(১০০)


(১০০)
ছাব্বিশ নিয়ে আজকাল বেশ ঠাট্টা মশকরা চলছে নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ছাব্বিশে মে শপথ নেবার পর থেকেই। ছাব্বিশে ডিসেম্বর সুনামি, ছাব্বিশে নভেম্বর মুম্বইয়ে উগ্রপন্থী হানা আর সবকিছুর মতই অক্টোবর ছাব্বিশ, ২০০৯-এ যখন ফিসফাস শুরু করেছিলাম তখন কেউ কেন আমিই ভাবতে পারি নি যে ফিসফাস সেঞ্চুরী করবে। বস্তুত শচীন তেন্ডুলকরও খেলা শুরুর সময় শচীন হবে বলে খেলা শুরু করে নি। আর আমি তো কোন ছাড়।

গত সাড়ে চার বছরে ফিসফাস বই হয়ে বেরনো থেকে শুরু করে ফিসফাস লেখকের জীবনে অনেক কিছুই ঘটে গেল যার সাক্ষী পাঠক পাঠিকারা রয়ে গেলেন। আজ ফিরে দেখার পালা, অথবা এগিয়ে চলার পালা।

শুরুর দিকের ফিসফাস পড়ে একজন সুহৃদ বলেছিলেন যে তারাপদ রায়ের ছায়া আছে। সত্যিইতো তারাপদ রায় যে ছায়া দিয়েছেন তা পরশুরাম আলী সাহেব আর সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ে চুবিয়ে নিয়েই তো আমাদের ভেসে যাওয়া। অন্ধকার রাতেও যদি লাইটহাউসগুলো ঠিক ঠাক আলো দেয় তাহলে তো লক্ষ বিচ্যুতিতেও লক্ষ্যচ্যুত হবার সম্ভাবনা থাকে না।

প্রথমে ভেবেছিলাম লিখবটা কি? রম্যরচনা তো হাজারে হাজারে পাতে পড়ে। পরে ভেবে দেখলাম, শেক্ষপীর বলে গিয়েছেন জীবনটাই রঙ্গ মঞ্চ। ঠিক ঠাক স্ক্রিপ্ট থাকলে রম্যরচনার অভাব হবে না। তাই হরলিক্স।

ফিসফাস নিরেনব্বুইতে বারবার ফিরে এসেছে মামা ভাগ্নে সংবাদ। সেই যে সেই অমর পঙক্তি “ওগো আমার পুলিশ আমায় আলতো করে তুলিস”। একঘেয়ে না হয়ে যায় বলে কত কত মামাসংবাদ যে ছেড়ে দিয়েছি।

এই তো দু দিন আগে। ছেলেকে নিয়ে ক্রিকেট কোচিং থেকে ফিরছি। ইউটার্ণ বন্ধ সাইনটা গাছের আড়ালে চলে গিয়ে দেখাই যায় না। ঘুরতেই ধরলেন। মামা ধরলে তো শুধু রিপোর্ট কার্ড দেখেই সন্তুষ্ট থাকেন না। মলাট ঠিক আছে কি না, পেনসিল ছোলা আছে কি না রবার ময়লা কি না হাজারো প্রশ্ন। শেষে একটু উষ্মা প্রকাশ করতেই বড়মামার কাছে নিয়ে গেল। মিনিট দুয়েক আলাপের পরেই তাঁর মনে হল আমাকে নাজেহাল করা ঠিক নয়। কিন্তু ছেলে দেখছে যে গাড়ির জানলা দিয়ে শরীর বার করে, ফক্কিবাজী তো চলবে না। তাই বললাম না চালান কাটতেই হবে। না হলে ছেলে কি শিখবে? (যত্ত ড্রামা) তখন কি খুশীই না হলেন সেই ফোঁটা কাটা বড় মামা যে কি বলব। যতক্ষণ লাগলো আমার নূন্যতম চালান কাটতে ততক্ষণে তাঁর হাঁড়ির হালহকিকত আমার নখ দর্পণে। আহা মামারাও তো মানুষ। কংসকে মনে পড়ে?

