(৯৬)


এক একটা দিন উঁচু নীচু
কেউ নিলে পিছু
টোকা দিলে চুপিসাড়ে কোণের দরজায়-

সেই রকম কালকের দিনটা ছিল বটে। মানে দেখতে গেলে কিস্যুটি না আবার না দেখলে অনেক কিছু। এই যেমন ধরুন অফিসের মিটিং-এ যাব বলে উর্ধ্বতন অধস্তন মিলিয়ে জনা চারেক তৈরী হয়ে অফিসের গাড়িতে চড়ে বসেছি। প্রস্তুতি বেশ ভালই হয়েছে। একেবারে “ফাটায়ে দেসো” শোনার জন্য তৈরী হয়ে যেই বেরিয়েছি ওমনি কোথাও কিছু নেই একখান সাইকেল রিকশা সম্পূর্ণ উল্টো দিক থেকে ছুটে এসে আমাদের গাড়িটাকে আক্রমণ করল।

সরকারী গাড়ি এমনিতেই ভীতু টাইপের হয়, তাই কুমীর তোমার জলকে নেমেছি করে নামতে গিয়েই ব্রেক মেরে দিয়েছিল বলে জাটিঙ্গা রিকশাটা তো গেল বেঁচে, কিন্তু একটা কান নড়ানো “চড়াক” করে আওয়াজ হল বটে। অফিসের গেট থেকে গার্ড দৌড়ে এল। এসেই গাড়ির দিকে না গিয়ে রিকশার দিকে চলে গেল এবং আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে রিকশার চাকার স্পোকগুলি থেকে কুড়কুড় করে আমাদের গাড়ির নম্বর প্লেটটা তুলে নিয়ে এসে খ্যা খ্যা করে হাসতে লাগল।

আমাদের গাড়ির ড্রাইভারটি একদম সজ্জন ব্যক্তি। সরকারী ভাষায় একদম “গৌ হ্যায় গৌ”। সে নিঃশব্দে দাঁত বার করে নম্বর প্লেট এবং তত সংলগ্ন কুড়নো বাড়ানো টুকরোগুলি তুলে নিয়ে এসে ডিকিতে রেখে দিয়ে আবার হাসিমুখেই আমাদের নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে দিল রওনা।

তারপর আর কি? মিটিং টিটিং উইদাউট ইটিং চলল বেশ কিছু দূর। আমাদের জয়েন্ট সেক্রেটারী ভদ্রলোকটি মাত্র গত বছর ইউপির মতো বিভূঁই থেকে এয়েচেন। ব্রিটিশ মানসিকতা ছাড়তে পারেন নি তাই মিটিং-এর নামে বাজার বসাতে জুড়ি নেই। তায় আবার কাল ছিল ফ্লাইট ধরার তাড়া। তাই সেই এলাটিং বেলাটিং মিটিং শেষ হতে হতে বিকাল চারটে।

কাজের নামে অষ্টরম্ভা তায় আবার চিচিং ফাঁক আর হরকরকম্বা…। আগে খুব অসুবিধা হত, পেটের ভিতর ভূমধ্যসাগর থেকে আগত শঙ্খধ্বনি শোনা যেত। আমার আবার খিদে পেয়ে গেলে মাথা খারাপ হয়ে যায়। সেই পরিস্থিতিতে মাথা ধরে গিয়ে বিগড়ে গিয়ে কি যে সব কাণ্ড হত তা ছাতা আদ্ধেক বুঝতেই পারতাম না। এখন অনেক বেশী সেয়ানা হয়ে গেছি। মাঝে কড়ে আঙুল যাবার নাম করে বেরিয়ে টুক করে মুখে দু চারটে রুটি আর তরকারি গুঁজে চলে আসি।

সে যাই হোক। মিটিং সম্পন্ন করে বাক্স প্যাঁটরা সহযোগে ফিরে আসছি অফিসের উদ্দেশ্যে এমন সময় ঘটল ঘটনাটা। এমনিতেই জাত্যাভিমানী বাঙালী নিজের পশ্চাতে চপেটাঘাত করার অভিযোগে ফিসফাসকে অভিযুক্ত করেছেন এবং তার উপর এর পরের এপিসোডে যা কহতব্য তার পর না আমায় দিল্লী থেকেই বার করে দেয়।

ভাগ্যিস অধিকাংশ জাঠ বাংলা পড়তে পারে না! (ফিসফাস এতটা ফেমাস হয় নি যে যে কয়েকজন নখে গোনা জাঠ বাংলা পড়তে পারেন তারাও পড়ে ফেলে আমাকে পেড়ে ফেলবেন!) তাই সাহস করে লিখে ফেলছি।

দিল্লীতে এখন ঝাঁটতুতো নেতা আর জাঠতুতো পুলিশের খুব রমরমা। আপনি কি বলছেন তাতে বিন্দুমাত্র কর্ণপাত না করে নিজস্ব প্রোপাগাণ্ডার হারমোনিয়ামে বেলো টিপে যাবে।

