(৭১)

বিয়ে খাওয়া… পাঠক পাঠিকা আবার এ রকম কল্পনা করে ফেলবেন না যে আমি দজ্জাল শাশুড়িদের মতো কিছু করার প্ল্যান করছি। গোদা বাংলায় পরিস্ফুট করে লিখলে হয়, “বিয়ে বাড়িতে নিমন্ত্রিত হয়ে ভোজ খাওয়া”। তা সে সব তো কিশোর বয়সের স্বপ্ন, যুবা বয়সের উন্মাদনা, পরিণত বয়সের লুকোচুরি আর বার্দ্ধকের দীর্ঘশ্বাস। তখন পাত পেড়ে বসে মানুষ গল্প করে, “খেয়েছিলাম বটে ন্যাপলার দিদির বিয়েতে…” বলে অতীত জাবর কাটা আর বর্তমানের শসা আর পেঁয়াজ কুঁচির দিকে তাকিয়ে কুম্ভীরাশ্রু মোচন।

যাই হোক, আমি এখনো সেই সিংহাসনে উপবিষ্ট হতে পারি নি বলে বেশী কথা বলব না। দু চারটে স্কোয়ার পাস খেলে গোলে বল দাগব। এক জমানায় রসগোল্লা খাবার খুব বদনাম ছিল বটে, একটা উচ্চিংড়ের মতো বন্ধু টপাটপ হজমির গুলির মতো রসগোল্লা খাচ্ছে দেখে আমি তার এক কাঠি বাড়া হয়ে শেষে বেলেঘাটা থেকে এক ঘন্টা হেঁটে ফিরে হজম করে ফেলেছিলাম অত্তোগুলো রসসোগোল্লা। বা আরেক নিমন্ত্রণে এমন খেতে শুরু করলাম যে আমার সঙ্গে জগঝম্প দিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমে এক অলপ্পেয়ে সমুদ্রের মতো সব রসগোল্লা থালাকে ফিরিয়ে দিয়ে (তখন তো আর মেলামাইন বা ঝুঠো কাঁচ ছিল না… কলাপাতায় নূপুর বাজিয়ে বানভাসি হয়েছিল অবশ্য) উঠে চলে গিয়েছিলেন নিজের বুকে দাড়ি লাগাবার প্র্যাকটিস করে। সে তো আকবর বাদশার জমানার গল্প।

এখন তো ওই শসা আর অ্যান্টাসিডের ভিতর লুকোচুরির স্টেজে দাঁড়িয়ে থাকি। তবু ভুলিতে পারিনা সেদিন বিজনে কি জানি কি হয়েছিল। তাই কেউ ডাকলে যারপরনাই আহ্লাদিত হই, নবদম্পতিকে আশীর্বাদ করে ঊর্ধ্বগগনে মাদল বাজিয়ে ঢেঁকুর তুলে ফিরে আসি, যাতে বেশী হড়কাতে না হয়।

তবে দিল্লীর বিয়ের নিমন্ত্রণের একখান ঝুঁকি আছে। এখানকার খান্না গুপ্তা টুটেজা পাকরেজারা বাস্তব জীবনে যতই চিকেন আর মানুষের ঠ্যাং চিবোক না কেন, অনুষ্ঠান বাড়িতে আশ্চর্যজনক ভাবে ভণ্ড তপস্বী হয়ে ভাজা মাছটিকে তেলের ডোবায় ফেলে ঘাসফুস চিবোয়। আর আমার অবস্থা রবি শাস্ত্রী খুব সুন্দর বর্ণনা করেন, “আমাকে কেউ খেয়ে ফেলার আগেই তাকে খেয়ে ফেলি”। সেই সব বিয়ে বাড়িগুলোতে আমি আমার মিষ্টি দাঁতের ভুষ্টিনাশ করি এখনো। যদিও কোথায় লাগে রসগোল্লা, গুড়ের সন্দেশ আর কোথায় লাগে গুলাব জামুন আর পেঁড়া। তবুও সামাজিক দায়িত্ব আর পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা কি ফেলে দেওয়া যায়? না চাইলেও গতি করতে হয়।

তা তেমনই এক পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা বিয়েতে যাবার হুকুম ছিল কাল। এমনিতে আমি খুবই বাধ্য, মন না মানলেও আমি মেনে যাই। তাই আমার ভালোমানুষি আর বাক্স প্যাঁটরা সঙ্গে নিয়ে রওনা হলাম বৃহত্তর নয়ডার উদ্দেশ্যে।

এখন একখান নতুন ট্রেন্ড হয়েছে। সবাইকে বুকে নিয়ে হাম সব এক হ্যায় পোষ্টার লাগানো। শহরে বাস করার জায়গা নেই? তো চলো সবাই রাজার হাটে তাঁবু গাড়ি আর পার্কের বেঞ্চি বা মেট্রোর সিটে বসে একটু একটু করে সাইডে সরে গিয়ে সুন্দরীর কোলে বসে পড়ার মতো করে শহরটাকে বাড়িয়ে নিয়ে ইয়েভি নিয়ে নিলাম আর উয়োভি ট্যাঁকে গুঁজলামের মানসিকতা। গ্রেটার নয়ডা আমার বাড়ি থেকে পাক্কা ৪৫ কিমি, তাও তাকে বর্ধিত দিল্লী ধরে যেতে হবে।

