(৯১)


পাঠক পাঠিকারা, দেখুন ছিটিয়াল ভাবতে পারেন! আমার তাতে ঘণ্টা, সেই কোন জমানায় স্কুলে এবং খেলার মাঠে শিক্ষক শিক্ষিকাদের উদ্ভট উদ্ভট প্রশ্ন করতাম বলে সেই শিরোপা কোটের বাম পকেটে নিয়েই ঘোরাঘুরি করছি। তবে এখন কেমন যেন ‘হাল্লার রাজা, হাল্লার রাজা’ মার্কা অনুভূতি হচ্ছে। সেই সবাই যখন মণ্ডা খেতে ব্যস্ত, সন্তোষ দত্ত তাঁর অননুকরণীয় স্টাইলে “ছুটি ছুটি” বলে চেল্লাতে চেল্লাতে আর নাপাতে নাপাতে বুন্দির কেল্লা থেকে বেরিয়ে ক্যামেরার বাইরে চলে গেলেন না? সেই রকম।

কিছু মনে করবেন না, এখন বাজে ঠিক রাত্রি দুটো চৌত্রিশ, এ সময়টাকে সাহেবরা চোখ মুখ পাকিয়ে আধা ঠোঁট চিপে মর্নিং বলতে পারেন বা নিশাচর প্যাঁচাগুলো দেড় ব্যাটারি হরলিক্সের কাঁচ চোখে লাগিয়ে “আভি তো রাত জওয়ান হ্যায় বলে’ আদিখ্যেতা করতে পারেন। কিন্তু ভদ্র সন্তানদের জন্য লিখিত অভিধানে বলা হয় এখন ঘুমের সময়। শীতকালে কম্বল আর গরম কালে ফ্যানের তলায় আরামে ঘুম যাবার সময়।

উপরের দুটো প্যারাগ্রাফের বিন্দু বিসর্গ কিসসু বুঝলেন না না? বলছি বলছি… তবে এবারেরটা বেশী লম্বা করে বলতে পারব না! নেহাত পার্শ্ববর্তিনীটিকে কপাল করে পেয়েছি তাই কুপিয়ে দিল না। কিন্তু কুপির তেল ফুরিয়ে কম্পুর সামনে বসে থাকলে কুপিত হতে পারেন। সেই শাস্ত্রে আছে না “বিধি বাম”? সেটি বামাদের জন্যই লিখিত হয়েছে। তাঁরা একবার তাড়া করলে আত্মারাম বাম ডান না মেনে সোজা হাঁটা লাগাবে।

তাই অল্প কথায় সুখ দুঃখের সাথী আমার পাঠক পাঠিকাদের সঙ্গে একটি জ্বরালো রাত্রির অভিজ্ঞতা শেয়ার করে পালাই।

ক দিন ধরে বেশ অনিয়ম হচ্ছে জানেন? কাস্টমসি আবহাওয়ার মা বাপ নেই (ভিজে ভিজে আবহাওয়া যদি আবগারি হয় তাহলে জবু থবুকে এটা বলা যাবেই না কেন?)।(ভিজে ভিজে আবহাওয়া যদি আবগারি হয় তাহলে জবু থবুকে এটা বলা যাবেই না কেন?)। (ভিজে ভিজে আবহাওয়া যদি আবগারি হয় তাহলে জবু থবুকে এটা বলা যাবেই না কেন?)

হেই রে রে করে ঠাণ্ডায় কাঁপিয়ে টেম্পোরারি মৃগী করিয়ে দিচ্ছে তো দুপুর রোদ্দুরে সাড়ে তিন কিলো দুশো ছত্রিশ গ্রামের তলায় সূর্যের তাপে ঘামিয়ে ঘন্টাকর্ণ বানাচ্ছে। ভারতীয় ক্রিকেট দলের মতই ভারতীয় আবহাওয়ার কন্সিস্টেন্সির বড়ই অভাব।

তা সে রকম অবস্থায় শরীরের আর দোষ কোথায় বলুন? দশ বারো দিন ধরে নন স্টপ দৌড়ো দৌড়ি (না এবার সামনে শঙ্কর নেই যে দৌড় করিয়ে গুলি মেরে দেবে, তাই এটা স্বেচ্ছায় বলেই স্বীকার করে নিচ্ছি) করে দেশ ও পরিবারকে উদ্ধার করার পর কাল সন্ধ্যাটা যেন কেমন অন্যরকম ঠেকল (আজ হবে না কাল? সময় জ্ঞানই গুলিয়ে গুগল হয়ে যাচ্ছে!)।

এমনিতে আমার ঘোরতর শত্তুরও বলতে পারবে নি, যে আমি হুট বলতেই শয্যা নিয়ে ‘আহা, উহু’ সহযোগে পিঁয়াজি মেরে যাই। চিরাচরিত পুরুষ সিংহের মতো হুঙ্কার ছেড়ে দেশোদ্ধারের মাঞ্জায় টান দিয়ে নিজের ছোট খাটো ত্রুটি বিচ্যুতিগুলিকে বুলডোজারে পিসে ফেলার মধ্যে কেমন যেন একটা আত্মশ্লাঘা (আহ! আমার ফেএএএভারিট শব্দ! কতদিন পর ব্যবহার করলাম!) অনুভব করি!

