(৯০)

পাঠক পাঠিকারা, দুইখান ডিস্ক্লেমার আগে ভাগে দিয়ে রাখি… বাঙালি কেন সারা পৃথিবীর সিনেমাসচেতন মানুষ বরাবরই চিত্র সমালোচক। তা এখন না হয় ফেবু হয়েছে তার আগে কি ননীদার চায়ের দোকানে, নোনামাসির রকে বসে চলচ্চিত্র অপারেশন হয় নি? না কি সে সব শুধু সিপিএম কংগ্রেস, ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগানের জন্যই তোলা ছিল? অতএব, ছাড়পত্র নেবার দরকার নেই। দ্বিতীয়তঃ সব ভালো হলে ভগবান আর খারাপে শয়তান। মানুষ যদি ভালমন্দে মিশিয়ে হয় তো সিনিমা কেমনে নয়?

যাই হোক, কানঘুষোয় শুনেছিলাম যে কমলেশ্বর বাবুর ‘মেঘে ঢাকা তারা’টি বেবাক উড়ে গেছিল বক্স অফিস থেকে, মাছি তাড়াবারও সময় পাওয়া যায় নি। তা তাঁর আর দোষ কোথায় বলুন- শরীরটাকে রাখতে হবে তো? তাই হরলিক্সস।

‘চাঁদের পাহাড়’ চড়েন নি এমন সুস্থ মস্তিষ্কের ছা পোষা বাঙালি বোধহয় বেশ কমই আছে। শীতের দুপুরে চারডি ভাত আর এক হাতা ডাল পোস্ত সহকারে ঢেঁকুর তুলে দিবানিদ্রায় স্বপ্ন দেখার নামে চাঁদের পাহাড়ে স্নান করাই তো ছিল আমাদের কিশোর কালের নির্বিকল্প সমাধির দিনগুলি। হাজার হোক স্বপ্নে তো আর দুয়ে দুয়ে চারও করতে হয় না আর সকাল চারটেয় উঠে “হুম হাম” সহযোগে শারীরিক কসরত করে নিজেকে তৈরীও করতে হয় না। তাই লাও ভাই এমনি হবে না তো শঙ্করাকে ডাক।

তা শঙ্কর তো তার স্বপ্ন পূরণ করতে উগাণ্ডা রেলওয়ে করে পাড়ি লাগিয়েছে রিখটারভ্বেল্টের কুয়াশার স্বপ্ন রাজ্যে। তারপর আর কি? বিভূতিবাবুর বিভূতিময় কলমের ছোঁয়ায় এক নিমেষে পৌঁছে যান সেই শীতের রাতের ঘাম ধরানো রোমাঞ্চপুরীতে। তা সে বুন্যিপ যতই অস্ট্রালিয়া থেকে এসে আপনার সঙ্গীই হোক আর কার্বনস্লিট হিরে জলের স্রোতে নুড়ির মত পড়ে থাকার মতো ম্যানহোল ফাঁকই হোক। অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় বাঙালী যখের ধনের মতো আগলে রেখে দেয় তার মর্ত্যপুরীর স্বর্গরাজ্যকে। তা সেই স্বর্গরাজ্যে যখন হানা দেয় কোন দুঃসাহসী তখন আমরা আবার ক্ষয়ে যাওয়া, ‘হুঁ হুঁ বাওয়া’ চশমাটা নাকের ডগায় এঁটে বউয়ের চিৎকার বসের বিকার গার্লফেণ্ডের আকার আর উইকেণ্ডের পোকার টেবিল ছেড়ে উঠে বসি, আদ্যিকালের কাঠের স্কেলটা নিয়ে। মেপে মেপে নিতে হবে মামা মেপে মেপে! নাহলেই ফেল! আর ফেল হলেই সাত দিনের ফাঁসি আর তিন মাসের জেল।

সত্যি বলতে কি আমারও যে এরকম মানসিকতা নেই তা জোর দিয়ে বলতে পারি না। তাই সময় নিয়েই চতুর্থ সপ্তাহে এসে বাক্স প্যাঁটরা বগলে করে গাঁ উজিয়ে হাজির হই দক্ষিণ পাড়ার এক সিনেমা হলে, চল্লিশ কিমি তখন নস্যি- নাকে টেনে বার দুয়েক নাক টেনে হেঁচে নিয়ে ভুলে যাও। তার বদলে হুড়মুড়িয়ে ঢোকো আধো অন্ধকারে। মাল্টিপ্লেক্সের বাক্সের পর্দায় তখন সবে ফিল্ম ডিভিশনের সার্টিফিকেট।

