(৮৫)


(৮৫)
দুদিন আগে অজয় দেবগণের “হাল্লাবোল” সিনেমাটা দেখতে দেখতে ভাবছিলাম যে বাস্তবে জীবনে যখন মানুষ এমন অবস্থার সম্মুখীন হয় যখন এতদিন যা নিজের বলে ভেবে এসেছে তা হঠাৎ করে অন্য কেউ নিয়ে নেয় বা তিল তিল করে গড়ে তোলা সৌধকে ভূলুণ্ঠিত অবস্থায় দেখে তখন কি করে? সমাজের ভয়, ইমেজের ভয়, প্রাণের ভয়, মানের ভয়, নাড়াবার ভয়, হারাবার ভয় সব ভয় ডিঙিয়ে মাউন্টেন ডিউ খেয়ে কি সে বলতে পারে যে ভয়ের আগেই তো আছে জয়।

আমার এক অনুজপ্রতিম লেখক এই সব নিয়েই তো তার প্রথম বইটি বার করছে “এভাবেও ফিরে আসা যায়”। তার জন্য এক রাশ শুভেচ্ছা রেখে আজকের ফিসফাস শুরু করছি।

এমনিতে আজকাল ঘটনা টটনা একটু পাশ কাটিয়ে যাচ্ছি আর কি। অমিতাভের হাই ভোল্টেজ ড্রামার মধ্যেও মাঝে সাঝে নাসিরের আণ্ডারঅ্যাক্টিং ভারসাম্যের কাজ করে তাই হই হই করে ফিসফাস ঘটাতে ঘটাতে মনে হয় একটু রেহাই দেওয়া ভালো। জিরিয়ে নিয়ে ভালো করে ফোড়ন চড়িয়ে নতুন রান্না করা যাবে।

কিন্তু আমার হয়েছে সেই রবি শাস্ত্রীর দশা, মাঠে আর লুকনো যায় না, যেখানেই ফিল্ডিং করতে যাই বল ঠিক তাড়া করে, ঘটনা ঘটেই চলে। তা দেশের ও দশের উদ্ধার করে কাল দুপুর বেলায় অস্ট্রেলিয়ার বেইজ্জতি দেখতে দেখতে একটু চিকেন রেজালা ঘুম দিচ্ছি, পার্শ্ববর্তিনী কি কারণে রান্নাঘরে ঢুকেছেন আর পরিচারিকা এদিক ওদিক ঝাড়াই পোঁছাই করে চলেছেন।

সরকারী কর্মচারী হয়েও ভাতঘুমটা দেওয়া হয় না বলে নিজের প্রতিই অভিযোগ আছে। হাজার হোক বনের মোষ তো একটা নয়, তাদের তাড়াবার কাজে আর সময় হয়ে ওঠে না। তা কালকের ঘুমটা বোধহয় উপভোগ করব বলেই মনস্থির করে দেড় মিনিট কাটিয়েছি। হঠাৎ পরিচারিকের মন্তব্যে ঘুম ভেঙে গেল। এই ভদ্রমহিলা এতটাই নীচু স্বরে কথা বলেন যে মাঝে মাঝেই অদৃশ্য রিমোটের দিকে হাত বাড়িয়ে ফেলতে হয় যদি ভল্যুম বাড়ানো যায়। তা সেই ভাবলেশহীন মৃদুমন্দ স্বরে তিনি ঘোষণা করলেন যে “বাঁদর ঢুকে গেল!” আমার অমন সুন্দর বৈঁচি ফলের মতো ঘুমের দফারফা।

উঠে দেখি ব্যালকনির দরজায় পরিচারিকা মহিলা হতবিষ্ময়ে দাঁড়িয়ে আছেন আর একটা বছর চারেকের বাচ্চা ছেলে শুধুমাত্র একটা লোমশ লেজ পড়ে অম্লানবদনে রান্না ঘরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমার পার্শ্ববর্তিনী বুদ্ধিমান, তিনি তোলপাড়ের সুযোগ না দিয়ে টুক করে রান্নাঘরের দরজা বন্ধ করেই তার ভিতরে রইলেন। আর বাঁদর বাবাজি প্রতিহত হয়ে বিনা বাক্য ব্যয়ে ফ্রিজের দিকে টার্ণ নিলেন। আমি ভাবলাম- খেয়েছে! এমনিতেই ফ্রিজে জায়গার জিনিস ঠিক জায়গায় থাকে না আর বাবাজীবন কি বার করতে কি বার করে ফেলে ছড়িয়ে একাকার করবে!

