(৮০)

প্রত্যেক শিশুই একটা সম্ভাবনা নিয়ে জন্মায়… প্রত্যেক শিশুই একটা সম্ভাবনার জন্ম দেয়। ৭০-এর সেই আগুনছেঁড়া দিনগুলোতে কলিকাতা মেডিকেল কলেজের পরিচিত ওয়ার্ডের পরিচিত বেডে আমার মা কোন সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছিলেন কি না সেটা কখনো শুনি নি, মানে অন্তত আমার মা বা বাবা “আমার ছেলে এই আমার ছেলে ওই” করে ভারত আবার জগতসভায় শ্রেষ্ট আসন লভে টভে মার্কা বাণী প্রচারে মত্ত হন নি। অন্ততঃ সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের রূপালী রেখা হিসাবে আমাকে দেখা টেখা হয় নি বলেই বিশ্বাস। কিন্তু সব মা বাপেরই সন্তানের সুখে সুখী হবার শখ থাকে, তাই তারা মা বাবা। তা মায়ের এই “টেলিফোন কালার”-এর ছেলেটি সম্পর্কে যদিও বা কোন শখ থেকে থাকে বা বাবা তার স্বপ্ন যদি তাঁর প্রথম সন্তানের মধ্যে দিয়ে দেখেও থাকেন তাঁর মহাজাগতিক চাপ কখনই আমাকে নিতে হয় নি। তাই শচীন তেণ্ডুলকার (আমাদের সময় অন্য “কার” ছিল গাভাসকার বা গাওস্কর- যে যে কাগজে চোখ সেঁকতেন সেই অনুযায়ী আর কি) বা মিকি মাউস, কোনটাই হবার উদগ্র বাসনা নিয়ে আমাকে চারাগাছে জল দিতে হয় নি।

তাঁদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল যে ছেলেটি যেন মানুষের মত মানুষ হয়… কিন্তু সেটাই তো সব থেকে শক্ত কাজ, তা কেই বা করে উঠতে পেরেছে আর সম্পূর্ণ মানুষ হিসাবে সর্বজনপ্রিয় ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছে, সেটা তো লাখ টাকার প্রশ্ন।

এতোগুলো কথা বলার মানে হল আজকের ফিসফাসটা ঢাক ফিস ফাস (যদিও ঢাক কখনো ফিসফিসিয়ে বাজতে পারে কি না তা নিয়ে মতবিরোধ থাকতেই পারে)। কিন্তু ফিসফাস যখন আমার এবং ততপার্শ্ববর্তী ঘটনাগুলিকে নিয়েই টিপ্পনী, তখন নিজেরটা তো পেটাতেই হয়, সে আস্তেই হোক বা জোরে। মোদ্দা কথা হল ভাল হবার চেষ্টা রাত দিন করে গেলে যদি সিকি আধুলি (এগুলো তো আবার আজকের দিনের দূর্লভ বস্তু- ডোডোর সমতুল্য) পাওয়া যায়। আর আজকের স্বনির্ভরতার যুগে বাজনাটা একটু ভাল না বাজাতে জানলে কদিনেই ডাইনোসর হয়ে যেতে হয়। তাই ফিসফাস…

বেশ মজা জানেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে লোকজন নেমন্তন্ন টন্ন করে আপ্যায়ন করছেন, পরিচয় হচ্ছে, পরিচিতি বাড়ছে, সঙ্গে বাড়ছে গল্প। কাল যেমনটি হল, এক অতীব সজ্জন দম্পতি ও তাঁদের সন্তানের সনির্বন্ধ আমন্ত্রণ রাখতে গাঁ উজিয়ে (থাকি তো ধ্যাদ্ধ্যারে গোবিন্দপুরে… যেখানেই যাই একটা রাজ্য তো পার করতেই হয়) গেলাম বাক্স প্যাঁটরা সহযোগে। আয়োজন আপ্যায়নের কোন ত্রুটি নেই, নেই সদাশয়তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টান। তাই সময়টা তালে গোলে চায়ে জুসে বেশ কাটছিল, গোল বাঁধাল কিচেনের কল!

মানব সভ্যতায়, বিশেষত শহুরে সভ্যতায় কিচেনের কলের অনেকটাই অবদান। অন্ততঃ আমার মতো ভজহরিবল মান্নাদের কাছে তার গুরুত্ব অপরিসীম। রান্না বান্না নিয়ে ফিসফাসের কোথাও একবার আলোচনা না হয় হবে (অবশ্যই ফিসফাসের ট্র্যাডিশন মেনে শুধু রেসিপিতে থামা নয়, পুরো দশ আঙুল চেটে পুটে স্লারপ) কিন্তু মূল মুদ্দায় আসি।

