(৫৪)

বাঙালীর উপহারে বই আর শেষ পাতে দই না হলে কি চলে? বই নিয়ে হইচই... রইরই... কই কই- এসবই হল আমাদের সকলেরই জীবন থেকে খুঁটে খাওয়া ঘটনা... প্রত্যেক বাঙালী অন্তত একটি বই কেউ নিয়ে আর ফেরত দেয় নি। আর অন্তত একটি বই সে নিয়ে আর ফেরত দেয় নি। এই জন্য সমগ্র বাঙালী সম্প্রদায়কে বছরে চারবার অন্তত হেঁচকি তুলতে হয় ও রক্ত দিতে হয়।

মানে রক্ত দেবার সঙ্গে বই টইয়ের কোন সম্পর্ক নেই নিরক্ষর বাঙালীও সমাজ চেতনার টানে রক্ত টক্ত দান শিবিরে গিয়ে ফটাস করে শুয়ে পড়ে ছুঁচ ফুটিয়ে নেয়। সে অন্য গল্প- সেপথে গেলে বেপথে যাবার সম্ভাবনা থাকে।

তার চেয়ে বরং বইয়ের গল্প বলি- বই মেলার গল্প... বইমেলার সঙ্গে আমার সম্পর্ক সেই আশির দশক থেকে। গল্প দাদুর আসর থেকে সবে বেড়িয়েই বই কিনতে চলে যেতাম ময়দান চত্বরে আর রবীন্দ্রনাথ হয়ে ফিরতাম... তার পর দুদিন মাথায় লাইফবয় রিন ইত্যাদি ঘষে কালো চুল আলো করে ঘুরতাম... হাত খরচের টাকা বেশি পেতাম না বা টিউশনির টাকা জমিয়ে যা পারি হাবি যাবি কিনে খাবি খেতাম!

তবে বইমেলা আমার শপিঙের অভ্যাসটা ঠিক করিয়ে দিয়েছে। পছন্দ করে কেনার পর পাখির চোখের মত একটাই জিনিষ দেখতে পাই সেটা হল ফেরার পথ। বাকি সব ফাঁকি সব... পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল।

১৯৯৭এর বইমেলার বীভৎস অগ্নিকান্ডের পর আমি গিয়ে বাড়াভাতে ছাই খুঁজে খালিল গিব্রান তুলে এনেছিলাম এই ভেবে... কখনো না কখনো তো এই আধ পোড়া বইটা গুটেনবার্গের বাইবেলের দামে বিকোবে। কিন্তু আজ বুঝি বইমেলার সবেতেই ছাপ্পা লাগাতে হয় গিল্ডের নাহলে আপনি ঠন ঠনে কালীবাড়ি... ফিচিং বৃষ্টিতেই চটি মাথায়... টেরও পাবেন না।

তা সেই বইমেলার সঙ্গে সম্পর্ক চুকেছে যবে থেকে ভারত সরকার তার মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন আমার। আগে বেশ হত একটা নাসিরুদ্দিনের গ্রন্থমেলা আর একটা অমিতাভের ক্যালকাটা বই মেলা। এখন তো নাসিরও ত্রিদেব করছেন। তাই আমার কপালে লবডঙ্কা জোটে আর চাড্ডি পান্তা ভাতের মতো বইমেলার খবর পাই... গন্ধ আর পাই না।

দিল্লীতেও দুয়োরাণীর বই মেলা হত বটে বছর তিন আগে পর্যন্ত কিন্তু সে সব ভাঙা হাটে লাটের বাঁটের মত বই ওলারা বসে থাকত... খদ্দের গেলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ক্যাচ কট কট করে নেবার আশায়। তা সেও দু চারটে সেম সাইড হতেই বা দোষ কোথায় নেই মামার থেকে তো কংস ভালই। তা কংসও গত দু বছর ধরে গোলকধামের গোলক ধাঁধায় ঘুরে বইমেলার পথ ভুলে পথিক হয়েছিল... আমার এক প্রিয় বন্ধু যে নিজের কুকুরকে বানর বলে গাল পাড়ত... প্রতি বছর বিবাহবার্ষিকীর মতো করে আমায় জিজ্ঞাসা করত হ্যাঁ রে আবার কাশ বনের উপর দিয়ে ট্রেন দেখতে কবে যাবি? সেই গোপাল ভাঁড় আলুর গুদাম পোড়ার পর প্রাণ ভরে পোড়া আলু খেয়ে টেয়ে মালিককে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল, “হ্যাঁ গা, তোমাদের গুদাম আবার কবে পুড়বে গা?” সেই রকম আর কি।