তা সেই আমিটাই কাল দিল্লীর আইটিও-র বিখ্যাত ট্রাফিক ডিঙিয়ে বাড়ি ফিরলামস সাড়ে সাতটায়। মাথাটায় একটা ক্রনিক ঝিঁঝিঁ বসন্ত আগমনের ডাক যে দিয়ে যাচ্ছে না তা নয়! কিন্তু সেটি কম্পু বাবার জয় বলে নির্বিকল্প সমাধি নেবার মতলবটাই ছিল।

এমনিতে আমার যেখানে সেখানে শাটার ডাউন করার বদনাম আছে। ভয়ঙ্কর ঘটনা নিয়ে বোধহয় এক দফা ফিসফাস লিখেও ছিলাম। সেই যে রাস্তায় গাড়ি চালাবার সময় ঘুম পেলে গান করি বেসুরো মার্কা। তা বাইক চালাবার সময় হলে যা তা হয়ে যেত। ভয়ে আমি রেড লাইটে বা রাস্তার ধারে সুযোগ বুঝে মিনিট দুয়েকের একটা ঝাপকি মেরে নি। কালকেও উদারচেতা আইটিও-র লালবাতির দৌলতে করে নিতে পেরেছিলাম। যখন ইহজগতে ফিরলাম তখন পিছনের গাড়িগুলো উতচকিত হয়ে হর্ণাচ্ছে আর সামনের গুল বাঁধা গরু ছাড়া পাবার মতো করে দৌড়চ্ছে।

তা উঠে ধাতস্থ হতে সেকেন্ড আড়াই সময় নিয়ে আমিও দৌড় লাগালাম। একটু ভালই লাগছিল। কপালে আর কুহু ডাকটা নেই, ভর সন্ধ্যাতেও কেমন যেন অন্ধকার লাগছে না। সামনে পিছনের আলো রাজপথ আলো করে পথ দেখাচ্ছে। পথের সাথীরা অনবরত প্যাঁ পোঁ সহকারে অভিবাদন জানাচ্ছে। আহা চোখ যেন ধাঁধিয়ে গেল। মনে হয় যেন স্বর্গে আছি।

তা মালুম পেলাম বাড়ি এসে, মাথা বেশ ধরেছে। কিন্তু মাশরুম কিনে এনেছি সখ করে রান্না করব বলে। আগেই বলেছি শরীরের সামান্য ওঠাপড়া হরলিক্সের মতো গায়ে না মেখে আমি দূরদার দৌড়ই জীবনের পথ দিয়ে। তাই ও সামান্য মাথা ধরাকে বিশেষ পাত্তা দেবার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু রান্না বাটি খেলে যেই স্বাদ আহরণের অপেক্ষায় হাত টাত ধুয়ে আসতে গেছি, তখনই রাজ্যের বমনেচ্ছা নাভির তলা দিয়ে বেরিয়ে, বুক ছুঁয়ে, গলা চুঁইয়ে মুখে উঠে এল! দয়ার সাগর, সবার ইচ্ছাকেই সমানভাবে প্রাধান্য দিই, এখানেও বাদ গেল না- বেসিনই ভরসা! কিন্তু বমনেচ্ছা হল ‘অতিথি তুম কব যাওগে’র পরেশ রাওয়াল! এলে গেঁড়ে বসে যাবার নামই নেয় না। তাই জলেরই বোতল হাতে তুলে নিতে বাধ্য হলাম।

এমনিতে ব্যাপারটা চুপিসারেই সেরে ফেলার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু আমার পার্শ্ববর্তিনীর এসব ক্ষেত্রে শ্যেন কর্ণ। পিছনে ঘুরেই দেখি, দুয়ে দুয়ে চারজোড়া চোখ নজর রাখছে, হাতে তার সুইমিং পুলের মত কফি কাপ! তাতে ওআরএস জীবনরক্ষক ঘোল! সেটি পেটে যেতেই, ইচ্ছারাম যে দড়ি ছেঁড়া বাছুর হয়ে গেল! কোন দিক দিয়ে সে যে ছুটে বেরোবে তাই বুঝতে পেল না! ইতিমধ্যে মধ্যপ্রদেশ বেশ সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে। তাই বাধ্য হলাম বাথরুমের দরজাটি বন্ধ করতে! অতঃপর সেন্সরের আওতায় এসে যুগপৎ ক্ল্যারিওনেট, ফুলুট, ড্রাম করতাল সহযোগে তার উর্ধ্ব ও নিম্নমুখে নিষ্ক্রমণ শুরু হল।

