(৫১)


সব পুরুষেরই ছোটবেলা থেকে একটা স্বপ্ন থাকে, প্রেমিকার কাঁধে মাথা রেখে স্বপ্ন দেখার। বড় হলে বা বুড়ো হলে সেই স্বপ্নটাই কি বদলে যায়? নিজেরটাকে নিয়ে জেরবার হয়ে অন্যেরটার দিকে হাত থুড়ি মাথা বাড়ায়?

জানি না, আমার দুশ্চরিত্র বলে বিশেষ (?) বদনাম নেই। শ্রীরামকৃষ্ণের মত না হলেও বা আমার এক পরিচিত বোন পাতানো বন্ধুর মত হ্যাঁ হলেও পরের ধনে পোদ্দারি করাটা আমার স্বভাব এবং অভাববিরুদ্ধ।

তবে আমি মাঝে সাঝে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে সফর করতে করতে ঘুমোই। দুই থেকে দশ মিনিট। তার পরই একদম ‘কামাল কি তাজগি’। ছোটবেলায় বাসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমিয়েছি, বসে বসে তো কথাই নেই। বাসে সিট পেলেই বাইরের দুনিয়ার দরজা পত্রপাঠ বন্ধ। স্বপ্নের দুনিয়ার সফর করতে করতে ‘কিম আশ্চর্জম’ ঠিক গন্তব্য আসার আগেই ঘিম ভেঙে যেত স্বপ্নাদিষ্টের মতই।

চাকুরী জীবন শুরু করেছিলাম হুগলী জুটমিলে- দেড় ঘন্টার রাস্তা পেরিয় ছটায় হাজিরা দিতে হত। তার উপর আবার রাত জেগে চাকুরীর পরীক্ষার পড়া… আরে বাবা শরীরটাকে তো রাখতে হবে? তাই জাবদা লেজার খুলে এক হাতে ধরে মিনিট পাঁচে নিশ্চল হয়ে ঘুম মারতাম। কেউ ধরতেই পারত না যে রেকর্ড মেন্টেন না করে আমি স্বপ্নের সমুদ্রে ডুব ডুব ডাব খেলছি। যাই হোক গে গিয়া

স্বভাব যায় না মলে আর অভাব যায় না শুলে…

তাই বসে বসে ঘুমের অভ্যাসটাকে স্বচ্ছন্দে বয়ে চলেছি আজও। হ্যাঁ আজও…

আজকেই দেখুন না, অফিস থেকে ফিরছি… মেট্রো করে বহুদিন পরে। হঠাৎ, নাছোড়বান্দা মশার মতো পোঁ ধরে এলো ঘুম, চোখ জুড়িয়ে গেল। হঠাৎ মনে হল কে যেন বেঁকে যাওয়া বই সোজা করে দিল আমার মাথাটাকে ঠেলে। চোখ মেলে চেয়ে দেখি চিত্তির… এক সুন্দরী সদ্যবিবাহিতা (ওরে বাবা হাতে চুড়া পড়ে রে তারা… মেয়েদের লেবেলিং-এর অনেক রকম রাস্তা আছে হে… সিঁদুর, আলতা, শাঁখা টাখা আরো কত কি… সুন্দর জিনিস একটু যত্ন করে রাখতে হয় কি না?) আমার পাশে বসে আমার দিকে বড়ই ব্যথিত নয়নে তাকিয়ে আছে। না না মেট্রো রেলের মধ্যেই কিছু করার মত দুশ্চরিত্র আমি নই হে। আর তার সঙ্গের পুরুষ সঙ্গী ডমিনোজ-এর কাজটি করে আমার দিকে কটমটিয়ে আছে। আমি তো বিষম টিষম খেয়ে ‘সরি’, থ্যাঙ্কু, পাঁউরুটি বিস্কুট টিস্কুট বলে ক্ষমা টমা চাইতে চাইতে আবিষ্কার করলাম সুন্দরীর কাঁধ আমি প্রাইভেট বাসের জানলার গ্রিলের মত ব্যবহার করে ফেলেছি।

বহুদিন আগে বালি হল্ট থেকে আসার সময় আরেক অনধিক সুন্দরীর কোলে ঘুমোতে ঘুমোতে গড়িয়ে পড়েছিলাম আর তিনি আর্ত কণ্ঠে ডেকে উঠেছিলেন, “কেউ প্লিজ এনাকে সোজা করে দিন না রে বাবা”।
সেটা মনে পড়তেই খচমচ করে ফোন বার করে আমার প্রাণের বন্ধুকে বললাম আবার সেই কান্ড করেছি রে। সে তো রাম অশ্বতর… বলে, ক্যালানি খেলি তো? আমি সবে তার কথা কেটে গোদা বাঙলায় একটি গাল পাড়তে যাব। হঠাৎ আবিষ্কার করলাম, আমার পাশের ললনা এবং তার “এই বল না” হাড় হিম করা শব্দে গোটা বাঙলায় নিজেদের মধ্যে বলে উঠল, “এখানেই নামতে হবে বোধহয়”। বিশ্বাস করুন, একবার ক্লাসের এক সহপাঠিনীকে বাসে সিট ছেড়ে দিয়ে মোরগ হয়েছিলাম, সহযাত্রীদের প্রশ্নের উত্তরে ‘আমার নাম বকুল’-এর মত বোকা বোকা উত্তর দিয়ে ধেড়িয়েছিলাম। এখানেও সেইরকম তোতলাতে শুরু করলাম আর বন্ধুটি বলল যে, “যা তোর গ্যাস হয়ে গেছে”। ইসস, এর থেকে গ্যাস বেলুনের মতো বেমালুম উবে গেলে বোধহয় ভালো হত।

কোনদিকে তাকাব, কেনই বা তাকাবো, কি ভাবেই বা তাকাব? এসব ভাবতে ভাবতেই ব্যথিত ললনা আর তার কটমটিত ‘বল না’ ট্রেন থেকে নেমে চলে গেল আর বহুযুগের ওপার হতে আষাঢ়ের মতো ভেসে এল বন্ধুর গলা, “খ্যাঁক, খ্যাঁক, খ্যাঁক”। মরণ দশা…

Advertisements

3 thoughts on “(৫১)

  1. গত বছর বইমেলা থেকে মেট্রো তে ফেরার পথে, সারা হাতে Tattoo করা স্লীভলেস T-শার্ট পরা একটি ছেলেকে দেখে আমি আমার সঙ্গীটিকে বলেছিলাম “একটু দেখো না, কথাও বাদ নেই” , আরো কী কী বলেছিলাম মনে নেই, সেই ছেলেটি হঠাত মিষ্টি মিষ্টি হেসে তাকেই বলল “দাদা একটু জায়গা দেবেন please. 😀 😀 এটা পড়ে সেটা মনে পরে গেল।

    Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s