(৮৮)


নাহ! অনেক ভেবেচিন্তে ইলেকশন ডিউটির একটা যুতসই বাংলা খুঁজে পেলাম না! কিন্তু সরকারী চাকুরেদের হেলদোলহীন জীবনে এটি একটি বিশেষ ধরণের কুইনাইন মিক্সচার যা খেলে চোদ্দপুরুষের অন্নপ্রাশনের পরমান্ন উঠে আসে কিন্তু না খেলে কাঁপুনি যে আছোলা বাঁশ হয়ে কোন দিক দিয়ে ঢুকবে তা টের পাওয়া যায় না।
ইলেকশন ডিউটির সঙ্গে আমার মোলাকাত সেই সুদূর স্বাধীনতাপূর্ব যুগে, ১৯৮০ সালে। যখন স্বনামধন্যা পরম পূজনীয়া ইন্দিরা গান্ধীজী সমহিমায় ফিরে আসেন, “দেখেছ তো আমিই ঠিক” বুলি সহকারে!
না না পাঠক পাঠিকারা আমাকে ডাইনোসরের বয়সী ভেবে বসবেন না! আমি বংশানুক্রমিক সরকারি চাকুরে। পিতৃদেবের ডিউটি পড়েছিল ডায়মণ্ড হারবার নামক পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম সর্বদক্ষিণ বিন্দুর নিকট প্রত্যন্ত বাদা অঞ্চলে। বাবার পিসতুতো পিসির বাড়ি ছিল সেখানে বলে আমাদেরও সেই চক্করে বেশ চক্কর মেরে আসা হয়েছিল সেখানে। তবে কি না বাবার মুখে মশার কামড় খেয়ে এক ঘরে ১০ জন শুয়ে থাকা আর টোপাজ ব্লেডের মতো পোণা মাছের পিস খাবার গল্প শুনে আর যাই হোক নির্বাচনী দায়িত্ব মেটাতে খুব বেশী উদগ্রীব বোধ করি নি।
যাই হোক পাকে চক্রে বাংলা মায়ের হ্যাংলা ছেলে এই পাণ্ডববর্জিত দিল্লীর (যদিও দিল্লী পাণ্ডবদের রাজধানী ছিল, কিন্তু সে তো সেই দ্বাপর যুগে) বুকে যে বছর এলাম সে বছর থেকে আরও বছর আটেক কি ভাবে যেন ইলেকশন ডিউটির এপাশ ওপাশ দিয়ে কাটিয়ে চলে এসেছি তা বলতে পারব না। তবে যে বার পড়ল, সে বার একদম হুড়মুড়িয়ে পড়ল।
গতবারের দিল্লী বিধানসভা নির্বাচনের সময় কানঘুষো শুনছিলাম যে এবারে বুলেটটিকে কামড়াতে হবেই! তা হলি হলি কেমনি হলি! দেশ পেরিয়ে কানাগলি! পোস্টিং লেটারে জায়গার নাম এল দেখি মদনপুর দাবাস, মুণ্ডকা! গুগলে খুঁজতেই দেড়দিন লেগে গেল! আর যাকেই জিজ্ঞাসা করি, সে বলে জানি না! যে জানে, সে রহস্যময় হাসি হাসে কিন্তু কিছু বলে না! সাসপেন্স আর চেপে রাখতে পারলাম না! একদিন অফিস থেকে বাহন সংগ্রহ করে রওনা দিলাম এবং সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে যেখানে গিয়ে পৌঁছলাম, তাকে দিল্লী শহরের অঙ্গ বলা আর ডিমকে আমিষ বলা একই হয়ে দাঁড়ায়।
হিসাব কষে দেখলাম বাড়ি থেকে বেয়াল্লিশ কিলোমিটার দূরে সেই মদনপুর দাবাস অবস্থান করেন। এবং সেখানে ভোর সাড়ে চারটেয় পৌঁছতে গেলে রাত থাকতেই বেরোতে হবে। কিন্তু সে তো পরের গল্প, তার আগে তো প্রশিক্ষণ! ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন নিয়েই যত কাণ্ড, তা তাকে সঠিক পদ্ধতিতে বাজাতে শিখতে হবে না?
