(১০১)


আলটিমেটলি নেহি নেহি করতে করতে মৌসুমী বায়ু প্রবেশ করেই ফেলল বলুন? তার উপর ছুটি কাটাতে কোলকাতায় বসে বসে মৌসুমী আকাশের স্মৃতিমেদুরতা, ইলশেগুঁড়ির চাদর, তাপমাত্রার হালকা ভাব, ছাতায় ছাতা মহানগরের রংহীন সৌন্দর্য্য, আর সবুজ সবুজ আর সবুজ। সব মিলিয়ে গত শতাব্দীর দিনগুলোতে ফিরে যাচ্ছি যেন। সেই কোন সুদূর কালে আমিও তো এই শহরেরই ছিলাম। আজ রোমিং-এর বাসিন্দা হবার পরেও এখনো টান খুঁজে ফিরে ফিরে আসি।

রোমিং বলতে মনে পড়ল, আমার ফোনটি গিয়াছে। মানে গিয়াছিল… আজকের হাইটেক যুগে সবই তো ফিরে আসে নতুন রূপে নতুন বেশে। তবুও প্রথমবার যখন বিদায় নেয় তখন বুকের নীচে একটা ছ্যাঁত করে আওয়াজ তো হয়ই।

শহরে এখন নতুন ট্যাক্সি, নো রিফিউজাল। হাজার খানেক নো রিফিউজাল ট্যাক্সি বাজারে ছাড়া হয়েছে, যার লাইসেন্স ফি মকুব করে দেওয়া হয়েছে। তার মানে আর বাকি হলুদ রঙ-এর বা হলুদ কালো কচ্ছপগুলো সারা শহর জুড়ে ঘুরে বেরায় যার সংখ্যা হাজার তিরিশেক সেগুলো কি রিফিউজ করার লাইসেন্সপ্রাপ্ত? ট্যাক্সি মানেই কি নো রিফিউজাল হওয়া উচিত নয়? কলেজে পরার সময় এক স্টুডেন্ট লীডারকে প্রশ্ন করেছিলাম, “এই যে তুই যে সব কাজগুলো ইউনিয়ন করেছে বলে গলা ফাটাচ্ছিস, সে কাজগুলো করাই কি ইউনিয়নের কাজ নয়? তাহলে আলাদা করে মাইলেজ নিচ্ছিস কেন?” সেদিনও উত্তর ছিল না আজও নেই।

যাই হোক, এবার নগর কোলকাতায় আমি দুইখান জিনিস ট্যাক্সির বুকে হারিয়ে এসেছি। একটি আমার পিতৃদেবের প্রাচীন প্রবাদের মতো মিশকালো ছাতা যেটি সল্টলেক সিটি সেন্টার যাবার পথে ট্যাক্সিতে ফেলে বেরিয়ে এসেই ফের ধাওয়া করে ধরতে গিয়ে দেখলাম সব ট্যাক্সিকেই এক রকম লাগছে। আর অপরটি আমার মোবাইল। সখ করে আমার পার্শ্ববর্তিনীর দেওয়া চলমান মুঠোফোনটিকে হঠাৎ বৃষ্টিতে মেয়েকে ছাতায় মুড়ে নিয়ে আসতে গিয়ে ট্যাক্সিতে ফেলে চলে এলাম গত সোমবার। তারপর অ্যান্টি থেফট সিস্টেম চালু করেও সারা দিল না সে। সব শুনে আমার এক বন্ধু বলল কাল, “এই জন্যই তো বিল নেওয়া উচিত ট্যাক্সি থেকে!” হ্যাঁ, যেন আগে থেকে জেনে বসে আছি তো যে ‘এই সেই ট্যাক্সি যেখানে আমি আমার মোবাইল হারাবো!’ (ভার্জিন মোবাইল বলে একটা মোবাইল পরিষেবা ছিল না?)