শুরুতেই চমক- ক্যামেরা ঈগলের ডানায় ভর দিয়ে স্প্রিংবকের আঙিনায় পদার্পণ করেছে। চালাও পান্সি সালিসবেরিয়া। দেব শঙ্কর (এ সেই হালদারবাবু নন, শঙ্কররূপী দেব) তখন পায়ের উপর পা তুলে কফিকাপে কেক ডুবিয়ে মৌজ করে গোঁফে দিচ্ছেন তা। আর ভাবছেন সেই আত্মনেপদী দিনগুলোর কথা যেগুলো আমরা ফ্ল্যাশব্যাকে পরবর্তী দু ঘণ্টায় আস্টেপিষ্টে লেপে নেব শরীর মনময়। তা তিনি যখন ‘মাগো আমায় ছুটি দিতে বল…” আবৃত্তি শুরু করলেন তখন মাছি গেলার অবস্থা হয়েছিল বটে কিন্তু ঘোড়ার খুরে খুরে সে ধুলা উড়াইয়া দিল আফ্রিকায়।

তারপর হাজির হল আফ্রিকার রাজা। সে রাজা কেয়াবাত হ্যায় ভাই… সাভানা অঞ্চলে চড়তে চড়তে গুহার মাথায় দাঁড়ায় কচি মাথা চিবোবার জন্য। কিন্তু না বলিয়া পরের দ্রব্য নিলে তাকে চুরি করা হয় আর প্রাচীন আফ্রিকায় তার শাস্তি মৃত্যু! তাই শঙ্করবাবু মাসাইদের ব্ল্যাকমেল করে এক বালতি আলতা আর পাঁঠার মাংস জোগাড় করে সিংহকে আহবান করল, “চল ভাগ চলে”! তা সিংহ বেচারি বুঝতে না পেরে তার দিকেই দৌড়ে এল! গুস্তাকি মাফ করার মতো নয়! তাই শঙ্করবাবু দে ঘুমাকে পয়েন্ট ফোর নট রাইফেলটা আকাশে চালিয়ে দিল ‘কালারি পায়াট্টু’ স্টাইলে আর শব্দেই বোধহয় আফ্রিকার রাজার থ্যাঙ্কু হয়ে গেল। অন্ততঃ পিছনের ভৌতিক ভয়েসটা তাই বলল।

তার আগে অবশ্য শঙ্করবাবুর গ্রীন মামাবাবুর সঙ্গে (বইয়ে যদিও ছিল ব্ল্যাক মাম্বা) টুকি টুকি খেলতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে খেয়েছে এক থাপ্পড়। শঙ্করও মনে হয়ে ঘুমের ঘোরেই দিয়েছিল ঘুরিয়ে এক। কিন্তু সেটা আর মানেকা গান্ধীর ভয়ে দেখায় নি, শুধু অনুমান করলাম, কারণ পরের সিনেই হাতে ব্যান্ডেজ ছিল। হাজার হোক মামাবাবু কামড়ালে ব্যান্ডেজ বাঁধার সময়ও পাওয়া যায় না বলেই গুগল বলছে।

