(৯৮)

আরেচ্ছাতা ফিসফাস মানেই কি গরুর রচনা নাকি দেশের গল্প? যে চার হাজার শব্দের মধ্যে না হলে কাকু তুমি আব্বুলিশ? তাই এবারেরটা শুরুর আগেই শেষ করে ফেলছি। নো ভ্যান্তারা নো দাল বুখারা (দাল বুখারা কি জানেন তো? আইটিসি-র সেই সারা রাত ধরে আঁচান খোসা ওলা অড়হর ডালের সম্ভার।) কচি কথা কচি করে বলাই ভালো।

কচি বেলায় আমি বেশ একটা এথলেটিক স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলাম যাতে বছরের সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছুটা ছ্যাতা পড়ে গেছে। মানে তখন ছোলা বাদাম গুড়, ভোরের লেকের হাওয়া, দু আড়াই মাইল দৌড়, তার সঙ্গে আনুষাঙ্গিক কসরত মিলিয়ে কোমরে হ্যান্ডল জমার জায়গাই থাকত না।

সমস্যাটা শুরু হয় শূন্য দশকে, একটা স্কুটার অ্যাক্সিডেন্টের সঙ্গে খুচরো পাপের মতো দৌড়দৌড়ির সময়াভাব মিলিয়ে মিশিয়ে হুপার জমতে শুরু করে। সেটি এখন গোকুলে বেড়ে বেড়ে সাইকেলের টায়ারে পরিণত হয়েছে। লোককে যতই বয়সের আর গোলমরিচ চুল দাড়ির দোহাই দিয়ে সমৃদ্ধির লক্ষণ বলে হাওয়া নিই না কেন, সমস্যাটা সমস্যাই!

বয়ঃসন্ধিকালে তিন ধরণের চেহারা আছে বলে জেনেছিলাম- এণ্ডোমর্ফ, এক্টোমর্ফ আর মেসোমর্ফ। তত্ত্বকথায় না গিয়ে এ তিনটি শ্রেণীবিভাগ হল আবলু গাবলু চেহারা, যারা কিস্যু না খেয়ে ক্রমে ক্রমে ফুলতে থাকে, একটা মস্তানি মাস্কেল মার্কা চেহারা আর আরেকটা সেই পটল চেরা চেহারা। এই শেষের যারা তারা সমৃদ্ধ হলে নেয়াপাতি ভুঁড়ির অধিকারী হন। যাদের পিছন থেকে দেখে কিচ্ছুটি বোঝার উপায় নেই কিন্তু সামনে এক ঝুড়ি টোপা কুল কোঁচড়ে করে ধরে নেওয়া থাকে।

পৃথিবীর ইতিহাসে কখনই পিজ্জা এবং পরোটার মধ্যে লড়াই হয় নি! যে যার এলাকায় শের। সমস্যাটা হয় মাঝখানের মেসোমর্ফদের তাদের একটু বেনিয়ম করলেই টাওয়ারে হাওয়া ভরে একেবারে কুম্ভকর্ণ। তার উপর যদি কারুর দাঁতে মিষ্টির ছোপ লেগে থাকে। মিষ্টি খাওয়ার গল্প বলতে শুরু করলে এ আর কুট্টি ফিসফাস থাকবে না, একেবারে আঠারো পর্ব হয়ে দাঁড়াবে। তবু এক দুইখান না বলে পারি না।

এক বিয়েবাড়িতে আমরা জনা কুড়ি বন্ধু মিলে বসে এক ব্যাচে সাড়ে তিনশো রসগোল্লা সাবড়ে দিয়েছিলাম। আরেক নেমন্তন্নবাড়িতে আমার আরেক সিড়িঙ্গে মার্কা বন্ধু একটু টান্টু অবস্থায় কম্পিটিশন করতে নামে, তা রসগোল্লাগুলো ছোট ছিল, বলে সে ছাপ্পান্ন আর আমি আর দুই বাড়িয়ে আটান্নে শেষ করি। মুঝসে পাঙ্গা? তা পেটের উপরি তল অতিরিক্ত ঠুসে গিয়ে ফুলে যাবার পর বেলেঘাটা থেকে এক ঘণ্টা হেঁটে বাড়ি ফিরে হজম করে ফেলেছিলাম। তা সে ছিল ত্রেতা এবং দ্বাপর যুগের গল্প এখন একবিংশ শতাব্দীতে মেটাবোলিজমের কুড়িটা চৌদ্দ বেজে গেলেও জিভের সাইজ তো কমে নি! তাই বাড়িতে মিষ্টি কিনে না রাখা এবং স্কুটার থামিয়ে ঠেলে নিয়ে হেঁটে যাওয়া জাতীয় প্র্যাক্টিকাল কসরত করতেই হয়।

