(৯৪)

“আমার প্রতিবাদের ভাষা আমার প্রতিরোধের আগুন…”
গানটা সেই বাচ্চা বয়েস থেকে গেয়ে এসেছি তুমুল বিক্রমে। এখন সলিল, জর্জ, গণনাট্য, বাসুদা সব মিলিয়ে আমার ইতিহাসে ঢুকে চলে গেছে। কোলকাতার প্রতিবাদের ভাষা ব্রিগেড পেরিয়ে মেট্রো চ্যানেলে এসে দাঁড়িয়েছে। পুরাকালে মেট্রো চ্যানেল নাম্নী তথ্য ও সম্প্রচার দপ্তরের একটি ট্যাঁশগরু ছিল বটে, যা আমাদের সুপারহিট মুকাবলা ইত্যাদি পৃথিবীর সপ্তম থেকে অষ্টম আশ্চর্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়েছিল। কিন্তু সে তো খৃষ্টের জম্মের আগের ঘটনা। মিলেনিয়াম পরবর্তী সময়ে মেট্রো চ্যানেল হল এসপ্ল্যানেড মেট্রোর সামনের একটুকরো জমি- যা স্বপ্নদেখিয়েদের একটুকরো আকাশ হয়ে দাঁড়ায়।

দিল্লী অবশ্য আকাশ দেখার বিষয়ে কোলকাতার থেকে বরাবরই যোজন এগিয়ে থাকে। পরিকল্পিত শহর হবার সুবিধা আর কি। সব কিছুর জন্যই নির্দিষ্ট স্থান আছে। ট্যাঁশ হতে চাও তো জনপথ থেকে জেএনইউ, হিপ হতে চাইলে সাউথ এক্স থেকে খান মার্কেট, চিপ হতে চাইলে সদর থেকে সরোজিনী সবই পেয়ে যাবেন এই ভুলভুলাইয়ার সবপেয়েছির আসরে। প্রতিবাদের আকাশও!

আরে বাবা দেশের রাজধানী বলে কথা, দেশের কেষ্টবিষ্টু ইষ্টুকুটুমদের কাছে আমার ভিতরের গোঙানি পৌঁছয় কি করে? তাই চলো দিল্লী! তা বলে যেখানে সেখান ফেলে ছড়িয়ে নোংরা করতে তো দেওয়া যায় না! তাই হ্যামলিনের বাঁশীওয়ালারা অনেক ভেবেচিন্তে একটুকরো আকাশ তৈরী করে দিয়েছেন, যার নাম যন্তর মন্তর। যন্তর চীজ বাওয়া! রামলীলা ময়দানে গরুর কাটার মতো ঘাস নেই তো যন্তর মন্তর, রাজপথে সরকার পথে বসলে যন্তর মন্তর, পার্লামেন্টে গোলাগুলি চললে যন্তর মন্তর, ওবামা-পুটিন কাটাকুটিন খেললে যন্তর মন্তর, বাবাজীকা ঠুল্লা হলেও যন্তর মন্তর! এই শেষ ব্যাপারটা নিয়ে একটু পরে ফুট কাটব! তার আগে ঘটনায় ঢুকে পড়ি।

যন্তর মন্তরের প্রতিবাদী রাস্তাটার উপর একটা সাউথ ইন্ডিয়ান খাবার দাবারের দোকান আছে! যেটা দিল্লীর নিরামিষ ভোজনের পীঠস্থান হিসাবে পরিচিত! তা সেখান থেকে ভেজ কুর্মা আর সেট দোসা কিনতে যাব বলে মনস্থ করে গাড়ি ঘুরিয়েছি। কিন্তু গন্তব্যের অনেক আগেই থেমে যেতে হল। রাস্তার সিকিভাগও বাকী নেই মঞ্চের চাপে আর তারস্বরে বাংলায়- হ্যাঁ পাঠক পাঠিকাগণ ঠিকই শুনেছেন, বিশুদ্ধ দিশি বাংলায় বক্তৃতায় বঙ্গ ললনারা আকাশ বাতাস কাঁপাচ্ছেন। বাংলার ম্যাঙ্গো পিপুলরা পেটে কিছু না পড়লেও চেঁচিয়ে পাড়া মাত করতে জুড়িহীন। কিন্তু তাই বলে দিল্লীতে?

