(৭৩)

পাঠক পাঠিকারা নিশ্চয় জানেন গত বিশ বছরের সব থেকে জনপ্রিয় গ্যাজেট কোনটি? আরে বাচ্চা বাচ্চা ভি জানতে হ্যায় ভাই! হোয়াট ইজ মোবাইল নাম্বার হোয়াট ইজ ইয়োর স্টাইল নাম্বার। যত দিন যাচ্ছে- অন্ধের যষ্টি, শীতলা ষষ্ঠী, পাথরের কষ্টি, বোশেখের জষ্ঠি আর রাবণের গুষ্টির মতো অপরিত্যাজ্য মোবাইলের ব্যবহার পিলপিল করে বেড়েই চলেছে যেন আদমসুমারির মাথা গোনা হচ্ছে।

বাংলা ভাষায় যাকে আমরা মুঠোফোন বলে বেশ আহ্লাদ অনুভব করি, সেই সেলফোন তথা মোবাইল ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হতে হতে বনসাই সাইজে টুকুত করে পুরুষের চোঙা প্যান্ট আর মেয়েদের টাইটসের অলিগলিতে সেঁধিয়ে যায় এমনভাবে যেন তেঁতুল পাতায় সুজন। কিন্তু যেই সেটা প্যাঁক বা টুং বা দুড়ুম বা দুম দাম করে বাজতে শুরু করে তখন যেন তোলপাড়িয়ে উঠল পাড়া… বলছি কথা একটু দাঁড়া টাইপের ব্যাপার স্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

শীতকাল এলে আরও সমস্যা ঠাণ্ডার সঙ্গে পকেটের সংখ্যাও যায় বেড়ে- আর তখন তা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ভল্ট। আগে নম্বর কম্বিনেশন খুঁজে বার করুন তারপর মিলিয়ে দেখুন যে আপনারটাই বাজে আর সবারটা ভালো কি না (মনের মিল ভালো, কিন্তু রিংটোনের মিল? নৈব নৈব চ), তারপর কোনরকমে ধরে সঠিক স্থানে টিক মেরে কথা বলতে শুরু করেই দেখলেন টাওয়ার অদৃশ্য, সংযোগ সমস্যা আর শুনতে না পেয়ে পাগল কে গোপাল ভাবা।

আগেকার দিন ছিল ভালো- যোগাযোগ না করতে পারলে পটাং বলে দেওয়া যেত যে বাড়ি ছিলাম না হে। আর এখন? বাড়ি নেই বলে কি ফাঁকি দিতে পারবে বাওয়া? মোবাইলে থাকো, হাতের কাছেই তো, দরকার পড়লেই কান ধরে কানে ধরিয়ে দেওয়া যাবে। আর কে না জানে যে কান টানলেই আসে মাথা- সে দিল্লী হোক বা কোলকাতা।

সেই কারণেই মানুষকে মিথ্যে বলতে শেখায় মোবাইল, স্বচ্ছন্দে বাড়ি থেকে না বেরিয়েই জানলার সামনে গিয়ে সে বলে দেয় এই তো দশ মিনিটেই…!

যাই হোক, ফিসফাস এদ্দিন ধরে যখন লিখছি তখন একটু সামাজিক কর্তব্য তো করতেই হয়। সৃষ্টিকর্তার সামাজিক দায়িত্ব বা Creators Social Responsibility বা CSR বলে কথা! তাই মূল গল্পে যাবার আগে একটু সাবধানবাণীঃ ঘাড়, মস্তিষ্ক, হৃদয় ও শিশ্ন সোজা রাখতে মোবাইলকে দুয়োরাণীর আসন দিন। মানুষের মতই উক্ত অঙ্গগুলি “ন্যাতানো” থাকলে খুব একটা উপকার হয় না। আর কোন কিছুর উপরেই অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার অপর নাম কিন্তু প্রতিবন্ধকতা। তা সে যতই বন্ধু বলে মনে হোক না কেন, ক্ষয় ক্ষতির হিসাবে দাঁড়ি কমা ফুলুস্টপের গরমিল করেই দেয়।