যাই হোক, সকাল হতেই কাগজপত্র গোছাগুছি করে চললাম স্থানীয় থানায়। যে থানায় সেই পনেরো বছরেরও বেশী আগে গেছিলাম চাকুরীর শুরুর ভেরিফিকেশনের ফিকিরে। এতদিন পরেও বাহ্যিক রূপ থানাটার পালটায় নি। সঙ্গে ছেলে ছিল, সে এখন কদিন ধরে ফেলুদা পড়ছে। থানায় ঢুকে বেশ একটা রহস্য রোমাঞ্চ অনুভব করতে শুরু করল। আমায় ফিসফিস করে বললও, “লাইফে ফার্ষ্ট টাইম থানায় ঢুকেছি”।

তা ছোটবাবু আমায় স্বভাবমতো চাটতে শুরু করলেন। “মোবাইল হারিয়েছেন? কাগজপত্র এনেছেন?” এও সেই ট্যাক্সির বিলের মতো কথা বলে রে! আরে মশাই আমি শহরে এসেছি কি মোবাইল হারাব ধরে? “না আমাদের উপর নির্দেশ আছে!” নাছোড়বান্দা তিনি, আমিও। মেজবাবুকে ধরে বোঝাতে, সে তরুণ তুর্কী বুঝে গেল। আমি তাকে বললামও আপনাকে মোবাইল খুঁজে দিতে হবে না। খোঁজার হলে সে আপনিই আমায় মেল করবে। (অ্যান্টি থেফট প্রযুক্তি বলে কথা) শুধু ডাইরি করে নম্বরটা দিন আমার সিমকার্ডটা উদ্ধার করি। অতঃপর দ্রুতই পুলিশের ছাপমারা কাগজ নিয়ে ছুট লাগালাম ম গা রোডের এয়ারটেল পরিষেবা কেন্দ্রের পানে।

ভাস্কর বলে একটি খুব মিষ্টি ছেলে আমায় অনেক হ্যাঁচড় প্যাঁচড় করে বলল যে, পার্ক স্ট্রীটের পরিষেবা কেন্দ্রে দিল্লির পোস্টপেড সিম কার্ড আছে। পার্ক স্ট্রীটের কাছেই তো ভারতীয় যাদুঘর!

গেলাম- পরিচয় পত্র, ঠিকানা, ছবি সব নিয়ে বাবু কহিলেন, ‘বুঝেছ উপেন, আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে তোমার ফোন চ্যাঁ ভ্যাঁ করতে শুরু করবে। সিমকার্ডটি পকেটে পুড়ে গেলাম ছেলে বগলে লালবাজার। তুমুল বৃষ্টির মধ্যে গাবা মোবাইল স্টোরের ভুজুং ভাজুং পেরিয়ে একই মোবাইল বগলদাবা করে বাড়ি ফিরলাম। ধীরে ধীরে নম্বরগুলো গুগল মেঘ থেকে উদ্ধার করা গেল। ফোন ছুটতে শুরু করল ইতিউতি, “এটা নতুন নম্বর?” “ওমা সিম হারিয়ে গেলে তো নতুন নম্বরই হয়!” না না নতুন সিমে পুরনো নম্বর পুনরুদ্ধার করা হয়! “যাঃ তা হয় নাকি?” ইত্যাদি এবং প্রভৃতি।

দুদিন এদিক ওদিক কাজে অকাজে কেটে গেল! কাঙ্ক্ষিত সময় আর আসেই না। যতবারই মোবাইল খুলি, “পরিষেবায় অনুপস্থিত”-এর পোঁ বেজেই চলে। শেষে বাহাত্তর ঘণ্টার মাথায় আবার ফিরে গেলাম ম গা রোডের কেন্দ্রে।