এপাশ ওপাশ দিয়ে মেসি রোনাল্ডোর মতো এগিয়ে যেতে যেতে শুনলাম মিড ডে মিলের কর্মীদের দুঃখের কথা! তাদের সারা বছর কাজ করিয়ে মাত্র ১০ মাসের মাইনে দেওয়া হয়। কারণ দু মাস নানা কারণে স্কুল ছুটি থাকে যে। ছুটি থাকলেই কি? পেট তো ছুটি নেয় না! তাই কেন্দ্রের বঞ্চনার প্রতিবাদে আকাশ বাতাস মুখরিত। সকলের মুখেই তখন বঙ্গের বিদ্যুৎলতার ভাষা! কিন্তু আমাকে তো উদ্দেশ্য ভুললে চলবে না! সেট দোসা যে তখনও মুখগহ্বরের স্বাদকণিকাগুলিকে রসসিক্ত করে চলেছেন।

এগোতে এগোতে দেখলাম আরও রকমারি ঝকমারি প্রতিবাদী মঞ্চের সারি। কিন্তু ঝটকাটা তখনই খেলাম। হ্যাঁ সন্দেহ নেই যে ভারত বাবাজি প্রধান দেশ। এত চাপ পলাশীর প্রান্তরের খাপ বুদ্ধুর বাপ সব মিলিয়ে বাবাজিদের পোয়াবারো। কিন্তু তা বলে কোন প্রতিবাদী মঞ্চ যদি হয় এই বলে যে ভারতবর্ষে পরিকল্পিতভাবে সাধুসন্তদের (বাবাজি) টার্গেট করা হচ্ছে, তাহলে সত্যিই ভাবতে হয়। নিত্যানন্দ শঙ্করাচার্য আশারাম এরা তো সব সেই হিন্দিতে বলে না? “গাউ হ্যায় গাউ” কুছু নাহি জানতা হ্যায়! সব ঝুট হ্যায়! ও তো ভগবান কা জীব আউর জিভ হ্যায়!

তবে ভাববার মতো ব্যাপার হল আরও বেশী যখন আমি মঞ্চের নীচের ভক্তদের মধ্যে নজর বোলালাম! উচ্চ থেকে উচ্চ মধ্যবিত্ত গৃহিণী ও ফ্যাশনদুরস্ত কামিনীদের সংখ্যা এতটাই চোখে পড়ার মতো যে সত্যিই ভাবতে হয় এই যে সব নিত্যানন্দ আশারামরা সারা জীবনের ব্যবসা ফেঁদে বসেছে মানুষের বিশ্বাসের ফায়দা লুটে তাদের কুকীর্তিগুলি কি সত্যিই বাবাজীকা ঠুল্লা? বিশ্বাসে যেমন মিলায় তেমনই লীলাও তাদের অপার! সে তো বাবাজী- তাঁর অপকর্মগুলি তো বিভূতি!

তিনি এই ধরাধামে এসে তাঁর লোমশ রক্ত চোষা হাত দিয়ে অকহতব্য স্থান একটু চুলকে নিয়েছেন তাতেই আমরা কৃতার্থ! তিনি ‘ব্যাঁও’ বলে ঢেঁকুর তুললে আমরা উদ্বাহু হয়ে গড়াগড়ি দিই। (বললাম বটে, কিন্তু সত্যিই কাজটা করে দেখবেন! বেশ অসম্ভব প্রকৃতির ব্যাপার!) তাই শত শত যৌন হেনস্থার অভিযোগ আসা কুকুরগুলোর এহ বাহ্য চাটতে, পাঞ্জাবীবাগ বা পিতমপুরার পশ বিউটিপার্লার চর্চিত বিউটিদের এতটুকুও কুন্ঠাবোধ হয় না! তাঁদের মনেও পড়ে না যে বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে কত কত নাবালদের কণ্ঠরোধ করে দেওয়া হয়!

