(৯৯)

পাঠক পাঠিকারা, ধরা যাক আপনি তালে গোলে মালে অফিস বেরোতে দেরী করে ফেলেছেন এবং সাড়ে নটার সময় নিজের লাল টুকটুকে স্পার্ক চালিয়ে বিকাশ মার্গ এক্সটেনশনের পথে আনন্দবিহার দিয়ে যাচ্ছে এমন সময় ফোন এল আপনার বসের। এমন জায়গায় যে আপনি গাড়ি সাইড করতেও পারবেন না আবার বস বলে ফোন ফেলে দিতেও পারবেন না। অগত্যা না হয় বসের ফোন তুললেন এবং তাকে ভুজুং ভাজুং দেবার সময় দেওনন্দন ঝা নাম্নী এক সাব ইন্সপেক্টর এবং ভূষণ কুমার বলে এক কনস্টেবল হেলমেট পরিহিত অবস্থায় আপনার ডান দিক দিয়ে ওভার টেক করে আপনাকে থামাতে বলল।

তাইলে কি করবেন? সেই বিজ্ঞাপনের ছাতাছেঁড়া ব্যক্তির মত ভাববেন “বড় দেরী করে ফেলেছি ভাই!” নাকি নেমে আমি এর বাচ্চা তার বাচ্চা বলে তাবড় তাবড় নাম ফেলতে শুরু করবেন? গায়ে যদি আবার কমলা হাফ শার্ট থাকে তো কেয়াবাত মিয়াঁ!

নাকি সুবোধ বালকের মত সুর সুর করে ট্যাঁক থেকে লাইসেন্স বার করে মাশুল গুনবেন? সে রকম করতে পারেন কারণ পাপ মাথায় নিয়ে তো আর দিন গুজরান চলে না! তার চাপে বেঁটে হয়ে যাবার সমূহ সম্ভাবনা।

তা না হয় করলেন, কিন্তু তারপর যদি দেখেন দেওনন্দন বাবু আপনাকে আগামী উনত্রিশ তারিখ কারকারডুমা কোর্টে তোলার তাল করছেন তাহলে? তাহলে বরং আপনি ধীরে ধীরে আপনার জাল বিস্তার করতেই পারেন। হাজার হোক আপনি তো ফাইন দিয়ে ‘ইউ আর ফাইন, আই অ্যাম ফাইন’ বলে চলে যেতেই চেয়েছিলেন, খামোকা ব্যাটা আইন দেখিয়ে ফাইনাবস্থার দফারফা করতে গেল কেন? আপনি তাকে অনুরোধ করতেই পারেন যে ভাই ফোনে কথা বলার হাজার টাকা দিতে পারব না আপনি রেড লাইট জাম্পের একশত টঙ্কা জরিমানা করিয়া আপনাকে মুক্ত করে দেয় যেন।

কিন্তু বিধি বাম থাকলে সে আপনাকে পাঁড় অবধি ডিকশনে আরও বোঝাতে বসবে, ‘নহি নহি হামারে জুরিসডিকশন মে খালি লাইসেন্স লেকে কোর্ট ভেজনা হ্যায়!’

আরে মশাই কোর্টের চক্করে পড়লে তো একটা দিনই পুরো বরবাদ। কেন ফোনের হামি খাবার সময় মনে ছিল না তা? আরে বাবা সে তো বিভীষণই বলে গেছে চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। তা জ্ঞান বুদ্ধি বেড়েছে যখন যাও হাওয়া খাও!

না না তা কি করে হয়? আপনি তখন তাকে ভাল করে বোঝাবেন যে নতুন সরকার ২৬ তারিখে শপথ গ্রহণ করলে ২৯ তারিখ আপনি দম ফেলার সময় পাবেন না। সে সেয়ানা বলতেই পারে, “তো ফির কাল আইয়ে!” ভেস্তে যাচ্ছে দেখে আপনি হালকা হালকা করে মন্ত্রালয় বা পদের গল্পের মশলা ফেলে তাতে আবার একটু জল ঢেলে দিতে পারেন এই বলে যে, আমি কি এ সব বলে সুবিধা চাইছি?