তা হল কি- মাণ্ডি হাউস থেকে তিলক ব্রিজের দিকে এসে যেই পথ ঘুরেছি অমনি তিনটে মুসকো জোয়ান জাঠ বেরাদর পুলুশ বাবা বেরিয়ে এসে গাড়ি থামিয়েছে। শুরুতে কিছু বলি নি! ড্রাইভারকে লাইসেন্স বার করতে বলে দেখি হাবিজাবি লিখতে শুরু করেছে! তখন আমি তাকে ডেকে বললাম, “ব্রাদার, ইয়ে সরকারি গাড়ি হ্যায়! সুবহ সুবহ এক সাইকেল রিকশা নে চুম্মি লেকে চলা গয়া। নম্বর প্লেট তো সাথ মে রাখা হ্যায়। লাগানে কি টাইম মিলতেই লাগা লেগা!” তা জাঠ বুদ্ধি, বলে কি না, “সরকারি গাড়ি হ্যায় তো কেয়া নিয়ম তোড়েগা?”

ব্যাস যায় কোথা। আমার ডেপুটি সেক্রেটারিকে বললাম “হটিয়ে! উতরনে দিজিয়ে!” নেমেই সে ব্যাটা সাড়ে ছে ফিটকে গিয়ে জিগালাম, “হাঁ ভাই কেয়া সমস্যা হ্যায়?” সে তো ঘোড়ার ঠুলি পড়েই পৃথিবীতে এয়েচে। সেও বলে যে গাড়ির নাম্বার প্লেট নেই তাই নিয়ম ভেঙেছে! কথা প্রসঙ্গে বলে বসে, “আপ ওর্দিপে পুলিশবালে কি সাথ বহেস কর রহে হো!” আর যায় কোথা! এতক্ষণ তবু টুপুর টুপুর আরব সাগরের ঢেউ ছিল, এবারে তো সুনামি! আমি ঠাণ্ডা মাথায়, গলা চড়িয়ে বললাম, “যাও পহলে তুম কেস ঠোকো! ফির ম্যায় বতা রাহা হুঁ বহেস অউর বত্তমিজিকি পরিভাষা কেয়া হোতি হ্যায়!” সে বলে কি না, “ভাই আওয়াজ থোড়া নীচে!” আমার ভিতরে তখন দিল্লীর সবকটা চিৎকৃত নেতা ভর করেছে। বলেই দিলাম, “পহলে আপ আওয়াজ নীচে করকে বাত করো ফির হাম শোচেঙ্গে!”

বেগতিক দেখে একটু বয়স্ক এক কনস্টেবল এসে বলল, “স্যর ঠাণ্ডে দিমাক সে ভি বাত হো সকতে হ্যায় না!” আমায় তখন রোখে কে, তাকেও দিলাম জ্ঞানের কথা শুনিয়ে, “আরে ভাই আপ জ্যায়সে বাত কর রহে হো ওয়সে বাতচিত হোনে সে তো ম্যায় হাত জোড়কে বাত করতা! আপনা কলিগ কো তমিজ শিখাও!” সেও তখন তার কনিষ্ঠ কলিগটিকে একটু স্নেহের বকাবকি করে দিল। কিন্তু কুকুরের লেজ তো সোজা হয় না! সেই জাঠ তরুণ তারপরেও কিন্তু পরন্তু করছিল বটে। আমি আমাদের ড্রাইভারকে বললাম, “চলো হিঁয়াসে!” সেও সেই দাঁত বার করেই গাড়ি নিয়ে এগিয়ে গেল অফিসের উদ্দেশ্যে!

যাবার পথে আমার থ হয়ে যাওয়া সিনিয়র ও জুনিয়রকে জ্ঞান দিতে ছাড়লাম না! “নরম পড় যাওগে তো রোব ঝাড় দেগা!” তারাও দেখলাম মাথা নেড়ে আমার সঙ্গে সহমত হল! “হাঁ জি আপনে ঠিকই কিয়া!” ব্যাস সমগোত্রীয়দের সম্মতি পেয়ে গেলে আর কি চাই!

কিন্তু ক্যারাটা বোধহয় লেগেই রইল। নইলে আর রাত্তিরের ঘটনাটা ঘটে?

হয়েছে কি, আমার একই অঙ্গে এত রূপ যে কি বলব! মানে যেই আমি সিরিয়াস সিনেমা দেখি, সেই আমি গোবিন্দার ফিলিম দেখে উদ্বাহু হই! যেই আমি ডায়বেটিস মার্কা বলিউডি রোমান্স দেখে নাট সিঁটকোই, সেই আমি অ্যানিমেশন আর সুপার হিরো ফিল্ম দেখে বগলে ফোঁড়া নিয়ে ঘুরে বেরাই। তা সেই এক সুপারহিরো ফিল্ম এসেছে কদিন আগে আর লোকমুখে শুনেছি যে জিনিসটা মন্দ হয় নি!

