(৮৪)

কখনো কখনো আত্মজীবনী লিখতে বসে লেখকের সযত্নে লালিত ইমেজ আর ইগো তার কলমের কন্ডোমে আটকে যায়, ফলে আসল গল্পটা গাছে উঠে দেখে মই নেই… খাতায় নামার মই নেই!

ঘেবড়ে গেলেন? প্রথমেই ঝটকা তার পর খটকা? লেখক করবেটা কি? এটা ফিস ফাসের পাতা তো? নাকি পাউলো কোয়েলহোর জালি অনুবাদের পেজ? না না ঘাবড়াবেন না! একটা ঘটনা ঘটল এমন, তারপর নিজেকে ঠিক মতো উপস্থিত করতে গিয়ে কত আনা জল মেশাবো নাকি নীট মারবো সেটাতেই সময় খেয়ে নিচ্ছিলাম… ফুটেজও!

অনেক ভেবেচিন্তে সত্যি ঘটনাটাকে দাঁড়ি কমা ফুলুস্টপ বিহীন অবস্থায় টেবিলে সাজিয়ে রাখছি। যে রকম খুশী সস মাখিয়ে খেয়ে নিন। আর না খেলে? নেহাতই আমার অক্ষমতা!

অক্ষমতার কথা আর বলি কি করে? সারা দিন ধরে একাজ অকাজ সেকাজ সেরে দিন পাঁচেক আগে ফিরছি বাড়ি! বাড়ির আগের মোড় ঘুরেই দেখলাম এক পাল গরু মোষ ষাঁড় বাছুর একসঙ্গে বিভিন্ন দিকে মুখ করে ভাবলেশহীন চোখে দাঁড়িয়ে আছে। ফুটবল খেলায় গোলকিপিং করেছি কিন্তু ডজ করাটা বোধহয় রক্তে নেই। তবুও পটু অপটু হাতে স্টিয়ারিং বাঁয়ে ডাইনে করে যেই ভুলভুলাইয়া থেকে বেরিয়েছি… ওব্বাবা একটা শেয়ালের মত সাইকেল রিক্সা বাম দিকের গলি থেকে বেরিয়ে হুড়ুৎ করে সামনে দিয়ে কাট মারতে গেল। আমি তখন সবে পরীক্ষা পাস করে ডান দিক ঘেঁষে হালকা অ্যাক্সিলারেটরে দিয়েছি চাপ। হঠাতই এই কাণ্ড!

এমনিতেই বিভিন্ন ভূমিকায় অভিনয় করতে করতে যথেষ্ট অরুচি ধরেছে! এখন যমের ভূমিকাটা নৈব নৈব চ! তাই শেষ মুহুর্তে স্টিয়ারিং হুইল সজোরে ব্রেক সহকারে দিলাম বাঁ দিকে ঘুরিয়ে… আওয়াজ হল ক্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যাআচ…ঘড়ড়ড়ড়ড়ড়…চুনচুনচুনচুনচুন…! নাহ রিক্সাটি হয়ত বেঁচে টেচে গেল কিন্তু আমার গাড়ির ডান চোখে বোধহয় হেব্বি জোরে গেল কাঁকড় ঢুকে। নেমে গিয়ে ছুটে গেলাম রিক্সাটার দিকে!

ইতিমধ্যেই পাসের খালি প্লটে ভলিবল খেলা কতগুলো হোঁতকা ছেলেপুলের দলও ছুটে এসেছে। রিক্সাওলাকে খাড়া করার পর দেখা হল তার চোট ফোট কোথায় লেগেছে! বাঁ হাতের তালুর উপরটা একটু ছড়ে যাওয়া আর হাঁটুর প্যান্ট ফেটে যাওয়া ছাড়া আর বিশেষ কিছু হয় নি! রিক্সাটাও দু পা ঢুকিয়ে হ্যান্ডেল সোজা করে দিলে সোজা হয়ে গেল! ছেলেগুলির মধ্যে একটি বলল, “ঠিক হ্যায় আপ যাইয়ে!” ফিরে এলাম আমার বাহনের কাছে

তার ডান চোখের চশমাটা একটু ভেঙেছে আর থুতনির কাছটা একটু দেবড়ে গেছে আর একটা দাঁত বোধহয় খুলে বেরিয়ে এসেছে! মানে মাডগার্ডটা আর কি! তা সেই অবস্থাতেই দু পা এসে বাড়ির সামনে পার্কিং করে, প্রথমে পার্শ্ববর্তিনীকে আর তারপর এদিক ওদিক গল্পগাছা করে ভাবলাম এপিসোডের সমাপ্তি! পরদিন সকালে খুলে আসা মাড গার্ডটি হ্যাঁচকা টেনে খুলে ফেলে ভাবলাম আরও এক দাগ উপরে ঢ্যাঁড়া ফেলে দিলাম!

