(৫৯)

<font size=3 * face=solaimanlipi>
ক্রিকেট খেলার সময় দেখবেন আপনার দলের সেরা ফিল্ডারটার কাছে বলই যাচ্ছে না আর সব থেকে ল্যাদারুস যে, তাকে মাঠে কোথায় লুকিয়ে রাখা হবে তাই ভেবে কুল পাবেন না। যেখানেই যাক, গালি গালি তস্য গালি থেকে ফাইন লেগ লঙ লেগ হয়ে সুইপার কভার- বল তাকেই তাড়া করে। সেই রকম আমাকেও মনে হয় ঘটনা তাড়া করে বা অন্যভাবে বলতে গেলে ফিসফাস তাড়া করে।

কিছু না করেও বসে থাকলে ফিস ফাস। করতে গেলে তো তা গম গম করতে থাকে। একবার কোন এক মহাজ্ঞানী সিনেক্রিটিকের লেখা পড়েছিলাম যে গদারের সিনেমায় একটা ট্রেন কেন ঠিক সাড়ে তিন মিনিট-ই দাঁড়ালো সেই নিয়েই গবেষণা হয়ে গেল। মহামান্য গদার হয় তো কিছু না ভেবেই চেন টেনে রেখেছিলেন বা কাট বলেন নি। কিন্তু বাক্স ভর্তি আলোচনার জন্য তো আর পয়সা লাগে না। যাই হোক সেই রকম আমিও আমার আপাত শান্ত নেয়াপাতি জীবনটিকে যতই সাধারণ ভাবে নির্বাহ করার চেষ্টা করি না কেন, জীবনের আনাচে কানাচে ঠিক কোথাও না কোথাও ফিস ফাস লুকিয়ে থাকে।

বর্তমান ঘটনাটি বর্ণনা করার আগে বেশ কিছু কাল পিছিয়ে যাব। আমার এক হাফ প্যান্টতুতো বন্ধু যে জীবনের নানা ওঠাপড়া সহজে গায়ে না লাগিয়ে টিকে আছে, সে থাকতো উল্টোডাঙায় মানিকতলা হাউজিং এস্টেটে। তা ছোট বেলা থেকেই আমার নেই কাজ তো খই ভাজ। তাই মাঝে সাঝেই সেখানে হামলা হত।

তা এমনই এক রোদজ্বলা দুপুরে… সুর তুলে কুকুরে (না না সেটা বোধহয় অন্য কিছু ছিল)… গিয়ে হাজির হলাম তার বাড়ি। সে থাকতো ফার্ষ্ট ফ্লোরে দরজার কড়া নেড়ে ও বেল মেরে যখন হাতে কড়া পড়ে গিয়েছে তখন নীচ থেকে ডাকা ডাকি শুরু করলাম এবং যা হবার আর কি- সে ছাড়া বাকি ফ্ল্যাটগুলির সবাই উঠে পরে নীচের দিকে তাকিয়ে রঙ্গ দেখতে লাগলো।

তখন আমার কাঁচা বয়স লোকের ভাবনা নিয়ে কম ভাবিত। তাই উপর্যুপরি ঢিল ছোঁড়া এবং অন্যের বাড়ি থেকে টেলিফোন করানো (সে জমানায় মোবাইল ছিল না এবং ফোনগুলি এতটাই কালো জাব্দা এবং ভারি হত যে তাকেও সহজে মোবাইল করা সম্ভব হত না) এবং সমবেত শেয়ালের মতো ডাকা (মানুষ বোধহয় গড়পড়তা দিনে ভগবানকেও অতটা ডাকে না)-র শেষে কোন উপায় না পেয়ে (অবশ্য ল্যাজগুটিয়ে বাড়ি যাওয়াটা উপায়ের মধ্যেই পড়ে না) শেষে বেশ কসরত করে দিবালোকে একাধিক বারান্দা ভর্তি লোকের সামনে দিয়ে ড্রেন পাইপ বেয়ে উঠে বারন্দার দরজা দিয়ে টুকি দিয়ে চমকে দিই সেই মহানুভব বন্ধুকে (অবশ্যই তিনি ঘুমোচ্ছিলেন এবং সদরের পরিবর্তে বারন্দা দিয়ে আমায় দেখে যারপরনায় চমকেছিলেন)।

