(২৭)

পঙ্গপাল দেখেছেন নিশ্চয়- বাস্তব জীবনে না দেখুন টিভির পর্দায় ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক বা ডিসকভারি। যখন আসে ঝাঁকে ঝাঁকে আর উড়িয়ে পুড়িয়ে গুঁড়িয়ে দিয়ে যায়। মনে হচ্ছে আমার উপর পঙ্গপালের আক্রমন হয়েছে। ঝাঁকে ঝাঁকে সবুজ সবুজ কালো কালো ঘটনার ঘনঘটা হয়েই চলেছে ক্রমাগত।
কাল গিয়েছিলা্ম তাপস দার বাড়িতে- তাপসদা সুতপা দি সজ্জ্বন- সুন্দর আপ্যায়ন তো করলেনই কিন্তু তার সঙ্গে সক্কালে বেলা যাবার আগেই ফোন করে বলে দিলেন বাইক নিয়ে আসিস না গুরগাঁও জলের তলায়। একে রোব্বারের সকাল, তার উপর বৃষ্টি একটা গাড়ি ভাড়া পাওয়াই ঝঞ্ঝাট। তাও ভাইয়ের সহায়তায় একটি গাড়ি বুক করা গেল- ড্রাইভার নেপালী একটা পুরানো ওয়াগন আর নিয়ে।
যেতে যেতেই বুঝলাম কস্মোপোলিটান মায়ানগরীগুলো প্রকৃতির চাপের কাছে কতটা অসহায়। যাইহোক খাওয়া দাওয়ার পর তাপস দাকে নিয়ে একটা মিটিং-এ যাওয়ার ছিল। ফেরার পথে তাপস দাকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে যাব। মিটিং শেষ হতে হতে ৮টা বাজলো। বেড়িয়ে তাড়াতাড়ি তাপস দার বাড়ির দিকে যেতে গিয়েই চিত্তির। গাড়ি গেছে বন্ধ হয়ে – ঘড়ড় ঘড়ড় করেই যাচ্ছে! ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করতে বলল- CNG খতম হো গয়া- পেট্রল সে চালু নেহী হো রহা।থোড়া ধাক্কা দে দিজিয়ে।
তাপসদা কাল ভুল ভাল অনেক কিছু খেয়েছেন- বেগুনী, মুড়িমাখা, দই, মিষ্টি ইত্যাদি। সুতপাদির প্রেস্ক্রিপসন অনুযায়ী ক্যালোরি ঝরাতে হবে। এর থেকে কি ভালো সুযোগ আছে?
আর গায়ের জোর দেখাতে পারলে আমি এক পায়ে খাড়া। শুরু হল পথ চলা শুরু হল গাড়ী ঠেলা। কিন্তু গাড়ী শুরু হলো না। আধা ঘন্টা অনেক কসরত এবং কিলোমিটার খানেক পর। ফোন লাগালাম গাড়ীর মালিককে আর ভাইকে! বললাম “আমি বাড়ি যাব! তোমরা বোঝাপড়া করে নাও”। বোঝাপড়া কি হলো জানি না মালিক সর্দারজীর ফোন এলো- তাকে সবে বলেছি যে ক্যায়সে গাড়ি ভেজতে হো- সে দেখি আমার উপরেই গরম নেয়! আমি ঘড়ি দেখলাম তখনো তো বারোটা বাজে নি। ড্রাইভারকে দিলাম- সে বেমালুম বলে দিল যে আমায় নাকি বলেছিল CNG ভরার দরকার আছে- আমি নাকি ভরতে দি নি! ঢপের বাপ একদম। যাইহোক ঝামেলার মধ্যে আর বেশী ঝামেলা করে লাভ নেই তাই ভাবলাম ক্যাব বুক করি! কিন্তু বৃষ্টির রাত্রে একটাও ক্যাব পাওয়া গেল না!