বিনামূল্যে জ্ঞান বিতরণের কারণটা এবারে বলেই ফেলি, বেশী ফুটেজ খেলে বেঁটে হয়ে যাবার সম্ভাবনা। এমনিতে আমিও গড়পড়তা ভারতীয়ের মতই তিন পায়ে চলি!! মানে দুই পায়ের সঙ্গে কোমরবন্ধনীতে ঝোলা একটি সেলফোন (একটাই, আজকাল তো আবার একাধিক সেল আর তার সঙ্গে ততোধিক নাম্বার না থাকলে আপনি আইসবাইস/ দুধভাত), যা আমাকে কারণে অকারণে ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে। কিন্তু আদৌ কি তা হয়? সেটা বলতেই এত ধানাই পানাই!

দু দিন আগে আমার শালীর সপতিক (সপত্নীক/ সস্ত্রীক হলে এটাই বা হবে না কেন?) আসার কথা- কিন্তু ভায়রাদাদাকে (সিম্পল লজিক- ছোট হলে ভায়রাভাই আর বড় হলে……) রাত্রেই ট্রেন ধরে লক্ষ্ণৌ যেতে হবে। এমনি হলে হয়তো, “না রে ভাই আজ হলো না!” ইত্যাদি দিয়ে কাজ চালানো যায়। কিন্তু উপলক্ষ যদি নীলিমার ক্ষণে (Once in a blue moon রে বাবা!!) উপস্থিত হয়, তাহলে লক্ষ স্থির করতেই হয়, তা যতই লক্ষ্ণৌ যাবার হোক না কেন, মানিয়ে চলাই তো জীবন! তাই আধ ঘন্টা হাতে রেখে রওনা হওয়া এবং রেডিও ট্যাক্সি বুক করা। রেডিও ট্যাক্সি হলো সেই ট্যাক্সি যাকে রেডি হয়ে ডাকলেই নাপাতে নাপাতে চলে আসে।

তা নাকে মুখে চোখে (মানে খানিক গন্ধ শুঁকে, খানিক চেখে আর খানিক দেখে) গুঁজে দাদা তৈরী, ট্যাক্সিও ডাক দিয়ে হাজির। কিন্তু গাজিয়াবাদ তো ট্যাক্সির পরিধি থেকে বাদ, তাই দিল্লীর রাস্তায় দাঁড়িয়েই, “হাঁ জি, কাঁহা হো জি” হাঁক। আমিও দ্য পারফেক্ট হোস্টের মতো তড়াক করে নিজের গাড়িটায় দাদাকে বসিয়ে মারলাম ছুট, দশ মিনিটটা যেন পাঁচ মিনিটেই হয়ে যায়। (কাক্কাজির একটা গান ছিল না… “শাশু তিরথ শশরা তিরথ তিরথ শালা শালী হ্যায় এবং ইত্যাদি ও প্রভৃতি” সেটা মাইরি একদম বেদবাক্য!!) যাবার পথে ফোন বাবাজি যেই দিল নিজের উপস্থিতি জানান, আমিও বাধ্য নাগরিকের মতো (মাঝে মাঝে আমার গান্ধিজীর তিন বাঁদরের অবস্থা হয়, “বুড়া মাত শুন, বুড়া মাত বোল, বুড়া মাত দেখ”… নিয়মেই নিরাময় আর কি!) তাকে করলাম হাত বদল। দাদাই যখন যাবেন তখন আমিই বা এর মধ্যে পড়ি কেন?

