(৯২)

দিল্লীতে গত শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসেই মাস তিনেক ছিলাম ব্যানার্জী লজের মেসে। এই মেসটা সত্যিই mess ছিল এতে কোন সন্দেহ নেই। পৌনে দুই খানি খুপরি, একখান জানালা এক খান কাঠের সিঁড়ি এবং ছাদের উপর স্নানাগার নিয়ে আজব অজায়বঘর। সকালে এক কাপ চা অফিসের আগে ভাতরাশ বা rush এবং রাত্রের ভোজন দিয়েই উদ্ধার করে দিত মালিক পক্ষ। (এই মালিক পক্ষ জিনিসটাই এরকম হয়! আচ্ছা শুরুতে তো তারা বলেন নি যে আমাদের রোজ কুক্কুট মাংস ভক্ষণ করাবেন বা রাজসিংহাসনে বাতানুকূল যন্ত্র সহযোগে আরাম ফরমায়েশ করাবেন। সম্পূর্ণ সজ্ঞানে আমি ওই কুটুরীতে ঢুকেছিলাম আর এখন গাল পাড়ছি!)
বিশেষতঃ সকালের খাবারটায় রাশ থাকত না কিন্তু rush থাকত বলে শাক সব্জি বা মাছের উপর জল ঢেলে তেলের আস্তরণ দিয়ে সাজিয়ে থালায় দিয়ে দিত।

ছোটবেলায় সুনাম বা দুর্নাম ছিল যে জল চিবিয়ে লোহা গিলে হজম করে ফেলতাম। একশো বছর আগে জন্মালে বোধহয় বায়না করে বরযাত্রী নিয়ে যেত। কিন্তু এই মেসের মেস্মেরাইজিং খাবার তিনমাস খাবার পর এমন অবস্থা হল, যে বেশীক্ষণ খালিপেটে থাকলেই চোঁয়া ভাঙে। তাই এ জন্মে আর ধম্ম কম্ম করা হল না- কি করে করব? উপোষ রাখতে পারি না যে।

যাই হোক মোদ্দ্দা কথা হল, বেশীক্ষণ না খেলে যেমন অ্যাসিড হয়ে যায়, তেমনই বেশীদিন ফিসফাস না লিখলেও নিজেকে মঙ্গল গ্রহের জীব বলে মনে হয়, তিনটে সিং গজায় যার দুটো মাথায় চোখ দুটো এক হয়ে যায় এবং ইত্যাদি ও প্রভৃতি।

তাই ফিসফাস। একটা বেশ পুরনো জিয়া নস্টালি গল্প দিয়ে শুরু করি, ক্লাস সিক্স থেকে আমার এক প্রাণের বন্ধু ছিল, যে এখনো আছে বলেই আমার এবং তারও বিশ্বাস! যদিও আমাদের প্রায় আড়াই বছর দেখা হয় নি। তবুও প্রাণের তার তো ইথারেই বাঁধা। যাই হোক, সে তখন বেলুড় বিদ্যামন্দিরে পড়ে ইকো জিও ম্যাথ নিয়ে। আমি তখন মৌলানায় নাকাল হচ্ছি। বললে হয়তো সে একটু বাড় খেয়ে যাবে (প্রস্থে হলে বোধহয় কোন একটা সময় ফেটেই যাবে, তাই দৈর্ঘ্যই সই) কিন্তু দর্শনে সুদর্শনই ছিল বটে আর আমি তো তখন রাজহাঁসের বাচ্চা! গ্ল্যামার তখনো নাকের ডগায় পৌঁছয় নি!

তা যাই হোক, হোস্টেলে ফিরে যাবার এক দিন আগে হঠাৎ এসে হাজির- তার বান্ধবীটি নাকি তার সঙ্গে কথা বার্তা বন্ধ করে দিয়েছে, এবং তার বাড়ি থেকেও হুকুম হয়েছে যে বেশী মাখন লাগাতে হবে না। ঘোরতর সমস্যা, এখন ভাবলে হয়ত কিছুই না কিন্তু তখন সেই উদ্ভিন্নযৌবনে এগুলিই ছিল জীবন মরণ সমস্যা।
তা সে বলে দেখা করতেই হবে যে করেই হোক, আমি বলি ফোন? সে বলে মাসি তোলে! গরমের ছুটি বলে এয়েচেন! (কি আপদ)