তা এ হেন আজগুবি দেশে, যেখানে বিশ্ব পুস্তক মেলার ঢোকার টিকিটই ৫০০ টাকা, সেখানে আবার রাশিয়ান সার্কাসের মতো শীত ফুরোবার পথে হাজির, বই মেলা। আমার ভাই বহুদিন ভাল করে না খেতে পেয়ে এক বিয়ে বাড়ি যাবার আগে ফেস বুকের শোভা বর্ধন করে গেছিল, “খাব, খাব, খাবই খাবো...” তেমন আমিও ভাবলাম, “যাব, যাব, যাবই যাব... বই বই যাব না”।

যেমন ভাবা তেমন কাজ, সরকারী চাকুরীর সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে আজ বিকালে গিয়ে হাজির হনু দিল্লীর তথাকথিত বই মেলার চত্বরে। ঢোকার আগে বেশ নিজেকে কেউকেটা লাগছিল... বই মেলা বলে কথা। তাই কেউটের মতো সুড়সুড়িয়ে নয় একেবারে হনুর মতো বুক ফুলিয়ে গিয়ে হাজির হনু লাল কার্পেটে মোড়া বই মেলায়।

দশ বারোটা টিম টিমে প্রদীপ বেশ জ্বল জ্বল করে জ্বলছে স্রেফ বুকের বাতাস নিয়ে। এদিক সেদিক এপার সেপার করে চলে গেলাম আমার পেটেন্ট জায়গায় দেজ, কিছু কিনতেই হয় বলেই আমার অন্যতম প্রিয় গল্পকার মতি নন্দীর গল্প কিনলাম। তারপর তাল ঠুকতে ঠুকতে চলে গেলাম হিমু ভাইকে দেখতে। বাংলা বর্তমান গদ্যের জগতে হুমায়ুন আহমেদকে মনে করা হয় এভারেস্ট। তাঁর অবিস্মরণীয় কীর্তি তার নিজের অলটার ইগো হিমু... তা হিমু ভাইকে দেখতে গিয়ে দেখি সে একেবারে অভিধান সদৃশ চেহারা নিয়ে বসে আছে। কি আর করা, ভাইকে গরম নিয়ে নিয়েছি। কিনবই বলে... তাই দুটি পাঁজর খুলে বই টি পকেটস্থ করলাম। তারপর কমলকুমারে মন ডুবিয়ে বুড়ো আংলার সঙ্গে উড়ান দিয়ে ফিরব ভাবছি...

উরিত্তারা সারপ্রাইজ সারপ্রাইজ, মঞ্চে অনিন্দ্য নিজের লেখা বই খুলে কলাপাতা পড়তে লেগেছে দেখে আমিও পাত পেড়ে খেতে বসলাম আর ডুব লাগালাম সেই আদ্যিকালের ভিয়েনের পৃথিবীতে যখন টিভির রঙ ছিল সাদা কালো কিন্তু ভোজবাড়ির থালার রঙ সবুজ... আহো! মিঠা গলায় মিঠা স্মৃতির ডাইবেটিস হীন রোমন্থনে সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। নেমে আসার আগে ফাউ ফুচকা হিসাবে বই মেলা নিয়ে একখান গানও শুনিয়ে দিলেন অমায়িক ভদ্রলোক। তারপর হাততালির মধ্যে বলে উঠলেন আপনাদের উৎসাহ দেখে আমারও হাততালি দিতে ইচ্ছে করছে কিন্তু আমি নগণ্য মানুষ শুনতে পারছেন না। আমি স্বভাববশতঃ অমায়িক গলায় বলে উঠলাম, “কান আর মন থাকলেই শুনতে পাব”। আহা, মিঠে করে হেসেও দিলেন সেলিব্রিটি। নেমে আসার পরে সৌ দা মিনি (আরে আমার এক পরিচিত বোন আমায় সৌদা ডাকে, স্বাভাবিক ভাবেই আমার পুত্রটি সৌদামিনি)র জন্য তেনার নিজের বই আমায় দাম দিয়ে কিনিয়ে (গরজটা অবশ্য আমারই ছিল) লিখে দিলেন ডাক্তারি হাতের লেখায় “বড় হয়ে পড়বে!”

তার পর আর কি, বাঙালীর বিশাল পার্কিং ক্ষমতার পরিচয় পেতে পেতে, দু চাকা চার চাকা ডজ করতে করতে ফিরে এলাম ধরা ধামে... কানের গোড়ায় গান গুন গুন করছে, “আমার চোখে ঠোঁটে গালে তুমি লেগে আছো...”।

বই আমি তোমা বই কিচ্ছুটি নই গো... কিচ্ছুটি নই।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s