(৬১)

(৬১)

জনগণ সাক্ষী আছেন যে ইদানীং ফিস ফাসের রেট হই হই করে বাড়ছে। মানে ফিস ফাস লেখার রেট আর কি। সেই তাসের দানে বসে ভাল হাত পেলে খেলোয়াড় যেমন পরের পর তুরুপ করতে থাকে সেই রকম আর কি।

তা কাল সকালে খড়গপুর হয়ে বাঁকুড়া হয়ে জঙ্গলমহলের ভিতর দিয়ে গেছিলাম পুরুলিয়া। পশ্চিম রাড় ভূমি গ্রীষ্মের দাব দাহে শুকিয়ে আমসত্ত্ব হয়ে পড়েছে। তার উপর শান্তিজলের মত বৃষ্টি মুখের তেষ্টা মেটায় না আর বুকের তেষ্টা দেয় বাড়িয়ে। তা সে যাই হউক গে গিয়া, যাবার পথে ভোর বেলায় একটি টাইমস অফ ইন্ডিয়া এবং একটি আদি অনন্ত আনন্দবাজার নিয়ে উঠেছিলাম রূপসী বাংলা এক্সপ্রেসে। সিট পড়েছিল মুখোমুখি বসিবার মাঝখানেই। তা আমার পাশের সিড়িঙ্গে ভদ্রলোকটি উঠেই সাহেবি কায়দায় জিজ্ঞাসা করলেন, “হ্যাভ দ্য নিউজপেপার গাই গন?” সে যে কখন এসে চলে গেল বলে গেল তাই জানি না ছাতা…তাও বিজ্ঞের মত মাথা নেড়ে বললাম, হাইয়া (হ্যাঁ আর ইয়া-র মাঝা মাঝি কিছু)। তারপর ভদ্রতাবশত তাঁকে আমার সংবাদপত্র সম্ভার প্রস্তাব দিলাম। টিপিকাল বাঙ্গালিয়া ইংরেজি টানে উনি বললেন যে উনি শুধুমাত্র ইংরাজি দৈনিক পড়তেই ইচ্ছুক। তা মধুসূদন দাদার কাছে সবই আছে। তার পর থেকে থেকেই উনি বিদেশী ভাষায় বিভাষন ও সম্ভাষণ করতে লাগলেন। আমিও ভাবি কি না কি? আমিও দাদরা কাহারবা সঙ্গত করলাম।

বেশীক্ষণ না, খড়গপুর আসতেই উনি খচর মচর করে নেমে গিয়ে এইসান গপ গপিয়ে লুচি আলুর তরকারি ঠ্যালা থেকে কিনে চিবোতে শুরু করলেন যে সব বিলিতি ফুটানি এসি ডাক্টের ফুটো দিয়ে বেরিয়ে গেল। ঠিক করলাম যাই হোক না কেন আমি বাংলাতেই বলব। তারপর থেকে শুরু হল নাদাল আর জকোভিচের র‍্যালি। তিনিও ঔপনিবেশিক আর আমিও স্বাধীনতা সংগ্রামী বীর বিপ্লবী ক্ষুদিরাম। (নাহ বার খাই নি)

শেষ পর্যন্ত কেউ টলল না। গেলফান্ড আর আনন্দের মত। বার্তালাপ শেষ হল করমর্দন এবং প্লেজার টু মিট ইউ আর আমিও আনন্দিত দিয়ে।

সে তো গেল গেল, ফেরার সময় আদ্রা হয়ে আসার কথা জাপানিজ ডেলিগেশন আসবে। তা চড়লাম বর্ধমান লোকালে। গতবার বনগাঁ লোকালে চড়তে গিয়ে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছিল। এমনিতে তো বনগাঁ লোকালে একজন কলার খোসা ছাড়ায় আর আরেকজন সেই কলা কুচুৎ করে খেয়ে নেয়… তার উপর নতুন উপদ্রব চৈনিক মুঠোফোন। সকলের হাতে হাতে, আর তাতে আছে মেমরি কার্ড ভর্তি গান। কেউ ‘বড়ি দূর সে আয়ে হ্যায়’ তো কেউ ‘পউয়া চড়াকে আয়ি’ এক সঙ্গে সমবেত কেকারবে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। এবারও ব্যতিক্রম নয়। ভর দুপুরে গতরখাকি রোদের বুকে কেউ যদি বিড়ি জ্বালাইলে করে চেল্লায় তাহলে আত্মারাম খাঁচা ধরে ঝাঁকাঝাঁকি করতে থাকে। সেই নিদারুণ উপদ্রবের হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে বসলাম ট্রেনের দরজার সামনে, আর চোখের সামনে এক এক করে খুলে যেতে লাগল সবুজ প্রকৃতির অপরূপ রূপ… বাংলার বাতাসে কিছু যাদু আছে যা কুরূপাকেও সুরূপা চিত্রাঙ্গদা করে অর্জুনের সামনে এনে হাজির করে আর মহাবলী গাণ্ডীবচ্যুত হয়ে পড়ে থাকে আত্মবিস্মৃত হয়ে।

