(৮১)


একাশিতম ফিসফাস লিখতে গিয়ে সেই সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের একটা গল্প মনে পড়ে গেল যেখানে হেঁয়ালিতে একাশির উল্লেখ ছিল। আসলে আশি শব্দটির অর্থ বিষ দাঁত। সেই বিষদাঁত সহ ‘এক ছোবলেই ছবি’কারী (বা কারিনী) সে সাপ হতে পারে বাপ হতে পারে আর আরেকজনও হতে পারেন যার ছোবল বিবাহিতরা কোন দিন খান নি বললে মনে হবে সেই ব্যাটসম্যানের কথা যিনি কখনই শূন্য রানে আউট হন নি।
তাই সেই একাশিতম গল্প লিখতে গিয়ে মনে হল, গল্প তো একখান নয় ছোটখাটো গল্প অল্প স্বল্প সর্বত্রই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এই যেমন আমার পার্শ্ববর্তিনী জানাচ্ছিলেন, তাঁর এক সহপাঠিনীর কথা, যিনি প্রতিদিন নিয়ম করে সেই বিষয়ের খাতা ভুলে গিয়ে ডাইরির পিছনের পাতায় (মানব সন্তান আর ডাইরির পিছনের পাতার মধ্যে সেই বৈমাত্রেয়সুলভ সম্পর্ক সৃষ্টির আদিকাল থেকেই চলে আসছে। কাটাকুটি, বক্স বক্স, থেকে ছেঁদো কবিতা লেখা সব কিছুরই সাক্ষী থাকে সে। কিন্তু বৎসরান্ত যেই আসতে শুরু করে সেই তখনই শতছিন্ন হতে হতে বহু অযত্নে সেই শিল্পকর্ম বাজে কাগজের ঝুড়িতে পাড়ি জমায়) সব নোট লিখে, অনিবার্যভাবেই টিফিন খেয়ে হাত না ধুয়ে ডাইরির পিছন থেকে কোন একটা পাতা ছিঁড়ে নিয়ে ভাল করে হাত মুছে গুডি টু সুজ হয়ে বসতেন এবং ততোধিক অনিবার্যভাবেই বাড়ি ফিরে নোট খুঁজে না পেয়ে মাথার চুল ছিঁড়ে আঁটি বানিয়ে আমার পার্শ্ববর্তিনীকে ফোন করে নোটের খোঁজ করতেন এবং যে ব্যাটাচ্ছেলে সেই ডাইরির পাতাকে আতাসত্ত্ব (এটা বোধহয় সম্ভব নয়, তবে ইচ্ছে হল তাই আমটাকে বদলে দিলাম আতায়) বানিয়েছে, তাকে তীব্র বিতৃষ্ণার সঙ্গে “গাঢা গোড়ু মোহিষ” (আরে of course গাধা গরু মহিষ!!) বলে সুতীব্র গাল পাড়তেন।
আমার ছেলের যেমন ডাইরির বিশেষ বিশেষ পাতা হঠাৎ হঠাৎ হারিয়ে যায়, ফলে সেই শূন্য রানে আউট না হবার মতই কখনই তিনি স্কুলে শিক্ষিকাদের বকুনির পাত্র নন, তাই প্রমাণ হয়ে যায়। অবশ্য তিনি কালকেই এসে জানিয়েছেন যে স্কুলে তাঁকে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, “অ্যালমানাক ম্যানেজার”-এর (ডাইরির গালভরা তেরো হাতি নাম অ্যালমানাক)- অর্থাৎ চোরের বালিশের নীচেই ধনরত্ন লুকিয়ে রাখার ঘটনা আর কি।
যাই হোক, সন্তান বড় হতে থাকলে টিভিতে বিশেষ বিশেষ বিজ্ঞাপন দেখিয়ে “এটার মানে কি” বা “এটা কি কাজে লাগে” মার্কা প্রশ্নগুলি বেশ কমে আসে। আর তখনই কেন যেন আপনার হাত পা হিম হয়ে আসে অজানাকে জানার আশায় বা আশঙ্কায়। সেই কে যেন কোথায় বলে গেছেন (বোধহয় ফেসবুকেই!!) যে প্রথম পাঁচবছর আদরে বাঁদর করুন, পরবর্তী পাঁচ শাসনে ঠাসুন- তাহলেই দেখবেন পনেরোতে গিয়ে সন্তান আপনার বন্ধু হয়ে গেছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সেই ক্ষণজন্মা দশ থেকে পনেরোর কোন হিসাব না দিয়ে আপনাকে গাছে তুলে মই কেড়ে নিয়ে বলে গেছেন যে “অজানাকে জানা এবং অচেনাকে চেনাই তো আনন্দের! তাই যেমন খুশী সাজুন!”
ভারতীয় পুরুষরা বিশেষ শরীরচর্চাকে গুরুত্ব দেন না বলেই হয় তো বুড়ো হতে থাকা বউ এবং বড় হতে থাকা সন্তানকে আদর করার বিষয়ে বয়সের দোহাই দিয়ে কমাতে কমাতে লাভ (নাকি love?)-এর ভাণ্ডারে বালি জমা করতে থাকেন। মুন্নাভাই তো শিক্ষা দিয়েই খালাস যে “যাদু কি ঝাপ্পি আর দাদু কি পাপ্পি” দুইই স্বাস্থের পক্ষে উপকারী। কিন্তু স্বাস্থ্য বানাতে যে শরীরটাকে রাখতে হয় সে বিষয়ে নীরবেই রয়ে গেছেন।
গড়পড়তা বাঙালী পুরুষের, সন্তান যখন দশ ছাড়িয়েছে, তখন থেকেই বুক ধড়পড়, মাথা ফড়ফড়, কান কট কট, হাঁটু ছটপট করতে থাকে। ফলে দশ থেকে পনেরোর সময়কালটায় শাসন, ভাষণ ও সম্ভাষণের মাত্রা তাঁরা কাটতে ভুলে যান।
সন্তানকে আদরের বয়স হয় না, শুধুমাত্র রকম ফের হয়। সে তো ছোট্টটি নেই আর! কিন্তু তবুও দেখুন তো মাঝে সাঝে ছোট্টটি ভেবে আদর করলে দেখবেন যে আপনার ও তার উভয়েরই অক্সিজেন ইনটেক বেড়ে গেছে, গাছপালার সবুজ আকাশের নীল আর গালের লাল রঙ আরও গাঢ় হয়েছে। তবে মাত্রাতিরিক্ত করবেন না। সন্তান বড় হচ্ছে, তার বন্ধুবান্ধব বা বান্ধবীদের সামনে সন্টুমনা মার্কা আদরের আতিসয্য সহ্যের সীমার টিলায় পা ঝুলিয়ে বসে থাকে ঝাঁপ মারার অপেক্ষায়- তাকে টুস্কি দিলে ফস্কে যাবার সমূহ সম্ভাবনা। তাই কম খান গম খান এবং ‘গম’ ভুলে থাকুন।