ওহকলা! দুদিন পরে বাক্স প্যাঁটরা সহযোগে বেরোচ্ছি, গার্ড এসে জানালো মুসকো মতন খান ১৩ জোয়ান এসেছিল এই বলে যে আমি নাকি কার গাড়িতে ধাক্কা দিয়েছি! আমি ভাবলাম ধুর ফালতুকা বাত করে কি হবে! আমার অনেকগুলি অ্যালিবাই আছে! ঘুরে টুরে ফিরে আসছি আবার গার্ড এসে বলল, “ও লোগ ফির আয়া থা! আব কার্ড ছোড়কে গয়া!” কার্ডে দেখলাম নাম আগরওয়াল! বুঝলাম কপালে আছে কিছু! যাই হোক ঝগড়া করব না এই মনে করে মারলাম একটা কল!

একটা কচি মতো গলার ভদ্রমার্কা ছেলে ফোনে বলল আমার যে অ্যাক্সিডেন্টটি হয়েছিল সেখানে নাকি তার পরোক্ষ অ্যাক্সিডেন্ট হয়! সে কি কাণ্ড? বহু আগে জ্যাকি চ্যানের একটি ফিল্ম দেখেছিলাম “ট্যুইনস” যার হিন্দি হয়েছিল সলোমন খানের “জুড়য়া” বা “জুড়বা”! সেখানে একজন কিছু করলে তার যমজ আপনা আপনি সেই রকম কিছু করে ফেলছিল অন্য জায়গায়! তা ভাবলাম, আমার গাড়িটি ভূমিষ্ঠ হবার সময় বোধহয় এরকম কিছু একটা গগন বিদারক ঘটনা ঘটেছিল, তাই আমি যে যে পথ দিয়ে যে যে ঘটনা ঘটিয়ে ঘটিয়ে গাড়ি নিয়ে গেছি, সেই গাড়িটাও হয়তো সে রকম কিছু করেছে! যদি জুড়য়া হয়ে থাকে আর কি!

তা গেলাম সেখানে… গিয়ে দেখি দুইজন দাঁড়িয়ে আছে! রকম সকম দেখে পিতা পুত্র বলেই মনে হল! তারা যত্ন নিয়ে দেখালো যে রিক্সাটা কিভাবে হ্যান্ডেল নিয়ে তাদের সাধের টাটা মাঞ্জায় এসে ধাক্কা মেরেছে এবং কি ভাবে তার ডিকি প্রদেশে ফুলের ঘায়ে চুমকুড়ি একটা ডেন্ট পড়েছে। তা পিতা তো শুরুতেই নেটে এসে ভলি মারছেন! “রাতে কোথা থেকে পান টান করে আসা হচ্ছিল? রিক্সা দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় কি করে মেরে দিলাম? তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছিল নাকি! মোবাইলে কথা বলছিলাম কি না? ইত্যাদি এবং প্রভৃতি!” আমি নিশ্চিন্ত মনে গ্রাউন্ড স্ট্রোক মেরে যাচ্ছি! হঠাৎ একটা ওভারহেড স্ম্যাশ মেরে বসলেন তিনি! থার্ড পার্টি ক্লেম করে ভালোয় ভালোয় মিটিয়ে না দিলে তিনি উকিল ডেকে কেস করবেন!

পাঠক পাঠিকাগণ, সিংগীদের মাথায় একটু ক্যাড়া থাকে! তারা পুলিশ আর কেস শুনলেই কেমন অদ্ভুত লাগাম ছাড়া হয়ে যায়! আমিও আর যাই কোথা! তাকে বললাম, “দেখুন যদি হুমকি দেন তো আপনার যেটা ইচ্ছা করুন! আমি এই গেলাম! আপনি গাড়ির পিছনে চুমু নিয়ে দু বছর ঘুরে বেরান আর আমিও বেরাই চোখে আঁব নিয়ে!” এতক্ষণে পুত্রটি ময়দানে অবতীর্ণ হল! সে ভালোমানুষ, বেশ বুঝিয়ে সুঝিয়ে বলল, আর আমার মাথাটাও আম পোড়া সরবতের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গেল! আর ঠাণ্ডা হয়ে গেলে আমার দিল বেশ বাগান বাগান হয়ে যায়! স্বতঃ প্রণোদিত হয়েই বললাম! ঠিক আছে আমি ব্যবস্থা করছি! তারপর একটু চু কিতকিত, এক্কা দোক্কা খেলে ফিরে এলাম!

কিন্তু বাড়ি এসেই ভাবলাম যে গাড়ি এখন খোঁয়াড়ে ঢোকালে তো দিন সাতেকের ধাক্কা! এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটা সম্ভব নয়! নিশ্চিন্ত মনে ঘুমোতে গেলাম কিন্তু মনের মধ্যে কোথায় একটা তেতো তেতো ভাব রয়ে গেল! পিতা ব্যাটা আমায় জিজ্ঞেস করেছিল আমি কোন স্টেট থেকে আসছি! কম্যুনাল আপার্থেইড কোথাকার…!!

