(৫৬)


(৫৬)

কলেজে পড়ার সময় একবার খুব শখ হয়েছিল চশমা পড়ব। তাতে একটু বুদ্ধিজীবী টিবি টাইপের দেখাবে… যেমন সুনীল শেট্টির মুরগির ঠ্যাং চিবোনো চেহারাটিকে মধ্যবিত্তের মানানসই বানাবার জন্য একটা কালো প্যান্টো ফ্রেমের চশমা ঝুলিয়ে দেওয়া হত সেই রকমই। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল গিয়ে, একটু আধটু খেলাধুলো করতাম তাই চশমা যদি সেই চৌদ্দটি নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর মধ্যে পড়ে তবেই হবে, নচেৎ তা উইশলিস্ট থেকে কচাৎ করে কেটে দিতে হবে।

রাস্তা বার করলাম, যে ব্যাট করার সময় বোলারের হাত থেকে বলের সেলাই দেখা যাচ্ছে না… যেন আগে কত পালিশ আর সেলাই দেখে ব্যাটিং করতাম। বাবা চিন্তিত হয়ে পড়লেন এবং সাধারণ হাসপাতালের সলিউশ্যন গোলা জল চোখে নিয়ে স্বপ্নালু দৃষ্টিতে পৃথিবী দেখতে দেখতে ফিরে এলাম বাড়ি। মনে সাধ, কাল থেকে আমার চশমা হবে ইত্যাদি এবং প্রভৃতি। কিন্তু সরকারি ডাক্তারদের ঘোড়া বেচার তাড়া থাকে না তাই স্বাভাবিক দৃষ্টি শক্তি এবং আক্কেল জ্ঞান ফিরে পেতে দেরী হয় নি।

তারপর বেশ কিছু সময় এবং শহর পেরিয়ে এসে সন্তান জন্মের প্রাক্কালে ডি এক্স বল গেম খেলতে খেলতে আমার সেই একদা ইচ্ছাকৃত ও অধুনা অনিচ্ছাকৃত চশমার চাষ করতে শুরু করলাম ২০০২-এ। এমন পাঁয়তারা কষেছিলাম যে অনুসন্ধানকারী ডাক্তার বলতে বাধ্য হয়েছিলেন যে , “আপ ইতনা দূর আয়া ক্যায়সে?”

সে যাই হোক চশমা ভঙ্গের সঙ্গে স্বপ্ন ভঙ্গের বেশ কিছু মিল অমিল তামিল খুঁজে পেয়ে, একবার বাইকের উপর চশমা রেখে তার উপর বসে পড়ে, একবার ছেলের থাপ্পড়ে দাঁতের জায়গায় চশমা উড়ে গিয়ে একবার চোখ কপালে তুলে চশমায় রিং টোন খুঁজে টুজে ফেলে ছড়িয়ে বেশ দিন কেটে যাচ্ছিল।

কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে যা সব হচ্ছে তা চশমার করিশ্মা বললেও কম বলা হয়। শুরু হয়েছিল আমার নিয়মিত চশমাটিকে নিয়ে। তার ফ্রেম সোজা করতে গিয়ে ভাঙল। রিমলেসকে ভাবলেশহীন ভাবে পাল্টে ফেললাম কিন্তু তারপর তার একটা কাঁচ ভাঙল এবং তার দিন তিনেক পর আরেকটি কাঁচ ভেঙে বৃত্ত হল সম্পূর্ণ।

যাই হোক নতুন চশমা তো বহাল তবিয়তেই আমার চোখের সামনে নাকের উপর দিয়ে এপার ওপার ঝুলছে। কাণ্ডটি ঘটেছিল আমার অপর দোসরটি নিয়ে।

প্রত্যেক মানুষের মুখোশের মত আমারও দুটি চশমা আছে একটি দিনের একটি রাতের- একটি ভিতরের একটি বাইরের। ভিতরের পালা ক্রমশঃ বদল হতেই থাকে বাইরেরটাও ভাবে কিছু একটা করতেই হয়। তাই করল কি গত সোমবার কুটুত করে হাওয়া হয়ে গেল। মানে আমার বহুবিধ সামগ্রীর মতো রোদ চশমাটিকে আমি অফিসে ফেলে চলে আসি।

এটা একধরণের অসুখও হতে পারে। বহুবার হয়েছে মায় ক্যামেরা পর্যন্ত বাইকের হাতলে ঝুলন্ত দেবানন্দের মতো রেখে দিয়ে আমি গন্তব্যে চলে গিয়ে তার আধ ঘণ্টা পরে মনে পড়ে দেড় কিলোমিটার ফিরে এসে সহগামীদের হার্টের পাল্পিটেশন বাড়িয়ে দিয়ে স্বচ্ছন্দে উদ্ধার করেছি। এ তো চশমা বই কিছু নয়। পরের দিন নিশ্চয়ই পাব এই ভেবে নিত্যানন্দের মতো রাত কাটিয়ে অফিসে এসে দেখি মালটি গায়েব। মানুষকে জীবন মাঝে সাঝেই কান ধরে বুঝিয়ে দিয়ে যায় তুমি নগণ্য। তা এখানেও নিজেকে মনে হল ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরগাছা যে জীবন নামক টু পাইস হোটেলে খেয়ে যাই কিন্তু বিল দেবার বেলায় মুক্তকচ্ছ।

মনের দুঃখে বাড়ি গেলাম- একেই চোখ দিয়ে জবাফুলের রস গড়াচ্ছে দিনের বেলায়। কারণ রোদ চশমাটিও আমার সাধারণ চশমার ন্যায় শক্তিশালী (পাওয়ারফুল) এবং তার অভাবে সেই সীতা বিনা আমি যেন মনি হারা ফণী। এই ভাবছি যে দিন দুয়েক চালিয়ে নিয়ে তারপর আবার নতুন চোখের সন্ধানে ছুটব। ওমা পরের দিন বুধবার অফিস এসে দেখি ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসেছে বাক্স প্যাঁটরা ও ওয়াইপ ক্লথ সমেত। আশেপাশের কর্মীদের জিজ্ঞাসা করেও ফল না পেয়ে বুঝলাম যে নীলা যে সবার সয় না। পাওয়ারফুল চশমার শক্তি সহ্য করতে না পেরে নিখোঁজ ছেলেকে আবার বাপের কোলেই ফিরিয়ে দিয়ে গেছে। বলিহারী যাই, কথায় বলে না ভাগ্যবানের চশমা ফেরে!

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s