসো, সরে সরে যেও না”, “ বড়দা একটা চিপ্স নিচ্ছ নাকি?” “মা কতবার হলো এই নিয়ে?” “এই তুমি এখানে হাঁ করে দাঁড়িয়ে দেখছ কি? যাও না লাইন তো বেড়েই চলেছে! অকর্মার ঢেঁকি একেবারে” ইত্যাদি এবং ইত্যাদি। যথারীতি এদের বাঁচিয়ে এগিয়ে চললাম নাহলে বলা যায় না বলতেই পারেন, “দাদা আপনিও বাঙালি?” তারপর ধরে বেঁধে গাইড বানিয়ে নিলেই চিত্তির আর কি…

ভিতরে গিয়ে অজানা এবং জানা ইতিহাস পুরোনো এবং নতুন ইতিহাস ভেঙে পড়া এবং গড়ে ওঠা ইতিহাসের সাক্ষী করলাম ছেলেকে। খুব উত্তেজিত- আজকাল যাকে পারে জি কে-র প্রশ্ন করে উতকন্ঠিত করে তুলছে। দাদু কন্যাকুমারী থেকে ফোন করেছে, “দাদু, বল তো কন্যাকুমারীতে কটা সাগর?” সে তবু চলে, অবিরাম বর্ষণের জন্য রামেশ্বরম ট্রেন যায় নি গাড়ি করে যেতে হয়েছে, চাপের একশেষ, “দাদু প্রথম ট্রেন লাইন ইন্ডিয়াতে কোথায় হয়েছিল বলো তো?” নাটকের মহলা দিতে গিয়ে সহ অভিনেতাদের ভিতর বিষম রোগটা ঢুকিয়ে দিয়েছে আর তাদের ভয়ানক উত্তেজিত পিতামাতাদের সামলাবার জন্য এগিয়ে দিয়েছে মুশকিল আসান বাবাকে।

যাই হোক গে, প্রতিটি প্রস্তর ফলককে নিয়ম করে ইংরাজী, হিন্দি এবং বাংলা(এটা শুনে, মানে আসে পাসের দর্শনার্থীদের মুখ থেকে শুনে)ভাষায় বুঝে নিয়ে গল্প করার জন্য প্রস্তুত হয়ে, দুই আঙুল, দু হাত এবং পরিশেষে মুঠোর মধ্যে কুতুবকে ধরে ফিরে আসলাম বর্তমানের জগতে। হাজার বছরের ইতিহাস ধীরে ধীরে গাছপালা এবং সন্ধ্যার মনোরম সূর্যাস্তের আড়ালে হারিয়ে যেতে লাগল। ছেলের ভালোলাগা সম্পুর্ণ করার জন্য গোলমার্কেটের গ্যালিনায় মাটন শিক রোল এবং চিকেন টিক্কা রোল খেয়ে টইটম্বুর হয়ে বাড়ি ফিরে এলাম- রাতে ঘুমোতে যাবার সময় দেখলাম ছেলে এতটা পথ হেঁটে হেটে ঘুরে বেরাবার পর পরিশ্রান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু মুখে একটা তৃপ্তির হাসি লেগে আছে দেখে আধো অন্ধকারেও নিজের জাজ্জ্বল্যমান মুখের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠলাম। ঠিক করলাম- বাড়িটা খাবার এবং ঘুমোবার জন্য ভালো যায়গা বটে কিন্তু বড় হয়ে উঠতে গেলে তো বেরোতেই হবে- ঘর হতে শুধু দু পা ফেললেই তো…

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s