(৯৭)

ফিসফাস বলতেই তো ঘনঘটা ভরা জীবনকাহিনী লেবুর আচার, কাঁচা সরষের তেল আর নুন লঙ্কা পেঁয়াজ দিয়ে মেখে খাওয়া। কিন্তু যারা জীবনের কথা বলে তাদের কথা বললে তো ফিসফিসিয়ে বলা যায় না! গম গম করে মাইক না বাজালে আর সার্থকতা কোথায়! আসলে আজকের স্বঢোলক বাজনদারদের যুগে কোথায় যেন মাটির কাছাকাছি কথাগুলো চাপা পড়ে যায়। সে ফেসবুকের পাতাই হোক, ব্লগের আয়নাই হোক বা মঞ্চের মূল অধিষ্ঠান ।

যাই হোক পাঠক/ পাঠিকারা, অনেক ভেবেচিন্তে আমার স্বল্প লব্ধ জীবন দর্শন আর নব্য লব্ধ স্বচক্ষু দর্শনের পাঠলিপিই আপনাদের সামনে রাখবার চেষ্টা করছি! হয়তো কিছুদূর যাব, হয়তো তা যথেষ্ট নয়! তবু শুরু তো কোথাও না কোথাও করতেই হয়?

সত্যি বলতে কি আমি জীবনে একবার শান্তিনিকেতনে গেছি, বার কয়েক বীরভূম বর্ধমান বাঁকুড়া আর দুইবার কাঠফাটা পুরুলিয়ায় গিয়ে পুড়ে হেজে একসা হয়েছি! কিন্তু শহুরে মনন নিয়ে বঙ্গ সংস্কৃতির ফুল চচ্চড়ি নিয়ে চড়বড়িয়ে গরম ভাত মেখে খেতে তো জুড়ি নেই। তাই আর পাঁচজন অগ্রজ বঙ্গবাজনদারদের মতই হেব্বি বোদ্ধা হয়ে গেছি এই ভাব নিয়ে কেশর ফুলিয়ে ঘুরে বেরাই। মাটি আর চটির মধ্যে যে ধীরে ধীরে বেশ কিছুটা ফাঁক তৈরী হয়ে যাচ্ছে তার হদিশ নেই!

হুঁশ ফেরে টালমাটাল হলেই! তা গত কয়েক মাস ধরে দিল্লীর বঙ্গকৃষ্টির মেশিনের তেল গায়ে মাথায় মাখতে গিয়ে এখন বুঝতে পারছি! টালমাটাল না হলে মানুষ কি আর হাঁটতে শেখে! পড়বি আর উঠবি ঘোড়ার মতো ছুটবি!

শুরু হয়েছিল পূজোর সময়! বাঙালীর দুগগা পুজো মানে তো ধুতি পাঞ্জাবী চাপিয়ে অঞ্জলি সুখ নিয়ে ঢাকের বাদ্যি আর ধুনুচির ধোঁয়া শরীর মনে নিয়ে সংস্কৃতির লিমেরিক লেখা! যেখানে প্রথম দুই আর শেষ লাইনটি বরাদ্দ রঙ মেলান্তি পরিচিত মুখেদের জন্য আর দুয়োরাণীর ঘরে মাঝের দুই লাইন থেকে যায় তথাকথিত বঙ্গ সংস্কৃতির মাটির প্রতিমা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য।

খেলাটা সেই মাঝের দুই লাইন নিয়েই! ঘুরে ঘুরে এজেন্ট ধরে খোঁজ খবর নিয়ে এসে বাংলা মায়ের বুকের নির্যাস তুলে আনতে হয়! তারপর আর কি! প্রবাসী নতুনত্বের পূজারী বাঙালী নতুন মোড়কে পুরনোকেই আহবান করে দুই বাহু খুলে! সঞ্জয় মণ্ডল ও তার ক্রিয়েটিভ ওয়েস্ট আর্ট সেন্টার হল সেই রকমই একটি দল! ফেলে দেওয়া রঙের ড্রাম, ফেরুল পাইপ, খালি বোতল, পাথরকুঁচি, আর কি না কি নিয়ে অ্যাফ্রো অ্যামেরিকীয় কায়দায় অভিনব ব্যাণ্ড। ঢাকের বাদ্যি আর শাঁখের বোল একজায়গায় উঠে এসে একদম জমজমাট কাণ্ড, আর তার সঙ্গে যদি যুক্ত হয় আধুনিক মঞ্চ সজ্জার ম্যাজিক আর আলোর কারিকুরি! তব তো কেয়া বাত মিয়াঁ।

