(৬৪)

কয়েকদিন আগেই আমার এক পরিচিত ব্যক্তি ঠোঁটের কোণে একটু অবজ্ঞার হাসি ঝুলিয়ে রেখে মন্তব্য করেছিলেন, “তোমার সঙ্গে কি সব সময় কিছু না কিছু ঘটে? একদম উত্তর কোলকাতার বাকতাল্লাবাজের মতো খালি গল্প আর গল্প!” তাকে আর কি করে বোঝাই এগুলো তো গল্প নয়, এ যে ফিস ফাস। সে রবিকবির মতো কানের কাছে পুনপুনিয়ে গান শুনিয়ে যায়, “যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক… আমি তোমায় ছাড়ব না…”। সকাল বিকেল, উঠতে বসতে, শুতে জাগতে, হাঁটতে চলতে, শুনতে বলতে আমার সঙ্গে ফিস ফাস ঘটেই থাকে। ট্যাগলাইনের মতো বলতেই পারি- Something fishy বটে কিন্তু Lots of things are fussy also.

এই যেমন ধরুন না দিন পাঁচেক আগের অন্ধকারের গল্পের মাঝেই… এটা নিয়ে এক অতি পরিচিত ব্যক্তি টুইট করেছিলেন যে “Is it really darkness ruling or it is merely everything has become dark?”

তা সেই সময় ভোর রাত্তিরে উঠে অন্ধকারের বন্ধ দরজা খোলার তোরজোড়ের মাঝেই ঘর্মাক্ত কলেবর হয়ে ল্যাজে গোবরে কোন রকমে অফিসের পানে বেরিয়ে পরলাম। মনে সাধ কালো মেঘ ফুঁড়ে যাব একেবারে উড়ে যাব… কে আর অন্ধকারের মধ্যে টিভি চালিয়ে খবর শুনতে গেছে?

তারপর যেতে যেতে, যেতে যেতে যেতে জ্যামের সঙ্গে দ্যাখা (শক্তি বাবু নিজস্ব শক্তিতে বেলকনিকে ব্যালঘরিয়া করে দেবার পরে পরেই নকলনবিশিরাও গায়ের জোরে বানান বাঁকাতে শুরু করে দিয়েছিল কি না!)!

তা আমার তখন দিল দিওয়ানা… কি ভাগ্যিস বর্তমান প্রজন্মের শেষ দেবদত্ত গলা সোনু নিগম সেদিনই জন্মেছিলেন আর আমাদের আঙুরের মতো রসালো গান উপহার দিয়ে গিয়ে ছিলেন… তাই সাত পাঁচ না ভেবেই গাড়ি দিলাম ঘুরিয়ে। এ দিক ওদিক দিয়ে ঠিক বেরিয়ে যাব, ছোট্ট ছোট্ট পায়ে চলতে চলতে ঠিক পৌঁছে যাব আর কি…

তা যেমন ভাবা তেমন কাজ… কিন্তু ডানদিক দিয়ে বাম দিকে গিয়ে ফ্লাইওভারে চড়তে গিয়েই দেখি বিধি বাম। ছায়াপথ জুড়ে গাড়ির লাইন লেগেছে যেন সামনেই হৃত্তিক রোশনের শ্যুটিং হচ্ছে। ততক্ষণে এফ এম গানের মাঝেই কামান দেগে দিয়েছে যে উত্তুরে গ্রিড পড়ে গিয়ে দফারফা। মেট্রোও চলছে না। আমার নাক বরাবর একটি মেট্রোলাইন চলে গিয়েছে আড়াআড়ি। সেদিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকেও মেট্রো মরীচিকাই হয়ে থাকল।

গাড়ি এগোয় গরুর গতিতে চার- পাঁচ পা… তারপরেই হাঁসফাঁস… মন বলছিল কাছেপিঠেই সে লুকিয়ে আছে… ফিসফাস হে ফিসফাস। তা বেশীক্ষণ সইল না। সোনু তখন শাহরুখীয় আন্দাজে সূর্যকে মধ্যগগনে পাঠিয়ে চাঁদকে কাজলের মতো নিয়েছেন হেলিয়ে… কে জানে সত্যিই হয়তো প্রথম প্রেমের আলোর দিনে এমনি দশা হয়।
দশা বলতে কিছুই না… বেশ কিছু কাল হো না হো, কহো না কহো মুঝে সব কুছ পতা হ্যায় আর দিল কি যো বাতে শুনতে শুনতে আকাশে ভাসতে ভাসতে পৃথিবীর বুকে ফিরে এসে বুঝতে পারলাম যে গত ১ ঘন্টা ধরে সূচাগ্র মেদিনীও নড়ি নি… ততঃ কিম? আমার মন তো তখন মধু, মৌসম মধুযামিনীর… যেখানে দর্দ-এ দাওয়া এফ এমের সুরে সুরে ঘুরে আসে স্যাঁতস্যাঁতে আকাশের ছোঁয়া নিয়ে।

আরও আধা ঘন্টা পরও দেখি তথৈবচ। গাড়ি চলে না চলে না চলে না হে… প্রত্যেক মানুষের ভিতরেই একটি জন্মগত নেতা থাকে… কেউ তাকে চেপে রাখতে পারে, কেউ পারে না। আমি? এ বাবা এটা কোন প্রশ্ন হল? তাহলে আর এতগুলো ফিস ফাস লিখলাম কি করে বলুন দেখি? তাই মনের পোকা যখন ‘তোফা, তোফা’ গান গাইতে শুরু করল। নিজেকে বললাম এই ত সময়। আগে বাড় জোয়ান…

যেমন ভাবা তেমন কাজ, ফ্লাইওভার তস্য ফ্লাই ওভারের উপর দিয়ে প্রায় ১ কিমি হাঁটার পর দেখতে পেলাম… আহা এ কি সত্য এ কি মায়া… কাহারে হেরিলাম। পৃথিবীর বুকে জাবর কাটা মানুষের সংখ্যা এতই বেড়ে গেছে যে তাদের খাদ্যের যোগান দিতে গিয়ে ভুষিভর্তি খড়কে বার দুই আরও ভর্তি করে ফ্লাইওভারের উপরে চড়ে আর নড়তে না পেরে টাল খেলে লাট হয়ে পড়ে আছে একটা গাড়ি!!