তিনি ওস্তাদ মানুষ! দু মিনিটেই ট্যাক্সির অবস্থান আর আমাদের গন্তব্যের অক্ষ দ্রাঘিমা মিলিয়ে দিলেন, আর তিন মিনিটে গাড়ি থেকে ট্যাক্সিতে (অবশ্যই সেটাও গাড়ি, কিন্তু ভাড়া) সামান আর মান হুঁশ উভয়েই স্থান পরিবর্তন করল এবং ট্যাক্সি উড়ে চলল গন্তব্যের দিকে। আমরা বাড়িতে অপেক্ষা করছি, যে কবে পুষ্পক রথ শ্রীলঙ্কায় ল্যান্ড করবে আর আমরাও বীণার বাজনা শুনতে পাব! (ফিসফাস-১ মনে আছে? বাজিল কাহার বীণা?) তা সে বীণা বাজল তবে আমারটি নয় তাঁর সহধর্মিনীরটি।

সেটাই স্বাভাবিক, কাছের মানুষকেই তো সবার আগে লাইনে জায়গা করে দিতে হয়। কিন্তু সে বাজনা বড় বেদনার মতো বাজল আমার কানে বুইলেন! দাদা আমাকেই চাইলেন- আমি ভাবি ওই থ্যাঙ্কু থ্যাঙ্কু টাইপের ডিস্ক্লেমারগুলোর অবতারণা হবে। কিন্তু সে গুড়ে চাউমিন (কি অদ্ভুত কম্বিনেশন একবার ভেবে দেখুন!) তিনি আমার কানে কানে সসংকোচে বললেন যে, “অশ্বত্থাম হত! ইতি গজ!” অর্থাৎ আমার মুঠোফোন তাঁর মুঠোতেই থেকে গেছে।

আমি তখনও অশোকচক্র পাবার চেষ্টা চালাচ্ছি- রাবণের মত হেসে, বললাম “সে আর এমন কি!” কিন্তু ভারসাম্য নড়বড়ে হয়ে যাবার বেদনায় বাঁদিকের বুকের তিন নম্বর পাঁজরাটা মচমচিয়ে বলে উঠল, “সে কি!”

জানেন, সেই পুরনোদিনের বিজ্ঞাপনটার কথা মনে পড়ে গেল, “এখন আমি কি করব?”-র উত্তর এসেছিল, রাবিন্দ্রিক টোনে, “বড় দেরী করে ফেলেছেন ভাই!” সত্যিই স্টেশন অবধি ছোটার সময়ও নেই। খালি আধঘণ্টার সাসপেন্সে লক্ষ্ণৌ মেলকে আমার বাড়ির সামনের ট্রেন লাইন দিয়ে কু ঝিকমিকিয়ে চলে যেতে অবলোকন করা ছাড়া কিছুই করার থাকল না।

বাড়ি ভর্তি লোক, আমার গেলা ছুঁচোটা গলার আশেপাশে ত্রিশঙ্কুর মতই ঝুলে রইল। মুখে বাজাজের সি এফ এল জ্বালিয়ে হ্যারিকেন হাতে বলে ফেললাম সবাইকে, “বাঁচলাম, অন্ততঃ শনিবার পর্যন্ত!” (শনিবারেই তিনি ফিরে আসবেন যে!) দেখতে দেখতে দুটো দিন কেটে গেল, একটা ঠেকা দেবার মতো দেশলাই বাক্স হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি যাতে আপতকালীন পরিস্থিতিতে আমাকে আমার লোক ধরতে পারে। (সেটা খুব জরুরী! জানেন তো! নিজের লোকের ধরা ছোঁয়ার মধ্যে থাকা!) ফোন ছাড়া ফণী (PHONEY নয় কিন্তু) হয়েই আছি। কিন্তু এত অসুবিধার মধ্যেও কোথাও যেন মনে হচ্ছে তিন দিনের জন্য হলেও কাঁধের বাঁদরটা একটু নেমেছে। একটু হাত পা ছড়িয়ে লাফাতে লাফাতে মহাশূন্যে দড়ি ছেঁড়া বাছুর হবার আনন্দ, নিত্য প্রয়োজন ও অভ্যাসের চিনচিনে ব্যথাটার মধ্যেও অনুভব করতে পারছি বলেই বলছি। মাঝে মাঝে আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়ানো ভালো। বন্ধন মুক্তির স্বাদ তো থাকেই, সঙ্গে থাকে বোনাস হিসাবে ফেলে আসা দিনগুলোর আশা। তবে বেশী দিন নয়, বাস্তবে ফিরে আসুন, নাহলে স্বভাব খারাপ হয়ে যাবে অভাবে!!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s