মজাটা হল অন্য জায়গায়, যখন আমি কোলকাতায় গিয়ে ওদের সঙ্গে দেখা করলাম! তখন দেখলাম ঠিক কি প্রচণ্ড পরিশ্রম এবং অধ্যাবসায় নিয়ে সুরতাললয় মিলিয়ে রামধনু গড়ে তুলছে ছেলেগুলো! টিভি চ্যানেলগুলো আসে নিজেদেরকে মসিহা প্রমাণ করতে! লোককে ডেকে ডেকে দেখায় দেখ এদের ট্যালেন্ট- আমরাই তুলে এনেছি! আর তারপর? সময় ফুরলেই স্লামডগ মিলিয়নিয়ারের বাচ্চাগুলোর মতো বাস্তবের জমিতে আছড়ে ফেলে দেয়! তখন প্রকাশিত আলোকেই বার বার হাত তুলে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেবার প্রচেষ্টা! কখনও সফল বা কখনও অন্ধকারই সম্বল। তবুও বিশ্বাস হারায় না! পারতে যে হবেই!

পারেও তারা, দাদারা দিদিরা নতুন ঢং দেইখ্যা দুই পয়সা দেয়! আবার আবার কইর্যাত ডাক পাঠায়! আয় আয় আয়! এভাবেই চলে নতুন দিনের সংগ্রাম! আর আমরা রসসিক্ত অবস্থায় বেশী দিন থাকতে পারি না বলে নতুন মনোরঞ্জনের খোঁজ পড়ে। বঙ্গ সংস্কৃতি, তোমার ভাসান যাবার দিনেও যেন ঠাকুরের নাক আর চোখ ভেসে থাকে!

সেই সূত্র ধরেই খুঁজে খুঁজে পাই নাটুয়া, ছৌ, কবিগান আর রায়বেঁশেদের! এর মধ্যে ছৌ অধিক পরিচিত- আজকের দিনে বাংলার মুখ দেখিতে গেলেই দেখা যায় কার্তিকের মুখোশ! যা তারা মাটির লেপের উপর কাগজ কাপড় চাপিয়ে শেষে মাটির প্রলেপ দিয়ে সালঙ্কারা করে তৈরী করে নিয়মিত কষ্টসাধ্য অভিনয়য়/ পারফরম্যান্সের জন্য! আমরা অবাক বিস্ময়ে দেখি হাততালি দিই, আর তারপর মুখ থেকে মুখোশ টেনে খুলে ফেলে ড্রয়িং রুমে টাঙিয়ে দিয়ে সমবেত হর্ষোল্লাসে মেতে উঠি।

কবিগান তো সেই পুরাকালের অ্যান্টনী ফিরিঙ্গি আর হালের জাতিস্মরেই সীমাবদ্ধ, ভোলা ময়রা, হরু ঠাকুর, ঠাকুর সিংহ নামগুলোর সঙ্গে সঙ্গে গানগুলোও তো স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে রয়েছে। কিন্তু ১৮৩০-এর পরেও তো পৃথিবী এগিয়েছে! কবিগান কোথায় গেছে? সে তো সেই শহরের গণ্ডী পেরিয়ে নদীয়া, বর্ধমান, বীরভূম বাঁকুড়াতেই গেছে আটকে! ট্র্যাডিশন আছে কিন্তু ট্র্যাজেডির অংশীদার হয়ে! মাঝে সাঝে হয়তো ডাক পড়ে! সরকারী বেসরকারি অনুষ্ঠানে! বাইরে থেকে আসে ডাক! তখন লোটা কম্বল গুটিয়ে এক সন্ধ্যার বাদশা! “আরে ওয়াহ! এ তো দারুণ” “খুব ভালো লেগেছে!” ব্যাস এই পর্যন্তই! ক্ষীর খেয়ে যায় খয়ের খাঁরা!