তা সেও ছিল ঠিক- হঠাৎ চুঁচড়োর কোন পর্তুগীজ সাহেব চিতাবাঘের দিবা নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটিয়েছে দেখলাম। মানে চিতাবাঘটা বোধহয় একটা বেঁটে গাছে ঘুম মারছিল। তা সাহেব ভয়ে সে গাছেই চড়ে চিতাবাঘকে দিয়েছে এক ধাক্কা। সে বেচারি মন মরা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। এমন সময় শঙ্কর এসে চিতাবাঘটাকে উদ্ধার করল। (একটা সত্যি কথা বলে ফেলি- এতক্ষণ ধরে শঙ্কর শঙ্কর করছি। আসলে ওটা দেব! শঙ্কর বইয়ে ছিল! এটা সিনেমা বলে দেব!) তা যাই হোক গাছ থেকে নামিয়ে দিলে সাহেবকে কোথাও তো নিতে হয়! শঙ্কর নিল বাড়িতে থুড়ি স্টেশনে! আর যায় কোথা এর জান বাঁচিয়েছে তো সাহেবকেও তো কিছু করতে হয় তা সে বেটা আষাঢ়ে গপ্পো শোনাতে বসল। আষাঢ়ে বলে আষাঢ়ে? সে গল্পে জুলুরা বাংলায় কথা বলতে শুরু করে আর বুন্যিপ বলে এক অতিকায় অলপ্পেয়ে থাবড়া মেরে টম অলটারের মতো দেখতে এক সাহবের ইহলীলা সাবাড় করে দেয়।
তারপর আর কি শঙ্কর তথা বিভূতিভূষণে ভর করে ক্যামেরা আমাদের সেই স্বর্গ রাজ্যে এমন ঘোরান ঘোরালো যে আমাদের ঘোর লেগে গেল। এ যে ঊর্বশী মেনকার থেকেও সোঁদর গো! আহা গোলাপ গাসে পেরজাপতি!! কি সুনান কি সুনান!

তা সাহেবের নাম জানলাম আলভারেজ! (গল্পের দৌলতে আগেই জানা ছিল! এতক্ষণ ধরে মাজাকি করছিলাম আর কি!) সে তো হেব্বি সমার্ট! এই পাহাড়ে চড়ছে তো এই কফি বানাচ্ছে! এই বুনোফুলের কুফল থেকে শঙ্করকে বাঁচাচ্ছে তো এই বুন্যিপ দেখে শঙ্করের “চলো এটাকেও সাবড়ে আসি” মার্কা আদেখলামোয় জল ঢালছে! এ জায়গাটা যে কি দারুণ লাগছিল কি বলব! গর্ব বোধ হচ্ছিল এই ভেবে যে সুদূর মফস্বলে বসে কেউ এই ভাবে কিছু ভেবেছিল আর সেই ভাবনাটাকে কাজে লাগিয়ে একজন কোলকাত্তাইয়া অর্দ্ধ শতাব্দী পড়েও তাজ্জব উড়ান লাগাচ্ছে! কেয়াবাত আর কেয়াবাত!

কিন্তু সব ভালোরই শেষ হয়! আলভারেজও মরল লোভের হাতে! (সে এক সাহেব তো সকাল বেলাতেই বলে দিয়েছিল যে, মানুষ বুন্যিপের হাতে মরে না মরে লোভের হাতে! অতএব তাইই সই)

কিন্তু দুর্ভাগ্য তার সঙ্গেই যেন সিনেমাটার সাড়ে সতেরোটা বেজে গেল! এর পর শঙ্করকেও পাওয়া গেল না! পর্দা জুড়ে দেবের মেক আপ আর মাতলামোর মনোলগ! বিভূতিবাবু যদিও এরকম লিখেছিলেন যে সে বেচারি না খেতে পেয়ে গুহায় আটকে দুর্বল হয়ে শেষ খড়কুটো (পড়ুন হিরে) সম্বল করে বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল! কিন্তু বিধি বাম! হিরের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে সে এক গুলিতেই শকুন সাবাড় করে তরিবত করে খেতে খেতে গ্রামবাংলার স্বপ্ন দেখতে লাগল! এই জায়গায় কিছু কিছু সিনেমাটোগ্রাফি দেখে মাথা হাতড়াচ্ছিলাম টুপির জন্য! কিন্তু হলের আরামের আর চুলের কেয়ারির জন্য তা আগেই বিসর্জন দেওয়ায় নাৎসি স্যালুট করেই কাজ সারতে হল। লোকে ভাবল কি আজব চীজ রে ব্যাটা এরকম সময়তেও হাই তুলে ঘুম দেবার তাল করছে?