বার ছয়েক গেছি। একবার তো বাইকে করে যেতে গিয়ে সাঁ সাঁ ১৪০ কিমির মাঝে ৮০ কিমির স্যান্ডউইচ হয়ে ভাবতে ভাবতে গেছি, “কেন? কেন? কেন?” তা প্রত্যেকবারই মনে হয় পাকিস্তানে যাচ্ছি বা নিদেন পক্ষে ভিন রাজ্য রাজস্থান। গাড়ি চলছে তো চলছেই থেমেছ কি মরেছ। এ যেন জীবন যুদ্ধের ঘোড়া বা ইঁদুর (নিজ নিজ আকৃতি অনুসারে শূন্যস্থান পূরণ করে নিন)।

তা কাল বাক্স প্যাঁটরা সমেত আটটার সময় রওনা হলাম, মনে সাধ একঘণ্টায় উড়ে গিয়ে কালো মেঘ ফুঁড়ে গিয়ে পেটে কিছু জুড়ে নিয়ে (ঘাস পাতা খাওয়ার থেকে সেলোটেপ দিয়ে স্যাঁটাই ভালো) টুক করে ফিরে আসব।

তা তার জন্য, দিন দুয়েক আগে একটি দীর্ঘসময় ধরে ডিউ সার্ভিস টুকু করিয়ে নিয়েছিলাম গত নরশু (নাকি তরশু… কে জানে? ধরে নিন না কিছু একটা!)। তখনই কেমন যেন সামনের বাম দিকের চাকার মতিগতি ঠিক লাগছিল না। এমনিতেই টিউবহীন টায়ারের গর্ভাবস্থা বোঝা মুশকিল হয়, তাই সার্ভিসকারী রজার ফেডেরারকে বলেছিলাম, “ভাই, তেমন বুঝলে স্টেপনিটিকে ময়দানে নামিয়ে হাওয়া ভরে দিও”। তা সে ত্রিকালজ্ঞ বরাভয় মূর্তি হয়ে বলে দিল, “আরে সাব টায়ার ঠিক হ্যায়, বদল নে কি জরুরত নেহি”।

আমরা তো আজকাল বাবাদের বাণীকেই জীবনের শেষ কথা বলে ধরে নিই। তাই বেদবাক্য মেনেই উড়তে শুরু করেছি। “জিন্দেগী এক সফর হাস্নুহানা” গান চলছে। কানে হাওয়া না লাগলেও তালা লাগে নি- মনে হতে শুরু করেছে, এই তো পৌঁছে গেলাম বলে তখনই হল ব্যাপারটা!

ঠাঁই ঠাঁই দুমদাম শুনে লাগে খটকা
খালি পেটে তাই বলে আমি ভাবি ভোঁটকা…।

কিন্তু সে গুড়ে জেলুসিল… কর্ণের রথের চাকা, মাঝ দরিয়ায় ডুবিল। জীবনটাকে ফুটবলের মত গড়িয়েছি বলেই বোধহয় কিছুতেই বিশেষ চুপসে যাই না, আর বাক্সটাও মজবুত, সব সময় ভার বওয়ার জন্য প্রস্তুত। তাই জোর কদমে নেমে পড়লাম স্যুট বুট পরে, রথের চাকা তুলতে।

তবে জনমনিষ্যিহীন কুরুক্ষেত্র (যুদ্ধের নোটিশ না দিলে আজকালকার প্রফেশনালরা খোঁয়াড়ি ভাঙেন না যে), একটুআধটু যে বুক দুরু দুরু করছিল না তা নয়। তার উপরে সঙ্গের তিনি তো গাণ্ডিব তুলে কাণ্ডারী হুঁশিয়ার করেই আছেন।

যাই হোক চুক্তির প্রথম শর্ত অনুযায়ী, নিজের পেশী শক্তির উপর বিপুল আস্থা রেখে ডিকিতে রাখা চাকা প্রবল বিক্রমে তুলতে গিয়েই ফুসসসসসসসস। অঙ্গদের জানুর মতো আটকে আছে। না পারি নড়াতে না পারে চড়াতে। তারপর অবশ্য তিনিই মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে পথ দেখালেন যে রথের পরিবর্ত চাকা ইস্ক্রুপ আঁটা হয়ে মিটিমিটি চাইছে। তারপর কসরত টসরত করে তাকে খোলা গেল।

তার পর এল জ্যাকের পর্ব।

জ্যাক অ্যান্ড জিল
ওয়েন্ট আপ দ্য হিল
টু ক্যাচ অ্যা গ্লিম্পস অফ দ্য গ্লাইডার
দ্য রবার ওয়াজ ব্রোকেন
অ্যান্ড দ্য গ্লিম্পস ওয়াজ অ্যা টোকেন
হুইচ ব্রট জ্যাক ডাউন বাই দা স্লাইডার…

এটা ছিল পি পি, মানে পুওর পোয়েম বা পচা পদ্য (আবার এ সব কেন? এবারের ফিসফাসটাতো দুম দাম হচ্ছে!)। ফিরে আসি রাস্তায়, জ্যাক ঘুরিয়ে গাড়ির গাত্রোতপাটন করতে কালঘাম ছুটে গেল। এক নম্বর কারণ, কখনো ঘোরাই নি ঘানি- দুই নম্বর কারণ, জ্যাকটি একটি লজঝড়ে কানি- আর তিন নম্বর কোথায় লাগাতে হয় কি জানি?

