(৮৬)


এখন ছটা খানেক বাজে। এয়ার ইণ্ডিয়ার কোলকাতা থেকে দিল্লীর ফ্লাইটে বসে লিখছি… সামনে একটা বস্তা পচা সিনিমা চলছে বটে তবে সেটি শব্দ ছাড়া শুনতে হিএব্বি লাগছে। এই তো এক্ষুণি কোমরের কষি বাঁধতে বলল। কিন্তু আমি বাঁধলাম না। হুমায়ুন আহমেদ যারা পড়ে তারা কোমরের কষি বাঁধে না। তারা সহজ বাক্য সোজা ভাবে লিখতে পারে না। যোগ ব্যায়াম করে হাতের ফ্লেক্সিবিলিটি বাড়িয়ে নিয়ে তারপর পিছন দিয়ে নাক ধরে। তাতেই আরাম। অন্যরকম হবার আরাম। এই যে ওঠার আগেই বোর্ডিং পাসটি বেপাত্তা করে দিয়ে গমগমিয়ে নিজের নামটি অ্যানাউন্স করালাম, তাতে অন্য কোনখানে হলে হয়তো লজ্জায় ল্যাজ দু পায়ের ফাঁকে নুকিয়ে ফেলতাম। কিন্তু মিসির আলির মিস্টিকাল মজাই হল এই যে বুকটা মদনলালের মত ফুলে গেল। সেই যে সেই মদনলাল, যাকে গাভাসকার বলেছিলেন যে দেশের হয়ে খেলার সময় বুক তিন ইঞ্চি ফুলে যেত।

এই যে আমি দেইখতে পাসসি পিলেনের খাবার আইতাসে, বাতাসে সয়াসসের গন্ধ লইয়্যা তাইতে মজা হইসে। আমি অহন গন্ধও দেখতে পাইসি। ভাইববেন না পাঠক পাঠিকারা, আমি বেশ সুস্থই আসি। অহন পিলেনটা দুলতাসে আর প্রমোদ তরণী বাইয়া সুবেশ পুরুষ এবং সুবেশা নারীরা হতকুসসিত খাবারের ট্রেগুলান লইয়া আসতাসে। অহন এট্টু ঝাঁপ ফেইল্যা দি তাইলে।

নাহ! খাওয়া দাওয়া নিয়ে একটা সাইলেন্ট স্কিট হয়ে গেল। আমি আর পার্শ্ববর্তিনী দুজনেই বোধহয় লক্ষ্ণৌইয়া, পহলে আপ পহলে আপের চক্করে ভুখা পেটে গন্ধ শুঁকেই কাটিয়ে দিতাম। আদমি তিন চিকেন দো! বাহুত না ইনসাফি হ্যায়। যাই হোক। চিকেন ভাগ করা যায় বলে এই যাত্রা বেঁচে গেল এয়ার ইণ্ডিয়া।

তবে এয়ার ইণ্ডিয়ার বয়স্ক সেবিকাদের মাতৃসমা হাসির কাছে অধুনা লুপ্তপ্রায় মুক্তকচ্ছ মাছরাঙা এয়ারহোস্টেসদের দেঁতো হাসি ঠিক যেন ব্যান্ডের বাঁধুনিতে লালনের গান। তাতে জান আছে বহুত, কিন্তু পরান তর্কসাপেক্ষে।

যাই হোক, একটা সিনেমা আসার সময়ও দেখেছিলাম এখনও দেখছি দেখাচ্ছে, দেখছি কিন্তু কানে কিছু নেই… চিবোচ্ছি কিন্তু গিলছি না। সিনেমাটার নাম “আশি কিটু”, যা তা রকমের ভালো সিনেমা… হবে বোধহয়, সারা ভারতবর্ষের মানুষজন একশো কোটি খরচ করে দেখেছে যখন। কিন্তু আমি এখন ভারতের মাটিতে নেই বলে সাহস করে বলতে পারছি যে বাকওয়াস ফিলাম। কিন্তু এখন যখন আবার চোখের সামনে আধো আধো সাবটাইটেলে গুটি গুটি পায়ে সিনেমাটা এগিয়ে যাচ্ছে তখন কেমন যেন একটা সন্তান সুখ অনুভব করছি। এই সিনগুলো আগেই দেখেছি আবার হচ্ছে। কানে বাজলে বোধহয় মনে বড়ই বেপরোয়া বাজত। কিন্তু এখন চোখে বাজছে বলেই বেশ লাগছে।