তা যা হোক শেষ মেশ ন্যাশনাল পার্ক সার্ভে পার্টিকে এক গুলিতে ক্যাম্পে বসিয়ে শঙ্কর দৌড়ে এসে স্ট্রেচারে শুয়ে পড়ে অ্যাকাউন্টিং শুরু করে দিল- একখান আমার শ্বশুরের জন্য- একখান আমার বৌয়ের বয়ফ্রেণ্ডের জন্য একখান আমার দেশের জাতীয় পতাকা তৈরীর জন্য (তখনো ঠিক মতো রূপ পায় নি কি না!) আর বাকি কুঁচোকাঁচা যা পড়ে আছে তা দিয়ে একটা স্টিমার কিনে অরেঞ্জ নদীতে করে সম্পত্তি পুনরুদ্ধারে রওনা দেবার জন্য! আমি সত্যিই ভেবে পেলাম না কি করে স্টিমারে করে পাহাড়ে যাওয়া যায়? কে জানে? নদীর সেই হিরের আলোগুলিই দিশা ঠিক করে দেবে কি না!

ও হ্যাঁ, মাঝখানে একখান ভাইটাল পয়েন্ট মিস করে গেছি! দেব এতক্ষণ ধরে কি নাকানি চোবানিটাই না খাচ্ছিল! সিংহ মারাটাও ভাল করে দেখাল না, মামাবাবুকে থাপ্পড় মারতে গিয়ে হাতেও ব্যান্ডেজ জড়াতে হয়েছে! বক্স অফিস তো গডফাদার! তাকে চটালে চলবে কেন! তাই হরলিক্স! মার ব্যাটা যত নষ্টের গোঁড়া ওই বুন্যিপটাকে! যতই বিভূতিবাবু বলুক না কেন বুন্যিপ আসলে সভ্যতার অত্যাচার থেকে প্রকৃতির ঐশ্বর্য বাঁচাবার জন্য প্রাকৃতিক অভিষেক! সে শালা সিনেমার সেরা অভিনেতাকে মেরেছে! তাকে ছাড়া যায়! তাই দেব রূপী শঙ্কর আর বুন্যিপ রূপী খরাজ মুখোমুখি! তবে শঙ্করের একটা বদ রোগ আছে! এ আবার ছুটিয়ে ছুটিয়ে মারে! সেই সেবার সিংহটাকেও ফালতুকে দেড় কিলোমিটার দৌড় করালো এমন যে গুলির আওয়াজেই পটকে গেল! এখানেও এক কেস! জ্যাকি চ্যানের মত ভিলেনের আগে দৌড়তে দৌড়তে হঠাৎ পাসের বাড়ির দরজায় নক করে পালিয়ে গেল! আর খরাজ বাবু যেই সেই অব্ধি এসেছে অমনি ফাঁদরূপি দরজা ফট করে খুলে তেনাকে ক্যালেন্ডার করে টাঙিয়ে দিয়ে বলল, হ্যাপ্পিওয়ালা নিউ ইয়ার ইয়ার!” বুন্যিপটা মুখ দেখাবার লজ্জাতেই মরে গেল!

যাই হোক সব শেষ হতে বসে বসে ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলাম, “হ্যাঁ রে কেমন লাগল?” সে “দারুণ” বলার পরে পরেই ফিরিস্তি দিতে শুরু করল, “ওখানে ওইটা নেই সেখানে সেইটা নেই”! তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, “শোন খোকা, এই দিল্লীর মতো ব্রিটিশ বহির্ভূত দেশেও একটা বাঙলা সিনেমা চতুর্থ সপ্তাহ পার করে হই হই করে চলছে আর আবাল বৃদ্ধ বনিতা ফুল্টুস মস্তিতে হাউসফুলের হাউই জ্বালাচ্ছে! দেখেছিস এমন?” ওর হয়ে আমিই উত্তরটা দিয়ে দিই? না পাঠক পাঠিকা দেখি নি! এটাও আরেকবার দেখা যায় কি না জানি না! তবে এই যে সাহসটি ডাইরেক্টর বাবু দেখালেন না? এতেই বোধহয় সেই রোমাঞ্চের দুর্ভিক্ষে ভোগা বাঙালীর অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়তারই জয়গান হয়ে গেল! গাল (অ্যাজ গালাগাল) দাও বা গালই (অ্যাজ চাকুম চুকুম করার জায়গা) দাও ফেলতে পারবে না বাওয়া! সাধে কি আর অর্ধ্ব কোটি জনতা সোশাল মিডিয়া সমালোচক হয়ে বসে আছে? অ্যাঁ?

Advertisements

3 thoughts on “(৯০)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s