(৫৮)


সামাজিক নেটওয়র্কগুলি এখন মানুষের যত্রে তত্রে সর্বত্রে শেওলার মতো জড়িয়ে থাকে, যাকে মাজাঘষা করলে তার আসল রূপ বেরিয়ে পরার সম্ভাবনা। সেই কোন জন্মে মহীনের ঘোড়াগুলি গেয়ে গেছিল যে, পৃথিবীটা ছোট হতে হতেও আমাদেরকে আরও দূরে আরও দূরে করে দিয়ে যাচ্ছে। এখন প্রেমিক প্রেমিকাকে গোলাপ দেয় না ডজন দুশো টাকা বলে, তার বদলে ফোকটে গোলাপের ফোটো ঝুলিয়ে দিয়ে আত্মিক দায়ভারকে সামাজিক নেটওয়র্কের পোষ্টার করে রাখে।

সে যা হোক, সামাজিক নেটওয়র্কের সব কিছুই কি খারাপ? কাছের মানুষ যখন গ্রহান্তরের বাসিন্দা তখন তার স্বপ্ন দেখার জন্য দিবানিদ্রার প্রয়োজন নেই। জালবাক্স খুলে দেখুন কপালে সবুজ টিপ লাগিয়ে ঘুরছেন কি না? তাহলেই তোমাতে আমাতে রামাতে শ্যামাতে জমাতে পারবেন। পেশাদার চিত্রকরদের সার্কিটে লাল টিপ লাগানোর অর্থ হল ছবিটি বিক্রিত হয়ে গেছে অর্থাৎ আর প্রাপ্তব্য নয়। সামাজিক নেটওয়র্ক সার্কিটেও তাই। সে আছে এখানেই কিন্তু আপনার জন্য হয়তো নয়। সে তখন ধরিলে তো ধরা দেবে না।

আর আছে শত শত সম্প্রদায়। এটা আবার একটা মজার জায়গা যার মাথায় আগে এয়েচে সে কচাত করে একখান নাম দিয়ে দোকান খুলে দিয়ে বসে থাকে কখন ধীরে ধীরে লোক জন আসবে, দোকান গম গম করবে। প্রথম দিকে তাদের প্রলোভন দিয়ে আনতে হয়। তারপর মানুষজনের আনাগোনা হলেই সে নিজের মাথার মুকুটটা মেলে ধরে আর এর ওর মাথা হাতে কাটে ঘাটে কাটে আর কাটে মাঠে… খেলতে নেমে বেগড়বাঁই-এর জায়গা নাই।

আর রৈখিক মাধ্যমে মানুষ ভাবে এক, দেখায় আরেক, আর করে আরেক। আর আছে ফেক প্রোফাইলের গল্প… আমার এক পরিচিত বন্ধু সারা সামাজিক নেটওয়র্কেই চেঙ্গিজ খানের মতো ছাপ ছেড়ে রেখে গেছেন যে মাঝে মাঝে মনে হয়ে তার আসল প্রোফাইলটি ছাড়া সমস্ত আশেপাশে ঘোরাফেরা করা পাব্লিক-ই সেই বন্ধুর ফেক। এই সূত্রে একটা গল্প লিখব ভাবছিলাম, যে একটি অন্তর্মুখী ছেলে একটি মহিলার প্রোফাইল তৈরী করে এদিক ওদিক ছেলেদের সঙ্গে সামাজিক নেটওয়র্কতুতো প্রেম করে বেড়াতো। তারপর যখন তার নিজের বয়স হল প্রেমের (সে কি রে পাগল প্রেমের কোন বয়স আছে নাকি রে?) তখন আর কোন মেয়েকেই পছন্দ হয় না। শেষে বোঝা গেল তার সেই প্রোফাইলতুতো মেয়েটিকেই সে ভালবেসে বসে আছে। নার্শিসাস।
তবে সবার উপর যে ব্যাপারটা হল হিল্লি দিল্লী শেখ চিল্লীর দেশের লোকেরা যখন এক জায়গায় হয় তখন মাছের দোকানের খরিদ্দারের মতো টিপে টুপে দেখে যে এই মালটাই সেই মাল কি না যে রোজ রোজ একটা চৌকো মুখ নিয়ে আমার জালবাক্সে উপস্থিত হয়। মিলে গেলে তো হই হই রই রই ব্যাপার। তা সেই হইচই টইকে জনগণ আবার গালভরা নাম দিয়েছে মিনলোৎসব বা Get Together বা get to get her।