হ্যাঁ, শেষোক্ত ব্যাপারটা পাঠক পাঠিকারা ঠিকই শুনেছেন। এতদিনে নিশ্চয় বুঝে গেছেন যে আপনাদের সাধের ফিসফাস লেখকের একটা আর্মেচারের কোয়েলে গোলমাল আছে। অ্যাক্সিডেন্ট হবার পর থেকে দৌড়ানোর উপর হাত পড়েছিল কিন্তু হাঁটার উপর তো নয়। কিন্তু আপনাদের তরুণ তুর্কী গুড়ের মুর্কি লেখক হাঁটা আর বুড়ো হওয়াকে সমার্থক মনে করে। তাই নিত্য নতুন ইনোভেশন। সেই তখনকার দিনে প্রচারে দ্বিতীয় আর প্রভাবে দ্বিতীয় সংবাদ পত্রে কমিক স্ট্রিপ আস্ত মাকড়সার দুর্দান্ত কীর্তি। তা সেখানে পিটার পার্কার গুণ্ডাদের সঙ্গে ‘ডিল’ করতে গিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় তাদের দুইখান হাজার সিসির বাইক দু হাতে অবলীলাক্রমে তুলে পাশে সরিয়ে দিয়েছিল এই বলে যে, “কথা বলতে অসুবিধা হবে এগুলো থাকলে!” ফল কি হয়েছিল তা বলার অপেক্ষা থাকে না।

কিন্তু বিষয়টা মনের মধ্যে গেঁথে গেছিল এবং ক্রমে ক্রমে সঠিক অ্যাপারেটাসের অভাব ঢাকার জন্য কখনো বাইস ইঞ্চির সাইকেল কখনো ভরাপেট সিলিন্ডার নিয়ে মাস্কেলে তা দিয়ে গিয়েছি। কিন্তু তাতে কি টায়ার ফুটো হয়? তাই সেই বছর দশেক আগেই আবিষ্কার করেছিলাম এই পন্থা। বিশেষ কারণে প্রতি সন্ধ্যায় যেতে হত বাইশ কিমি দূরে পঞ্চশীল এনক্লেভে। তা শীত গ্রীষ্ম বর্ষা মেহনতি ভরসা করে স্কুটার একুশ কিমি চালিয়ে বাকি এক কিমি একশো পনেরো কিলো ওজনের স্কুটার ঠেলে নিয়ে যেতাম। অন্ধকার বলে বিশেষ লোকে পাত্তা দিত না। তাতে সারা শরীরের ওয়র্কআউটও হত আর জনগণের বোধগম্য পেট্রল বাঁচানোও হত।

কিন্তু বর্তমানে চারচাকা আসার পরে ব্যাপারটা প্রায় অবলুপ্তির পথে চলে যায়। তাও বছর চারেক আগে আনন্দ বিহারের ফ্লাইওভারে ছড়বার সময় একটু বেশী খাওয়া মিষ্টি হজম করার জন্য এই রাস্তাটা নিয়েছিলাম। ঠেলে ঠেলে ফ্লাইওভারের আরোহণে এক কিমি মুখের কথা নয়, পাপদোহনের জন্য যথেষ্ট। বেশ হাঁসফাঁসিয়ে মাঝামাঝি গেছি এমন সময় একটা বাইক এসে থামল পাশে। “বন্ধ হো গয়া?” মুচকি হাসলাম। “পেট্রল নেহি হ্যায় কেয়া?” আবার মুচকি হাসলাম। কিন্তু সে নাছোড়বান্দা। অবশেষে সম্পূর্ণ সুস্থ টকটকে নতুন বাইকে বসে ঠ্যাঙ দোলাতে লাগলাম আর সে পরোপকারী মানবদরদী কষ্ট করে ঠেলে ঠেলে নিয়ে গেল ফ্লাইওভারের মাথায়। তারপর ভালমানুষের পো আমায় জিজ্ঞাসা করল “আব কোই তকলিফ তো নহি হোগা?” আমি কতবেলের মত মুখ করে বললাম, “তকলিফ কিস বাত কি? শুক্রিয়া” বলে স্টার্ট বাটন টিপে তার সংক্রান্তির রসবড়ার মতো চোখের সামনে দিয়ে বাইক চালিয়ে বাড়ি চলে এলাম।