সত্যি ভারতবাসীর মতো ডিস্ক্রিমিনেটিং বেশ কম আছে! নাহলে এখনো ফেয়ার অ্যাণ্ড লাভলী সর্বাধিক বিক্রিত ক্রিম হয়? ফরসার সঙ্গে ঝকঝকে আর কালোর সঙ্গে কুচকুচে কি ভাবে বলা হয়ে ভেবে দেখুন? তারপর নর্থ ইন্ডিয়ান আর সাউথ ইন্ডিয়ান এবং সর্বোপরি উত্তরপূর্ব ভারতীয়দের বিষয়ে বিরূপ মনোভাব তো দেখাই যায়!

ক দিনে আগেই অফিসে একটু ধাক্কা লেগে যাওয়ায় অন্য মন্ত্রালয়ের এক বয়স্ক চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী, স্বগতোক্তি করেছিল, “সব বাহারবালে চলে আতে হ্যায়!” তো তাকে আদর করে দু দিকে মাখন মাখিয়ে দিয়েছিলাম।

সে যাই হোক, সকালে উঠেই মনে হল দিনের আলোয় একবার গিয়ে দেখি! গিয়ে দেখি, যা ভেবেছিলাম তাই! এটাকে নিয়ে এখুনি যদি ইন্সিউরেন্স ক্লেম করি তাহলে আমার নো ক্লেম বোনাস তো যাবেই, সঙ্গে অতিরিক্ত গ্যাঁটের গচ্চা গুনে দিতে হবে! তাই অফার ফেললাম পুত্রটিকে, (পিতার সঙ্গে আমার তখন আদায় মিষ্টি দইয়ের সম্পর্ক…) পুত্রটি সত্যিই ভালোমানুষ! সে তৎক্ষণাৎ রাজী হয়ে গেল যে আমার চেনা এক মেকানিকের কাছে নিয়ে গিয়ে ডেন্টিং করিয়ে নিয়ে এসে যা হয় তাই ম্যানেজ করে দেব! গাণিতিক দিক দিয়েও তা লাভজনক! নো ক্লেম বোনাসের অনেক কমেই হয়ে যাবে!

যেমন ভাবা তেমন কাজ! আধ ঘণ্টার মধ্যেই তিন অঙ্কেই ডিল ফাইনাল করে বিজয়ী হাসি হেসে ফিরে এলাম! ম্যানেজ করতে না জানলে এই পোড়া পৃথিবীতে টেকাই দায় হয় দেখছি! ইতিমধ্যে অবশ্য পুত্রকে তার পিতার অকালপক্বতার জন্য ঠাণ্ডা মাথায় মিষ্টি মিষ্টি কয়েকটি নিখুঁতি খাইয়ে এসেছি! আর সেও ইয়ে উয়ে করে হ্যাঁতে হ্যাঁ মিলিয়ে নিয়েছে! হাইকোর্টের কোর্টশিপ বলে কথা… কে আর ফালতু ওজর তোলে!

দেখুন পাঠক পাঠিকাগণ, যথেষ্ট চেষ্টা করে নির্জলা গল্পটি বলে গেলাম, তবুও মনুষ্যোত্তর তো নই তাই ৫% প্লাস মাইনাস করে নেবেন পড়ার সময় তার বেশী নয় দিব্যি গেলে বলছি!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চ ১: ডিসক্রিমিনেশন নিয়ে অনেকগুলো কথা বলেও নিজে ফুড়ুত করে জাত তুলকে গালাগালি দেকে দেশী ভদ্রতার সীমা এক ইঞ্চির জন্যেও বোধহয় পার করে দিয়েছি। (গিমিক? হেহেহেহে… কে জানে?)

প্র পু ২: কাল দক্ষিণ দিল্লী থেকে ফেরার পথে গাড়ি ভুড়ুস করে বন্ধ হয়ে গেছিল! ভাগ্যিস রেস বলে একটি গাড়ি সারাই সংস্থার সঙ্গে বছরের গোড়ায় একটু হা ডু ডু খেলে রেখেছিলাম… তাই জাম্প স্টার্ট করিয়ে দিয়ে গেল মিনিট ২০-র মধ্যেই! তবে সাবধান বাণী, ব্যাটারি বদলে ফেলুন সার্ভিসিং করিয়ে নিন! সেই যে এই সপ্তাহে যাতে না হয় তার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম না? ঠিক ব্যাটা সুযোগ বুঝে সুদ গুণে নিল! খাবার সময় খাবার না খেলে, খাবারের সঙ্গে সঙ্গে ওষুধের জন্যেও খরচ বাড়ে! বিটনুনেও তখন পাপের ফলের স্বাদ ভালো হয় না! ডিং ডং!!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s