দিল্লি শহরটার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ঠিক কালোজিরে আর কাঁচালংকা-র (আরে অনেক তো হল সেই কাঁচকলা আর আদার গল্প এবার একটু অন্য রেসিপিতে যাই না বাপু)। মানে আলাদা থাকলেও ক্ষতি নেই আবার একসঙ্গে হলেও মনের শান্তি প্রাণের আরাম। পনেরো বছর পরেও শহরটা যেমন আমায় গিলে খেতে পারে নি, তেমন এত দিন ধরে সহবাস করতে করতে, শহরের নাক ডাকা বা ‘ব্যাঁও’ শব্দে ঢেঁকুর নিক্ষেপ সহ্যের সিলেবাসে ঢুকে গেছে। তাই আটচল্লিশেও আছি আবার মাইনাসেও আছি। নো নড়ন চড়ন। দিল্লিও বেশী ঘামায় না, জানে এই এক জান আছে যাকে জাঁতাকলে ফেললেও যা তা বলে বদনাম করবে না। তাই তুমিও ঠিক আমিও ঠিক। শহরটা বাড়ছে নিজের মত করে, কে জানে, আর বছর দশেক পরে হাতে হাত রেখে রজতজয়ন্তী সেলিব্রেট করব না আমরা?

প্রথম প্রেমিকাকে মনে আছে? সেই তন্বী ষোড়শী বা অষ্টাদশী যখন সদ্য যৌবনের প্রস্ফুটনে দমকা হাওয়ার মতো দুলে দুলে ফুলে ফুলে ঢলে পড়ত তখন হৃদয়ে হিল্লোল উঠত কি না এই প্রশ্ন ঘোর বাস্তববাদী তার্কিককে করলেও উত্তরে চোখ উদাস করা মুচকি হাসি ছাড়া কিছু পাবেন না। তা সে যতই এখন ডাল পালা এয়ার কন্ডিশন, এলসিডি সহযোগে আশি কেজির অ্যামেরিকান টুরিস্টারের জাবদা খাতা হয়ে যাক না কেন। প্রথম আলোয় ফিরে এলেই যেন প্রতিদিন সূর্য ওঠা সফল করে তোলে তার মুখ। সেই হল আমার কোলকাতা, কোন সে গত শতাব্দীর শেষ প্রান্তে শ্বশুরবাড়ি বাপেরবাড়ি খেলতে খেলতে প্রবাসী হয়ে যাবার পরেও, গত পনেরো বছরে চরিত্রের আমূল চিত্রোতপাটনের পরেও রোমান্সটা কিন্তু একই থেকে যায়। সেই ময়দান ছুঁয়ে, প্রিন্সেপ বাবু ঘাট ছুঁয়ে, বইপাড়ায় ঘুরে ঘুরে বাসা বাঁধে বুকের মাঝে। আমার কোলকাতা আমার সেই সদ্য যৌবনের প্রথম প্রেম। আমার প্রথম আলো- আলোড়নের সাথী। কলসীর কানাতেও তো প্রেম লেখা থাকে কি না?

যাত্রা পথের শরিক আমার, দুই এবং চার চাকা সাথী আর সঙ্গে থাকুক মেট্রো, ট্রেন ও উড়ো জাহাজের গল্প। এ গল্প তো শেষ হবার নয়। বারে বারেই ফিরে আসে টুকি দিয়ে টি দিয়ে যায় চাঁদমামা। ফিসফাসের মুক্ত হাওয়া তো পথে ঘাটেই লেখা। তাই এবারও কোলকাতা আসার সময় এয়ার স্টুয়ার্ড যখন তার বিমান সেবিকা দুই সাথীকে খাবার পরিবেশনের সময়, আরোপিতে ইংরাজিতে বলে ওঠেন, “আই উইল ডু ইট ফ্রম দ্য ফ্রন্ট, ইউ টু ওয়াচ দ্য ব্যাক” আর উত্তরও পান, “ভেরি ওয়েল, নো প্রবলেম”, তখন সে সব ঈশ্বরের অমোঘ বাণীর মতো স্থান পেয়ে যায় ফিসফাসের পর্দায়। অমরত্বের প্রত্যাশাহীন গল্পগাথায়।

খেলার মাঠের গল্প খুব বেশী আসে নি এখানে। আসলে কোথাও একটা জ্বালা থেকে গেছে- সফল না হবার জ্বালা। খুব কম বয়সেই মাঠকে সলাম নমস্তে করে দেবার জ্বালা। সেই জ্বালাগুলো তাই আমার গল্পে যতটা উঠে আসে, আমার গল্পগুলো মাঠে ততটা থাকে না। তবুও এই ময়দান, কল্যাণী, নৈহাটি শ্যামনগর লালগোলার সবুজ, দিল্লির ধুসর আমার ফুসফুস। চুপিসারে দুটান মেরে দিয়ে সারা জীবনের অক্সিজেন সঞ্চয়।