যাউক গে গিয়া। কোলকাতার আবহাওয়াটা কচি কচি হয়ে গেছে… কোচি কোচিও বটে। চারিদিকে সবুজের সমারোহ, তাজা সবুজ। কংক্রিটের জঙ্গলে মোড়া বিষণ্ণ সবুজ নয়। এ যেন সদ্যজাত ঘোড়ার বাচ্চা মাটিতে পড়েই তিড়িং বিড়িং লাফাতে লেগেছে এমন সবুজ, এমন কচি কচি। আর আকাশটা মাইরি বেইমানি করতে শুরু করেছে। ভাদ্রের শুরুর দিকে কোলকাতার আকাশ একেবারে ক্যালকেশিয়ানদের মতই চেগে থাকে। কখন কার উপর ঢেলে দেবে তার ঠিক নেই।

কোচিতে বার তিনেক গিয়ে দেখেছি একটা বৃষ্টির মেঘ আস্তে আস্তে ফোয়ারার ছড়িয়ে ভিজিয়ে দিয়ে চলে যায় কিপটেদের মতো। তোয়ালে কেটে রুমাল করে নিতে হয় মাথা মুছতে। কোলকাতার ওয়েদারও এখন সেই রকম। আসব আরেকদিন… আজ যাই।

যাব আর কোথা? স্বভাব যাবে না মোলে আর অভাব পাবে না মলে… শ্যাম বাজারের মেট্রো থেকে নেমে ম্যাঙ্গো জুসের খোঁজ করছিলাম! (প্রবাসীদের এই এক রোগ… সেই ১৯৪৭এ বোধহয় শহর ছেড়েছে আর এখন গেলেই ভাবে শহরটা সেই একই রকম ফিরপো, ধাপা, দেওয়ালে বিজ্ঞাপনে চাপা রয়ে গেছে। বাইপাস দিয়ে হই হই করে হৃদস্পন্দন ছবি এঁকে চলেছে জিগজ্যাগ… তবুও কি মনে ভালোবাসা একই রকম থাকে? আদি অকৃত্রিম ম্যাঙ্গো জুস তো দুধে মিশে গিয়ে শেক-এ রূপান্তরিত হয়েছে।)

ডিস্ক্লেমারটা বড়ই বড় হয়ে গেল! যাই হোক নেতাজির ঘোড়ার ল্যাজের দিকে এগোতে এগোতে হঠাৎ দেখলাম এক মাতাল সন্ধ্যাহ্নিকের পূর্বেই জল পুলিশের অধীনে চলে গিয়ে পড়ে আছে পাঁকপাশে। তার আবার তিন খানা পা- একটা বোধহয় কেজো নয় তাই আরেকটা কাঠের যোগাড় করতে হয়েছে। যাই হোক শুয়ে থাকতে তো আর পায়ের দরকার পড়ে না। তখন পা আছে বলেই মনে হয় না। মনে হয় স্বর্গে আছি। তা নতুন যুগের বিকেলের কোলকাতার দেখি ভ্রুক্ষেপ নেই। আমি বেশ দোনামোনা করতে করতেই পথের পাঁচিল ডিঙিয়ে লাফ দিয়ে নামলাম পথে। সারা শরীর পাঁক এবং ধেনোর দুর্গন্ধে মাখামাখি। তা মাটিতে নেমেছি যখন মিশে যেতে দোষ কি?

একটানে সোজা করে দিতেই, তেনার খোয়াবে বিচ্যুতি… উগ্র প্রতিবাদ… উঠবেই না! নাগপাশের মতো তাকে জাপটে ধরে এক হেঁচকায় তুলে নিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলাম বীর বিক্রমে নিরিবিলির খোঁজে। শ্লা, খোয়াবেও ভেজাল ঢুকিয়ে দিবি রে! সবাই আতঙ্কিত, চমৎকৃত, প্রসেনজিত, বিশ্বজিত হয়ে হাঁ করেই রয়েছে তাকিয়ে। সবার হুঁশ ফিরল, বজ্র নির্ঘোষে “কোলকাতার মানুষ কি মানবিকতাও ভুলেছে নাকি? সাহায্য করুন আমাকে!” হুড়মুড়িয়ে ছুটে এলো জনা তিনেক। তাড়াতাড়ি একটা কোণা খুঁজে তাকে বসিয়ে দিলাম খোয়াবনামা লিখতে, পিছনে একজন নিয়ে এল ক্র্যাচটা আর জুসওয়ালা এগিয়ে এলো জল দিয়ে আমার হস্তধৌত করে দিতে। পাঁকে নামলে যে মলিন অহংকার ছাড়তে হবে ভায়া।