গল্পের শেষভাগে এসে পড়ে নাটুয়ার দল আর ব্রতচারী গ্রামের রায়বেঁশে নাচ! নাটুয়ার আবার একটি পৌরাণিক ইতিহাস আছে! নটরাজ বিবাহে নন্দী ভৃঙ্গী নাকি নেচেছিলেন এই নাচ! রাম সীতার বিয়েতে চন্দ্ররাজ নেমে এসেছিলেন মর্তে নাটুয়া নাচতে!

আর গুরুসদয় দত্তের ব্রতচারীগ্রামের রায়বেঁশে নাচের সঙ্গে তো আধুনিক বাংলার গর্বের ইতিহাস জড়িত! বাঁশের উপর উঠে সাইকেল চালানো নাগরদোলায় ঝুলিয়ে দুপায়ে ঘোরানো! বা মিলিটারি টাট্টুর মতো দেহ সৌষ্ঠব! এই নিয়েই রায়বেঁশে এই নিয়েই অ্যাক্রোব্যাটিক বাঙালীর আন্তর্জাতিক বিকাশ! মাঝে মধ্যে পুরস্কারও জোটে বটে! হাজার হোক! কষ্টসাধ্য সাধনার ফল! তাকে তো মানব বিকাশ- সংস্কৃতি রক্ষার নামে মাঝে সাঝে সামনেও আনতে হয়! কিন্তু তারপর আমরা ভেবেও দেখি না এরা কোথায় যাচ্ছে! কি খাচ্ছে কি পরছে আর কিই বা পড়ছে! কাজের বেলায় কাজী কাজ ফুরলেই না জি!

তাই মুর্শিদাবাদের পুরস্কার প্রাপ্ত আবুহোসেন নিজের ট্র্যাডিশন বাঁচিয়ে রাখার কথা চিন্তা করে রায়বেঁশে আকাদেমি খুলতে চায়! প্রতিশ্রুতির বন্যা বয়ে যায় হাততালির মাঝখানে! কিন্তু সত্যিই বা কটা সাহায্য এসে পৌঁছয় মাটির কাছে?

সে যাই হোক ফিসফাসের পাতায় তো আর বিষোদ্গার করা যায় না! হাজার হোক এরও একটা ট্র্যাডিশন তৈরী হচ্ছে! তাই সেই বয়স্ক ব্যক্তির কথা দিয়েই পাঠক পাঠিকারা আজকের এই অন্যরকম খবুরে ফিসফাস শেষ করি! নববর্ষের শুভেচ্ছা দিতে উঠে তিনি বললেন, “বঙ্গ সংস্কৃতি মানেই তো আমরা শহুরেরা রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, অতুল প্রসাদ বা হালফিলের ব্যাণ্ডেই আটকে যাই! একটু বাইরে বেরোলে হয়তো দেখতে পাব পরিধিটা আরও বড়!” বড়ই তো! তাও তো ভাদু, ভাটিয়ালি, কীর্তন, বাউল, ঝুমুর, লঘুড় নাচ, রণপা নৃত্য, মন্দিরা গম্ভীরা নৃত্য ইত্যাদির কথা বললাম না!

দুই পা ফেলে ঘর হতে বেরিয়ে দেখুন বন্ধুরা, শিশির বিন্দুরা আজও ধানের শিষের উপর সসম্মানে বর্তমান! শুকনো বাণিজ্যায়নের প্রখর দাবদাহতে তা শুকিয়ে যায় নি!

One thought on “(৯৭)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s