(৬৫)


এবারের ফিস ফাসের নাম দিলাম খুচরো ফিস ফাস। আগের বারের অভিযোগ ছিল যে ইঁদুরকে গণেশ বানানো হয়েছে… তা যুগটাই তো পাল্টে দেবার- শোষিতই এখন শোষক- সেই কবে পরভিন ববি দুনিয়া দুলিয়ে গেয়ে গেছেন- “শিকারী খুদ ইঁহা শিকার হো গয়া…” আর বাংলার বিখ্যাত দৈনিক সেই শুনে বলে ফেলে, “উলটে দেখুন পালটে গেছে”। তা যাই হোক ছোট্ট ছোট্ট ঘটনার ঘনঘটা, আমি নিমিত্তের মতো ব্যাঙটিকে অপারেশন টেবিলে ফেলব আর পাঠক পাঠিকারা কাটাছেঁড়া করে তার তিনকাল এক করুন এই আশায় রইলাম।

খুচরো একঃ
আজকাল কোলকাতায় বাড়ি গেলেই দুটো প্রশ্ন, “কবে এলি?” আর “কবে যাবি?” মুড খারাপ থাকলে বলতেই পারতাম আমি তো কারুর র্যা শন ধ্বংস করতে আসি নি। তা বাড়ির পথে গেলে মুডটা বেশ ভালই লাগে, তাই মনে হয় এখনো লোকে মনে রেখেছে। একই মুদ্রার এ পিঠ আর ও পিঠ আর কি। সেখানে যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে বসে, “আরে তোমাকে এখানে দেখি না কেন? আর থাকো না নাকি? চাকরি বাকরি করছো? বিয়ে শাদী?” কেন জানি না বয়সটা পট করে তেরোটা বছর কমে যায়। “কেন যায়, কেন যায়?” রফি সাহাবের প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কি চাড্ডিখানি কতা? তারপর আবার নচিকেতা গেয়ে গেছে , “কে যায়?” যাক গে। শুরুতেই ভাঁটালে ফিসফাসের গতিতে ভাঁটা পড়তে পারে। তাই উত্তরে “ঐ আর কি চালিয়ে নিচ্ছি” মার্কা হাসি দিয়েই পরের গল্পে লাফিয়ে যাই।

খুচরো দুইঃ
এবারে টালিগঞ্জ। এখানে আমায় কেউ বিশেষ চেনে টেনে না। বাইরের শিল্পী কি না? তা মেট্রো থেকে গড়িয়ার পথে অটোয় উঠে বসি মাঝখানে গ্যাঁট হয়ে। একটি পাটকাঠির মতো ছেলে উঠতে গিয়ে পায়ে খায় চোট। স্বভাবসিদ্ধ জ্যাঠামোতে একটু আহা উহু করে বসি। কিন্তু আজকালকার ছেলে, নিজের মরহম নিজেই দিতে জানে, তাই ভ্রুক্ষেপ না করে আধপোড়া সিগারেটে টান লাগায়। বিরক্ত হই বটে কিন্তু পল দো পলকা সাথে মুখ বুজে থাকলে খুব যে বাত বিগড়বে তা তো নয়। প্যাসিভ স্মোকিং-এ আর দেশের কতটাই বা ক্ষতি হয়! কল কারখানা, যান বাহনের ধোঁয়ায় মুখ পোড়া হনুমান হচ্ছি তো এক আঙুল সিগারেট আর কিই বা করতে পারে? যে যাই হোক, চলতে চলতে তার হঠাৎ খেয়াল হল যে তাকে সোজা হয়ে বসতে হবে। এই অবস্থায়, “দাদা একটু চেপে বসুন না” বললেই সাধারণত কাজ হয়। যদিও তেঁটিয়া লোকজন, জায়গা কোথায় বলে টলে, কিন্তু কেমন করে জানি না ফুড়ুত করে একটুখানি জায়গাও বেরিয়ে যায়। এক্ষেত্রে প্যাঁকাটি আর সে ধ্যাষ্টামো না করে গেলেন ভীমের মত মল্ল যুদ্ধে। মানে ফুটবলের ভাষায় সোল্ডারিং আর কি। আর সব মানুষের মতই আমিও ভালবাসার কাঙাল বুঝলেন? ভালবেসে হেসে টেসে বললে কি না করতে পারি। কিন্তু ট্যারামো করলে মাথার ক্যাড়াটা এটু নড়ে টরে যায় না? তাই আমিও ঠিক করলাম আমার কাঁধ আর অঙ্গদের জানু সমার্থক করে দেব। তা চীনের প্রাচীরে খড়কে কাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে আজ অবধি কেই বা আর বড়লোক হয়েছে। তাই ফল যা হবার হল, তিনি সুড়ুত করে নেমে গেলেন পরবর্তী স্টপেজে, তবে সেটিই তার গন্তব্য ছিল কি না জানি না।