যাই হোক মন ও পেট পরিষ্কার থাকতে শিখতে কতক্ষণ? ততক্ষণে অবশ্য বিয়ের কনে (যে নিমন্ত্রক ছিলেন আর কি) ও রাস্তা ঘাটে হাতিকে কাদা থেকে টেনে তোলা ব্যাং ‘রেস’ কোম্পানিকে ফোন করা হয়ে গেছে। কনেটি বড়ই ভালো- অত ঝামেলার মধ্যেও (পাঞ্জাবী বিয়েতে ল্যাজ বিশিষ্ট ব্যাপার স্যাপার কমই হয়!) সে তাদের গাড়ির ড্রাইভারের নম্বর দিয়ে দিয়েছিল নির্দেশ সহ। তা সেই ডোনাল্ড ডাকের ডাক বিশিষ্ট মিকি মাউস বলল যে পারি চক (নদীর পাড় আর কি) পৌঁছে যান, তাইলে ব্যবস্থা করে দেব! (ইল্লি আর কি! সেখানে গেলে তোকে ডাকতে হবে কেন রে মুখ পোড়া মিনসে?)। আর রেস বলল, এখন দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশ পেতে চলেছে তাই এক ঘন্টা লাগবে। (তারপর শেফালী খান এসে বলবে, ‘ওয়াও, পাঞ্চার? ক্যায়সে?’ ইত্যাদি টিত্যাদি)।

যাই হোক আমি ঠাণ্ডা শীতের রাতে লেপের আদরে না থেকে তারাদের চাদর মুড়ে নিয়ে যথাক্রমে জ্যাক, পথপাশের ইঁট এবং প্রস্তর খণ্ড সহযোগে রথ তুলতে শুরু করলাম। দু কদম যাই তো এককদম থামি আর হাজার কথা ভাঁট বকি। আরেকজন শিবের মত সমস্ত গরল পান করে সমন্বয় সাধন করেই যাচ্ছেন।

তার পর এলো সেই ফ্রেমে বাঁধানো মূহুর্ত। হুড়ুৎ করে জ্যাক ও পাথর এবং ইঁট সঠিক উচ্চতায় পৌঁছে গেল আর চার পাঁচবার লাফালাফি করে বসে যাওয়া চাকাটিও ধড় থেকে আলগা করে ফেললাম। এই সময় পুত্র বলল, “বাবা রেসের গাড়ি চলে গেল, পাশ দিয়ে!” আমি বললাম “যেতে দাও গেল যারা, আমি দ্রুত জুড়ে নিই আছে তাড়া! (কে জানে, শুধু মাত্র খবরদারি করার জন্য যদি ফি চেয়ে বসে?)

আর কি, নতুন টায়ার লাগানো তো সময়ের অপেক্ষা, তা সেও হয়ে গেল কিছুক্ষণের মধ্যে। কিন্তু দেখা গেল বহুদিনের অযত্নে সেও চুপসে আছে। তাই কোনরকমে গাড়ির ডান দিকে চেপে বসে সবাই মিলে টুকুস টুকুস করে পৌঁছে গেলাম।

ও হো এ তো দেখি ‘ছিল বেড়াল আর হয়ে গেল রুমাল’! বিয়ে বাড়ির গল্প হবে না? সে আর কি বলি ঝাঁচকচকে বিয়েবাড়ির, ধবধবে সাদা প্লেটে, ততোধিক সাদা খাবার দাবার খেয়ে টেয়ে (যতটা পারলাম আর কি!) ফিরে আসার সময় দেখলাম বিয়ের পুরুত গো বেচারা বর পেয়ে হাতে ও গাঁটে কাটছে। বলুন দেখি, অন্য পোশাক আনে নি শীতের রাতে বিয়ে করবে বলে, গো দান করতে হবে- আর না পারলে প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ সর্বঘাটে কাঁঠালি কলা অর্থদান। তা সে ভালোমানুষের পো আবার এক তাড়া নোট হাতে নিয়ে বসেছে, তার কপালে তো ধ্রুপদ খেয়াল আর শূন্য দেওয়ালই লেখা থাকবে।

তা সে যাকগে, যে যার নিজের কর্মফল ভোগ করে। জ্ঞানত অজ্ঞানত আমরা কত রকম কাজ করেই তো বলে ফেলি, “এ মা বুঝতে পারি নি!” তা তার ফল যাবে কোথায়, এ জন্মেই তা খেয়ে যেতে হবে… বাজারের যা অগ্নিমূল্য হচ্ছে! আমেন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s