যাই হোক, অনেক গুরুগম্ভীর কথা হয়ে গেল পাঠকপাঠিকারা, ক্ষমা করে দেবেন! তবে কি না জানেন তো, ফিসফাস তো শুধুমাত্র শেষ বসন্তের ফুসকুড়ি নয় যে একুট সুড়সুড়ি দিয়েই কেটে পড়বে! ফিসফাস জীবনবোধের গল্প, থাক না তাতে দু আনা নির্মল গুড়ের ফোঁটার মতো মিষ্টত্ব! তবু জীবনবোধই যদি বোবা হয়ে যায় তাহলে ফিসফাসের গল্পগুলির সঙ্গে দেওয়ালের ক্যালেন্ডারের কোন ফারাকই থাকবে না! সকালে উঠে খালি দেখে যাব যে আজ রোববার! ব্যাস তার পরেই ঝাঁপ দিয়ে পড় কালো নীড়ে।

ভেবে দেখবেন, আমাদের এই ভীরু অক্ষম জীবনটাতেও যদি আপন আচরণ দিয়েই প্রতিবাদের দুয়ে দুয়ে মিলিয়ে দিতে পারি তাহলে সাপের পাঁচ পা কখনই আমাদের জাপটে ধরতে পারে না।

যাই হোক গল্পে ফিরে যাই। আরও একটু দূরেই সেই আনন্দ ধাম! দোসা আর কুর্মার দোকান। এগোতে লাগলাম আর বিচিত্র এবং বিহ্বল করা মঞ্চগুলি চমৎকৃত করতে লাগল। এমনিতেই যন্তরমন্তরকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছিলেন আন্না এবং ততপরবর্তীকালের চিত্তচঞ্চলম শ্রীমান কেজরিওয়ালবাবু। কিন্তু চন্দন কাঠের পরেও তার আশে পাশের গাছগুলি গন্ধ নেবার জন্য মরিয়া হয়ে ফেলে যাওয়া পথের শরিক হতে গড়াগড়ি খায়! তেমনই গড়ে ওঠে ধর্ষণ বিরোধিতার নামে রাজনৈতিক জ্যাবরং, কিষাণ সভার নামে অর্থনৈতিক বিষোদ্গার এবং আরও না জানি নাম না জানা কি সব সভার নামে অনৈতিক মিডিয়ায় মুখ দেখাবার অদম্য ইচ্ছা। তাই মঞ্চ দেখি “সনসনিখেজ খুলাসা”-র যেখানে একজন বিদগ্ধ ব্যক্তি দিবানিদ্রায় সুইজারল্যাণ্ড ভ্রমণে ব্যস্ত থাকেন। তাই মঞ্চ দেখি রাগা আর নমোর পরস্পর বিরোধী বন্দনার আর তাই আমার উদ্দিষ্টের অর্ডারকালে, সমস্ত অধর্মীয়- ধর্মীয় জিগির মিলে মিশে এক হয়ে যায়- রাহুল বাবাকো… এক প্লেট সাদা ইডলি দো! মোদীজি আয়েঙ্গে তো … উত্থাপ্পাম খায়েঙ্গে কেয়া? কেজরিওয়াল জওয়াব দো কি… মেরা সেট দোসা বন গয়া কি নেহি! সব মিলিয়ে একদম পাগল পাগল অবস্থা!

কোন রকমে আমার উদ্দিষ্ট খাবারটি নিয়ে অফিস ফিরে যেতে মনস্থ করে! এডউইন মোজেসের মতো হার্ডল ডিঙোতে ডিঙোতে ফিরে আসতে আসতে কানে এসে পৌঁছয় মিড ডে মিলের মঞ্চ থেকে উচ্চারণ, “আমরা এখানে উপস্থিত আমাদের মা বোনেদের মুখে খাবার তুলে দিতে পারছি না বলে, সমবেত অনশনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি!” কি নিদারুণ অভিব্যক্তি! কি মানবিক উপলব্ধি! পেট না চললে মনের গেট খোলে কি করে বলুন তো? আমাদের মত সাধারণ মানুষ কাগজের পাতায় আর টিভির পর্দায় একটু আহা উহু করেই গেটের কথা ভুলে সেট দোসায় মন নিবেশ করে! পথে নেমে পথ চলার থেকে ড্রয়িং রুমের কাউচে মদ্যপান ও কিঞ্চিত বাদাম চিবানো সহযোগে ভাঁট বলায় মন ভাসিয়ে রাখি! কথায় আছে না অধিকন্তু ন দোষায়!! উদরপূর্তি সেট দোসায়ও!!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ “বাবাজী কা ঠুল্লা” কথাটা একটি অপব্যক্তি! যার অর্থ ‘কিস্যু না’ অথবা ‘Floccinaucinihilipilification’!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s