মিনিট পাঁচেক বুইলেন! তাপ্পর তড়াক করে উঠে জালনার আলনা থেকে শান্তিনিকেতনী ঝোলাটি তুলে তাতে আমাদের প্রাক্তন স্কুলের ম্যাগাজিন “বালুচর” খান তিনেক এদিক সেদিক থেকে ঢুকিয়ে একটা নোট বুক হাতে নিয়ে বললাম চল! সে বলে কোথায়? বললাম চল বৈশালী! (কি আপদ! এ বৈশাখী কাকা! কোলকাতায় সল্টলেকের পাড়ে) তা তার বান্ধবী (যার নাম বৈশাখী কোনমতেই নয়) থাকেন সেখানে! সে আন্দাজ করেই বলল কি করবি সেটা বলবি কি? আমি বললাম এখনও জানি না! কিন্তু বেশী বকিস না! এটাই তোর একমাত্র আশা! এটা না নিলে আশা ভাসা ভাসা হয়ে আবছা হয়ে যেতে সময় লাগবে না।
সে নিমরাজি হয়ে আমার সঙ্গে চলল! কুড়ি বছর পরেও বাসটা মনে আছে… সেই মুর্শিদকুলি খাঁর আমলের লজঝরে ৪৬এ! সেও ঢিকির ঢিকির করে চলে আর আমিও মনের জিলিপিকে নেড়ির ল্যাজের মতো সোজা করতে থাকি! মিনিট তিরিশেক পর বাস গন্তব্যে থামল যখন আমার কাঠিলজেন্স তৈরী হয়ে গেছে।

নেমেই বন্ধুকে বললাম, আমরা বালুচর পত্রিকা থেকে এসেছি। মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের পরবর্তী পদক্ষেপের উপর আলোক ক্ষেপণ করার সমীক্ষা করতে। বেশ খটমট ছিল বলে বিশ্বাস লোক চট পট বেশী প্রশ্ন না করে উত্তর দেবার জন্য রেডি হয়ে যাবে। সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় বন্ধুকে বলে দিলাম যে একদম ট্যাঁ ফোঁ করবি না! পারিস তো বোবা সেজে থাক! না হলে ভুলে যাও প্রেমে পড়েছিলে, খেলাঘর তুমি গড়ে ছিলে, কারও দুই চোখে মরেছিলে, কারও দুই হাত ধরেছিলে ইত্যাদি!
দরজায় কলিং বেল! বার দুই! টিং টং! এক মহিলা দরজা খুলতেই তাঁকে দম ফেলার সময় না দিয়ে গত পনেরো মিনিট ধরে মুখস্থ করা ডায়লগ দিলাম ঝেড়ে! ফল হল সেই উত্তর আধুনিক কবিতার মতই (এটার কপিরাইট নেওয়া আছে! ফিসফাস-১ পড়েছেন তো?)! ও আচ্ছা তাই এই বাবুন এদিকে আয় কি বলছে দেখ তো, তোর ইন্টারভিউ নেবে বোধহয়! দুজন রিপোর্টার এসেছে! আমি আবার কারেক্ট করিয়ে দিলাম, ইন্টারভিউ নয় সমীক্ষা! আহো!

বাবুন তো এসেই যুগপৎ বিস্মিত আনন্দিত প্রসেনজিত বিশ্বজিত হয়ে মুখে মাছি ধোঁকার ব্যবস্থা করে আছে। ‘তুমি’ ‘তোমরা’ এই দুটি কথা বলতে রাখী গুলজার আর অটলবিহারী বাজপেয়ীর সমান সময় নিয়ে নিশ্বাসের ফাঁক দিয়ে কুঁ করে বলল! ৩২ অলআউট! বন্ধুটি এমনিতেই আমার দাবড়ানিতে কাঁচুমাচু! তারপর আবার দুর্ঘটনার সম্ভাবনায় বিব্রত হয়ে চোখ দিয়ে হেসে মুখ দিয়ে কেশে একসা! আমি অবশ্যই তার হাত দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছি “সন্ধ্যা সাতটায় কোয়ালিটিতে” সেটা মুঠোর রুমাল করে প্রশ্ন করা শুরু করলাম! সে কি প্রশ্ন বুঝলেন? বাবুন উত্তর দেবে কি মুখ খুল্লেই খালি ভকভকিয়ে হাসি বেরোচ্ছে! আমি তাকে একবার বকেও দিলাম, মনে হচ্ছে আপনি আপনার ভবিষ্যৎ নিয়ে সিরিয়াস নন! ধুর তার ভবিষ্যতের নিকুচি করেছে, চোয়ালে ব্যথা হয়ে যাচ্ছে এখন হাসতে হাসতে আর তুমি ব্যাটা সিরিয়াসের খেপ খাওয়াচ্ছ।