তাকে চাক্ষুষ করিবই
তার ঝুলপির চুল ধরিবই
তারে মুড়ি চানাচুরে
চিনি আর গুড়ে
লাড্ডুর মতো মুড়িবই।
তাকে দেখিলেই হবে দিল খুশ
তার ললিপপ আর ল্যাঞ্চুস
চুষে আহা আহা করে গাব গান
আর বিদেশি বিড়িতে সুখ টান
সে যে সপ্ত সাগর পেরিয়ে
কত বাধা বিপত্তি এড়িয়ে
শুধু আমারই জন্য এয়েচে
আর আমার পানেই চেয়েচে গো সে যে চেয়েচে
তবু যাবার বেলায় পিছু ডাকে
খানা আরও যদি কিছু স্টকে থাকে
তালে সেগুলোও দিয়ে চলে যাক
তাহা আমি খাই আর সেও খাক
আর ফিরে গিয়ে সেও লিখে থাক
আহা জিটি ছিল কি যে মনোরম
আমি আইঢাই, সেও পমেটম
কবে আবার মিলিতে আসিবে
এঁদো ডোবার জলেতে ভাসিবে
সবে মিলে গান গাহিবে
সেই আশাটুকু শুধু বেঁচে থাক আর
আমি খাই আর সেও খাক।
আহা এমন দিন কি আসিবে।
যবে জিটির ভেলায় ভাসিবে সবে ভাসিবে।

যাই হোক, আমি আর বেনোজলে গা ভাসাতে বাদ যাই কেন? একটা ছোট্ট ঘটনা দিয়ে এই ঘটা করে জিটি পটানো গল্প শেষ করি।

এক ভাতৃতুল্য বন্ধুকে নতুন জিটির খবর দেব বলে ফোন করলাম, তা ফোন তুলে এক কচি শাসমল (কচি ডাব যখন সবে পাকতে শুরু করে আর গলায় তার শাঁস আসে তেমন গলা) বললেন, কে বলছেন? আমি তো প্রথম থেকেই গোলের দিকে ছুটেছি, “চিনতে পারছিস না হতচ্ছাড়া? নম্বর টুকে রাখিস নি কেন রে? (অবশ্যই “রে”র পুটকি টা ছিল না)” সে যতটা সম্ভব গম্ভীর গলা করে বলল, “কার সাথে কথা বলবেন?” আমি নামটা বললাম (সে নামটা লিখতে গেলে হাত সাবান দিয়ে ধুতে হয় বলে এখানে আর বললাম না), তাতে সে থেকে তিনি হয়ে গেলেন এবং বললেন তিনি নাকি উক্ত ব্যক্তির বাবা। আমি প্রথমে খুব জোরে একখানা এটম বোমা ফেলতে যাচ্ছিলাম, তারপর ভাবলাম কি জানি হতেও পারে। তাই যথা সম্ভব গলা মোলায়েম করে বললাম, …কে বলে দেবেন যে আমি ফোন করেছিলাম! রেখে দিতেই বার্তা। আমিই আমিই আবার কল করো! কলালাম, সে তো এক চোট হাসির পর যেটি বলল সেটি আর যাই হোক বিশ্বাস যোগ্য নয় তবে কি না সামাজিক জাল তো? কোন নদীতে কোন মাছের গলা টিপে ধরে কে জানে?

গলা কাঁচুমাচু করে বলল, “আরে আমার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে ফোন নাম্বার নিয়ে কোন গে আমায় বার বার ফোন করে বিরক্ত করছে বলেই তো এরকম ভাবে ধরলাম। তা তোমার নাম বলেই দুম করে রেখে দিলে, আমাকে তো বলতেই দিলে না!”

আমি হাসব না কাঁদব ভেবে না পেয়ে বললাম, যাক গে! মানে যাক গিয়ে মানে থাক গে মানে হল গিয়ে অনেক হয়েছে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s