কিন্তু বিবেক বলে তো একটা বস্তু আছে? অন্তত আসতে যেতেই যখন বিবেক বিহার পড়ে তখন তার কামড় কচ্ছপের মতই চেপে বসে বুকের উপর। এতদিন তাই সে সব পন্থা শিকেয় তুলে সাপ ব্যাং টিকটিকি জড়িবুটি হুপহাপ রামদেব রবিশঙ্কর সব পন্থাই চালিয়ে গেছি। কিন্তু সেই কথায় আছে না স্টেরয়েড একবার নিলে আর কিছুতে সারে না। তার প্রেমে যে একবার মজেছে সে কি আর আধুনিক ইন্টারনেট এসএমএস-এর হাইটেক রোমান্সে গোঁত্তা খায়? তাই টায়ারটা যখন সাইকেল থেকে মপেডের দিকে যাচ্ছে তখন আবার সেই পদ্ধতি অবলম্বন করতে মন চাইল।

এবারে আনন্দবিহার যাবার রাস্তায় ফ্লাইওভারের উপর চড়তে গিয়ে ঠেলতে শুরু করলাম বাইক। বেশ ঘাম বেরনো চর্বি ঝরানো হন্টন হচ্ছিল। কিন্তু দিল্লী তো দিলওয়ালো কা শহর। প্রয়োজনে কেউ আপনার জন্য থামবে না কিন্তু অপ্রয়োজনে মগজমারি করতে সবাই এগিয়ে আসবে। মাথার কাছাকাছি প্রায় পৌঁছেই গেছি, ওমা হঠাৎ করে দানবীর কর্ণের মতো একটি ছোকরা বাইক দাঁড় করিয়ে আবার সেই কথা জিজ্ঞাসা করল, “দে দু ধাক্কা?” চার বছরে অভিজ্ঞতা বেড়েছে চার কিমি। তাই এবার তড়বড়িয়ে বলে দিলাম “না না উপর যাতে হি চালু হো যায়গা!” আর শেষ দশ বারো কদম হুড়মুড়িয়ে এক প্রকার দৌড়িয়েই মাথা পৌঁছেই বাইক স্টার্ট করে দিলাম। ছোকরার পাশ দিয়ে যাবার সময় বললাম, “দেখা?” তারপর তার সন্দেহ বিজড়িত চোখের দিকে না তাকিয়েই পোঁ পাঁ পগার পার।

পাঠক পাঠিকারা, এই যে এই আখ্যান পড়লেন এরপর পথে নেমে পত্রপাঠ ভুলে যাবেন খুচরো ভুল মনে করে। ফিসফাস লেখকের মতো চিড়িয়াল চীজ কালে ভদ্রে একটাই পাবেন! তাই রাখাল বালকের গল্প মনে রেখেও পথে ঘাটে বিপদে আপদে পড়া মানুষকে সাহায্য করতে একটু এগিয়ে যাবেন। কোচিং-এর তাড়া, গার্লফ্রেণ্ডের খাঁড়া আর পোনা মাছের চারা আবার হয়তো পাওয়া যাবে কিন্তু সেই আত্মশ্লাঘা অনুভবের মূহুর্তগুলো কেন জানি না ফিরে আসে না কখনো। মাহেন্দ্রক্ষণ বলে কথা। হুঁ হুঁ বাওয়া! যাই হোক দেখলেন তো সেই আমের গল্প শোনাতে গিয়ে আমড়ার আচার করে ছাড়লাম। আমেন।

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ দুটো হিন্দিভাষী রবীন্দ্রপ্রেমীর গল্প। যারা “ম্যায় খিলাড়ি তু আনাড়ি”ও রাবিন্দ্রিক উচ্চারণে গান। তাঁদের একজন নতুন নতুন দিল্লী আসার পর সহকর্মীর কিউবিকলে বসে আড্ডা দেবার সময়, সহকর্মী বাইরে গেলে তার বাড়ি থেকে আসা ফোন কলের উত্তরে বলে বসেন, “ও তো আভি হামারে বিচ মে নহি রহে!” আর একজন বঁটি কিনতে গিয়ে দোকানদারকে বোঝাতে বসেন, “ও জো শোয়া রহতা হ্যায় ফির খাড়া হোতা হ্যায় ফির কাটতা হ্যায়!” এবং তার উত্তরে দোকানদারের কাছ থেকে শুনে বসেন, “কেয়া চাহিয়ে? সাপ?” বোজো কাণ্ড

প্রঃ পুঃ১ “আরে ভাই বীচ তো সাইড মে হোতা হ্যায় তো ফির উসকো বিচ কিঁউ কহতে হ্যায়?”

4 thoughts on “(৯৮)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s