বেশী না, মিনিট পাঁচেক! তারপরের অবস্থা হল হিচককের সিনেমার মত। চারিদিক দিয়ে কেমন যেন একটা গা ছমছমে ঠাণ্ডা জাঁকিয়ে বসল। কথা বেঁকে বেঁকে যেতে লাগল, পার্শ্ববর্তিনী মোজা পড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ছেলে এসে মাথায় হাত বোলাতে লেগে গেল। আমি যত বলি, ‘না না, এখুনি ঠিক হয়ে যাবে’, তারা কেউই বিশ্বাস করল না। তারা কেন, আমারও যেন কেমন কেমন ধরা লাগতে আরম্ভ করল। তাই কাল বিলম্ব না করে পাঁচমণি কম্বল চাপিয়ে দিলাম শরীর ছেড়ে। তারপর সে কোথায় কোথায় যে পাড়ি দিলাম তার নেই ঠিক! অদ্ভুত অভিনব সব ব্যাপার। এই পিকনিক যাচ্ছি তো এই মানুষজনের বাড়ি টাড়ি দিকশূন্যপুরে পাড়ি দেওয়াচ্ছি, অভুতপূর্ব জায়গায় অভিনব ব্যক্তিত্বদের এনে হাজির করছি। বর্ণে গন্ধে সুরে ছন্দে একদম ক্যাটাভরাস ব্যাপার।

হঠাৎ ঘুম ভাঙল পায়ের কুটকুটানিতে। পাঠক পাঠিকারা, এমনিতে অত্যাধিক শীত বা গরমে আমি কেমন দার্শনিক টাইপের ফিলোজফিকাল হয়ে যাই। ভগবানের মারে ট্যাঁফুঁ করে বিশেষ লাভ হয় না বলে চতুর্দশী কিশোরের মত ‘আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে’ গাইতে গাইতে ড্যাবড্যাবিয়ে বেঁচে থাকার আনন্দই উপভোগ করি। কভু কাবু নই মার্কা নওজোয়ানের গাহিয়া গীত শীত ভাগাই। তাই বাড়িতে মোজা টোজা পড়ে শীত বাবাজিকে জিত অনুভব করতে দেবার কোন ইচ্ছাই থাকে না। মুখে বলি, আমার পা বেশী ঘামে বা পা শুকিয়ে যায়। আসলে, আধিভৌতিক আপাত পৌরুষটাই ব্যাপার। (ভাগ্যিস জ্বর ছিল, তাই যা নয় তাই বলে যাচ্ছি আর আপনারা সহ্য করে যাচ্ছেন!!)

তা যা হোক, পা কুট কুট করতেই বুঝতে পারলাম, জ্বরবাবাজী বুঝে গেছেন যে এর পিছনে বিশেষ সময় নষ্ট করে লাভ নেই। প্রাপ্য সম্মানটুকুও দেবে না। তাই শরীর ছেড়ে বাড়ি ছাড়া হয়েছেন। আর বলব কি মশাই হেঁইসান আনন্দ হল যে কি যে করলাম সে সব আর নাই বা বললাম!

তা যাই হোক, পার্শ্ববর্তিনীর অনুমতি নিয়েই ল্যাপটপ নিয়ে চুপিসারে বসেছি আপনাদের সঙ্গে এই জ্যাবারাং ভাগ করে নেবার জন্য! আফটার অল, ফিস ফাস তো মনের খুশীতে লিখে চলা। তা পুলুশ মামার গল্পই হোক, এরোপ্লেনে মিশির আলিই হোক, বা একটি জ্বরালো রাত্রির অভিজ্ঞতাই হোক। ভালো মন্দ নিয়েই তো ইনিংস- একটা কি জিরো রান করে আউট হয়ে আত্মশ্লাঘা (ওহ পারি না! আবার! ইয়াহু!!) অনুভব করতেও দেবেন না?
গালাগালি দিতে হলে নীচের ঠিকানায় পাঠিয়ে দেবেনঃ

ফিসফাস-১, কেয়ার অফ সৃষ্টিসুখ, স্টল নং- ৪৬৫, কলকাতা বই মেলা প্রাঙ্গণ (লিটল ম্যাগাজিনের টেবিলগুলির পাশেই), ২৯শে জানুয়ারি থেকে ৯ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৪।

ও হ্যাঁ, দক্ষিণাটিও দিতে ভুলবেন না। আরটিআই-এর জন্য দশ টাকা লাগে, এক্ষেত্রে আরেকটি শূন্য লাগিয়ে নেবেন। যাই হোক না কেন আপনাদের গালাগালিই তো জীবনের পাথেয়। দাড়ি টাড়ি কামিয়ে গাল মসৃণ করতে তো একটু খরচ লাগে না কি? চন্নু! এখন এট্টু আধটু হোঁশ ফিরছে, এখনো যদি ঘুম না লাগাই, তাহলে আমার আপাত শান্ত, আপাত জাঁদরেল পার্শ্ববর্তিনীটি দুম দাম লাগাবেন বলেই আমার স্থির বিশ্বাস! কে না জানে বিশ্বাসে মিলায় বস্তু!

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s