(৯৩)


পাঠক পাঠিকারা, জানেন তো আমরা তথাকথিত ভদ্রলোকরা আপাত ভদ্রতাবোধের আড়ালে অনেক অপ্রিয় কথা চেপে গিয়ে জগৎ সংসারের বেশ অপকারই করে থাকি। দিনের পর দিন ধরে সহধর্মিনীর আনোনা রান্না মিষ্টি হাসি সহযোগে গলাধঃকরণই হোক বা সশ্রুমাতার নিজ পুত্র সম্পর্কে হ্যালোজেন চোঁয়ানো ধারণাই হোক বা বসের বুকনিই হোক আর রাষ্ট্রনেতা বা নেত্রীদের “ছাতের ওপর কাক- আমি দেখে পুঁইশাক” টাইপের সৃষ্টিই হোক। অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে ছেঁদো হেসে পেট ফুলিয়ে যাই আর ক্রমিক অন্তরালে জেলুসিল সহযোগে পরবর্তী বোমাটির জন্য প্রস্তুত হই।

মধ্যবিত্ত জীবনের ট্র্যাজেডি হল বুকের ভিতরে প্রতিবাদ আর ইমান ধরম গজগজ করতে থাকে কিন্তু বাইরের ফুলকাটা পাঞ্জাবীটার মোহও ত্যাগ করতে পারি না। চোখের সামনে ছুরি নাচালেই চুক চুক করে ন্যাজ নেড়ে ছুঁড়ে দেওয়া রুটি চেটে বাহুমূলকেত্তন সহযোগে দিনগুজরান বোধহয় আমরা জন্মের সময়ের মুখের চামচে নিয়েই সারা জীবন কাটিয়ে দিই।

সেই যে বিদ্যাসাগর বলে গেছেন না? কানাকে কানা খোঁড়াকে খোঁড়া এবং অশ্রাব্যকে অশ্রাব্য বলিও না? সেটিই আমাদের জীবনের পরম পাথেয়, বেদবাক্য, আল কুরাণ, গীতা, বাইবেল আর সিথির সিঁদুর।

আমি যদিও মনে করে সাহিত্য সংস্কৃতির সার্বিকভাবে সকলের পছন্দ হবে এমন কোন কথা নেই! এদের ঠিক ভাল বা খারাপের মানদণ্ড হয় না! আপনার শাহরুখ খানকে পছন্দ হতেই পারে কিন্তু আমার জনি ডেপের প্রেমে অন্ধ হয়ে থাকা থেকে আপনি আমাকে আটকাতে পারবেন না! পারা উচিতও নয়, স্বাধীন দেশের স্বাধীন বাসিন্দাকে স্বাধীনভাবে শাহরুখ খানকে ভালবাসা থেকে আপনি কেন আমিও আটকাতে পারি না। কিন্তু তা বলে পচা গলা মাংসপিণ্ডটিকে শুধুমাত্র বিনি পয়সায় খাচ্ছি বলে “ইদম অমৃতম” সহযোগে উদ্বাহু হয়ে নেত্য করাটাও বোধহয় সমীচীন নয়। সাত হাজার লোক কালোকে সাদা, ঘোড়াকে গাধা, খোলাকে বাঁধা আর আশারাম বাপুকে রাধা বলে চিৎকার করলেই তো আর তা হয়ে যাবে না। তা হলে তো প্লেবিসাইট করিয়ে কাশ্মীর কবেই কন্যাকুমারীর থেকে আরও দূরে দূর দেশে চলে যেত আর তার সঙ্গে হায়দ্রাবাদও বিচ্ছিন্ন বদ্বীপের মতো ভিন দেশের বাসিন্দা হত আর আপনিও হায়দ্রাবাদি পরমান্ন খাবার স্বর্গীয় সুখ থেকে বঞ্চিত হতেন।

তাই বলি কি রাখ ঢাক ভালো ঢাক পেটানোও ভালো! কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে নিজের মন, মত এবং অমতকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত! যা ভাল নয় তা সত্যিই ভাল নয়- অন্তত আপনার জন্য! এটা ভাবা বেশ জরুরী!

কালকের ঘটনাটাই বলি। দিল্লীর বুকে বঙ্গ সংস্কৃতি উৎসব মরুভূমিতে গোলাপের সমান না হলেও বেসময়ের বাদলে বর্ষার মতই ঘটনা। তাই আমরা আয়োজকরা ঝাঁপিয়ে পড়ে হাত পেতে আঁকচিয়ে পেটে বন্দুক ঠেকিয়ে টাকা পয়সা জোগাড় করে শিবরাত্তিরের সলতের মতো গঙ্গাপাড়ে ফেলে আসা সংস্কৃতির ঢাক যমুনার ধারে তেরে কেটে তাক তাক বাজাতে শুরু করে দিই। দুটো ভাল গান দুটো ভাল উচ্চারণ শোনার জন্য বিদ্যাসাগরের মতো উত্তাল দামোদরের বুকে ঝাঁপ দিয়ে ঝড় জল উপেক্ষা করে ছুটে চলি উৎসব মণ্ডপের দিকে!