পথদুর্ঘটনায় হাঁটু মুড়িয়েও তাই ডবল ব্যাণ্ডেজ আর নিক্যাপের আড়ালে ফিরে ফিরে যাই, গালিতে দাঁড়িয়ে ব্যাটসম্যানের জীবনী শুষে নিতে বা অনায়াস ফ্লিকে অফ মিডলের বলটা মাঠের বাইরে ফেলতে গিয়ে ব্যাটের রামকাহিনীতে আর আর্মারের জোরে অ্যাবডোমেন গার্ড ফাটিয়ে দেবার আস্ফালনে। এখানে আমার গল্প কম কিন্তু রাংতার মোড়ক ঝকমকিয়ে ওঠার সেই ছোট্ট ছোট্ট আনন্দ বুক ভরিয়ে দেয়। এক টুকরো জাফরানে এক হাঁড়ি বিরিয়ানীর বর্ণ গন্ধ বদলানোর মতো।

বিরিয়ানীর কথা বলতেই মানেকা গান্ধীর পশুপ্রেমের মতোই আমার খানদান মনে পড়ে। অর্কুট ফেসবুকে যাঁরা আমার সঙ্গে কাটাকুটি করেছেন তাঁরা খানদানের খানদানী অ্যালবাম দেখে জিজ্ঞাসাও করেছেন। হ্যাঁ রে এটা কথা থেকে তুলেছিস? নিজে রান্না? কি জানেন তো? ফুটবল, কবিতা, ওয়াইন বা ছবি আঁকার মতই রান্না একটা আর্ট প্লেজারের চরম পর্যায়ে ঘোরাফেরা করে। শুধু রান্না নিয়েই একটা ব্লগ লিখব বলে একবার খুব পাঁয়তারা কষলাম। কিন্তু সব কথা কি মুখে বলা যায়? সব প্রেম কি চিঠি লিখে বোঝাতে পারেন? বলতে পারেন ঠিক কতটা ভালবাসেন তাকে? পারলে আপনি ঈশ্বর আর আমি সাধারণ কেরানী।

তা কেরানীরও বিরিয়ানীর সখ থাকে, আমারও। সত্যি, বিরিয়ানী যারা পছন্দ করেন না তাঁরা ব্যক্তিগত পছন্দের সঙ্গে আসলি বিরিয়ানীর মিশেলটাই ধরতে পারেন না হয়তো। হ্যাঁ ব্যক্তিগত পছন্দ তো থাকতেই পারে কিন্তু বলুন দিকি চাল, আলু, ডিম, মাংস, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, পুদিনা, ধনেপাতা কাঁচালংকা আর মাথা ঘোরানো সব মশলাগুলোর স্বাদ গন্ধ যদি ঐকতানে বুকের মাঝে সেতারের মুর্ছনাই না তুলল তাহলে সে আর বিরিয়ানি হল নাকি? মাংসের তেলে ভাত ভাজা টাইপের থার্ড ডিগ্রীর খাবার হয়েই থেকে গেল। সে যা হোক ব্যক্তিগত পছন্দ এবং অভিজ্ঞতার কথাই তো। তো আপনি ধরে ধরে উচ্ছে চিবোন না কে বারণ করবে (জনান্তিকে জানাই, আমার প্রিয়তম সবজি কিন্তু সেটিই)।

আচ্ছা, এই বঙ্গ সংস্কৃতিটা খায় না মাথায় মাখে বলতে পারেন? বিদেশ বিভুঁইতে এলে আরও বেশী করে মনে হয় যে আমরা বাংলা মায়ের হ্যাংলা সন্তান। ট্রামে বাসে, বাজারে দোকানে অফিসে কাছারি বিল্ডিং টিং-এ একটু পরিচিত মায়ের ভাষা কানে ওডিকোলনের কাজ করে। প্রাণ ঠাণ্ডা মন ঠাণ্ডা হৃদয়ে গোবিন্দভোগ চালের পায়েসের গন্ধ ম ম করতে থাকে।

