(৮২)


মে মাসটা আপামর বাঙালী জনসাধারণের জন্য বড়ই পুণ্যের মাস! এমনিতে তো পাপের বালতি ভত্তি থাকায় উপচানোর জায়গা থাকে না। স্থবির জাতি বলে কবে সেই ঘি খেয়েছি সেই গন্ধ শুঁকেই উদগার করার বদনাম তো বদনে নিয়েই বেড়াই। তবু মে মাস এলেই আমাদের জাতীয় জীবনে ভোটের কালির মতো সুদাগ ফেলা দুই মহিষীর জন্মদিন চলে আসে। সাত আট কিংবা নয়ে রবীন্দ্রনাথ তো ছিলেনই, হালের আমলে যুক্ত হয়েছেন সত্যজিৎ।
অবশ্য নিজের ধনরত্ন মণি মানিক নিয়ে বাঙালী কখনই যত্নবান নয়, তাই একটা কান বা একটা অস্কারের দরকার পড়ে, মাথায় মানিক নিয়ে নাচন কোঁদনের জন্য। (অবশ্য মাণিকের উচ্চতা এতটাই যে মাথায় তোলার দরকার পড়ে না। এমনিতেই একচালাগুলির মাঝে ফ্ল্যাটবাড়ির মতো খাড়া হয়ে থাকেন)

সে যাকগে ছিদ্রান্বেষী(পড়ুন নীরদ সি চৌধুরী)দের মুখে চুনকালী দিয়ে নিজেদের হাড়ে ধানদুব্বো গজিয়ে অগুনতি বাঙালী জাতি বেশ বেঁচে আছেন। আর হালফিলের মানিকের থেকেও বেশী করে ফি বছরে দূর্গাপূজোর মতো প্রাণের ঠাকুর রবিন ঠাকুরকে নিয়ে একটু নাচানাচি একটু গলাগলি করে কৃষ্টির খুশবু ছড়িয়ে চলেছেন মে মাসে।

তা রবীন্দ্রনাথ বাঙালীর পৈত্রিক সম্পত্তি, ঠিক যেমনটি রাম, রহিম এবং গান্ধী বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠী ও দলের বংশ পরম্পরায় পেয়ে আসা সওগাত, তেমনটিই। তাই রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে উৎসব যদি বিদ্বেষীরা আঁতলামী ও আদিখ্যেতার সমনাম বলে চালাবার চেষ্টা করেন তাহলেও কুছ পরোয়া নেহী। চালাও পানসি জোড়াসাঁকোর তলা দিয়ে কোপাই নদীর ধারে। যেখানে খটখটে রোদ্দুর আর যাবো কদ্দুর বলার পরেও প্রশান্ত বটগাছের মতো ছায়ায় মোহন বাঁশির সুরে শান্তি মেলে।

যাই হোক, ভূমিকাটা বেশ বড় সড় হয়ে গেল! আসলে কি জানেন তো পাঠক পাঠিকাগণ, যতই যুগাধিক সময় ধরে এই কদমার মতো শক্ত রুক্ষ প্রান্তরে পড়ে থাকি না কেন, ভিতরের চিনির পাহাড়টা তো রয়েছেই (বাঙালী তো তরমুজ… বদনামটা বা সুনামটা বহুদিনের), বাঙালী পরিচয়টা বুকের উপর প্ল্যাকার্ডের মতো লাগিয়ে ছাব্বিশ ইঞ্চিকে ছেচল্লিশ করে ঘুরে বেড়াতে পারি তো এই সময়টাতেই। তাই “ট্যাগোর”এ ভর করে সংস্কৃতির বৈতরণী পার করতে আর পাঁচটা ক্ষীণজন্মা বাঙালীর মতো মে মাসের সপ্তাহান্তের সকালগুলিতে আমিও বাক্স প্যাঁটরা সহযোগে বেরিয়ে পড়ি প্রভাত বন্দনায়।

প্রাণের মানুষকে তখন সকলখানেই দেখতে শুরু করি। তারপর কচি, ঝুনো, কাঁচা, পাকা, কড়া, মিঠে, সুগম, দুর্গম সংস্কৃতির পথ পেরিয়ে দেখা করি তার সঙ্গে। মহামানবের আগমনবার্তায় মন রাঙিয়ে নিই, সাতরঙা মন আমার। কাঁঠাল ফাটা গরমে পিউমিক স্টোনের মতো ছিবড়ে হয়ে যাওয়া শরীর মন তরতাজা করে নিয়ে তুলে নিই চলার পাথেয়। তারপর বছর ঘোরার অপেক্ষা।

বেশ চলছিল, হাঁক ডাক শাঁখ টাক কাক ফাঁক আর মৌমাছির চাকের মতো রবীন্দ্রজয়ন্তীর রসাস্বাদন করে, দু এক জায়গায় কের্দানি দেখাবার সুযোগও এলো… সে সব তো ভালই। কিন্তু হঠাৎ কোন এক বিদ্দ্বজনের মনে হল যে গানটাও গাওয়ানো যেতে পারে আমাকে দিয়ে।

