৬৯

“দেখছেন তো দাদা কত সাফার করতে হয়?” একে তো কান্ডারী হুঁশিয়ার হয়েই আছেন… আজ দিল্লী কাল কলকাতা, যেখানে পারছেন ফেলে ছড়িয়ে একসার কাণ্ড। তার উপর পথে ঘাটে যানজটে নাকাল হয়ে পাঁকাল মাছের মতো সুড়ুত করে বেরিয়ে যাব তার জো নেই। সেখানেও কেউ না কেউ খাটিয়া পেতে বসে তেল মেখে মুড়ি চিবোচ্ছে মুখটাকে বাংলার পঁচাত্তর করে। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে একটু এগোলেই মামা বাড়ির এলাকায় লাল আলো জ্বলে যায়। সেলাম, নমস্কার, আদাব করেও রেহাই পাওয়া যায় না। কত যে সাফার করতে হয়…

এগুলো আমার নয় জনৈক অটো চালকের মনের কথা। না, প্রথম বাক্যটি ছাড়া বিশেষ কিছু বলতে পারেন নি। তিনি কিন্তু পশ্চাৎ দর্শন আয়না মাঝে সাঝে মনের আয়না হয়ে দাঁড়ায় যে। কলকাতায় এলেই ভ্রমণ বিলাসিতা বুকের উপর চেপে বসে। সকাল হলেই ট্যাঙস ট্যাঙস করে শহর দর্শনে বেরিয়ে পড়া। এখন তো একটা নয় দু দুখান লেজুড়।

যাই হোক, শোভাবাজারের শাঁকালু চিবিয়ে বি কে পাল এভিনিউ বেয়ে অরবিন্দ সরণীর দোরগোড়ায় বাক্স প্যাঁটরা সমেত এসে দাঁড়িয়েছি, অমনি, উল্টো মুখো একখান অটো জিনেদিন জিদানের মতো একখান জবরদস্ত টার্ণ নিয়ে দাঁড়ালো সামনে, “উল্টোডাঙ্গা?” অস্বীকার করে উপায় নেই, এমনি কিছু একখান চাইছিলাম বটে। তা আশে পাশে তাকিয়েও স্বপ্নাদিষ্ট বাবাকে দেখতে পেলাম না তাই বিনা বাক্য ব্যয়ে উঠে বসলাম বাহনে। একটু এগিয়েই হরি ঘোষ স্ট্রীট, সেই যে যেখানে বিশ বছর আগে আমি আর আমার মাসতুতো দাদা, অষ্টমীর দিন হঠাৎ কোথাও কিছু নেই একটি চারতলা বাড়ির ছাদের দিকে আঙুল দেখিয়ে কিছুক্ষণ, ‘ওই দ্যাখ’, ‘সত্যিই তো’, ‘কি দারুণ, না’ ইত্যাদি বলে ভিড় জমিয়ে দিয়ে চলে এসেছিলাম। সেটাতেই প্রমাণ হয়েছিল যে পাবলিকের হুজুগের বিশেষ কোন কারণ দরকার পড়ে না। যাই হোক, মূল গল্পে ফেরা যাক নাহলে বাসি রুমালি রুটির মতো গল্প টেনে জনি লিভারের জন্য প্যারালাল গল্প চালালে কপালে অর্ধচন্দ্র জুটতে পারে। পাবলিক কি এতই বোকা নাকি? (এটা নির্ভেজাল গ্যাস)

তা সেই হরি ঘোষ স্ট্রীটের মুখে, একটা প্যাশন (হিরো মোটরসের) প্যাশনেটলি আড়া আড়ি মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে উলটো দিক জরিপ করছিল। যেন ফেলে আসা পথে কুহেলী কাজল জড়িয়ে রাখা… তাই খুঁটে খুঁটে তুলে রাখছিল। এদিকে যে ভুঁইফোঁড় লেভেল ক্রসিং হয়ে গেছে তা আর খেয়াল নেই। ফলে সেই বাছা বাছা বিশেষণ জুটলো কপালে, (তার, আমার নয়) কথা বাড়তে পারে এই আশঙ্কায় আমি দিলাম মাঝখানে ঠ্যাং ঢুকিয়ে। ‘আরে, চলো না ভাই।’ ব্যাস আর যাই কোথা। সেই যুগান্তকারী ডায়লগ- “দেখছেন তো দাদা কত সাফার করতে হয়?” তারপর আমাকে বলার সুযোগ না দিয়েই, বাইক আরোহীর, ব্যবচ্ছেদ শুরু হয়ে গেল। আরও আগে টেনে নিয়ে যাবার ইচ্ছা হয় তো ছিল, কিন্তু তালি তো একহাতে বাজে না। তাই আমার মৌনী হওয়াই বাঞ্ছনীয় হয়ে দাঁড়ালো। গাড়িও গড়ালো খান্না হয়ে গৌরীবাড়ী বাড়ি পেরিয়ে বিধান নগর স্টেশনের দোরগোড়ায়। প্রায় মেরে এনেছি তখনই আবার ঘটলো আরেক ফিস ফাস। কিছু না, পুলের নীচ দিয়ে আসার সময় পুলুশ বাবা হাত বাড়িয়েছে কি বাড়ায় নি। অটো চালক ফটাস করে সেলাম ঠেকে এক গাল হেসে বলে দিল “হ্যাপ্পি নিউ ইয়ার”। মামাটা কচি ছিল তাই কি করবে বুঝতে না পেরে টুক করে মাথা নেড়ে দিল। আর চালক ঝাড়ল তার পেট ডায়লগ, “দেখছেন তো দাদা কত সাফার করতে হয়?” সঙ্গে জুড়লো ফাউ হিসাবে, “হাত এদের বেরিয়েই আছে। কিছু বলার আগেই মুখ বন্ধ করে দিতে হয়…”

আমার পেটে সত্যিই তখন হাসির হাল্লাগাড়ি চলতে শুরু করেছিল। তাই বিশেষ কথা না বাড়িয়ে সোজা ভি আই পি সুইটসে ঢুকে দুখান গুড়ের কড়া পাক খেয়ে একটু ধাতস্ত হলাম। আপনারা যদি বিশেষ আমোদ না পেয়ে থাকেন তাহলে ফ্রিজ খুলে একখান সন্দেশ খেয়ে আরাম করুন আর আমিও কাটি। আমেন…

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s