তা সে তো গত শতাব্দীর শেষ দশকের শুরুর গল্প, এখন তো যুগও অনেক এগিয়েছে আর যুগের হাওয়াও।

দু দিন আগে একটা প্রোজেক্টের ডেডলাইন আর লোডশেডিং-এর সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছি, স্টুডিওর ঘড়িতে তখন বাজে সাড়ে ১১টা। গত ১৫ মিনিট ধরে আশেপাশে কারুর ফ্ল্যাটের দরজায় উপর্যুপরি খটখটানি এবং টিংটং হয়েই চলেছে এবং আমি যথারীতি সুনাগরিকের মতো তাতে কান না দিয়ে কাজ শেষ করার দিকে মন দিয়েছি হঠাত আরও মিনিট ১৫ পর আমার দরজায় করাঘাত। খুলে দেখি আমার পাশের ফ্ল্যাটের বাঁশপাতা মাছের মতো যে বাঙালী ভদ্রলোক এই কিছুদিন আগেই পদার্পন করেছেন, তিনি।

– আমার ছেলেটা ভেতরে বোধহয় ঘুমুচ্চে। দেখুন না খুলছে না, সাড়া দিচ্ছে না কতক্ষণ ডাকছি।
– ফোন নেই?
– না! আমার খুব টেনশন হচ্ছে। ছেলেটা মাঝে মাঝেই বলে সুসাইড করব!!! করে ফেলেছে কি না কে জানে! (এই কেলো)
– না না অত ভাববেন না! আমি কি ভাবে সাহায্য করতে পারি? আমার বারন্দা দিয়ে ডাকবেন? (সুইচ হিটের মতো রণ কৌশল বদল করে দেখবেন?)
– হ্যাঁ সেটা করে দেখি।

অগত্যা প্যাঁচা জাগা রাতে কাকপক্ষীকে (যদিও এই অঞ্চলে সত্যিই ছাদের উপর কাক দেখে অবাক হয়ে যেতে হয়) জাগিয়ে দেবার মত যথেষ্ট ডাকাডাকি করে কোন ফল না পেয়ে। আমি আমার বাড়িতে রাখা একটা লগা (না হুকিং বা ঘুড়ি ধরতে ব্যবহৃত হয় না। পুরানো পর্দা ঝোলাবার ভাঙা রড, যা বড় অযত্নে পড়ে থাকে, সাহায্যে লেগে বর্তে যায়।) দিয়ে তাদের বারন্দার দরজায় ঠোকাঠুকি করলাম, রান্নাঘরের জানলায় ঘষাঘষি করলাম। উল্টোদিকের সদরের পাশের দরজায় খট খট করলাম। কিন্তু ভবি ভোলবার নয়। এদিকে বাঁশপাতার কাঁদো কাঁদো অবস্থা। আর আমিও ভাবছি সত্যিই তো জোয়ান মদ্দ ছেলে যদি ফট করে বলে হেমলক সোসাইটি দেখতে যাব তাহলে কার বাপেরই বা ভাল লাগে।

শেষে উনিই বুদ্ধি দিলেন যে সামনের লোহার জালিদার গেটের ছিটকিনির দিকের জালি যদি কেটে ফেলতে পারি কোনরকমে তাহলে হয়তো ছিটকিনিটা হুডিনির মতো কায়দা করে খুললেও খোলা যেতে পারে।

আপনি দেখবেন যক্ষনি কোন অদরকারি জিনিষের দরকার পড়ে, সেটি গোঁসা করে টুক করে বেপাত্তা হয়ে যায়। যেন এতদিন আমার দিকে তাকাও নি যে বড়? এবার মর! কি জ্বালা সবাই সুযোগ পেলেই সহধর্মিনীর মত ব্যবহার শুরু করে।

আমিও যথারীতি স্ক্রু ড্রাইভারটি না পেয়ে একটি রেঞ্চ ও প্লাস দিয়ে স্বশক্তি প্রয়োগে লেগে পড়লাম। পুরুষ মানুষের স্বভাব- গায়ের জোর দেখাবার সুযোগ পেলে আর ছাড়ে কেন। তা বেশ ১৫-২০ মিনিট বেটাইমে কসরত করার পর দুর্ভেদ্য তার জালির ডিফেন্স ভাঙতে সক্ষম হলাম। এদিকে বাঁশপাতা দুলেই চলেছেন! ফোন আসেঃ