ধীরে ধীরে গিয়ে পড়লাম আদ্রা স্টেশনে। তখন বাজে পৌনে তিনটে। পেটে ছুঁচো ডন মারতে মারতে মাসল ক্র্যাম্প করে লাট খেয়ে পড়ে আছে। যা হোক স্টেশন থেকে বেরিয়ে গেলাম খেতে। এক পাঞ্জাবী হিন্দু হোটেল দেখে খাবার অর্ডার দিলাম। তা সে যা দিল তার মধ্যে শুধু খেসারির ডালটার ঠিক ঠিক নুন ছিল বাকি আনোনা ডিমের ডালনা খেলাম নুনে পোড়া আলুভাজা দিয়ে এবং শেষ পাতে ক্ষীর কদমের মত ফ্যাকফ্যাকে ডিমটা এক কামড়ে জল সহযোগে গলাদ্ধকরণ করলাম।

তারপর দিলাম হাঁটা জয়চন্ডী পাহাড়ের দিকে। প্রকৃতি যদি বনলতা সেনের মতো বুক খুলে দেয় গভীর প্রশান্তির জন্য। যদি পাখীর নীড়ের মতো চোখে খুঁজে পাই দিন গুজরানের রোজানা টুকি টাকিগুলো। সময় কাটে না… সময় কেটে যায়। সময় আসে জাপানিজ ডেলিগেশনের আসার।

কদিন আগেই ইনিয়ামা অভয় দিয়েছেন যে রিকিদিকে নিয়ে তিনি সঠিক সময়ে এসে হাজির হবেন। তা তার আগে তাঁর চিন্তা উপস্থিত হয় যে খাব কি? তাই মানুষের ভাল করতে গিয়ে নির্ধারিত সময়ে ১ ঘণ্টা পরে এসে হাজির হয় তারা। এসেই সটাং আমার সামনে দিয়ে হেঁটে চলে যায়। জানি বয়স হচ্ছে, জানি সারাদিনের ধকলে চোখ মাথার পিছন দিয়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম, তবুও একটা পাঁচ ফুট এগারোর দামড়াথেরিয়ামকে দেখতে পাবে না এমন দুর্দিনও দেখতে হল জীবদ্দশায়। তা আমি ফোন করলাম অমনি চড়ুই পাখির মত জাপানীগুলো কল কল করে উঠলো। বললাম “যে পথ দিয়ে চলে গেলে সে পথ এখন ভুলে গেলে হে?” ফিরে এসেও অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে সালমা আগার মত। বাধ্য হয়েই হাঁক পাড়লাম।

তার পর আর কি পরবর্তী দু ঘণ্টা ধরে মোগলাই আর কফি সহযোগে কতলোকের যে জিভ কাটালাম, তার ইয়ত্তা নেই। শেষে খাবার দোকানের লোকগুলোও আর সহ্য করতে না পেরে গান চালালো, “বড় বড় দিদিরা সব উঁকি মেরে চায়…ইত্যাদি”।

ফেরার পথে একটা গাছের উপর সারি সারি হোয়াইট পেন্টেড স্টর্ক বসে থাকতে দেখে ইনিয়েমা মুখ হাঁ করে চাতক পাখীর মতো তাদের দিকে চেয়ে রইলো। যেন শ্রীরামকৃষ্ণ কালো মেঘের বুকে সাদা বক দেখে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছেন। শেষে মুখে বিশেষ কিছু পড়তে পারে এই ভয়েই তাকে বলতে বাধ্য হলাম যে আদ্রা এখনো গোল্ডরাশের শেষ দৃশ্যের মতো হয়ে যায় নি যে যা হোক তা হোক খেতে হবে।

ফিরে আসার সময় জাপানী চড়াই দুটির শুভ কামনার পরে ইনিয়েমার করে দেওয়া পরোটা আলুর তরকারি ও পায়েস আয়েস করে খেয়ে কিছুটা রেখে দিয়ে ট্রেন-এ উঠে শুয়ে পড়লাম। মনে সাধ, প্যাসেঞ্জার ট্রেন থামতে থামতে যাবে তাই পৌঁছতে পৌঁছতে ভোর হয়ে যাবে।

কিন্তু সে গুড়ে এক রাশ গোবর। সাড়ে চারটেয় অ্যাটেন্ড্যান্ট হুড়মুড় করে নাড়া দিয়ে বলল পৌঁছে গেছে। আমি উঠেই বুঝলাম সবেগে আব্বাস আলি বেগ রান নিতে প্রস্তুত। সে সময় না দিয়ে আধফোটা সকালের বুক দিয়ে ঝিরিঝিরি ফোঁটা মেখে চলতে শুরু করলাম হাওড়া ব্রিজের দিকে। ট্যাক্সি একশো কুড়ি থেকে নেমে এলো মিটারে। চড়ে বসে বেশ কিছু দূর আসার পরেই খেয়াল করলাম যে আমার ডাব্বাটি গিয়েছে গচ্চা। মানে ট্রেনের মধ্যেই ফেলে চলে এসেছি। বেগ তখন বেগানাই বটে।

একরাশ কষ্ট নিয়ে দুপুরবেলায় শ্যামবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম প্রায়শ্চিত্তের জন্য। কালকেই কথা হচ্ছিল স্বর্গে গিয়ে বিভূতিবাবুর সঙ্গে দেখা করার কথা। আজ বুঝলাম পাপের পেয়ালার ফুটোটাও যথার্থ নয়, তাতে ফুট কাটে না বিশেষ, গলেও না…

Advertisements

3 thoughts on “(৬১)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s