সন্তান বড় হয়ে যাবার অভিজ্ঞতাকে দৈনন্দিন ব্যস্ততার আড়ালে পাপোষের নীচে ট্রান্সফার করবেন না। আপনার সৃষ্টি বিকশিত হচ্ছে, এই দৃশ্যটি রোজ রোজ অষ্টম আশ্চর্যের মত আপনার কাছে নতুন অভিজ্ঞতার সম্ভার নিয়ে আসে। যাকে ডাইরির পাতায় লিখে রাখতে গেলে হারিয়ে যাবার সম্ভাবনা। তার থেকে মনের খেরোর খাতায় নতুন দাঁত গজানোর মতো করে তাকে সাজিয়ে রাখুন থাকে থাকে। বয়সকালে সে যখন আপনার কাঁধ ছাড়াবে, তখন অবসরে একে একে নামিয়ে এনে ঝেড়ে পুঁছে দেখুন, নিজের চকচকে মুখের ছায়াটা অমলিনভাবে দেখতে পাবেন। সেই আশাতেই তো আমিও রোজ রোজ এক একটা ছবি এঁকে ক্যানভাসে রঙ মাখিয়ে রাখি।

যাই হোক, গুরুদেব বলেছেন যে ইমো এবং ইনো দুই-ই কম সম শরীরের পক্ষে উপকারী তাই ইমো প্রয়োগের একটি ঘটনা টুক করে বলে নিয়ে আজ পালালাম। বেশ কয়েকবছর আগের ঘটনা, দিল্লীর পরিচিত বাঙালীটোলার ব্যস্ত বাজারাঞ্চলে একটি কফি রঙের স্কুটার এসে থামল। আরোহী পরিবারের তিনজনের মাথাতেই কিছু না কিছু রয়েছে। দেড় বছরের শিশুটির মায়ের মাথায় ঘোমটা, শিশুর মাথায় চকচকে টাক (সদ্য কেশরাশি বিদায় করে কৃতার্থ হয়েছেন বোধহয়) এবং আরোহী পিতার মাথায় অনধিক চকচকে শিরস্ত্রাণ। শিশুটির পিতা হয়তো অনেক দূর থেকে অনেক ক্ষণ ধরে স্কুটার চালিয়ে এসে অবশেষে গন্তব্যে পৌঁছেছেন। মানে তখনো চিত্তরঞ্জন পার্ক দিল্লীবাসী বহির্বংদের পীঠস্থান ছিল বৈকি।

তাই বাহান্নতম পীঠে এসে আনন্দের ফল্গুধারা বইতেই পারে, যা প্রকাশ করার মত কিছু না পেয়ে (আর্কিমিডিসের মতো ‘ইউরেখা আইঅমিতাভ’ বললে হয়তো মন্দ হত না! কিন্তু ওই যে বললাম, নিয়ন্ত্রণ বস্তুটি আর যাই হোক আদরের সঙ্গে মিশ খায় না।) সদ্য টেকো সন্তানকে দুহাতে তুলে হেলমেট পড়া অবস্থাতেই খপাৎ করে চুমু খেতে গেলেন। কিন্তু “চকাস”-এর জায়গায় শব্দ হল “ঠকাস”!! আর ফল হল মারাত্মক। নির্বিকল্প বাতাবরণ সসব্যস্ত হয়ে কেঁপে উঠল শিশুটির গগনবিদারী এবং তার মায়ের হৃদয়বিদারী হাহারবে। শিশুর পিতার অন্তরও হাহাকার করে উঠল বটে কিন্তু সহধর্মিনীর উচ্চকিত কেকারবে তা দু পায়ের ভিতর ল্যাজ গুটিয়ে বাজার পানে যাত্রা করল। সাপ এবং বাপ ছাড়া যে তৃতীয় “আপ”, তার ছোবলে বদ রক্ত বার করে দেওয়ার সময়ও পাওয়া গেল না। সাধে কি বলে “‘আপ’নি বাঁচলে বাপের নাম আর সবার শেষে সাপের নাম”! “লতা” “লতা” “লতা”!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s