(৪৬)


এই অধ্যায়ের নাম দেব ভেবেছিলাম “Close encounter of a third kind”। না কোনো কল্পবিজ্ঞানের সিনেমা নয়। এমনিই ভেবেছিলাম… কিন্তু তারপর মনে হল বাকি প্রথম আর দ্বিতীয়টি কি হবে তাহলে?

তারপর ভেবে ভেবে বের করলাম যে প্রথম মোকাবিলা তো আমরা আমাদের সঙ্গে আধবোজা চোখে মুখে ফেনা নিয়ে করে ফেলি সকালবেলায়… নিজেকে জিজ্ঞাসা করে নিই, “কি সব ঠিক তো? আজ কিছু কেলো করবে নি তো আবার?” পরেরটা তো ধরে নিতেই পারি আমরা সারা দিন ধরে যত লোকের সঙ্গে কথা বলি বা কথা না বলে পাশ কাটিয়ে যাই…সেই সব মানুষদের সঙ্গে…

তাহলে তৃতীয় রকমটি কি? আরে বাবা মানুষ ছাড়াও তো মানুষ আছে পৃথিবীতে, কুকুর বিড়াল বলে কি আর মানুষ নয়?
কটা পুরনো সেই দিনের কথা ঘষে মেজে নিয়ে তাপ্পর, সদ্য ভূতপূর্ব ঘটনাটায় আসব…

ঘটনা একঃ মানুষের পূর্ব পুরুষ বাঁদর আর ভগবানের পূর্বপুরুষ বোধহয় হনুমান… সব করিতকর্মা লোককেই দেখেছি হনুমানজির পূজো করতে। তা সেই হনুমানের হাত থেকে খুব জোড় বেঁচেছিলাম বছর চারেক বয়সে মাউন্ট আবুতে… একা একা হলিডে হোমের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে মুখপোড়াগুলোকে দেখে (তখন অবশ্য শব্দটার আক্ষরিক অর্থ বুঝতাম না… অমলিন ছিলাম কি না?) কিছু একটা নিশ্চয় করেছিলাম… নিদেন পক্ষে ফুসমন্তর পড়েছিলাম “এই হনুমান কলা খাবি ইত্যাদি…” কিন্তু হাতে কলা না নিয়ে বাঁদরামো করতে গিয়ে বেকায়দায় পড়ে গেছিলাম… তেড়ে তাড়া করে তারা, কোনো রকমে রিভলভিং গেট দিয়ে টুকুৎ করে গলে প্রাণে বাঁচি…

ঘটনা দুইঃ তার পরের বছর মুসৌরিতে মাসতুতো দাদা (চিন্তা নেই সঙ্গে তার বাবা মাও ছিল বটে)-র সঙ্গে হলিডে হোমের জন্য দৌড়ে নামছি(এই হলিডে হোমগুলি একটিও সমতলে হয় না কেন কে জানে?) সামনের একটা বাছুরের মতো কুকুর যাকে যমদূতের মোষ বলে ভুল হতে পারে, দৌড়তে এবং ঘৌ করতে শুরু করে… আমি আসলে আজম্ম ফিট, মাসতুতো দাদার সঙ্গে দৌড়তে দৌড়তে দেখতে পাই, বড় জানলাটা খোলা, একলাফে সেখান দিয়ে ঢুকে প্রাণ বাঁচাই। মাসতুতো দাদা আজন্ম ভোদকা… সে দৌড়ে দরজার উপর গিয়ে পড়ে, কিন্তু দরজা খুলবে কে? বড়রা তো পিছনে। কিন্তু তার আগে তো দাদার পিছনে ছিল বাছুর কাম মোষ কাম কুত্তা সে গিয়ে ঠিক সেকেন্ড ব্র্যাকেটের মতো তাকে ঘিরে দাঁড়ায়… কি হয়েছিল জানি না… শিক্ষিত কুকুর তাই আঁচড় পড়ে নি কিন্তু মাসতুতো দাদা হঠাৎ ঢুকেই বাথরুমের দিকে দৌড়ে চলে গেছিল… ছোট বলে কি আর সম্মান নেই গো।

তারপর খোলা খিল এবং ব্যাট দিয়ে সাপ মারা, হিংস্র কুত্তার হাত থেকে পেটোয়া কুত্তা কে বাঁচাতে বাঁশের প্রয়োগ, গলায় পচা মাছের গন্ধ বিশিষ্ট সাপ জড়িয়ে ছবি তুলে, রাত বারোটার সময় বন্ধুর বাড়ি থেকে ফেরার সময় পশ্চাতদেশের বিজ্ঞাপনরত গরুর গায়ে বাইক মেরে গৌরাঙ্গের ন্যায় সারারাতব্যাপী হরিসংকির্তন পেরিয়ে এসে পড়লাম বর্তমান ঠিকানায় যেখানে… ঠিক ধরেছেন বাঁদরের উপদ্রব বেশ বেশী।