তা দেওনন্দন এ সব অনেক দেখেছে। সে আপনার প্রতি পূর্ণ সম্মান বজায় রেখেই আবার বোঝাবে যে তার হাত পা বাঁধা, সেও তো আপনার কাছে কোন উপঢৌকন চাইছে না! তখন আপনি বিকল্প খুঁজবেন, বলবেন, “আরে আগে রাস্তে মে ট্রাফিকবালা খাড়া মিলেগা, চলো সাথ মে যা কে উসে পেমেন্ট করকে আতে হ্যায়।”

তা সে গেঁতো শুনবে কেন? সে জোর করবে, “আরে উনকা জুরিসডিকশন অলগ হ্যায়! আপ কেয়া আপকা মন্ত্রালয় ছোড়কে দুসরে মন্ত্রালয় মে যাকে কাম করকে আওগে?” আপনার বুকে টং করে লাগবে! বল ব্যাটা কি বলবি? তখন আপনিও বলবেন, “আগর জরুরত পড়ে তো ও ভি করনা হো গা!” আপনি যে কালকেই মোদিময় ভাষণ শুনেছেন, “দেশকে লিয়ে কুছ ভি করনা পরে তো পিছে নহি হটনা!” টাইপের ভাষণ।
তারপর, আপনি ঘুরে ফিরে এই ওই তাই বলে বলবেন কোন সা থানা? সে হয়তো বলল, আনন্দবিহার! তা আপনি তখন প্রস্তাব দেবেন যে। “চলো ওহা যা কে ভর কে আতে হ্যায়!” যেন এদিকে রোদ্দুর আসছে চলো ওই ঘুপচিতে গিয়ে বসি!

তা সে দেওনন্দন ঘাঘু মাল, সে আপনাকে বড় ছোট, উঁচু নীচু, ভুল ঠিক, ট্রাফিক পুলিশ খাঁকি পুলিশ ইত্যাদি নিয়ে গল্প জুড়তে আরম্ভ করবে। ব্যাস এই সুযোগটাই তো চাইছিলেন। আপনিও তখন যেন একটু একটু গলে আসছেন এইভাবে আলোচনায় যাবেন, ওদিকে ঘড়ির কাঁটা বয়ে যায় তো যাক। আড়চোখে দেখবেন ভূষণ কুমার উসখুস করছে কি না। করলেই তো ব্যাস ঘড়ি আপনার দিকে ঘুরতে শুরু করেছে।

কিন্তু দেওনন্দন পাতায় চলা পুলুশ! সে তখন আপনার নাম ধাম কাম সব লিখে নিয়ে কোর্টের নোটিশ পাঠাতে তৎপর হয়ে উঠবে। আপনি তখন যেন বাধ্য নাগরিক। বলবেন যে, “কব যানা হ্যায়?” “কাল আইয়ে, ৪ বাজে!” “৪ বাজে? ১১ নহি হো সকতা?” “আরে ম্যাজিস্ট্রেট কেয়া আপকা শকল দেখকে বয়ঠেঙ্গে?” সত্যি তো! তারপর আপনি যেন মেনেই নিয়েছেন বলে লাইসেন্স এগিয়ে দেবেন, কিন্তু আহ্লাদী গলায় বলবেন, “আরে মোবাইল পে বাত কর রাহা থা মত লিখো! লিখো রেড লাইট জাম্প কিয়ে থে!” এই নিয়ে মিনিট তিনেকের চাপান উতোরে দেখবেন ভূষণ কুমার ছটফটিয়ে যাচ্ছে।

শেষে সেই বরাভয় মূর্তি হয়ে আপনাকে অভয় প্রদান করবে, “আরে স্যার আপ যাইয়ে, কোই চালান নহি ভেজেঙ্গে”! আপনি অবশ্য তখনও সৎ নাগরিক, “নহি নহি গলতি কিয়া তো ভুগতনা পড়েগা হি না?” এবারে সেই হাত জোড় করে আপনাকে অনুরোধ করবে, “স্যার আপ যাইয়ে প্লিজ! ভরোসা রাখখিয়ে কোই নোটিশ নহি ভেজেঙ্গে।” এর পর চলে আসবেন মাথা নাড়তে নাড়তে যেন কতই না অন্যায় হোল! তারপর গাড়ি চালিয়ে তাদের পাশ কাটিয়ে যাবার সময় থ্যাঙ্কু বলে নাম জানতে ভুলবেন না! আপনিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচবেন, আর তারা তো বাঁচবেই।

এই যে উপরোক্ত টোটকা দিলাম তা ব্যবহার করতেই পারেন। তবে কি না আক্কেল দাঁত তো সকলেরই গজায়! সেই ভরসায় বলি, আইনকানুন তৈরী হয় যাতে অধিকাংশের সমান অধিকার থাকে। তাই সেগুলো একটু মেনে চলুন। গাড়ি চালাতে চালাতে মোবাইলের হামি খাওয়া বন্ধ রাখুন! আর খুব জরুরী হলে গাড়ি পাশে দাঁড় করিয়ে কথা বলে নিন। কে জানে, বিপদ কোথায় ওঁত পেতে থাকে!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ বসকে কেন দেরী হল, তার ব্যাখ্যা দিতে দেখবেন কোন অসুবিধাই হবে না! মামার পাল্লায় সবাইই এক বা একাধিক বার পড়েছেন। আপনার সহকর্মীরাও সহমর্মী হয়ে উঠবে।

Advertisements

4 thoughts on “(৯৯)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s