এমনিতে শিশু, কিশোর এবং তরুণ বয়সে হাঁই মাই করে গান টান যে করি নি তা নয়। অমায়িক গলায় মাইক পিটিয়ে গান পাউডার ছড়িয়ে অনেক গোলাগুলিই ছড়িয়েছি। কিন্তু যত্নের অভাবে বন্দুকেও মরচে পড়ে আর এ তো মানুষের গলা। সাইকেল আর সাঁতার কেউ ভোলে না বটে কিন্তু গান ভুলতে দু দণ্ডও লাগে না। এ এমন এক সাধনা যা ছাড়লেই ছেড়ে চলে যায়। তা আমার সাধনা কেন ববিতাকেও কোন কালে ভালো লাগতো না। তাই যা হবার তাই হল… গানের মঞ্চের পরিধি ছোট হতে হতে ড্রয়িংরুম ছুঁয়ে বাথরুমে গিয়ে হাজির হল। গায়কের থেকে হরবোলা হিসাবে বেশী পরিচিতি হয়ে যাবে, এই ভয়ে হেলমেট এবং ঢাকা কাঁচের আড়ালেই গানকে সীমিত রাখলাম।

তবে এর জন্য শুভানুধ্যায়ীদের অবদানও আছে। সঠিক সময়ে তারা বলে দিয়েছিলেন যে ‘শোনো বেশী…’ বাকিটা আর বলতে লাগে নি। কিন্তু সম্প্রতি ফেসবুকের রিলেশনশিপ স্ট্যাটাসে পরিবর্তন করার পরেই দেখছি, গানটা দোনলার মতো ঠিক কোথাও না কোথা দিয়ে বেরিয়ে পড়ছে। ঢেকে ঢুকে রাখতে গেলেও শুনছে না। সময়ে অসময়ে কারণে অকারণে অস্থানে কুস্থানে সাহস দেখাতে গেলেই যা হয় আর কি… পট করে আবদার এলো সমবেত রবীন্দ্রগানে একক পুরুষ হিসাবে গলা দিতে হবে। (দিল্লীতে আবার পুরুষ কণ্ঠের বড়ই অভাব… তাদের মাঠে ময়দানে গানের মঞ্চের থেকে, লোকসভা বা রামলীলা ময়দানেই বেশী পাওয়া যাচ্ছে)

গলার তোড়ে এই সামান্য প্রস্তাবকে তিস্তাতোর্সা এক্সপ্রেসে চাপিয়ে দিতেই পারতাম কিন্তু বাধ সাধলো আইনত সম্পর্ক… শালী সাহেবা হুকুম করলেন যে নিশ্চয়ই গাইতে হবেই। পুরোটা গান… সকালে তানপুরো নিয়ে আধাআধি বসে গিটকিরি দিলেই নাকি আলিবাবার গুহা যাবে খুলে! পার্শ্ববর্তিনীও দেখলাম চিড়িক চিড়িক করে টুনিবাল্বের মতো হাসতে লাগলো। প্রস্তাবকারিণীও সোৎসাহে শুরু করলেন গান তোলানো।

এমনিতে কাজ এবং সংসারের চাপে ঢাইমণি ডাম্বেলটাও ঠিক করে তোলা হচ্ছে না বলে প্যান্টের বোতাম বারেবারেই কান্নিক মারার চেষ্টা করছে। তার উপর গান তোলা! চাড্ডিখানি কথা নাকি! যাই হোক নাকে মুখে মুড়িচানাচুর আর চা গুঁজে লেগে পড়লাম গানগুলো তুলতে! কিন্তু বয়স হচ্ছে আর স্মৃতিশক্তিটা বার বার বেগড়বাঁই করছে। না পারছি গান মনে রাখতে না পারছি সুর। দুটিই যেন GUN আর শুঁড় হয়ে এদিক ওদিক দিয়ে দৈন্যদশা প্রকট করেই চলেছে। কিন্তু তাতে না কমছে প্রস্তাবকারিণীর উৎসাহ আর না নামছে পার্শ্ববর্তিনীর পারদ।

যদিও আমি বাধ্য ছাত্রের মতোই সকাল বেলায় গলার গুহ্যদ্বারের শিকলি খুলে অন্ধকার ঘরে ইলেক্ট্রিশিয়ানের কাজ শুরু করেছি। কিন্তু অদ্ভুতভাবে দুটি ঘটনা ঘটায় ফিসফাস অবধি আমার গোপন অভিসারকে প্রকাশ্যে আনতে বাধ্য হলাম।

আজ সকালে পার্শ্ববর্তিনীর সাধনায় (নাকি ববিতায়) সঙ্গী হয়ে ঝাঁপি খুলে বসেছি- ওদিকে দুটি ঘটনা ঘটছিল।