কিন্তু যেই সেই সংস্কৃতির চক্করে নিজের শহরটায় ফিরে আসি তখনই দেখি, কনভেন্ট এডুকেটেড বাঙালীদের দুর্ভিক্ষগ্রস্থ উচ্চারণ এবং ভাষাপ্রেম। একরাশ নাকউঁচু ইগোর তলা দিয়ে ফল্গু নদীর মতো সংস্কৃতি ধীরে ধীরে মাটির বুকে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তাই তো কোলকাতার বাঙালী নেমন্তন্ন বাড়িতে দাল মাখনি, নান পরাটা, শাহী পনিরের সমারোহ। পুঁইশাক চচ্চড়ি, ধোঁকার ডালনা, ছানার ডালনা আর কষা মাংসরা সেখানে ব্রাত্য। শিক্ষা ছেড়ে পর্যটনে।

প্রচণ্ড পরিশ্রমের পর বাঙালী ‘থকে’ যায় আর সামনা সামনি কথা প্রসঙ্গে মেয়ে কোথায় তার উত্তরে বলে ফেলি মেয়ে উলটে গেছে। বলে তার উলটি অর্থাৎ বমি পরিষ্কার করার জন্য ওয়েটার ওয়েটার চিৎকার করতে থাকি। আসলে কি জানেন, ভাষাটা বা পরিচিতিটা বা সমগ্র সংস্কৃতিটার রূপ পাল্টাচ্ছে। এক্ষুনি গেল গেল রব না তুলে দেখিই না ভাল না খারাপ। ভোকাবুলারি বাড়লে তো ভাষা সমৃদ্ধই হয়। সে প্রবাসেই হোক বা মিনিবাসে। ভাল ভাষা ভাল বাসা দেখেই ঘর বাঁধে। বললে হবে খচ্চা আছে না?

তা পাঠক পাঠিকারা-

খরচ নাকি খচর মচর?
জ্বলবে ঘামে লাগলে আঁচড়
চিরবিরিয়ে উঠবে পাড়া
মাথায় পড়বে ব্রাহ্মী শাক
স্যাটায়ার আর হিউ মারাতে
আরাম চেয়ার মন সারাতে
উঠবে বেজে ঢোল নাকাড়া
উঠবে বেজে সানাই ঢাক
বাজবে ফিসফাসেরই ঢাক।।

সোজা কথা বাঁকা সুর
চাঁটা মারা মোটা ক্ষুর
রোগা গলা টিংটিঙে
মনে প্রাণে বেদুইন?
যত হাসি তত ফ্যাঁচ
কেন কর ক্যাঁচ ক্যাঁচ
নেট ঘেঁটে পৌঁছাও
ফিসফাস ডট ইন
আহা ফিসফাস ডটইন

ছানা পোনা বউ সোনা
সব আসে ফিসফাসে
বেটা সওয়া বেটি পোয়া
সাজানো বাগান
বসন্ত বসতবাটি
উস্তাদি কালোয়াতি
ফিসফাসে সব আসে
গাও জয়গান
আহা গাও জয়গান

সত্যি কথাটা শেষে এসেই বলি। আসলে কি জানেন তো, অনেক দিন ধরে যদি ধরে রাখি যে একটা তাগড়া ডিম পাড়ব তাই একদম ঢোল কত্তাল চ্যালা চামুণ্ডা জুটিয়ে মোচ্ছব করতে গিয়ে শেষে যদি উটপাখির জায়গায় টিকটিকি বেরোয় তাইলে কি জুত সয়? তা দাদা সেঞ্চুরী করতে গিয়ে যদি আউটগোইং বলে খোঁচা দিয়ে বেঁচে যাই আর বল বাউণ্ডারী না হোক থার্ডম্যানে এক রান হলেও তো চলবে। এই ফিসফাসটাকে সেই রকমই ধরুন আর পচা ছড়াগুলোর জন্য ক্ষেমা করে দেবেন। এন্টারটেনমেন্টকে লিয়ে সব চলতা হ্যায়। হ্যায় না? বোলো বোলো?

9 thoughts on “(১০০)

  1. পড়ে ভাল লাগল। সেঞ্চুরির জন্য অভিনন্দন। কিছুদিন আগেই আপনার ব্লগ ফলো করা শুরু করলাম (৯৭ থেকে)। এর আগের গুলো সময় বার করে পড়তে হবে।

    Like

  2. আরেকটা কথা – ‘ কনভেন্ট এডুকেটেড বাঙালীদের দুর্ভিক্ষগ্রস্থ উচ্চারণ এবং ভাষাপ্রেম‘ — এটা একেবারে লাখ কথার এক কথা। এদের বাঙলা শুনলে হাড়ের ভেতর জ্বালা ধরে যায়।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s