(৭৫)

একটা হাততালি দেবেন না মাইরি? দুটো লিখতে পারব কি না ঠিক ছিল না এখন প্ল্যাটিনাম হয়ে গেল!
যাই হোক দিল্লী বইমেলায় তো বেশ দিল্লগি হোল বুইলেন! বই টই বিক্কিরি হল! হাজার গণ্ডা লোককে স্বাক্ষর আর নম্বর দিয়ে পরেরটার পথ প্রশস্ত করেই রাখলাম। তবে প্রশস্ত হলেই তো চলে না, লিখতেও হবে গণ্ডায় গণ্ডায়, তা তার জন্য তো ঘটনাও দরকার! সে আর জোর করে কি রোজ হয়! এমনিতেই মানুষ একদম একটা বোরিং একঘেয়ে জীব, বুঝতে চেষ্টা করে করে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে নুন ছাল বেরিয়ে যাবে তবু অধরাই থেকে যাবে।

যাই হোক এবারের ফিসফাসের শুরুটা হবে বইমেলার শেষ দিয়ে। শেষের থেকেই শুরু আর শুরুতে লেখা শেষের বাঁশি। তা ওস্তাদ তো তার মার শেষ রাতের জন্যই তুলে রাখেন, উদ্যোক্তারাও কম কিসের? সুকুমার রায়, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় স্মরণ ছুঁয়ে একেবারে বাংলা দেশের রাঙামাটিতে। এমনিতে সে মাটির সোঁদা গন্ধের সঙ্গে যে দুটি বেশ বিখ্যাত তা হল বাউল গান আর ছৌ নাচ। পাশাপাশি জেলা, কি সুন্দর কৃষ্টির ঢাকে গুড়গুড় করে মধ্যম তান সেধে চলেছে, তালে তালে ছন্দে ছন্দে, পুরুলিয়া- বীরভূম, পুরুলিয়া বীরভূম- একে বারে ধেগে না না ধিন তা।

তা বাউল মায়ায় নীল আলো জ্বালিয়ে দিয়ে যখন ছৌয়ের ফ্লুরোসেন্টে গিয়ে পৌঁছল পরিবেশ, আমিও বাগিয়ে বসলাম ক্যামেরা। কাত্তিক আর গনশা শুরু করল সামারসল্ট, বসন্ততেও ঘাম দিল ছুটিয়ে! আমিও কপাকপ ছবি তুলতে শুরু করলাম। কিন্তু খালি ভাবি ডিজাইন তো বহুত হচ্ছে, কিন্তু নাচ কখন হবে? গণেশ যে সে দয়াল বাবার (মনে আছে তো? কলাখেকো দয়ালবাবাকে? ইউটিউবের দুনিয়া দিয়েছিল দুলিয়ে!) মতো দুলে দুলে এসে একবার সামনে ডিগবাজি আর একবার পিছনে ডিগবাজি খায়। তারপর কেতো এল ময়ূরের পিঠে চেপে, সেও তাই করে। এমনিতে বেশী ফ্লাইট দিলে বলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়। এখানেও সেই কেস! আওয়াজ হলো কেতো হেলো নি বাবা পরে যাবা তো!

তা তখন এসে হাজির হল দুই ভুটানী সিঙ্গি, এমনিতে নিজে সিঙ্গি হওয়ায় আমিও একটু চোখ গোল গোল করে এসে বসলাম! তা সেও দুজন দেখি হেলে দুলে এসে কাতুকুতু খেয়ে শুয়ে পড়ে। আমার তখন দুটি সম্ভাবনা কথা মনে পড়ল।

এমনিতে সিঙ্গিগুলোতে দুটো লোক থাকে একটা সোজা হয়ে আরেকটা কুঁজো হয়ে তার কোমর ধরে। কিন্তু ধরুন প্রথম জন যদি মুলো খেয়ে কাতুকুতু খায়? অথবা যদি তারাও ডিগবাজি খাবার চেষ্টা করে কিন্তু দুজনে দু দিকে দেয়? সে যাকগে সেগুলো বোকা বোকা ব্যাপার হয়ে গেল বটে। কিন্তু যেটা ভয়ানক ভয়ংকর হল, সেটি হল কণ্ঠ পরিবেশনকারী।