যেমন ভাবা তেমনি কাজ, লাফ দিয়ে ফ্রিজের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বাবাজীবন ডান হাত দিয়ে টান মেরে ফ্রিজ খোলার সময়েই চাপ দিয়ে বন্ধ করে ফেললাম, সঙ্গে পোস্কার বাংলা ভাষায় নির্দেশ, “না এখানে কিছু নেই যাও! একদম নয়! খুলবে না, বলছি!” বাঁদর অনেক রকম বাঁদরামি দেখেছে কিন্তু বঙ্গভাষী বাঁদরামি দেখে নি, যে কিনা লম্ফ ঝম্প না করে ছোট ছেলেকে বকার ছলে তার বিরোধিতা করছে।

বাঁদরটা বোধহয় বাংলা বুঝলো না, তাই সে ভাবল হয়তো আমি তাকে বলেছি “Show me your teeth!” তা সেও তদ্রূপ বিদ্রূপ করা শুরু করল। কিন্তু তাতেও দেখে বান্দা বিন্দাস বলে চলেছে, “না এরকম করবে না! যাও চলে যাও!” গাল চুলকে একটু ভাবতে বসল, বার দুয়েক আবার দরজা খুলতে চেষ্টা করল ফ্রিজের কিন্তু আমার হাত তো সেই স্প্রিং ডোরের কাজ করছে, খুললেই বন্ধ করে দিচ্ছে। ইতিমধ্যেই পরিচারিকাকে বললাম, “সদর দরজাটা খুলে দিন!” তারপর বাবাজীকে বললাম, “এ দিক দিয়ে যাও, এখানে কিছু নেই! কিছু পাবে না!”

তা সে ত্যাঁদড় বাঁদর! লাফ মেরে সামনের টু সিটার সোফার মাথায় বসে এক পা আর দু হাত দিয়ে ফ্রিজের দরজায় টান লাগালো! কিন্তু জেদ আমারও আছে! আমার ফ্রিজ থেকে এসে আমার অমতে কেউ কিছু নিয়ে চলে যাবে, মামদোবাজি না কি? ভয় তো রয়েছেই, যদি “কিচ্চিত কিচ্চিত উচ্চিংড়ে ঘেংচু” বলে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন কি করব?

তা সেই মত, সাইড অন স্টান্সে দাঁড়িয়ে রইলাম যাতে মুখোমুখি আক্রমণের সুবিধা না দিই এবং আমার উপর ঝাঁপালে চাপড় মেরে দরজার দিকে সরিয়ে দিয়ে চোটপাট কম করতে পারি। মনে মনে তখন অস্টোত্তর শত নামের মতো, “ডরকে আগে জিত হ্যায়” মন্ত্র পড়ে যাচ্ছি। কিন্তু আশঙ্কা একটা রয়েই গেছে, ব্যাটা যদি কিছু না পেয়ে লণ্ডভণ্ড শুরু করে দেয়। লোকসান তো আমারই।

যাই হোক পরিচারিকাকে নির্দেশ দিলাম সব দরজা বন্ধ করে ছোট ঘরে দরজার কোণে রাখা পুরনো ব্যাটটা যেন আমায় পাচার করে। সেই ব্যাট যে আমার বহু তৃতীয় প্রকার সংঘর্ষের সাক্ষী। বাঁদর খেদন ও ইঁদুর নিধনের বিশ্বস্ত সঙ্গী। তা পরিচারিকা ছোট বড় ব্যাট আর হকিস্টিকের মধ্যে থেকেও কেন যে একটি দাদুর লাঠিকে পছন্দ করলেন কে জানে। ভিতর থেকেই আওয়াজ এল, “লাঠি চলবে?” উফফ এই অবস্থায় আবার অপশন দিচ্ছে অমিতাভ বচপনের মত! আমার খড়কে কাঠি হলেও চলবে!

আমার হাতে তখন একটা প্লাস্টিকের চেয়ার ঢালের মতো উঠে এসেছে, সেটা দেখা মাত্রই একটু ঘাবড়ে গিয়ে বাঁদর রিক্লাইনারের উপর নেমে, চেয়ারের মাথাটা ধরেছে, তার পায়ের কাছে টিভির রিমোট ও পেন। তার পর খান পাঁচেক বার চেয়ার টানাটানি চলল। এমনিতেই চেয়ারে বসলেই লোকে তা নিজের সম্পত্তি বলে মনে করে আর ছাড়তে চায় না, এ তো আমার নিজেরই বাড়ির চেয়ার, ছাড়ি কোন উপায়ে! তখন সে বিরস বদনে রিক্লাইনারে থেবড়ে বসে আমার দিকে চেয়ে মাঝে সাঝেই দাঁত টাত দেখিয়ে যেন বলতে লাগল, “ছাতা আচ্ছা বাঁদর তো তুমি, ফ্রিজও খুলতে দেবে না, চেয়ারেও বসতে দেবে না! তো করবটা কি?”

