(৩৩)


নাহ আমি ইস্তানবুল বা “জাপান কা বুল” গিয়ে রান্না শিখি টিখি নি তবুও যদি জিজ্ঞাসা করেন তাহলে মুনমুন সেনের মতো বলতে হয়, “আমি কেন রান্না করি? দারুণ লাগে।”

আর জনান্তিকে জানিয়ে রাখি দু পয়সা রোজগারও হয়- অবশ্য দু পয়সা বললাম আর পাঠক পাঠিকা বিশ্বাস করে নিলেন এমন তো নয়। তবে ধরে নিন ১৯৪২-এর দু পয়সা।

সবাই এবার আমায় ছিঁড়ে খাবার উপক্রম করবেন, যদি জানেন যে আমি এই কথাগুলো মান্ধাতা আমলের p3(শুনলেই সেই হোসিয়ারীর দিনগুলো মনে পড়ে যায় না?) মেশিনে বসে লিখছি- নাহ রবীন্দ্রনাথের গুপ্তধনের মতো কোনো ঘটনা নয়।

এ সব দু পয়সার গল্প ঘটে কালা ভদ্রে- বছরে একবার আসে- তাও দূর্গাপূজো এবং আনন্দমেলা(নাহ এটা সেই একদা নির্মল অধুনা ডেঁপো অপ্রাপ্তবয়স্কদের পত্রিকা নয়) নাম নিয়ে।

বুঝলেন না? আরে বাঙালীর হুজুগ বলে কথা। দূর্গা পূজা হবে তো স্টল লাগানো হবে না? আর স্টল আর খাদ্য দ্রব্য সমার্থক হয়, অন্তত বাঙালীর কাছে। জেঁকে বসে টেবিল নিয়ে খান কুড়ি মহিলা এবং সংখ্যালঘূ পুরুষ গোলাপ ফুল, ধূপ ধুনো, চার্ট পেপার ইত্যাদি দিয়ে সাজিয়ে বসেন সঙ্গে হাঁড়ি কুড়ি ডেকচি কড়াই থেকে শুরু করে অধুনা মাইক্রোওয়েভ অবধি সব টেবিলের উপর সাজিয়ে অধ্যাবসায়ের সঙ্গে কাষ্টমার নারায়ণ সেবা করে চলেন ঘন্টা দুয়েক কড়কড়ে হরিয়ালি পাত্তির বিনিময়ে। তার সঙ্গে চিরন্তনী বুলি, “মা ঠাকুমা দিদিমা শ্বাশুড়ি(যেন আমারটা আমায় কতো ভালোবাসে এবং বাকিরা তো বঞ্চিত …) সবার সঙ্গে মন দিয়ে ঘাড় নীচু করে হাত পুড়িয়ে শিখেছি।”

সব শুনে টুনে ভাবলাম, আম্মো দি গরুর গা ধুইয়ে।যেমন ভাবা তেমন কাজ- দুদিন আগে ডানাওলা খাদ্যসামগ্রী ধুয়ে মুছে সাফ করিয়ে টুকুস টুকুস করে কাটিয়ে ঝোলের বড়ির মতো কাটিয়ে কুটিয়ে নিয়ে এসে ডুবিয়ে দিলাম যতন করে রাখব তারে মার্কা ম্যারিনেশনের পুকুরে। তারা বেশ নধর ব্যক্তিত্ব নিয়ে লাল সাদা হলুদ সবুজ রঙে কপাত কপাত করে ঢুকে গেল সরু মোটা শিকে- তারপর শুরু হলো ষ্টীম নেওয়া- কুক্কুট শ্রেণীর প্রাণীরা মানুষের থেকে উন্নত তাই গনগনে আঁচেও দিব্যি রঙ পালটে বহুরূপী হয়ে উঠতে পারে।

তারপর সবকটাকে গামলা বন্দি করে রাখা হলো তুলে- অনেক হয়েছে পরেরটা পরেই হবে। তারপর শুরু হলো আসলি রূপচর্চা। আরে কুক্কুট বলে কি এরা মানুষ নয়। সওনার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হলো।একবারে হলো না, দুবার- পেঁয়াজ, টমাটো, আদা রসুন, লঙ্কা তেজপাতা, জায়ফল জয়িত্রী, লবঙ্গ দারচিনি- সবাই মিলে আগে নিজেরা মাখলো তারপর কুক্কুটবড়িদের মাখালো তারপর সওনায় ঢুকলো- সে কি ঢোকা, বাপরে, ঢুকে আর বেড়োতেই চায় না। ঘড়ির দিকে নজর নেই! ডুবছে তো ডুবছেই। অগত্যা দেখে ময়দা, ঘি আর দই দিয়ে কুড়মুড়ে ম্যাট্রেস বানাবার প্রস্তুতি নেওয়া হলো। সব করে টরে- সংসারকে গাড়ির পিছনে মাথায় সামনে বুকে বেঁধে রওনা দিলাম আনন্দমেলার উদ্দেশ্যে।