খুচরো তিনঃ
পরের ঘটনাটা এরই আশে পাশে ঘটা, তবে এবার স্থান বিবেকানন্দ রোড। শহরের এটিএমগুলির একটি বৈশিষ্ট্য আছে যে খুব কপাল খারাপ না থাকলে আপনি টাকা পয়সা পাবেন না। যেন আপনার ঠিক আগের ব্যক্তিই দেউলিয়া হয়ে যাবার ভয়ে অনিয়ন্ত্রিত অর্থ আত্মসাৎ করে কেটে পড়েছেন আর আপনার হক্কের কপালে লেখা আছে ফুটো পয়সা আর দইয়ের ফোঁটা। (এই গল্পটা সবাই জানে তাই আর ছড়ালাম না)
তা এডাল সে ডাল করে টাকা হাতে পেতে পেতে তিন খান এটিএম পেরিয়ে গেল। যাবার কথা ছিল কোন আত্মীয়ের বাড়ি, তা বাঙালীর স্বভাব, খালি হাতে যেতে নেই। তাই হাতে করে একখান কোল্ড ড্রিংক্সের বোতল নিয়েই যাচ্ছিলাম। ডালবদল (দলবদল তো করে উঠতে পারলাম না, এটাই সই) করতে করতে কোন পাতে যে ঝুলিয়ে রেখে এসেছি… বেশ চলছিলাম, হঠাৎ হাত খালি লাগতেই বুঝলাম কি হয়েছে। কোলকাতার ছেলেরা হক্কের দাবী কখনই ছেড়ে আসে না। তাই আবার ডালে ডালে পাতায় পাতায় ফিরে যেতে যেতে এক এটিএম-এ ঢুকে দেখি পাশের টেবিলটায় একটা গোল জলের দাগ। মানে তিনি এখানেই ছিলেন কিন্তু এখন নেই। তুমি কোথায় করে ডাকতে ডাকতে দেখি পাশের গার্ডরুমের দরজাটা খোলা, তা সেটাকে টোকা দিতে আরও খুলে গেল আর আমিও গলে গেলাম তারমধ্যে দিয়ে। এদিক সেদিক করে দেখি সামনের কাঠের আলমারিটিও খোলা। তা সেখানে দিতে হল হালকা টান। ও বাবা, দেখি আমার গণেশ ঠাকুর আমার সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে। আব্বু ধুকি।
তা দেখতে শুনতে আমার গণেশের মতই লাগলো বটে তাই বিনা বাক্য ব্যয়ে সেটিকে তুলে বগল দাবা করে আবার ফিরে এলাম। আসতে আসতেই মনে হল, এটা আমারই তো বা অন্য কিছু মিশিয়ে রেখে দেয় নি তো? দুর্ভাবনায় কি হাওয়ায় মাতবার আগেই ছিপি খুলে এক ঢোঁক মেরে নিশ্চিত হলাম… তুমি আমারই ইত্যাদি এবং ইত্যাদি। যার বাড়িতে গেলাম তার হাতে খোলা বোতল দিয়ে বললাম, “হেব্বি তেষ্টা পেয়েছিল তা বগলে বাচ্চা নিয়ে আর শহরে ঢ্যাঁড়া পেটাতে যাই কেন? তাই আর কি…” সেও দেখলাম বেবাক আমার যুক্তি মেনে নিল। কি আর করি, আমিও অন্য গল্পে যাওয়া মনস্থ করলাম।