বাংলার সোঁদা গন্ধ পাবার তাগিদে, ইলিশের বিরিয়ানী ফিস চপ ও ঘুগনি সহযোগে শনিবারের সন্ধ্যায় অবগাহন করি লোকসংস্কৃতির স্রোতে।

হরপার্বতীর বিবাহের সময় বাদ্য ছিল না বলে জয়ঢাকের আমদানী হয় আর সানাইয়ের সহযোগে উল্লাস নৃত্যের মাধ্যমে নববধূর আনয়ন করেন মহাদেব, নটরাজ বেশে। সেই নাচই রাম সীতার বিবাহে চন্দ্রদেবের অঙ্গ বেয়ে আধুনিক ভারতের বিস্মৃত এক নাচের আঙ্গিক রূপে আমাদের সামনে এসে হাজির হয়- নাটুয়া। পুরুলিয়াতেই এর বসবাস বলে ছৌ নাচের সঙ্গে বেশ মিল, সেই যে চন্দন গাছের পাশে থাকা গাছেও সুগন্ধ ম ম করে না?
তা নাটুয়ার আন্তরিকতায় মজে থাকতে থাকতেই দেখবেন যে দিল্লীর বঙ্গ সংস্কৃতি সাম্রাজ্যের আব্বল নম্বরের সঙ্গীত সহযোগীরা তবলায় ঠুকঠাক আর সিন্থেসাইজারের টাপুর টুপুর নিয়ে হাজির স্টেজে। অষ্টমীর সন্ধ্যা সাড়ে সাতশো লোক আর স্টেজ আলো করে আছেন মিউজিশিয়ানরা তার মধ্যেই আবির্ভাব হয় বঙ্গবাসী আবৃত্তি নক্ষত্র এবং ক্ষীনদেহী তিনি-র।

অবশ্য তার আগেই নাটুয়ার নৃত্যে ‘ইন্সপায়ার্ড’ হওয়া তিনির উনি ইঁট রঙের শেরওয়ানী আর সাদা রঙের নাগরাই পরে স্টেজের উপর ইতিউতি নেচে নিলেন। এক বন্ধুর মন্তব্য, “কিনে ফেলেছিল কোথাও কিন্তু পরার সুযোগ হয় নি! অকেশন দেখে মাঞ্জা দিয়ে নিয়েছে!”

আবৃত্তি নক্ষত্র শুরু করলেন আমাদের রবীন্দ্রনাথ দিয়ে। আর তারপরেই তিনি আড়মোড়া ভাঙলেন আপাত নজরুলগীতি দিয়ে! আরে মাইরি, সে যেন কুম্ভকর্ণের ঘুমভাঙা- যুগপৎ আটাশিটা ঘোড়া এবং বত্রিশটি গাধা দিগ্বিদিক থেকে ত্রাহি ত্রাহি রবে হুলা হুলা গান আর ট্যাঙো ট্যাঙো নাচ জুড়ে দিয়েছে। আমি পিছনে বসে ভাল মানুষের মত মুখ করে সত্তর টাকার রাধাবল্লভী দিয়ে বিনিপয়সার আলুদ্দম চিবুচ্ছিলাম! এক পরিচিত মহিলা আমার দিকে সবেগে ধাবমান হলেন! আমি যেই ভেবেছি মারবে নাকি আমায়? আয়োজকদের একজন চুনোপুঁটি বলে কথা। তা তিনি এসেই জিজ্ঞাসা করলেন এর মানে কি? তা আমি কি আর তোতাপাখি নিয়ে বসেছি! আশঙ্কা যে ছিল না তা নয়! তবে সেটা যে এত বড় ডঙ্কা হয়ে বাজিবে বুকে কে জানিত!

এক ভদ্রলোক এসে তো রীতিমতো শাসিয়ে গেলেন যে সাউণ্ড কে এনেছে এরকম বাজে সাউণ্ড যেন কখনই আর নেওয়া না হয়! তাঁকে বোঝাতে গেলাম যে আরে আবৃত্তিটা খারাপ হচ্ছে নাকি কিন্তু পাগলা ষাঁড়ের মুখে সিন্নি তুলে দিয়ে বাটি কাঁচিয়ে দেওয়াটা একেবারেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আমি বাধ্য হয়েই মোবাইল খুলে গেম খেলতে শুরু করলাম। আর তিনি ধরলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত! পুপুল বিশ্বাস কর, হাবুল দুপ্রি-ও এর থেকে বেটার গান! রবীন্দ্রসঙ্গীত! এ তো গান নয় কামান! দুম দাম গোলা ছুটছে আত্মসমর্পণ করে যে জান বাঁচাব তারও উপায় নেই!

এক বন্ধুকে ডেকে বললাম, “আয় আমরা নেত্য করি! সেই যে সেই শাহরুখ আর কাজল বৃষ্টিতে ভিজে আঙুল নাড়িয়ে মিউজিক ধরিয়ে নাচতে শুরু করে, “তুম নেহি সমঝোগে অঞ্জলি কুছ কুছ হোতা হ্যায়” সেই রকম! পাগলা ক্ষেপা সকল ভুলে যে রকম নাচে সেই রকম! তা সে খালি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল!