– নেহি স্যার ম্যায় বিজি হুঁ। নেহি নেহি ও নেহি ম্যায় সচমে ফাঁস গয়া হুঁ। আরে মেরে ইহা এক লড়কা কাম করতা হ্যায়। শায়দ ও খুদকুশি করলি হ্যায়! নেহি নেহি শায়দ শো রহা হোগা ইত্যাদি এবং প্রভৃতি।
এর সঙ্গে মাঝে মাঝে আমাকেও শিল্প নির্দেশনা দেওয়া আছে।
– এদিকে নয় ওদিকটা একটু করুন- আরে আমার হাত বেশ পাতলা আছে টুক করে ঢুকে যাবে ইত্যাদি এবং প্রভৃতি।

আমি এই ঝড়ঝঞ্ঝার মধ্যেই যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণ রেখে মন দিয়ে বৈঠা বেয়ে চলতে চলতে লোহার গেটে ছিদ্র করে বাঁশপাতাকে বললাম “আসুন”। অবশ্য এসেই বা কি করবেন, তিনি ফেলে ছড়িয়ে এক সার করলেন। আমি এবার বললুম “সরুন”, তারপর নিজে হাত ঢুকিয়ে দেখলাম যে নাহ ছিটকিনিটা খোলার পর্যাপ্ত জায়গা নেই। তাই ছেলের ব্যাট নিয়ে এসে (না না সে তখন সমস্ত জাগতিক ব্যাপার থেকেই মন সরিয়ে ঘুমুচ্চে) তার হাতল দিয়ে কাঠের দরজাটায় দু ঘা দিতেই একটু নড়বড়ে হয়ে গেল। (এতক্ষণ ধরে নাটক দেখছে, সাড়ে বারোটা বেজে গেছে, কত আর দম থাকে? বেশী প্রতিবাদ করল না!) এই বার হাত ঢুকিয়ে কোন রকমে ছিটকিনিটি খুলেই এক লাথিতে কাঠের দরজা খুলে ফেলে (পরম সৌভাগ্য সেখানে ছিটকিনি লাগানো ছিল না) দুরুদুরু বক্ষে শয়ন কক্ষের দিকে এগিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখি, সে অকালকুষ্মাণ্ডটি উল্টো দিকে ঘুরে, এসি চালিয়ে, খালি গায়ে শুয়ে আছে। আমার তখন না আঁচালে বিশ্বাস হয় না… খুব সন্তপর্ণে দেখার চেষ্টা করলাম যে শরীরের রঙ পরিবর্তন হয়ে গেছে নাকি? সেদিন দুপুরেই হেমলক সোসাইটির ট্রেলার দেখেছি… “মরবে মরো… ছড়িও না”! তা এতক্ষণে বাঁশপাতা একটু হাওয়া পেয়ে এসে এক ধাক্কায় বডিটা (?) সোজা করতেই সে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে উঠে পরে জিজ্ঞাসা করল- “কেয়া হুয়া? আগয়ে আপ? ক্যায়সে আয়ে?”

মনে হচ্ছিল দিই টেনে এক…! যাই হোক, মাথা ঠাণ্ডা রেখে বেরিয়ে আসব, বাঁশপাতা বলে উঠল, “পিছলে দেড় ঘণ্টে সে বুলা রহে হ্যায়। ভাইয়া নে খোল দিয়া হ্যায়। তুম শো রহে থে? মাফি মাঙ্গো ভাইয়া সে!” সত্যি বলতে কি ক্লাইম্যাক্সের পরেও নাটক টানলে আর দর্শক থাকে না। তাকে মাঝ পথে থামিয়ে দিয়ে বললাম, “ছাড়ুন তো, আপনি ঘূমোন আর আমিও ঘুমোই!”

ওনার ফ্ল্যাটটা থেকে বেরোবার সঙ্গে সঙ্গেই লোডশেডিং হল… আর আমারও ষোলোকলা হল পূর্ণ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s