আপ্যায়নকারীদের কিচেনের নীচেতে রাখা জলের কলটি গ্যাসের সিলিন্ডার সরাতে গিয়ে কিচাইন করে বসে আছে। সময়ের জাঁতাকলের সুযোগ নিয়ে জলে গলে নরম হয়েই ছিল… তাতে সিলিন্ডারের চপেটাঘাত পড়তেই বাপ বাপ করে লাফ মেরেছে, আর জল তো তখন স্রোতের ভেলায় ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে জগৎ সংসার।

এতক্ষণ আমি বেশ সুঅতিথির মতো বসে বসে চানাচুর চিবচ্ছিলাম আর চার টাকা বারো আনা দামের হাসিটা ঠোঁটের ডগায় ঝুলিয়ে রেখে আলপিন থেকে এলিফ্যান্ট করছিলাম। কিন্তু স্টুডিওর ঘড়িতে কাঁটা সরসরিয়ে সরতে শুরু করেছে। আর সামাজিক দায় বলেও তো একটা ব্যাপার আছে? বলেছিলাম না, বাবা মা ঠিক ছোটবেলায় মানুষ হবার মুলোটা নাকের ডগায় ঝুলিয়ে রেখে দিয়েছিলেন? তাই সেই মুলো দিলো খুঁচিয়ে, আর আমিও চললাম কিচেনের পানে জিনস উঁচিয়ে (না না শুধু মেলানোর জন্য বলি নি, কিচেনে তো তখন তা তা থই থই… আরে বাবা জিনসটাকে বাঁচাতে হবে তো।)

গিয়েই দেখি, একি!! এ যে নায়গ্রা (এই চোপ!! একদম এটার সঙ্গে অন্ত্যমিল দিয়ে কিছু বলব না। সেন্সর দেবে কাট করে!!)!! ভাঙা কলের জল ঢাকা ডিঙিয়ে সুদূরের পিয়াসী হয়ে কাঁচা সবজি, চাকু ছুরি মায় ডাল, পায়েসের বাটি ঘটি সব দিচ্ছে ভাসিয়ে। কি তার প্রতাপ, কি তার বিক্রম! সৌন্দর্যের ব্যাখ্যা আর করলাম না কারণ আধা অন্ধকারে এমন ভয়ঙ্কর ঘটনার সৌন্দর্যের ব্যাখ্যা করতে যে বুকের পাটাটা দরকার, সেটা স্বীকার করাই ভালো যে বড়ই অভাব।

কিন্তু বর্ণনায় সময় কাটিয়ে কি নীরো হব নাকি? রোম পুড়ে যাচ্ছে আর বেহালার খোঁজ করলে তো আমি দিকভ্রষ্ট রাজকুমার। তার থেকে না হয় অপরিচিতের খোঁজে যাই, যেখানে গৃহকর্তা টর্চ বাগিয়ে পরিচারিকাটিকে নিয়ে ছুটেছেন সত্যের সন্ধানে। গৃহকর্ত্রী তো হাঁই হাঁই করে উঠলেন, বিশেষ অভ্যাগতরা যদি কাজ করতে ছোটে তো গৃহস্থের বদনাম। কিন্তু ‘ভেজা পায় বড় দায়’, কারণ তখন, জমানো জল বাধাবিহীন ছড়িয়ে যাচ্ছে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে, তাই, ‘হাঁ জি, আমি নিমরাজি!!’

উপরে গিয়ে দেখি সে এলাহী ব্যাপার। পরিচারিকাটি চিলেকোঠার মাথায় যা হাতের কাছে পারছে পিয়ানোর রিডের মতো টিপে থুড়ি ঘুড়িয়ে যাচ্ছে। আর গৃহকর্তা তাতে জুবিন মেহতা (নাকি মেটা? সৌজন্যে বাংলা সংবাদপত্রের চলন্তিকা…)-র মতো পরিচালনা করে যাচ্ছেন। নিশ্চুপ রাতের আকাশে টিম টিমে তারাদের মঞ্চে দুজনে অজ্ঞাত অপেরা সঙ্গীতের ধুন তুলে চলেছেন। কিন্তু জলের স্রোত যে কে সেই, নৌকা ভাসাবার সময় এসে গেছে যেন।