আমি দেখলাম লোকে ঘামছে, মাথা চুলকোচ্চে আরও কত কি! গান শেষ হতেই “তিনি” ছুটে গেলেন সাউণ্ডের কারিগরকে বকে দিতে! আমরাও আশ্বস্ত হলাম এর পর নিশ্চয় ভালো কিছু হবে! তা সে হল, আবৃত্তি নক্ষত্র তাঁর সমগ্র অনুভব এবং হৃদয় দিয়ে উচ্চারণ করলেন বাংলা মায়ের কথা! আর “তিনি” আবার ঘাড় নেড়ে উঠলেন, “কে যেন গো ডেকেছে আমায়”! কেউ ডাকেনি মামণি! শের শাহ ঘোড়ার ডাকের প্রচলন করেন এবং তার আগে ঘোড়া ডাকত না!

মধ্যযুগের ইউরোপে যখন প্লেগ হয়েছিল তখন তার চিকিৎসা কিছুই ছিল না। বাধ্য হয়ে গদি বাঁচানোর রাজনীতি ডাইনির প্রকোপ বলে কেজি কেজি নারীমুণ্ড ঘচাং ফু করত।

আর সাধারণ মানুষ? তারা তখনও প্রার্থনা করত, এখনও করে, “ও সুবহা কভি তো আয়েগি!!” আবৃত্তিকার বললেন যে সময় বিশেষ নেই, তাই শেষ হবে “তিনি”র গান দিয়ে! এবার আর দর্শক চুপ করে থাকল না! আম আদমি গর্জে উঠল, “না না আপনি বলুন! আমরা আর নরক যন্ত্রণা নিতে পারছি না!” উনি বললেন, কিন্তু তিনিকে বেশীক্ষণ আটকে রাখা যায় না তাই তিনিই শেষ করবেন বলে শুরু করলেন “ইস্টিশানের রেলগাড়িটা”।
এতক্ষণ পর্যন্ত তাও তালে তালে রযািশপাচ্ছিলেন কিন্তু এবার আর কিছুই রাখা সম্ভব হল না! তাল টোকিওয় সুর সান ফ্রান্সিস্কোয় আর দর্শকের কান পামীর মালভূমিতে বালির মধ্যে গড়াগড়ি খেতে লাগল! তিনি এক কান চেপে গাইতে লাগলেন! যেন আরেক হাতে মাইক না থাকলে তিনি সেই কানও চাপতেন! কাঁহাতক আর ক্যাকোফোনি সহ্য করা যায়! সৃষ্টিকত্রীরও বিবমিষা হতে পারে।

তারপর কেউ হয়তো চেন টেনেই রেলগাড়িটা থামিয়ে দিয়ে থাকবে! আমি শোনা বা জানার মতো অবস্থায় ছিলাম না! উদ্যোক্তাদের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না! তাদের দেখেই যেন ১৮৯৪তে স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর জলদমন্দ্র স্বরে বলে উঠেছিলেন, “বল, বল, সমগ্র বিশ্ববাসী আমার ভাই!” হ্যাঁ ভাই পাঠক পাঠিকারা, টাকা তো আর গাছে ফলে না! এক এক পাই পয়সার হিসাব করেও যারা আমরা বিভূঁইতে বসে বাংলা পান করতে চাই! তাদের কাছে বিখ্যাত কণ্ঠগুলিকে শুনতে গেলে যে মাশুলটা দিতে হয় সেটা মাঝে মাঝে বিষপানের সমান হয়ে দাঁড়ায়! তখন তাদের সত্যিই কেউ দেখার থাকে না!

আমিও সংগঠকদের একজন বলেই বলছি না, তবুও নক্ষত্রদের তাঁদের কথাও একবার ভাবা উচিত! শুধুমাত্র পারফর্ম করতে পারব বলেই হ্যাঁচকা চেন টেনে বিপথগামী ট্রেনে না উঠলেও চলে। আর তিনির উনি? দাদা আপনার প্রচুর টাকা- দান খয়রাত না করতেই পারেন, আপনার ইচ্ছে- তার থেকে বাড়ির ছাদে উঠে সব টাকা পুড়িয়ে দিন! পরিবেশ দূষণ হবে, কিন্তু তার প্রভাব এসব জীব জন্তুর ডাকের হিম ধরানোর ভয়ের প্রভাবের থেকে ক্ষণস্থায়ী।

Advertisements

2 thoughts on “(৯৩)

  1. সত্যি আমার অত্যন্ত প্রিয় শিল্পীর আবৃত্তি শুনতে গিয়ে এমন ঘেঁটে ঘ হয়ে যাব বুঝতে পারিনি। আর ওটা আপনি ভুল লিখলেন, তিনি “ইস্টিশানের রেলগাড়িটা” গান নি, 🙂 উনি গেয়েছিলেন “ইষ্টিশানেড় ড়েলগাড়ীটা ” 😛

    Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s