(৮৭)


আবার উড়ান আর আমি কোলযন্ত্র নিয়ে ঠোকাঠুকি করে চলেছি… ফিসফাস তো রণে বনে জলে জঙ্গলে যেখানে সেখানেই তার গলা উঁচিয়ে জানান দিয়ে যায়। এখানকার ছুটকো ছাটকা ঘটনা নিয়ে হয়তো একটা বানানোই যেতো, কিন্তু সে পরে কখনও হবে। তার আগে একটা প্রশ্ন করি, কখনও হারিয়ে গেছেন?

হ্যাঁ, পাঠক পাঠিকারা ঠিকই শুনেছেন, হারিয়ে গেছেন কখনও? উত্তরে বলতেই পারেন যে প্রশ্নটা তো এরকম হওয়া উচিত ছিল যে পথ কি এখনও খুঁজে পেয়েছেন? জীবনের কানাগলিতে উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে উড়তে উড়তে যেমন পাখী বাসা খুঁজে পায়, সে রকম পেয়েছেন খুঁজে পথ, আপনার ঠিকানা লেখা পথ?

এই রে এ সব ভীষণ রকমের আঁতেল ব্যাপার স্যাপার হয়ে যাচ্ছে, আর ফিসফাস তো আঁতলামো নয়, ফিস ফাস হল ঝাল মুড়ি বা মুড়ি লজেন্স, যা চিবোতে গেলে ফ্রেঞ্চ ক্যুজিনের মতো নিজের দাঁত ও জিভের আকুপাংচার করতে হয় না, শুধু পথ যে দিকে যায় সেদিকে বয়ে গিয়ে স্বাদ আহরণ- ভাল লাগলে মনে রাখুন আর না হলে? স্রেফ ভুলে যান!

যাই হোক ছোটবেলায়, আমি যখন খুব ছোট ছিলাম (বিশ্বাস করুন সত্যিই ছোট ছিলাম) তখন বড় মাসির বাড়িতে থাকার সময়, বাবা- মা বাইরে থেকে ফিরতে দেরী করছে বলে সবাইকে অতিষ্ঠ করে ফেলেছিলাম, বাড়ি কোন বাস যায় বলে! মাসতুতো জামাইবাবু আমায় নিরস্ত করার জন্য বলে দিয়েছিল 8B! তাই পলক ফেলার সুযোগ না দিয়ে, সবাইকে দাঁড় করিয়ে রেখেই জনবহুল অরবিন্দ সরণী দিয়ে ছুটে গেছিলাম কাল্পনিক 8B ধরার জন্য। হরি ঘোষ স্ট্রীটের মুখে জামাইবাবু ধরে সপাটে এক চড় না কষালে বোধহয় আক্কেল গুড়ুমই হয়ে থাকত, আর আমায় ধীরে ধীরে ফরেস্ট গাম্পের মতো দেখতে হয়ে যেত।

সে যাই হোক, আবশ্যিক গৌড়চন্দ্রিকার শেষে আসল ঘটনায় আসা যাক। ছেলেপুলেদের পরীক্ষা থাকলে বাপ মার নাড়ির গতি উর্ধ্বগামী হয়ে যায় সে তো চিরকালীন সত্য, তবে সত্য বলতে কি আমার বা আমাদের এখনো সেই রকম অভিজ্ঞতা হয় নি, পরীক্ষা চলাকালীন রক্তচাপ এখনো ১২০/৮০তেই ঘোরাফেরা করে বলেই বোধহয় দুনিয়ার রঙ্গ দেখে অবাক হয়ে যাই।