খুচরো চারঃ
ছেলেবেলায় ফিজিক্স পড়তে গিয়ে জেনেছিলাম যে এক জায়গার কিছু পদার্থ সরালে তবেই সেই জায়গায় নতুন পদার্থ আনা যায়। অপদার্থগুলোর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা। আমার পরিচিত অপদার্থগুলির একটি সদ্য গিয়েছেন এবং তার বদলে একটা চড়াই পাখির গোঁ ধরা নাপদার্থ এয়েছেন। তা তার সঙ্গে দেখা করে ফিরে আসছি, (যদিও সে তার আগেই ফ্রিজের মাথা ও মাউন্ট এভারষ্টের মধ্যে মিল নিয়ে বাস্তবিক ডেমো দেখিয়ে দিয়েছে) সে দৌড়ে ফোন হাতে এসে যা বলল তার মানে দাঁড়ায় এজমালি জমিদারী ছেড়ে গিয়ে এক পাবলিক তার ওয়াকফের দাবীদারের কাছে জমির হিসাব চাইতে ফোন করেছে। আমি খুব গম্ভীর গলায় ফোন ধরে বললাম, “কে মা তুমি? কাকে চাই?” সে কচি আরো কচি হয়ে বলল, “কাকু!!!! আমি ইশের বন্ধু ইয়ে বলছি… ইশে আছে?” বোজো কাণ্ড। “কাকে”র উত্তরে “কাকু” আমি পাঁচু দত্তের মতো করে বলে উঠলাম, “কাকুউউউউ, কে কার কাকু? কাকুরই বা কে?” এতোগুলি ডবলু এইচ প্রশ্নেই সে ঠিক চিনে গেল যেমন করে কচুকে চেনে ইয়ে… “এ মা সারস বলছিস!!” বাকিটা শোনার জন্য ছিলাম না। আপনারা অনুমান করে নিন…

খুচরো পাপ (পাঁচ?)
এখানে কোন ঘটনা নেই। বহুদিন পর নিজের শহরে স্বাধীনতার দিন উপভোগ করলাম। সেই ক্ষুদিরামের জন্মদিন থেকে শুরু হয়ে যায় স্বাধীনতা সপ্তাহ, সারা শহর জুড়ে বাচ্চারা চিত্রকর হয়ে যায়, মোটা মোটা প্যাস্টেল নিয়ে ধূসর শহরকে কল্লোলিনী করে তোলে। আকাশ বাতাস মুখরিত হয়, কিশোরের বিদেশিনী আর রফির ঝড়ে যাওয়া গুলমোহরের ফুলে। যুগবিজয়ী শিল্পীরা আবার কানের ভিতর দিয়ে মরমে পশিয়া বলে যায় “ভাল আছি ভাল থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো…” আকাশের গায়ে প্রবল মেঘেও তখন এক ফোটা আলো উঁকি দিয়ে বলে যায় “হাল ছেড়ো না বন্ধু বরং কণ্ঠ ছাড়ো জোরে…”

শেষ পাতে দুধ ভাত
মোটামুটি সুচরিত হলে কক্ষনো বিবাহযোগ্যা তরুণী ও তার পিতামাতার সঙ্গে একই কোচে ভ্রমণ করবেন না। একই সঙ্গে নিজেকে বিশ্বকামুক এবং আইসক্রিম বলে মনে হবে। বাকিটা নিজেরা নিজেরা কাটা ছেঁড়া করে নিন, আমি আর বাড়ালাম না। জয় হিন্দ!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s