কম বয়েসি একটি ছেলে এসে বলল, “থ্যাঙ্কু।” আমি বললাম, “এ তো আমারও কেউ নয়, তোমারও কেউ নয়, তাহলে থ্যাঙ্কু কিসের?” সে বলল, “কেউ তো এগিয়ে এল না! আপনি এলেন! অন্ততঃ এটুকুই তো আপনাকে দিতে পারি!”

বেশ কিছুক্ষণ পর আবিষ্কার করলাম পচন ধরা শহরের পূতিগন্ধ হয়তো লেগে রয়েছে গায়ে, কিন্তু বুকের মধ্যে কোথাও চন্দন রঙ ছড়াচ্ছে, মানুষ এভাবেই হয়তো বেঁচে থাকবে, বেঁচে যাবে জাতটা, বজ্জাতি ডিঙিয়ে।

সেই যে শুরুতেই বললাম হুমায়ুন আহমেদ পড়ছি। প্লেনটা নামছে নীচে, কিন্তু বেশ টের পাচ্ছি, মিসির আলির unsolved-এর মতই কিছু না কিছু আমাদের অলৌকিকভাবে নেমে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে দেবে। টাকার দাম পড়ে যাওয়া থেকেও হয়তো। আমেন। আর ও হ্যাঁ, ভুলভাল বাঙাল ভাষায় জিবরিশ কিছু লিখে ফেলেছিলাম, এখন তা মুছতে মন চাইছে না। থাক না। কিছু unsolved puzzle- লৌকিকতার আড়ালে।

4 thoughts on “(৮৬)

  1. কলকাতা এখন একটা গ্রামকে হারিয়ে ফেলেছে, অনেকটাই। বাকীটুকুও গেলে আর কিছুই হবে না ভায়া। মানে তুমি যদি তখন কলকাতার লোক হওয়ার অতীত রাখো তাহলে সমস্যায় পরবে। নগরে, ব্যাস্ততায়, কার সময় আছে? সাংবাদিকের চাকরী করতে গিয়ে হাড়ে হাড়ে বুঝেছি। যে সাংবাদিক মানবিক স্টোরি করেন তিনিই পথে সদ্য গাড়ি চাপা পড়া শিশুকে অবলীলায় তুলে নিয়ে যেত বাধা দেন। কি না কি কেস খেতে হবে! জোর করে নিয়ে গেছি অফিসের গাড়িতে বলে বসেরা খুব বিরক্ত হয়েছিলেন। নিয়ে যাবার পরে সেই শিশুর পাড়ার লোকেরা এসে নিজেদের মধ্যে খানিক ফিসফাসের পরে বলেছিল এরাই চাপা দিয়েছে। ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। নেহাত সাংবাদিক বলে সুবিধে করতে পারেনি। স্টোরি করা সাংবাদিক হেসে বলেছিলেন ‘জানতুম’!

    আমিও জানতুম! কিন্তু জানতুম তো এটাও যে এটাই সন্ধের স্টোরি হতে যাচ্ছে। সেই বসেরাই আবার সাংবাদিক পাঠিয়ে মানবিকতার সেবায় আমাদের চ্যানেল কেমন লেগে থাকে বলে স্টোরি করে মাইলেজ কুড়োবে। জানতুম মানুষ এমন। কিন্তু তাতে আমাকেও অমন হতে হবে এটা জানলেও মানতে পারলাম না এদ্দিনেও। কিন্তু এটা এখন মানি যে কলকাতার মধ্যে নিহিত গ্রামটি প্রায় মুছে গিয়েছে।

    Like

    • শব্দটা বোধহয় গ্রাম নয়। শব্দটা মূল্যবোধ বা মানবিক দৃষ্টিভঙ্গী, যা আমাদের আত্মার কাছাকাছি। তা সেই যখন কাছাখুলে খাঁচা ছাড়া হচ্ছে তখন তো একটু উঠে পড়ে লাগতেই হয়। কি বল? সঙ্গে থেকো।

      Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s