গিয়ে দেখি, সাস বহুরা মিলে খাবার দাবার নয়, কুচুটেপনাও আমদানী করেছেন। “আমি তো আগে থেকেই এখানে দুটো জায়গা করে রেখেছি, আপনি এখানে জিনিস রেখে গেছিলেন নাকি? দেখি নি তো- ও হো ওদিকে যান না? ওই কোণে…” ইত্যাদি ইত্যাদি। Who cares, আমার হাতে তখন জাদুমন্ত্র আছে। কপাত করে গ্যাসস্টোভ খুলে চাটু চড়িয়ে ম্যাট্রেসগুলোকে ঘিএর পাকে পাকিয়ে কুড়মুড়ে করে তোলার কাজে মন দিলাম। আরেক দিকে তখন বিশাল বড় সুইমিং পুলে কুক্কুটদের সওনা হচ্ছে। মনোরম পরিবেশ- সঙ্গে হাজির লহসুনির রায়তা।

দেখলাম গুটি গুটি লোকজন হাজির এবং মেনু দেখে বিন্দাস হিন্দিতে কথা বলতে শুরু করল (বাঙালীর এই দোষ, বহুত চালাক ভাবে নিজেকে) ঠিক এই সময় আমার বুকে রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিত রায় উত্তমকুমার এবং রঘু ডাকাত হু হু করে জেগে ওঠে। পিচিক করে হেসে বলে দি, “আমি বাঙালী” (যা একখান থোবড়া বানিয়েছি- আমার বাবাও বলবে না আমি বাঙালী!!)

তার পর আর কি? “এটা কি চিকেন? পূজো মন্ডপে চিকেন? কত করে দিচ্ছেন? দুটো পরোটা? আরেকটা দিয়ে দিন না- বেড়ে দেখতে লাগছে কিন্তু- খেতে কেমন? (যেন আমি গান্ধিজীর মন্ত্রশিষ্য) রায়তাও দিচ্ছেন? দাদা প্লিস ৫ প্লেট বানিয়ে দিন না- আমি কি খারাপ দেখতে? (হ্যাঁ, পাঠক পাঠিকা, এটাও শুনতে হয়েছে!!)” ইত্যাদি এবং ইত্যাদি।

মাঝে জাজেরা এসে ঘুরে গেলেন, “What is this, ok- so how did you prepared it? Did you do it on your own? (যেন আমি জিগস কালরার জামাই- আদর করে অন্য একটি ষষ্ঠী পূজো করা হয়েছে)” আরে ধুর! কে তখন জাজেদের পাত্তা দিতে গেছে? খদ্দের পরম লক্ষী, সরস্বতী, কার্তিক, ওলাইচন্ডী এবং বিপাশা বসু! বেজার মুখে বললেন, “Should we come later?” ঘপাত করে অজয় দেবগণের মতো ঘাড় নেড়ে দিলাম- এতটা বোধহয় আশা করেন নি। ম্রিয়মান হয়ে চলে গেলেন। আমি তখন যোগান দিয়ে উঠতে পারছি না। গিনিপিগের মতো পিল পিল করে খদ্দের আসছে। বাবা রে বাবা! আমার হেল্পার ছেলেটিকে বললাম reserve বার কর, চটা চট পরোটা ব্যাল আর কটাকট আমি ভাজি।

এক প্রীতি জিন্টা আমার পরোটার প্রতি (আমার প্রতি নয় কিন্ত) প্রীত হয়ে গিয়ে ৪০ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন আমার সামনে, (আচ্ছা বিস্যামিত্র কি পাচক ছিলেন?) এবং শেষ হবার পর হেইসান মিষ্টি করে বললেন, “খুব সুন্দর ( আমি নই, পরোটা এবং চিকেন টিক্কা মশালা!!)” মনে হলো চাটুটাই গিফট করে দি। কিন্তু সে কি আর করা যায়? আমি আবার পরকিয়া নারকীয় উল্লাস অনুভব করি!

যাই হোক টানা আড়াই ঘন্টা শচীন তেন্ডুলকরের ফিটনেসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমার নটে গাছটি মুড়োলো এবং খরচের খাতা নিয়ে বসে দেখলাম, লাভের গুড় পিঁপড়ে একা শেষ করতে পারে নি- পূজোটা স্বচ্ছন্দে ‘ওহ ক্যালকাটা’য় কাটানো যায়। তারপর আয়োজকদের মধ্যে একজন এসে আবার আমার তেল চপচপে হাত ধরে নাড়িয়ে টারিয়ে দিয়ে বলে গেল তৃতীয় পুরস্কার জুটেছে। আর আমার নিজেকে গোপাল ভাঁড় মনে হলো- সেই বাচ্চা গোপাল- আলুর আড়ত পুড়ে যাবার পর পেট পুড়ে পোড়া আলু খেয়ে আড়তদারকে জিজ্ঞাসা করেছিল, “ হ্যাঁ গা, তোমাদের আড়ত আবার কবে পুড়বে?”

এগারোটা নাগাদ যখন গাড়ি চালিয়ে ফিরে এলাম- ডানদিকের পিছনের পকেট আর সামনের এফ এম তখন একসঙ্গে গাইছে, “তুম যো আয়ে জিন্দেগী মে- বাত বন গই…” এবং ইত্যাদি!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s