তবুও স্কুলে পাঠানোর জন্য নূন্যতম মেহনত তো করতেই হয়। তা সে সবের পরিসমাপ্তি ঘটে যখন সবুজ ট্যাগ ঝুলিয়ে হলুদ বাসখানি ছেলেকে যথাস্থানে নিয়ে যেতে এসে হাজির হয়। সোমবার ছিল সে রকমই একটি দিন। তবে আমাদের সংলগ্ন রাস্তাটির সুরৎহাল ফেরানোর ব্যবস্থা হচ্ছে বলে বাসবাবু বলে দিয়েছিলেন যে মর্ণিং ওয়াক একটু বেশি করতে। মোড়ের মাথা অবধি পৌঁছে গিয়ে অপেক্ষা করছি প্রভাতমুক্তির বাণী শোনার জন্য… হঠাৎ দেখলাম বছর চারের একটি বাচ্চা মেয়ে শুধুমাত্র একটি টি শার্ট পড়ে আমার থেকে মিটার দশেক দূরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে অমলিন সকালের আবহাওয়ায় এক ফোঁটা চোনার উদ্গীরণ করছে, মনঃটা ভার হয়ে গেল। আমার ছেলেটাও তার সদ্য লব্ধ দায়িত্ববোধ নিয়ে দেখছে বাবা কি করে!

বাবা আর কি করে, সে দেখতেই থাকল, এবং দেখল যে, মেয়েটির আপাত পথ হারানো নিয়ে কারুর কিছু হেলদোল নেই বিশেষ… সত্যিই বড়ে বড়ে শহরো মে অ্যাইসি ছোটি ছোটি বাতে তো হোতা হি রহতা হ্যায়, একটা ছোট বাচ্চা যদি পথ হারিয়ে থাকে তাহলে কার আর কি আসে যায়! বাচ্চা তো বিখ্যাত পদবী নিয়ে সোনার চামচ নাকের ডগায় ঝুলিয়ে ভূমিষ্ঠ হয় নি!
মনটা ভার হয়ে গেল, আশেপাশে জিজ্ঞাসা করে বাচ্চাটির আদত পরিচয় পাওয়া গেল না। নিজেকে ঠিক ঋত্বিক ঘটকের ছবির বিকাশ রায়ের মতো মনে হচ্ছিল। কচি মেয়েটাকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কি হয়েছে?

আধো আধো বোলে সে বলে উঠল, মাম্মি চলি গয়ি ছোড়কে… অজানা আশঙ্কাকে বাজপেয়ীর বক্তৃতার মতো উড়িয়ে দিয়ে সে শেষ করল, কাম পে! (অশ্বত্থামা হত… সে তো কতকাল আগেই!)

খালি পা, পরনে শুধু একটা ছোট টি শার্ট, মায়া হল জানেন! কোলে নিয়ে এদিক ওদিক খোঁজ খবর করতেও জুটল লবডঙ্কা! মেয়েটিও অচেনা কারুর কোলে উঠে খুব অপ্রস্তুত, জোর করেই একরকম নেমে গেল! ইগোতে লাগল? কে জানে? একবার মনে হল পরের ছেলে পরমানন্দ… তার পরেই নিজের ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব, পিতৃত্ব ইত্যাদি ভারী ভারী শব্দ মাথার ভিতর বোঁ বোঁ করতে লাগল, আর আমি ছেলেকে বললাম নিজ দায়িত্বে বাসে উঠে যেও! বলে এগিয়ে গেলাম সেই আপাত ফুঁপিত মেয়েটির দিকে… সে তখন নিজ দায়িত্বে মায়ের খোঁজে এগিয়ে চলেছে। গেলাম পাশে পাশে, “কাঁহা কাম করতি হ্যায় তুমহারা মা?” (ছোট বলে কি তার সম্মান নেই? আমাদের কাউকে “তুই” বলতে একটুও সময় লাগে না!) সে বলে যেতে লাগলো আঙুল তুলে দেখিয়ে “উধার, দুকান কে বিচ মে সে গলি নিকল গয়ি উধার!”