বেগতিক দেখে আমিই বললাম, ‘দেখি? না কি?’ গৃহকর্তা, অতিথি শিল্পীর আগমনে যুগপৎ শশব্যস্ত এবং উতচকিত হয়ে মাথা নাড়লেন অগত্যা। আমি এগিয়ে গেলাম পিয়ানোর দিকে। আমি তো সেই দিকভ্রষ্ট নাবিক যে ছোটবেলা থেকে ভুলে যায় ঘড়ির কাঁটার কোন দিকে ঘোরালে বন্ধ হয় এবং কোন দিকে খোলে। (অর্থাৎ পরবর্তী জীবিকা হিসাবে সিন্দুক চোরের চাকরি থেকে পত্রপাট ঢ্যাঁড়া!) তবু কিছুক্ষণ এদিক ওদিক করে এবং কিছুটা পরামর্শ বলে নিশ্চিত হলাম যে মাঝের সাতখানি সারেগামাপাধানি হল গিয়ে আসল সরগম। বাকি তো মাথার উপর দিয়ে আর পায়ের নীচ দিয়ে প্রবাহিত। কিন্তু পরিচারিকাটি ততক্ষণে বামদিকের সমস্ত চাবি বন্ধ করে দিয়েছে (এর মূল কারণগুলি হল সেদিকের চাবিগুলিতে সবকটি চাকা উপস্থিত, ধরে ঘোরাতে সুবিধা… তাই ‘দে গরুর গা ধুইয়ে’)! অতঃপর যা হবার হল, যার বাড়ির জল বন্ধ হয়েছে সেই পক্বকেশ সুদর্শন এসে হাজির… তাতে সমস্যা হল তিনি বাড়ির সমগ্র জলের দাগে লেখা ইতিহাস নির্দ্বিধায় বলে যেতে লাগলেন, যেন কাহারবায় সঙ্গত। গৃহ কর্তা প্রাণের দায়ে সুরে সুরে ‘হ্যাঁ, হুঁ’ করে যেতে লাগলেন।

আমি ততক্ষণে দেখলাম যে হাত দিয়ে চাকাহীন স্টপার ঘোরানো আর যাই হোক আমার কাজ নয়, বীরপুরুষদেরও ঘোড়ার সাহায্য লাগে, টগবগিয়ে… তাতেই তো ভাগ্যের চাকা ঘোরে। তাই নীচে নেমে এলাম সাঁড়াশির খোঁজে (এই এক সমস্যা, হিন্দিতে সাঁড়াশিকে কি যে বলে তা গৃহকন্যা ষোড়শীকে বোঝাতে পায়ের জল ঘাম হয়ে মাথায় উঠে গেল… তার মা এসে মুশকিল আসান করলেন শেষে!)
কিন্তু দুধের স্বাদ কি ঘোলে মেটে, সাঁড়াশি দিয়ে জং পড়া স্টপার ঘোরাবার বৃথা চেষ্টা করে করে ক্লান্তির অপেক্ষায়, তখনই সেই সৌম্যদর্শন পড়শি বরাভয় মূর্তি নিয়ে হাজির হলেন প্লাস সহ। প্লাসের প্লাসপয়েন্ট হল মোক্ষম জায়গায় চেপে ধরে ঘোরালে সে বাধ্য ছেলে বড়, সে কানাকে কানা বা খোঁড়াকে খোঁড়া বলে না। জলকে বলে না জং তাই সেই জঙ্গ দ্রুতই খতম হল।

কিন্তু সমস্যা অন্য খাতে বইলো। কোন চাবিতে কে বন্ধ হয় ধরতে না পেরে মুড়ি মিছরির এক দর- তাই সে বাড়িতে জল আসাই হল বন্ধ। তারপর সেই প্রথম গিটার শেখার মতো একটা করে চাবি খুলে বাকি বন্ধ করে করে শেষে তেনার হদিশ পাওয়া গেল। স্টুডিওর ঘড়িতে তখন একে একে এগারো পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে কাঁটা মধ্যরাত্রির সন্ধানে।

যাই হোক বেশী টানলে গল্পের রবারত্ব খতম হয়ে যাবে, তাই সংক্ষেপে সেরে দিই (রাত হয়ে গেছিল তো)। খেয়ে দেয়ে চলে আসার আগে শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় বলে রাখলাম, ডিনারটা তো মজুরির অধিক হয়ে গেল…! প্রত্যুত্তরে সমবেত হাসির মধ্যে, গৃহকর্তা অমায়িক মুখে নম্রভাবে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে পরের বারের শুকনো ডিনারে আমন্ত্রণ জানিয়ে রাখলেন (মানে বর্ষাকালে এলে অবশ্য কেউ গ্যারান্টি নেবে না)।

যাই হোক আসার পথে রিং রোড আর প্রগতি ময়দান থেকে আগত ভৈঁরো রোডের জংশনে বিশালাকৃতি ট্রাক ট্রেকারদের বদান্যতায় পাওয়া জ্যামটা হাঁকডাক মেরে মিনিট পাঁচেকে সুরুয়ার মতো স্মুথ করে বেরিয়ে এলাম বাস্তবের আঙিনায়। গাড়ির স্টিয়ারিং তখন পার্শ্ববর্তিনীর কব্জায়, আমি আর কি করি, ভাবতে লাগলাম আহা পৃথিবীটা যদি এ ভাবে দেখি তাহলে কতই না ভাল লাগে। এটাকেই বোধহয় বলে THE OLD WORLD CHARM…. বা জোহারি জানালার ভাষায়, ‘I’m Ok, You’re Ok’. আমরা সবাই ভালো…সবাই ভালো মানুষ… রাতের আকাশেও যেন তখন আলোর বন্যা।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s