ইতিমধ্যেই পরিচারিকা হাতে লাঠিটি নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়ালো আর তাকে দেখেই বাঁদরটা ঘাবড়ে গিয়ে রিক্লাইনারের দরজার দিকের হাতলে গিয়ে বসল। কিন্তু লাঠিটা আমার হাতে আসতেই দাঁত খিঁচিয়ে তেড়ে এলো প্রায়। কিন্তু আমি লাঠিটা পিছনে করে, চেয়ারকে ঢাল বানিয়ে রোমান গ্ল্যাডিয়েটরদের মতো পোজ নিয়ে বিশুদ্ধ বাংলায়, “এদিকে আর একদম আসবে না বললাম কিন্তু!” বলতেই কেন জানি না ঘাবড়ে গিয়ে ব্যালকনির দরজাটার কাছে ধপাস করে বসে মনমরা হয়ে তাকিয়ে থাকল।

কিংকর্তব্যবিমূঢ় পরিস্থিতিতে আরও মিনিট তিনেক কেটে গেল, ওদিকে পার্শ্ববর্তিনী রেডিও ধারাবিবরণী শুনতে শুনতে বোর হয়ে বললেন বেরোব, যদি একটু ভিডিও সম্প্রচারও দেখা সম্ভব হয় আর কি! কিন্তু একই রকম শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় তাকেও বারণ করে দিলাম! বাঁদরটা কি বুঝলো কে জানে, কিন্তু দাম্পত্য কলহ হচ্ছে কি না ভেবে আমার ডাণ্ডা দিয়ে দরজা বন্ধ করে তাকে বাইরে সরিয়ে দেবার প্ল্যান চৌপাট করে হাত দিয়ে দরজা আবার খুলে ড্যাবড্যাবিয়ে তাকিয়ে রইল।

আমি আর কি করি ভেবে, পরিচারিকা, যিনি এতক্ষণ ধরে দেওয়ালের সঙ্গে ক্যালেন্ডার হয়ে সেঁটে ছিলেন তাকে বললাম যে খাবার টেবিলের উপর থেকে একটা পুরনো আলুবোখরা পরে আছে সেটা নিয়ে আসতে। সেটা নিয়ে ভাবলাম বাঁদরের উপর দিয়ে টপকে ব্যালকনিতে ফেলে দেব যাতে সে বাইরে চলে যায়! ওব্বাবা! ব্যাটাচ্ছেলে কপাৎ করে সুরেশ রায়নার মতো ক্যাচ করেই মুখের মধ্যে পুড়ে দিল! তারপর বার করে খোসা ছাড়িয়ে মন দিয়ে খেতে শুরু করল! আর আমিও তার মনোযোগের সুযোগ নিয়ে কপ করে দরজা বন্ধ করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।

পার্শ্ববর্তিনী বাইরে এসে জানলা দিয়ে তাকে উঁকি মেরে দেখে সন্দেহ প্রকাশ করলেন যে আমার সঙ্গে তার পূর্বজন্মীয় সম্পর্ক আছে, না হলে কোন রকম হাল্লা না করেই বাংলা শুনে গুটুর গুটুর বেরিয়ে গেল কি করে?

আমি আর কি বলি! বাইরে থেকে যতই শান্ত থাকি না কেন, ভেতর ভেতর তো বেশ তোলপাড় হচ্ছিল! তাই পার্শ্ববর্তিনীকে কেমন দিলাম মার্কা হাসি দিয়ে চেয়ারে বসতে গিয়ে টের পেলাম যে হৃৎস্পন্দন কি পরিমাণ বেড়ে গেছে আর দুম করে ঘুম ছেড়ে ওঠার জন্য একটা চিনচিনে মাথা ব্যথা শুরু হয়েছে।

তা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তো হতেই পারে! বিশেষত প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধের! অদ্ভুত আচরণের তো আবার কোন ওষুধও নেই! কিন্তু নিজের সম্পত্তি বা নিজের লোকের উপর বাইরের কেউ এসে দুম করে কব্জা জমাবার চেষ্টা করলে তাই বা হতে দিই কি বলে? হাজার হোক “আপনা হক” বলে তো কিছু আছে! সে যতই বাঁদর হোক না কেন! সব কিছুর মন্ত্র তো একটাই “জয় শ্রী রাম!!”

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ রাম নিয়ে রমরমা পরে না হয় কখনো করব! বিশেষত নৃসিংহ প্রসাদ বাবুর ‘দেবতার মানবায়ন’ বইটিতে যে খিল্লি করা হয়েছে তা আমার বড়ই পছন্দের এবং তা নিয়ে একটা চ্যাপ্টার কখনো খরচ করব না তা কি হতে পারে? আরে ছোঃ রামো!!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s