নির্দিষ্ট দিনে, আমাদের নিয়ে গিয়ে পিতমপুরা টিভি টাওয়ার নামের গোয়ালে ঢুকিয়ে দেওয়া হল এবং পঞ্চাশ হাজার ফর্ম ও একত্রিশ হাজার স্বাক্ষরের পর, আমার সহকর্মীদের আমার সঙ্গে জুতে দেওয়া হল। এসডিএম বার বার করে বুঝিয়ে দিলেন প্রিসাইডিং অফিসারের মহান কর্তব্যের কথা। নিজেকে কেমন যেন মীরজাফর মীরজাফর লাগছিল। দায়িত্ব তো প্রচুর কিন্তু ক্ষমতা? বিশাল বড় প্রশ্ন চিহ্ন নিয়ে সেই ডি-ডে (ডিউটি ডে)-র আগের রাতে ঘুমতে গেলাম।
এবং উঠে পড়লাম, চারটেয় পৌঁছতে গেলে তো দুটোয়ে বেরোতে হবে! অফিস থেকে একটি গাড়ি যোগাড় করে রেখেছিলাম আর একটা জিপ পাউচে খান দুই স্যান্ডউইচ! সঘন অন্ধকারের বুক চিরে আমার গাড়িটি এগিয়ে চলল দুটি হেডলাইটের ভরসায় (আরে নাহ! রাস্তায় যথেষ্ট আলো ছিল, কিন্তু বেয়াল্লিশ কিলোমিটার বলে কথা, অমন করে বললে কেমন একটা রোমাঞ্চ হয় না?) নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছে দেখলাম আমার নারায়ণী সেনা এসে হাজির। রিটার্নিং অফিসারের থেকে ইভিএম এবং হাবি জাবি কাগজের তারাগুলি নিয়ে শুরু করলাম অভিযান। দোকান সাজাতে সাজাতে সাড়ে ছটা বেজে গেল। এজেন্টরা আস্তে আস্তে আসতে শুরু করল।
প্রথমেই তিন বড় বড় পার্টির (এখানে হাত ও পদ্মের সঙ্গে হাতিও চলে মৃদুমন্দ চালে) এজেন্টদের একসঙ্গে করে বলে দিলাম, বেশী পাঁয়তারা কোষো না হে! পুলিশ দিয়ে বেধড়ক ঠ্যাঙানি খাওয়াবো! তা বলার বোধহয় দরকার ছিল না! তারা আগে থেকেই আপাত দৃষ্টিতে সব কিছু মেনে চলতে রাজী ছিল। তবুও সাড়ে ছফিটের জাঠগুলোকে খামোকা একটু রঙ বরষে দেখাবার সাধ এড়াতে পারলাম না।
যাই হোক ক্রমে ক্রমে লাইন বাড়তে কমতে লাগল। যাকেই একটু সন্দেহ হয় এজেন্টরা হা হা করে জানিয়ে দেয় যে সে তাদের ইজের পড়া বয়সের বন্ধু! একটু যে কেমন কেমন লাগে নি তা নয়! কিন্তু বেলা বারোটা নাগাদ যখন এক ‘মাষ্টারজী’ তার ভোট আগে কি করে পড়ে গেছে বলে কাঁই মাই জুড়ে দিল তখন সন্দেহ মজবুত হল। কেসটা সম্পূর্ণ গট আপ হচ্ছে, তুই ১০ গোল দে আমিও দশ দিই আর পাঁড়েজীও দিক দশ! বাস হিসাব বরাবর! কিন্তু মাস্টারজীকে নিয়ে পড়লাম মুশকিলে, যদি একে ভোট দিতে দিই তাহলে কাস্টিং ভোট হিসাবে একটা কাগজের ভোট করতে হবে তার আলাদা খাম আলাদা খান তিনেক ফর্ম! কাগুজে অত্যাচারে পাঁজরা ভেঙে শয্যাশায়ী হব!
তা দেখলাম তিন এজেন্টই উঠে এসে “মাস্টারজী বাহার আইয়ে প্লিজ!” বলে ধরে নিয়ে গেল! বুঝলাম তার একটা হিল্লে হয়ে গেল! নির্বিঘ্নে তাকে জানলা দিয়ে চলে যেতে দেখে মনটা যে একটু খচখচ করছিল না তা নয়! কিন্তু আপনি বাঁচলে বাপের নাম, ইলেকশন ডিউটি চাপের নাম!