তাই সোজা সুজি তৃতীয় ঘটনা…
অফিস থেকে ফিরেছি সবে… হঠাৎ কুমড়ো পটাশের মাসতুতো বোন প্রতিবেশিনী এবং বরবটির ন্যায় তার দুই মেয়ের চিৎকার শুনে বারন্দায় বেড়িয়ে দেখি তাদের ব্যালকনিতে, একটি ধেড়ে সাইজের বাঁদর বসে এক মনে কাপড় শুকবার ক্লিপ চিবিয়ে যাচ্ছে। ভিতরের বীরপুরুষ জেগে উঠল এবং আমার এক এবং অদ্বিতীয় অস্ত্র ব্যাট নিয়ে ভীম ভবানীর মতো তাদের ব্যালকনিতে গিয়ে উপস্থিত হলাম… মাকড়াটা (এটা আক্ষরিক অর্থ কিন্তু) আমার দিকে জুল জুল চোখে দেখছিল, আমি কিন্তু চোখাচোখি করি নি… শত্রুকে আক্রমণ অতর্কিতে করতে হয় বলে, যেন দেখতেই পাই নি এমন ভাবে বাঁদরের বাঁদিকে গিয়ে হাজির হয়ে দুম করে ঘুরে রাহুল দ্রাবিড়ের ন্যায় ধ্রুপদী পুল মারি এবং বাঁদরটির লাল পশ্চাতদেশ টুকটুকে করে দিই… সে ব্যাটা বাঁদুরে ভাষায় গালাগাল দিতে দিতে পালায়।

এর কিছুদিন পরে এক বন্ধুর সঙ্গে মোবাইলে কথা বলতে বলতে সিঁড়ি বেয়ে উঠছি… হঠাৎ দেখি শমনের মতো তিনি বসে আছেন… আমি তো ভাবলাম গেলাম… তবু সাহস নিয়েই তার দিকে না তাকিয়েই উঠতে শুরু করলাম… সে আমায় বেশ দাঁত মুখ খিঁচিয়ে, মানুষের বাচ্চা ইত্যাদি বলে গাল দিতে শুরু করল… এই সময় বুদ্ধিমানের কাজ হল পাত্তা না দেওয়া… বাঁদর বলে কি মানুষ নয়? মান হুঁশ দুটোই বর্তমান তাই স্রেফ ইগনোর করে দেওয়ায় লজ্জায় মুখ লাল করে কেটে পড়ল এবং আমাকে একটা সেলফ টিচিং লেসন দিয়ে গেল… বাঁদর তো বটেই, মানুষ পর্যন্ত বাঁদরামো করলে আজ পর্যন্ত স্বচ্ছন্দে ইগনোর করে দিই… তাতে কিন্তু অনেক ভালো থাকি…

শেষ ঘটনাটা বেশী দিন নয়, এই গত পরশুর… রান্না ঘরের গ্রিল বেয়ে একটা বিড়ালের সাইজের ইঁদুর ঘরে ঢুকে পড়ে, আমার বাড়িতে যে ছেলেটি থাকে সে পায়ে কারেন্ট লাগছে এমনি করে তিড়িং বিড়িং নাচতে থাকে… আমার ভাই “ভয় কি রে পাগল মা কি তোর একার?” মার্কা মুখ করে এক মনে নারায়ণ স্যান্যালের ভুষ্টিনাশ করতে থাকে… উপায়ান্তর না দেখে ছেলেটিকে একমাত্র ভরসা ব্যাট আনতে পাঠাই এবং সদর দরজাটা খুলে দিই… তা ব্যাটা ব্যাটও খুঁজে পেতে দেরী করছিল আর সেই ইঁদুর জানলার উপর গণেশ মূর্তির মাথায় ওঠার চেষ্টা করছিল…

সৃষ্টি পুরোপুরি উলটে যাবে এমন অনাসৃষ্টি কি সহ্য করতে পারি? তাই নিজেই বীর বিক্রমে ড্রপকিক মেরে ঘরের দরজা খুলে ব্যাট বার করে এনে কিছুটা বিলিয়ার্ড কিছুটা ঝাঁঝরি পরিষ্কার কিছুটা সোফা সরিয়ে এবং শেসে নিখুঁত কভার ড্রাইভের মাধ্যমে দরজার পাল্লার পাশ দিয়ে মালটাকে বাউন্ডারির বাইরে বার করলাম… সেই মালটা কার পাল্লায় পড়েছে বোঝার আগেই সিঁড়ি দিয়ে পগার পাড়… নিজের প্রেসিশন দেখে নিজেই গর্ব বোধ করলাম। সময়কালে এরকম কভার ড্রাইভ মারতে পারলে কভার এক্সট্রা কভার সব দর্শক হয়ে হাততালি দিত আর বলবয়ের কাজ করত…

যাই হোক মানুষের জীবন তো খেলার মাঠ…সে তো শেক্ষপীর কবেই বলে গেছেন… তাই আরও অনেক এনকাউন্টারের মাধ্যমে জীবনের বাধা বিপত্তি এবং কনফিউশনগুলি দূর করতে করতে আরেক এনকাউন্টারের জন্য বসে আছি… ফোর্থ ডাইমেনশনে যার সঙ্গে দেখা হবে যদি সত্যিকারের মানুষের মতো মানুষ হতে পারি… তাই আত্মাক্ষরিকতা (সেলফ একচ্যুয়ালাইসেশনের বাংলা… এখুনি আবিষ্কার করলাম… কি দারুণ না?) অর্জন করার আশায় দিন গুনে চলেছি… বাঁদরামো জিন্দাবাদ।।

One thought on “(৪৬)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s