শেষে সর্দারজির কাছেই ফিরলাম- সে ততক্ষণে আমার ভাইকে আওয়াজ দিয়ে দিয়েছে “বিল্ডিং সে ফিকোয়া দুঙ্গা”। অফেন্স ইস দ্য বেষ্ট ডিফেন্স। যাইহোক মাথা ঠান্ডা রেখে একটু জ্ঞান দিলাম যে এই সময় মাথা গরম করলে কত মুস্কিল। যদিও মুস্কিলটা আমারই বেশী তবুও সর্দার বলে মেনে নিতে অসুবিধা করল না। বলল “দেড় ঘন্টা দিজিয়ে দুসরা গাড়ি ভেজ রাহা হুঁ”। তখনই বাজে ৯টা কিন্তু কিসসু করার নেই ভেবে তাতেই ঘাড় নাড়লাম।
তাপস দা ততক্ষনে সুতপা দিকে ফোন লাগিয়ে বলেছে যে গাড়ি নিয়ে আসতে। অপেক্ষায় থাকলাম। নেপালী ড্রাইভারের গাড়ি নিয়ে খুচ খাচ চলছিলই, শত বারণ সত্ত্বেও কমে নি! ফল স্বরুপ গাড়ির ব্যাটারি বিগড়ে গেল- একদম সাহারায় শিহরণ, গুরগাঁও-এ গন্ডগোল।
তাপস দা তখন ফ্যালনা পাবলিক- ভুসভুসিয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে। আমি ছেলেকে নিয়ে গাড়িতে বসে আছি। অনেক confusion-এর পর সুতপা দির গাড়ি নিয়ে আগমন ঘটল অনেক খোঁজা খুঁজির পর। ফিরে গেলাম- অপেক্ষা করতে থাকলাম আর আডডা চলতে থাকল- আগেই বলেছি সজ্জন পরিবার- তাই বিরক্তি নেই হাসি মুখেই ঠ্যালা সামলাচ্ছে! কিন্তু ঘড়ির কাঁটা ঘুরেই চলেছে আর দ্বিতীয় গাড়ির দেখা নেই! কতক্ষন আর গ্যাঁজানো যায়-ফোন করেই যাচ্ছি আর দ্বিতীয় ড্রাইভার টিপিকাল ভোজপুরী উচ্চারনে বিভিন্ন রকম ভাবে “ব্যস দো মিনিট” বলে যাচ্ছে। পাঠক পাঠিকাগন সত্যজিতের ‘পটলবাবু ফিল্মস্টার’ মনে করুন! কতরকম ভাবে ‘আহ’ বলা যায় সেই আর কি। ঘড়ি ঘুরছে আর অস্থিরতা বাড়ছে- এগারোটা গাড়িটা আগের গাড়ির কাছে এসে পৌছেছে। আবার সেই দু মিনিট- দুটাকে দশ ভেবে তৈরী হয়ে বসলাম- দশ গিয়ে বিশ ত্রিশ শেষে চল্লিশ হলো কিন্তু দু আর হলো না। শেষে তাপস দা বিকট চিৎকারে বকা লাগালার দুমিনিটটা এক হতে একটুও সময় লাগল না।
ভোজপুরি এসে বলল ‘কিতনা ঝামেলে মে ফাঁস গয়া’। আমি মনে মনে কিড়মিড় করলেও মুখে একটা বিদগ্ধ পলিটিশিয়ান মার্কা হাসি ঝুলিয়ে রেখে বললাম চলিয়ে- ভাবলাম যাক বাবা এবারের ফিস ফাসটা আর বেশী বড় করব না।
কিন্তু বিধি বাম। সে নিয়ে গেল আগের গাড়িটার কাছে তারপর আগের গাড়িটার সামনে চেন বেঁধে শুরু হল টানা। সে টানা বলে টানা? একজন ৫০-এ গাড়ি ছোটাচ্ছে তো আরেকজন ব্রেক মেরে দিচ্ছে দুরুম করে! একজন ব্রেক মারছে তো আরেকজন ক্লাচ! ক্ষণে ক্ষণে গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে তর্জা। ভোজপুরী এক মুন্ডা সর্দার ড্রাইভার নিয়ে এসেছিল। ভোজপুরী, সর্দার আর নেপালী মিলে কি ভয়ানক ভাবে নিজ নিজ ভাষায় ঝগড়া করতে শুরু করল প্রতি ৩ কিমি অন্তর যে আমি ভাবতে লাগলাম নীরেন চক্কোত্তি হলে এটাকে কি ছন্দ বলবেন? চক্করবৃত্ত ছন্দ?
গাড়ীদ্বয় আর শিকল বোধহয় ভীষণ বিরক্ত হয়ে পড়েছিল- হাজার হোক ওদের তো কোন তাড়া নেই আর অভিধানী তর্জা কাঁহাতক আর লোকে সহ্য করতে পারে আর এ তো যন্ত্র। মোতিবাগের কাছে এসে কটাস করে চেন নিজের নাক কেটে আমাদের যাত্রা ভন্ড করল। যাব না ব্যস! কি করবি তখন আবার তিনজনে মিলে তিনপাত্তি খেলতে থুড়ি তিনটে লোহার পাত্তি নিয়ে চেন জুড়তে বসে গেল।
শেষ মেষ কখন যে খেলা ফুরিয়েছিল আর কখন বাড়ি পৌছেছিলাম তার ইতিহাস তো তাপসদার মোবাইলে গ্রথীত আছেই তবে তাপসদার টাইমিং-এর জবাব নেই! বলেছিল একটা ফোন করে দিস পৌঁছে- কিন্তু বাড়ি পৌছন মাত্রই নিজেই ডায়াল করে জিজ্ঞাসা করে বসল পৌছলি- আমি বললাম ‘অবশেষে’। তারপর আজ উঠতে বেশ দেরী করলাম! দু পাঁজরে আর হাঁটুতে বেশ ব্যথা নিয়ে অফিস যেতে গিয়েও ভারত বন্ধের জন্য ফিরে এসে মেট্রো ধরলাম এবং এই সফরটা বিশেষ তামঝাম ছাড়াই শেষ হয়াতে বেশ অবাক হলাম তাই আর বেশী হ্যাজালাম না।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s