ভোটের দিন বারোটা থেকে তিনটে ভারতীয় নাগরিকদের সাংবিধানিক দায়িত্ববোধ বেড়ে যায়, কারণ তখন ছুটির দিন রান্না করা, শীতের দিন খেউরি করা আর ভোটের দিন পহলে আপ করা শেষ হয়ে যায়। বুথের সামনে লাইন ধীরে ধীরে লম্বা হচ্ছে, আর আমাদের হাতও দ্রুত চলছে। আমার নিজের পাও দ্রুত চলছে বটে। এদিক ওদিক স্বভাবসিদ্ধ হাঁকডাকে অস্থির করতে করতেই আবিষ্কার করলাম যে খান দুয়েক পুরাতন মুখ। তাদের ইতিমধ্যেই ভোট দেওয়া হয়ে গেছে কিন্তু জামা পালটে চুলে টেরি বাগিয়ে মুখে ভুরভুরে গন্ধ নিয়ে আবার সে আসিছে ফিরিয়া।
কপাৎ করে ধরলাম! সোজা দাঁড়াতে পারছে না কিন্তু জাঠতুতো জেদ তার! ভোট দেবেই! ‘দেখ লো স্যর! হাত মে নিশান কাঁহা?’ বাঁহাতের তর্জনী ধরে দেখি সেখানে চ্যাটচ্যাটে ক্রিম! ব্যাস আমারও জেদ চেপে গেল! ভোট তো দিতে দিলামই না! উপরন্তু তাকে দু হাত উলটো করে রাখতে বলে নিজের হাতে তার দু হাতেই তর্জনীর নেলপালিশ কবজি অব্ধি টেনে দিলাম। হুঁ হুঁ বাওয়া! তুমি যাও ডালে ডালে আমি পাতায় পাতায়! এজেন্টরাও টুক টুক করে তাকে টেনে নিয়ে গেল এই বলতে বলতে আর হবে না আর হবে না!
ততক্ষণে তিনটে বেজে গেছে আর আমার স্যান্ডউইচ দেহ রেখেছে! না খেয়ে শুধু দু কাপ চা আর বিস্কুট (অবশ্যই নিজের পয়সায়! নাহলে চিকেনের ঠ্যাঙ চিবুতাম হয় তো!) চেখেই কাটিয়ে দিলাম। স্টুডিওর ঘড়িতে তখন পাঁচটা বাজতে পাঁচ! এজেন্টদের আগে থেকেই বলা ছিল, তাদের একে একে ভোট নিয়ে ইভিএম মেশিন ক্লোজ করলাম যখন তখন মেজ কাঁটাকে পাঁচের ঘরে রেখে মিনিট আর সেকেন্ডের কাঁটা আমে দুধে বারোটায় মিশে গেল!
কিন্তু বিধি বাম, সেই স্কুলে মোট ৭ টি বুথ, আর সব কটা বুথের ভোট গ্রহণ শেষ না হলে সরকারী জালী গাড়ি (জাল দেওয়া গাড়ি আর কি) রওনা দিতে পারছে না! তাই বনের মোষ তাড়াতে সেখানেও লেগে গেলাম। একটি বুথে সাড়ে বারোশো ভোটার! প্রিসাইডিং অফিসার এক বয়স্কা শিক্ষিকা, আর তাঁর পোলিং অফিসারগুলি বেবুন (পশ্চাৎপক্ক আরকি!) তা যাই হোক কোন মতে তাদের কাজ শেষ করাতে করাতে করাতে গেল সাতটা বেজে!
তারপর জেলের কয়েদীদের মতো ‘প্যাঁ পোঁ’ করতে করতে সেই গোয়ালে গিয়ে হলাম হাজির। তারপর কাগজ পত্রে সই সাবুদ করে জামিন টামিন বার করে আসতে বেজে গেল সাড়ে বারোটা! চক্ষে আমার তখন মাতালের মতো ঘুম ঢলে পড়ছে আর আধফোটা চাঁদটা মুচকি মুচকি কেমন দিলাম মার্কা হাসি হেসে যাচ্ছে!
যাই হোক সে তো নাহয় গেল পাঁচ বছর আগের ঘটনা! দুর্ঘটনা না ঘটলে তো এই ভোট ভোট খেলা প্রতি পাঁচ বছর অন্তরই! মাঝে লোকসভা নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন নীরব থাকার পর আবার শ্যামের বাঁশি নিদারুণ সুরে বেজেছে! তাও এসএমএসে! পেট্রোলিয়াম ছেড়ে অন্যত্র এসেছি কিন্তু পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক বিদায়ী সম্বর্ধনার মতো সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে এই পোস্টিং! তবে এবার বেশী দূরে নয়, দশ থেকে পনেরো কিলোমিটারের মধ্যেই! একটা গল্পের জন্য মুখিয়ে আছি! চৌঠা ডিসেম্বর তো আস্তে আস্তে এসেই গেল! তাই না? এই একমাত্র জায়গাতেই সরকারী চাকুরেদের বছরে বছরে লাগা না পরিশ্রমের কালিটা এক ঝটকায় ঝকঝকে পালিশে রূপান্তরিত হয় যে! অপেক্ষায়…

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s