এক, ফি বছরের মতো সঠিক সময়ে সঠিক কাজের জন্য পাড়ার কুকুর বাচ্চার সংখ্যা বেড়ে যায় এবং তারা সঠিক সময়ে বড় হয়ে চিল্লামিল্লি করতে থাকে। তার মধ্যে একটি আবার থই থই সকালে সোজা লেজ ব্যাঁকালে বা রোদজ্বলা দুপুর সুর তুলে নূপুরে বা শুনশান রাত্রে জ্বালা দিয়ে গাত্রে পোঁ ধরে শেয়ালের মতো। তারপর প্রথম সপ্তক থেকে মধ্যমা ছুঁয়ে নেমে আসে খাদের গভীরে। এমনিতে তো ঠিক আছে কিন্তু ঘুটঘুটে রাত্তিরে যদি কেউ “অ্যাই আমায় কেউ গাইতে বোলো না” বলে গান ধরে তখন আলতো করে আসা সন্টুমন্টু ঘুমের যে বারোটা বেজে গিয়েই কাঁটা ঘুরতে থাকে তা আর বলার অপেক্ষা থাকে না। তা তাকে প্রায়ই রাতে বাংলায় ধমক দিয়ে ধাতস্থ করানো গেছে। এখন আর অসময়ে পাঁজরা মেলে ধরে না। কিন্তু গানের বালাই বড়ই বালাই তা সে ঠিক সেই সময় যোগ সাধনা করছিল মন দিয়ে। হঠাৎ শুনতে পেয়েছে আমার গলা! এসব ক্ষেত্রে এটাই ঘটে যে ঘুমন্ত কুকুর উঠে পরে হাঁউ মাউ স্বরে গলা জোরে! কিন্তু আমার গানের কি মহিমা! তিনি চপাৎ করে গান থামিয়ে সুর সুর করে চলে গেলেন বিফল রথে, মন ফেলে রেখে। এ যেন সেই উত্তর আধুনিক কবিতার মতো “কি বুঝিনু জানি না… কিন্তু একটা কিছু হল বটে! আমি নিশ্চুপ বাক্যহীন হয়ে গেনু!”

অপরদিকে, আমার পাড়াপড়শিদের মধ্যে একটি অত্যন্ত শ্রীল স্বরের অধিকারিণী এক মহিলার বড় মেয়েটি আরও বড় হয়ে উঠছে। তা সেই কারণে দুজনেই তর্জা করে নিজের নিজের বিদ্যে জাহির করে আলাপ, বিলয় সহকারে। সে তো আমার ছেলেও আমি খেলেই বিস্কুটের পর ফ্রুট জুস খেয়ে “ইয়াকুল্ট খাই বাবা?” বলে কোঁৎ পাড়ে। কিন্তু আমার গলা যেই শেষ সিঁড়ির দিকে ধাওয়া করেছে, সঙ্গে সঙ্গে বিবাগী সন্যাসীর মতো সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে পরিবেশ শান্ত করে ফেললেন তাঁরা।

আর তার কিছুক্ষণের মধ্যেই, দরজার বেল বাজল। আমি তো মনে মনে ঘোরতর আপত্তি সহকারে গিটকিরি দিতে তৈরী হয়ে দরজা খুলে দেখি যে সেই পড়শি মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন গানের ওপারে। নিজেকে গাল দিতে দিতে দরজা খুলতে না খুলতেই এক গাল হেসে তিনি বললেন, “প্রেসবালে ভাইয়া নে কাপড়ে দে গয়ে থে কল, আপলোগ থে নেহী……” আমি কিন্তু লক্ষণটি বিলক্ষণ বুঝলাম।

কিন্তু উৎসাহ বড়ই বিষম বস্তু। বিশেষত পার্শ্ববর্তিনীর মতো কড়া শিক্ষাগুরু থাকলে। তেনাকে বোঝাতে গেলাম বটে যে এই যা সব ঘটছে তা কিন্তু স্পষ্ট বলছে যে সঠিক রাস্তায় যাচ্ছি না। গলার ব্যায়ামের থেকে মুগুর ভাঁজা বা সিটআপ দেওয়া অনেক যুক্তিগ্রাহ্য কাজ। কিন্তু সংসারে কেই বা কবে আর যুক্তির ধার ধেরেছে? (ধ্যারালেও চলে কিন্তু…) তাই এরপর সেই পরিচিত ঝর্ণাধারায় আমার ক্ষীণ প্রতিবাদ গেল ধুয়ে। আর তারপর যদিও অল্পক্ষণের মধ্যেই দেরী হয়ে যাচ্ছে বলে উঠে টুটে চলে এলাম অফিস। কিন্তু গলায় ঘাড়ে তেলমালিশ যে এখানেই শেষ হবে না তা বেশ বুঝতে পারা যাচ্ছে। আরে বাবা রোববারে গলা দিতে হবে তো নাকি???? গানে? রবি ঠাকুর বলে কথা!!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ ছেলেটার কদ্দিন ধরে গান টান করার ইচ্ছে টিচ্ছে হচ্ছিল না… কিন্তু বাপকেও লাইনে দাঁড়াতে দেখে বোধহয় বোধোদয় হয়েছে। বাড়ি ফিরে দেখছি সেও দুলে দুলে “আমরা সবাই রাজা” আর “তুমি কেমন করে গান কর হে” করছে। ঝড় উঠেছে… কি বলেন?

Advertisements

2 thoughts on “(৮২)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s