(৬২)


(৬২)

এই ছোট্ট ছোট্ট পায়ে চলতে চলতে ঠিক পৌঁছে যাব।

কতদূর এসেছি জানি না, কিন্তু পথ চলা যে খান থেকে শুরু হয়েছিল সেখানে ফিরে যেতে কি ভালই যে লাগে। লোকে বলে যে সেরা স্মৃতি স্কুলে, আমিও ব্যতিক্রম নই। আর সামাজিক নেটওয়র্কের দৌলতে স্কুলের দিনগুলোতে আজকাল ঘনঘনই ফিরে যাওয়া যায়। আড্ডা, খুনসুটি, অক্সিজেন, এক মুহুর্তে অনেকটা বেঁচে নেওয়া। সবই পাওয়া যায় হঠাৎ রাস্তায় হারিয়ে যাওয়া মুখ যখন চমকে দিয়ে বলে… “… কি খবর বল? কতদিন দেখা হয় নি!”

কলকাতায় এলে একটা দিন তাই নিয়ম করে তুলে রাখার চেষ্টা করি স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার জন্য। সবাই হয় তো আসে না… কিন্তু সেই ২০ বছর আগের দিনগুলি ফিরে আসে। পাকাচুলগুলো যেন একটু একটু করে কেঁচে যেতে থাকে… মুখের বলি রেখাগুলো প্রসাধনী ছাড়াই হয়ে যায় আবছা।

সেই রকমই একটা দিন ছিল কাল। কতগুলো চরিত্রহীনের সঙ্গে চরিত্র খোয়াতে বসেছিলাম। কত কি ফেলে আসা স্মৃতি আজকের অ্যাচিভমেন্ট ভেদ করে ভেদাভেদ ভুলিয়ে দিল। এক কাপ চা আর ডাইনে ও বাম সব মিলে মিশে একাকার। কে কবে বিয়ের পরেও গিয়ে ঝারি মেরে স্মার্টলি বলে দিল যে আমি কিন্তু বিবাহিত তাই যা করবে ভেবে চিন্তে। কে তারও আগে ব্যর্থ প্রেমিকের মুখের উপর ঝামা ঘসে দিয়ে বলেছিল নও ছবি নও ছবি সুধু পটে লিখা… পুরনো ব্যথা পুরনো কথা পুরনো জিনস আর গিটারের মত ছড়িয়ে যায় বুক জুড়ে মন জুড়ে।

সময় ফুরিয়ে আসে বড়ই তাড়াতাড়ি… এ শহরে সন্ধ্যা নামে দ্রুত। ২০ বছর আগের ডানপিটেগুলো ভিড় জমায় ফুড কোর্টের আড্ডায়। তারপর চলে খাওয়া আর দাওয়া… এটার চিলি চিকেনটা দরের না তো ওটা নিয়ে আয়। সেটার কফির দাম বেশী তো কি হয়েছে… পকেট মানির জমান তো ফুরিয়েছে… পকেট ফুরোয় নি। ফোন আসে, উত্তর যায়, “দাঁড়াও না বাপু একটু আড্ডা মারব না?” সারা জীবন তো বেগারই খাটলাম।

এর মাঝেই এক ভিন রাজ্যের ব্যবসায়ীকূলের পেটুক চূড়ামণি পিজ্জা ও নুডলসের পাহাড় বয়ে আনে পাস দিয়ে। অবস্বম্ভাবি ভাবেই ফুট কাটতে হয়, “বাপরে মানুষজন কি খায় রে বাবা!” বলতেই হতচ্ছাড়া বন্ধু আর বন্ধুনীগুলো উদ্দিষ্টর দিকে না তাকিয়ে তাকায় নির্দিষ্টের দিকে… এক অবলা সুন্দরী হাতে তিন খানা দোসা নিয়ে গুডি টু সুজ হয়ে আসছিলেন। তার দিকে তাকিয়ে তারা ফ্যাক ফ্যাক করে হাসতে থাকে। আমি তখনও প্রাণপণ চেয়ে আছি সেই পিজ্জা ও নুডলসের টেবিলের দিকে। কিন্তু যা সর্বনাশ হবার হয়ে গিয়েছে। ফরসা মুখ টকটকে লাল করে তাকিয়ে থেকে ফিরে এসে আমাদের টেবিলের পাশ দিয়ে যাবার সময় পালটা আওয়াজ পড়ে, “ফুডকোর্টে লোকে খেতেই আসে” (জিও পাগলা পারি না! টান্টু ডায়লগ)।

এই বয়সে বার খাওয়া কমে গেলেও কুড়ি বছরের বাড় তো বাড়া হয় নি। তাই সকলের উৎসাহে বাড়া ভাতে ছাই ফেলে বলে দিই। ভুলটা শুধরে দেবই। তারপর সমবেত না না-র মধ্যে উঠে যাই সেই সুন্দরীর টেবিলে, তার দিদি বোন আর মা-র উপস্থিতিতেই বলে ফেলি, “আপনি যা ভেবেছেন তা কিন্তু নয়। আপনাকে কমেন্ট পাস করি নি আমি। আপনি বাঁ দিকে তাকালেই টের পাবেন কাকে বলেছি!” কিন্তু ভবি তো ভুললেও কবি কি করে ভোলে? তিনি ভলি ফেরত পাঠালেন, “আপনাকে দেখে আমি ভাবতে পারি নি আপনি এই কাজটা করতে পারেন!” (একটা ব্যাখ্যা… আপনাকে তার মানে দেখছিলাম আমি) আমি তবুও ব্যাকহ্যান্ড ডাউন দ্য লাইন, “আপনি একবার বাঁ দিকটা দেখুনই না”। শেষে সিনেমার গল্পের মতো হার মানলেন তিনি একবার টুক করে বাঁদিকে তাকিয়েই দেখলেন, পাহাড়ের খনন কার্য তখনও চলছে। বিপত্তির নিষ্পত্তি ও মধুরেণ সমাপয়েৎ… তার পর চোখাচুখি হাসি। ফিরে আসার সময় খচ্চর বন্ধুগুলির মধ্যে একটির মন্তব্য, “ফোন নম্বর নিলি না কেন?” তাকে কি করে বোঝাই সে রাবণও নেই আর নেই সে লঙ্কাও। আসিতে আসিও না আর যাইতে কাশিও না…

4 thoughts on “(৬২)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s