তা গাড়িটিকে পুলি দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বটে… কিন্তু খড়গুলি তো আর গোনা যায় না! ঠিক কতগুলো ভুষি খড়ের জন্য কটা কি লাগবে এই হিসাব করতে গিয়েই দিন কাবার হবার জোগাড়… স্টুডিওর ঘড়িতে তখন ১১টা বাজে।

আমি যদিও সর্দার নই… তবুও বারোটা বেজে যাওয়াকে বড়ই ভয়। তাই ময়দানে নেমে পড়লাম… বেশ মিহি মিহি চিঁহি সুরে বৃষ্টি বুকে মনে জলবিন্দুর প্রলেপ দিয়ে যাচ্ছে। ভিজছি কিন্তু ভিজছি না মার্কা সেই পরিবেশ। তার মধ্যেই একটু হাঁক ডাক (ফিস ফাস আর হাঁক ডাক ত অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত) করে কিছু পথপাশের পুচ্ছ নাচানো পাখীদের নিয়ে পাহাড় সমান করার চেষ্টায় লাগলাম। না আছে ডিনামাইট না গ্রেনেড, কিন্তু মাথার বুদ্ধি তো তখনও টাইট হয়ে এঁটে যায় নি। তাই যে ভাবেই হোক একটা লেন যদি খড় বিছিয়ে কার্পেট করে দিতে পারি তাহলে গাড়িগুলি চলতে শুরু করে। এই ভেবে প্রথমে হাত, তারপর ভাঙা কাঠের টুকরো, তারপর বেওয়ারিশ বাক্স ও শেষে সারা শরীর দিয়ে ভুষি মালের মধ্যে দিয়ে হেঁটে গিয়ে শুরু হল রাস্তা তৈরীর কাজ।

সিভিল ইঞ্জিনিয়াররা নাকি বাড়ি বানায় বলে দাবি করেন, কিন্তু ঘর তো তৈরী হয় ঘরবালা বা বালিদের দিয়েই… সেই রকমই পুলিশ ও প্রশাসনের যখন অ্যাস্থমার সমস্যা উপস্থিত হয়। তখন পাবলিকই সবজান্তা গামছাওলা হয়ে ধরাধামে অবতীর্ণ হয়। এখানেও উৎসাহী শ্রমিকের অভাব হল না। তবে তারা সবাইই ভ্যারেণ্ডা ভাঁজনেওয়ালা… যাদের গাড়ি আটকে আছে বা অফিসে যেতে দেরী হচ্ছে তারা শুধু মাত্র টিকিট কাটা দর্শক… গণ্ডারের চামড়া পরিধান করে থাকে। শত অপমানজনক মন্তব্যেও তাদের মন বা অবস্থানের পরিবর্তন হয় না আর আমি এই সুযোগে, সমাজ, সংস্কৃত, মনমোহন সিং, জর্জ বুশ, সাদ্দাম ও মকবুল হুসেনের উপর জমানো ক্রোধ টিটকিরির মাধ্যমে সুরক্ষিত ভাবে প্রকাশ করে দিই। কর্মরত সকলেই উপভোগ করি। খড়ের ধুলোর সঙ্গে খেউরের কম্বিনেশনে মনোরঞ্জনের উপাদান নিয়ে আসে।

মিনিট ১৫ পর প্রথম গাড়িটি সদ্য তৈরী রাস্তার উপর দিয়ে বয়ে যেতে প্রস্তুত হয়। তারপর কিছু কসরত এবং সমবেত হর্ষোল্লাস ও এক্সিলারেটরের বহিঃপ্রকাশের মধ্য দিয়ে অভিযানের সাফল্য ঘোষণা করতে করতে এগিয়ে চলে যায়। আর আমিও হাততালির মাঝে দৌড়ে দৌড়ে ফিরে আসি আপন ঠাঁইয়ে গাড়ি তখন এতক্ষণ একা থাকার জন্য আমার সঙ্গে আড়ি করে দিয়েছে। না হলে খামোখা লাইটারটা কখন যেন হাতের চাপে অন হয়ে যায় আর খুলতে গিয়ে, অরন্যদেবের খুলির ছাপ পড়ে যায় ডান হাতের তর্জনীতে।

আরও মিনিট পনেরো পরে সেই জায়গায় যখন পৌঁছলাম তখন আশেপাশের ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণকারী স্বতঃপ্রণোদিত হি ম্যানেরা চিনতে পেরে সবাইকে আটকে আমার জায়গা করে দেয়। আত্মশ্লাঘার মধ্যেই অনুভব করি… আকাশ, বাতাস, এফ এম এবং পতিত নর্দান গ্রিড সোনুর সঙ্গে বর্ডারের গানে গলা মেলাচ্ছে… “ম্যায় এক দিন আয়ুঙ্গা…”!
আমেন!

প্রয়োজনীয় পুনশ্চঃ নর্দান গ্রিড কথা রেখেছিল… একদিন পরেই আবার এসেছিল ধরাতলে লুণ্ঠিত হয়ে… এবারে আর একা নয়, ইষ্টার্ন ও নর্থ ইষ্টার্ণকে সঙ্গে নিয়ে। তা সে অন্য গল্প…

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s