প্রশ্নোত্তর পর্ব্ব বেশ কিছুক্ষণ চলল মাসিমার নজরের সামনে! তিনিও বেবাক আলোচনায় সামিল হলেন! কিন্তু এবার তো চিরকুট হাতবদল করতেই হয়! অগত্যা মাসিমা মালপো খামু! অবশ্য মালপো অবধি পৌঁছতেই হল না! তিনি নিজেই উঠে গেলেন জল, কাঠগজা আর নিমকি নিয়ে আসার জন্য! এই সুযোগে আমি বাবুনের হাতে তার প্রেমিকের চিরকুট গুঁজে দিলাম “কবুতর জা জা জা” বাবুন তখন হেঁসোরাম হুঁশিয়ারের ডাইরি থেকে উঠে এসেছে! সে হাসতে হাসতেই চিরকুটটা হাতে নিয়েই কলকলিয়ে উঠল, “এটা কি?” মোলো যাঃ! এখুনি মাসিমা এসে পড়বে আর এ মেয়ে দেয়ালা করছে! হাড় হিম করা গলায় বললাম, “মাস্টারমশাই আপনি কিন্তু কিছু দেখেন নি!” মানে “চুপচাপ মাল্টা পকেটস্থ কর এবং পরে দেখে নিও!”

তারপর আর কি? কাজের বেলায় কাজী আর কাজ ফুরলেই রাজী! তেল চুকচুকে মুখ নিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরল আর রাত্রি নটায় বন্ধু এসে হাজির! মজুরী হিসাবে কাঁকুড়গাছির সামান্য এগ মাটন রোলই সই কিন্তু বন্ধুর আনন্দ বোধহয় লাখ টাকার সমান। প্রার্থনা করি সেই আনন্দ যেন বর্তমান থাকে চিরকাল।
আজ তারা ব্যাঙ্গালোরে তাদের ছোট্ট মিষ্টি একটা ফুটফুটে মেয়েকে নিয়ে সুখে শান্তিতে ঘরকন্যা করছে।

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ- ঘর কন্যা বলতে গেলে আমার ঘরের কন্যাটির কথা মনে পড়ে গেল! সে প্রথমবারের জন্য ফিসফাসে পা রাখছে! আপনাদের আশীর্বাদ কাম্য পাঠকপাঠিকারা! আশীর্বাদ করুন সে যেন যোগ্য ফিসফাসের যোগানকারিণী হয়ে উঠতে পারে!
তবে কিনা পা রাখবে আর গল্প করবে না তা কি হয়? তার কারণে আজকাল রাত দিন এক হয়ে যাচ্ছে, ঘুম হয় না- তাই রেড লাইটে হ্যান্ডব্রেক মেরে ঘুমিয়ে নিই সেকেন্ড তিরিশ! যতটা মেকআপ হয় আর কি! আজও ঘুমোচ্ছিলাম কিন্তু পাশের হণ্ডা সিটির চালিকা সাবানা আজমির কি খেয়াল হল কে জানে! নিজের জানলার কাঁচ নামিয়ে আমার জানলায় দুম দুম করে মেরে আমায় জানান দিল, “আপ সো রহে হো!” তিনি বোধহয় বর্ণ পরিচয় পড়েন নি! কানাকে কানা খোঁড়াকে খোঁড়া ঘুমন্ত কে ঘুমন্ত বলে না সেটা তাঁর জানা ছিল না!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ২- ব্যানার্জী লজের অন্ধকূপে খুব যে খারাপ ছিলাম তা কিন্তু নয়! যে সঙ্গটা পেতাম সেটা অমৃতযোগ ছিল! আমার কোয়ার্টার রুমমেট ছিলেন অরবিন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় বেঙ্গল কেমিক্যালের! দাদা যদি ভুল করেও ফিসফাস পড়ে থাকেন তাহলে যোগাযোগ করবেন-আমি এখনো সেই তিমিরেই পড়ে আছি।

One thought on “(৯২)

  1. দাদা আমার অবস্থাও তোমার মতোই, কন্যাশ্রীর ঠেলায় জানে কাঁহা গয়ে দিন.. সায়াহি আপনি সাথ হ্যায়। সকাল ছটা থেকে ছটা পনেরো অবধি বাথরুমে ব্রাস করতে করতে দেওয়ালে মাথাটা ঠেসিয়ে একটু মার্জারনিদ্রা দিয়ে নিই। কে বলে ঘোড়াতেই শুধু দাঁড়িয়ে ঘুমোয়?

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s