এমনিতে তো তিনি এক হাতে মাইক নিয়ে আরেক হাতে রিড টিপে হারমোনিয়াম বাজিয়ে সাধারণের থেকে দু ধাপ উঁচুতে গলা তুলে তুলকালাম করছেন। তারপর তাঁর হঠাৎ মনে হল যে আগের বাউলরা কি গেয়ে গেছে? আমি কি তাদের থেকে কোন অংশে কম? সেই বলে পুরুয়ালি ভাষায় গানের মাঝেই খপাৎ করে লালন আর হাসন রাজার এক দু লাইন পাঞ্চ মারতে শুরু করলেন। আমার পার্শ্ববর্তিনী (এনার রসবোধটা আবার একদম খাপে খাপ বুদ্ধুর বাপ, নলেন গুড়ের পায়েস! না থোড়া যাদা না থোড়া কম) বলে বসলেন, “এই এরা কি দ্বিজেন্দ্রলালের অনুষ্ঠানের সময় ছিল? তাহলে তো চিল চিৎকার করে এক্ষুণি ধরবে, ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা আর আর দূর্গাও দশ হাতি ডিগবাজী খাবে”। আমি সেই সম্ভাবনার কথা চিন্তা করে মানে মানে পড়লাম কেটে। বইমেলা পর্বের হল সমাপয়েৎ।

কিন্তু এত নিরামিষ গল্প কি ফিসফাসে চলে? লোকে বলবে কি? আরে চক্ষু লজ্জা বলে তো একটা ব্যাপার আছে। তাই দূরবীণ দিয়ে গল্প খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম। বেশী দূর যেত হল না। আজ সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফেরার পথে হঠাৎ দেখলাম পুলিশের ব্যারিকেড, চেকিং হচ্ছে! তা সেখানে এক জোড়া নধর গোপালকে ধরে একটি সদ্য যুবক পুলুশ মন দিয়ে জ্ঞান দিচ্ছে আর তারই পাশ দিয়ে একখান একটু বেশী যুবা পুলুশ বাইকে করে লেন টেন ডিঙিয়ে গেল চলে।

এমনিতেই দিব্যি কেটেছি যে যেখানে দেখি ছাই, চেষ্টা করিব যদি ফিসফাস পাই। তাই এই পঞ্চানন বাকি থাকে কেন। বাইকে করেই বীরদর্পে এগিয়ে গিয়ে বললাম, “তুম লোগ বিনা হেলমেটবালে কো পাকড়নে কে লিয়ে তো জাল লেকে ব্যায়ঠে রহতে হো। তুমহারা সাথী যো বিনা হেলমেটকা গয়া উসকা কেয়া? উসকো কিউ নেহি পাকড়তে হো?”

সে প্রথমে গেল ঘাবড়ে, এই কচি পুলুশ জন্মে সে কক্ষনো এমনটি দেখে নি… পথচারী এসে দিচ্ছে দেড়ে ধমক। তারপরেই সে ফিরে পেল সেটি যাকে গোদা ইংরাজিতে বলে composer (আরে নাহ, এ আর রহমান বা বিঠোভেনের বাঁশি হারায় নি!)! তারপর তেড়িয়া হয়ে বলল, “কিসকি বাত কর রহে হো? ও তো উস তরফ ইন লোগোকা বাইক রাখনে গয়া!” এ তো সেম সাইড শুধু নয়, তার সঙ্গে এক তোড়া দুয়ো। বাইকে বসে বলে নিজেকে চাঁটা মারাটা বেশ শক্ত কাজ! হেলমেটে মেরে হাতই না মটকে যায়। কিন্তু বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র মেদিনী। তাই একই হাম্বা বজায় রেখে বলে উঠলাম, “তো কেয়া, অ্যাইসা হি তো তুম লোগ করতে হো!” বলে খচর মচর করে কেটে পড়লাম সেখান থেকে, যেমন সেই বাঘটা ঝর্ণার নীচে দাঁড়ানো ভেড়ার বাচ্চাটাকে নিয়েছিল খেয়ে। না পালক পড়ে যাবার শব্দ না শোনাই ভালো! মুরগি হতেই পারি কিন্তু নিজের ভিতরের কোঁকড় কোঁ শব্দ অন্য কেউ যদি শুনে ফেলে? জল যাবে শুকিয়ে! তখন আটাও গেলা যায় না আর ছুঁচোও নয়।

2 thoughts on “(৭৫)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s