ছেলেকে সারপ্রাইজ দেব বলে ধরে নিয়ে কাল রাতে টিকিট কাটতে বসলাম আজ অর্থাৎ আট তারিখের জন্য। তা দেখি কি সব কটা শো সন্ধে বেলায় আর একটা তো ভর রাত্তির দশটা চল্লিশে! তা ভেবে দেখলাম আজকের ছুটির সদ্ব্যবহার করতে গিয়ে কাল রাত্তিরেই দেখে নেওয়াটা হবে বুদ্ধিমানের কাজ! তা ফিল্মি ওয়েবসাইট গুলো সময় দেয় মোটে সাত মিনিট। তারপর আমার আড়াই মাসের কন্যারত্নটির দৌলতে আমাদের বাড়িতে মাঝে মধ্যেই এম এস সুব্বালক্ষ্মী আর লতা মঙ্গেশকর একসঙ্গে রেওয়াজ করেন (তৃতীয় লিঙ্গের দলবলও ভয়ে এসে উঠতে পারে নি এত দিনে)। তা কাল ছিল সে রকমই এক সন্ধ্যা। সুরের মূর্ছনার ঠেলায় দিন গেলাম ভুলে আর টিকিট কেটে বসে রইলাম আজকের।

কিন্তু বেকুব বনে গেলাম যেই টিকিট নিয়ে ছেলেকে সারপ্রাইজ দিতে যাব। নিত্যানন্দ হয়ে মোবাইলটা খুলে দেখাতে গিয়ে দেখি যে তারিখে সাতের জায়গায় আট লেখা! লে হালুয়া। রাত দেড়টায় ফিল্ম শেষ হবে তারপর সকাল সাড়ে পাঁচটায় উঠেই স্কুল নিয়ে কুস্তি! বাপরে সে তো চটকে চুয়াত্তর ব্যাপার হবে! তা বেগতিক দেখে ফোন করলাম বুক মাই শোকে! সে শোকে অশোকে ইনিয়ে বিনিয়ে জানিয়ে দিলে যে হবে নি কো! যদি না ধরে করে হলের ম্যানেজারকে কোন ব্যবস্থা করতে পারি!

অগত্যা আবার একটি টিকিট কেটে রওনা দিলাম হলের উদ্দেশ্যে! এই অঞ্চলে বাড়ি থাকার সুবাদে টুক করে পাড়ার দোকান থেকে বিস্কুট আনছির মতো করে সিনেমা হলে পৌঁছে যাওয়া যায়! তা পিভিআর বিশাল বড় হনু মাল্টিপ্লেক্স তারা আমায় বুঝিয়ে বলে দিল যে সেটি সম্ভব নয়! তার থেকে যেন আমি কাউকে দান ধম্ম করে দি টিকিট দুটো! তা আমি আবার মুখ কাঁচুমাচু করে জিজ্ঞাসা করলাম যে “হ্যাঁ ভাই, আমি যদি তোমাদের হলের সামনে আমার দুইখান টিকিট কাল বেচে দি তাহলে আমাকে ব্ল্যাকার বলে পুলুশে দেবে না তো! মামাদের কাছে আমার একটা আলাদা রেপুটেশনা আচে না?” তা তারা তখন বরাভয় মূর্তি দেখাল!

আর আমিও বাড়ি ফিরে এলাম সিনেমা দেখতে যাবার তোরজোড় করতে। কি মনে হল ফেসবুকে লিখে দিলাম যে আমার কাছে দুইখান টিকিট আছে কেউ যদি দেখতে চাও তো দেখতে পার! লিখেই বুঝলাম চিত্তির! তাই আবার ডিসক্লেমার দিলাম, “বন্ধুগণ, এটিকে ডেটের আহবান ভেবো নি কো! আমি দুইখান টিকিটই গতহস্ত করব!” ব্যাস প্রথমে যারা নির্বিকল্প ছিল তারাও হইহই করে উঠল! আর খিল্লি খেউর চলতে লাগল!

সে যাই হোক সিনেমাটিক প্যারাডক্স-এর একটা অসম্ভব সুন্দর নিদর্শন দেখে কাল রাত আড়াইটেয় বাড়ি ফিরেছি! (প্যারাডক্স নয়? ক্যাপ্টেন আমেরিকা নাম্নী একটি সুপারহিরো বলছেন যে ব্যক্তিগত তথ্য সম্ভার কোন সংস্থার কাছে রেখে দেওয়া মানে ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং কোন একটি সংস্থাকে অসম্ভব শক্তিশালী করে দিয়ে ভারসাম্যহানী করা! ভাবা যায়? আজকের উইকিলিক্স আর আড়িপাতার যুগে, আমেরিকার অ্যানিমেশন যুগপুরুষ এ রকম উল্টো গানা গাইছে শুনলে, ওবামাবাবু মামাবাড়ি পালাতেও পথ পাবেন না!)

আজ সেই কাঙ্ক্ষিত দিন, এখনো ঘণ্টা পাঁচেক আছে বাকি! আশায় আশায় বসে আছি যদি সেই দুইখান অব্যবহৃত টিকিটের যদি কিছু হিল্লে হয়! নাহলে? নাহলে আর কি? সেই নির্বাক রাত্রে দুইখানি টিকিট নিয়ে আমি দাঁড়িয়ে থাকব সিনেমা হলের গেটের সামনে! ডবল অর নাথিং- ডবল অর নাথিং- ডবল অর নাথিং… নাথিং!!

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s