আট বছর হয়ে গেল, তাও দুকানের মাঝখান দিয়ে যে গলি বেরিয়ে গেছে সেটা খালিই রয়ে গেল… খুঁজেও পেলাম না! তবু তার সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকলাম- কি জানি শহরকে নরক বানাবার জন্য মানুষের চেষ্টার তো অন্ত নেই! বাচ্চা মেয়ে বলেই বোধহয় আরও একটু বেশী সতর্কতা। মিনিট দুয়েক পরে আবার একটা মোড়ে পৌঁছে সে স্বাভাবিকভাবেই পথ খুঁজে পায় না। তার আর দোষ কোথায়, আমরা বড়রাই অহরহ পথ হারাই তো সে তো ছোট শিশু, নিজের পথ নিজে করে নিতে এখনও দেরী আছে।

শেষে সহানুভূতিশীল আরও দুই মহিলার সঙ্গে মিড রোড কনফারেন্স করে সে সিদ্ধান্ত নিল যে ফিরে যাবে। আর যুধিষ্ঠিরের যষ্টি হলাম আমি। এবার বললাম, “কোলে আসবে?” না বলল, কিন্তু আঙুল ধরে এগিয়ে যেতে লাগল আর আমিও সাহস পেয়ে ধীরে ধীরে উলটো পথে নিয়ে চললাম আধচেনা বাড়ির দিকে।

হঠাৎ পথেই একটা ছেলে এসে জিজ্ঞাসা করল, “আঙ্কল, আপকি বেটি হ্যায়?” আমি মাথা নাড়তেই বলল, “ইসকা ভাই ঢুঁঢ় রহা হ্যায়!” ধড়ে প্রাণ এল আর দাদাকে দেখতে পেয়ে বোনও দৌড় মারল তার দিকে এতক্ষণের কান্না ভুলে। একটু বকা ঝকা করলাম বটে দাদাকে, কিন্তু তারও যে বয়স দশ পেরোয় নি।

যাই হোক, দাদার সম্পত্তি হাতে তুলে দিয়ে আমি ফিরলাম বাড়ির মুখে, কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে মুখ ঘুরিয়ে দেখলাম, দুই ভাইবোন টুক টুক করে ছোট্ট ছোট্ট পায়ে চেনা পথে এগিয়ে যাচ্ছে, কোথাও কোন দ্বিধা নেই। সঙ্গে থাকলে আবার ভয় কিসের রে পাগলা?
যাই হোক, উড়ানের মধ্যেই বসে লেখা শেষ করা মুখের কথা নয়, বিশেষ করে আমার বাম পাশে রাশিয়ান ললনা (আরে আভা, লাভা মনোলোভা থাকলেই পূর্ব ইউরোপীয় বা রাশিয়ানা… সেই রকমই তো নাম বলল) দিব্যি ভঁসভসিয়ে ঘুম দিচ্ছে, আর ডান পাশের মহারাষ্ট্রিয়ান পিতা ও হায়দ্রাবাদি মাতার সুযোগ্য পুত্রী লিস্টার ইউনিভার্সিটিতে হেলথকেয়ার আর ওয়েলফেয়ার নিয়ে পাঠরতা তরুণীটি উগ্র ব্রিটিশ অ্যাক্সেন্টে হাবিজাবি বকে যাচ্ছে আর আমি হুঁ হাঁ করতে করতে লেখা শেষ করছি আর এই মাত্র ল্যান্ডিং অ্যানাউন্সমেন্ট হয়ে গেল বলে এখুনি বন্ধ করতে হবে পাখা।

তার মাঝেই প্রায় বছর তিনেক পরে মুম্বইয়ে নামব… তাও গণেশ বিসর্জনের দিনে, ভাগ্য করেছি বটে। (আগের প্যারাগ্রাফটি পার্শ্ববর্তিনীকে ফোন করে জানাতে অবশ্য তিনিও একই কথা বললেন… ভাগ্য করেছি বটে!! (ইয়ে এটা পরে যুক্ত করা, ক্ল্যারিফিকেশন দিয়ে দিনু কিন্তু!))

2 thoughts on “(৮৭)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s