ভাস্কর খুব মাই ডিয়ার ছেলে। সঙ্গে সঙ্গে নিজের ল্যাপটপ খুলে দেখিয়ে দিল যে আপনার আবেদন না মঞ্জুর হইয়াছে। আপনার ঠিকানার প্রমাণ পত্র পঠনযোগ্য নয়। আহা এই কথাটি আমাকে আগে জানালে না বাবা? উচিত হয় নি! আমি তাকে বোঝাতে বসলাম- আমার তো পোস্টপেড। ঠিকানা নিয়ে কি করবে বাবা। পরিচয় নিশ্চিত কর! আমিই সেই ব্যক্তি কি না! যে হারানো নম্বরটি ব্যবহার করে! ছেলেটি বুদ্ধিমান চট করে বুঝল। তারপর বলল আপনার লাইসেন্স এনেছেন? হ্যাঁ অফ কোর্স! তবে ইউ পির লাইছেন কি না? জালিয়াতি এড়াতে এরা এমবস করিয়ে বানায়। ফটোকপি করা সম্ভব হয় না। স্ক্যান করে দিচ্ছি! বিকালে চার ঘণ্টা পরে ফোন করবেন প্লিজ।

দুপুর গড়িয়ে বিকেলে, ফোন- ও হ্যাঁ, স্যার আপনার সিম কার্ডটায় সমস্যা আছে। আপনাকে আবার পার্ক স্ট্রীটে ফিরতে হবে। অগত্যা, মৌসুমী পুলওভার আর ইলশেগুঁড়ি চাদরে মুড়ে গেলাম মেট্রো চড়ে পার্ক স্ট্রীটে ফিরে। হাতে হাতে সিম। রাত দশটার মধ্যে কাজ করতে শুরু করবে।

আমি ফিরে এলাম গিরীশ পার্কে। ইন্টেন্সিটি বেড়েছে সিটিটার, বৃষ্টির অন্ধকারের মানুষের সকলের। ঘরে ফিরতে গিয়ে দেখি না বাস না অটো ওঠার মত অবস্থাতে কেউই নেই! রাস্তাই নেই এগিয়ে যাবার। ঢিকির ঢিকিরে বাবা আমার চিরকালীন অ্যালার্জি। এই পথ যদি না শেষ হয়।মার হাঁটা। মানিকতলা পর্যন্ত আসার পর শরীরের স্বেদও ফুরিয়ে যায়। ফাঁকা অটোর আগমনে ব্যাঘ্রলম্ফে প্রথম সীটটি দখল করে ফিরে এসে দেখি, যে সকল বাস আমি পিছনে ফেলে হাঁটতে শুরু করেছিলাম সেগুলো পিছনে পিছনেই আসছে।

ছাড়ুন সে সব কথা, কোষ্টা রিকা ইতালির ঘাড় মটকাচ্ছে। শেষ দশ মিনিট ঘড়িতে এগারো ছাড়িয়েছে কিন্তু আমার মোবাইল বাক্যহীন। ফোন লাগালাম পরিষেবায়, প্রিপেড ঘুরে পোস্ট পেডে যেতে লাগল পাক্কা সাত মিনিট। টোটকা নিয়ে ফিরে এসে দেখলাম কার্যোদ্ধার হয় নি। আবার ফোন লাগালাম। পারদ চড়ছে। একজন স্পষ্ট বলে দিল যে দিল্লির সিম এখানে অ্যাক্টিভেট করা সম্ভব নয়। গলা চড়ালাম। মাজাকি পায়া হ্যায়? সাত কাণ্ড রামায়ণের পর সীতার শ্বশুর ধৃতরাষ্ট্র! লাইনে এল পোস্ট পেড বাবাজী। তার হাজারো ল্যাঠা, নামের বানান ঠিকানার বানান শেষে বিকল্প নম্বরের বানান জিজ্ঞাসা করতে আমি একটু তোতলালাম! অত কি আর মনে থাকে ছাতা দশ বছর আগে কি নম্বর দিয়েছিনু! সে আমায় চার্জ করে! আপনি বিকল্প নম্বর বলতে পারছেন না তাহলে কি করে হবে বলুন! এবার সত্যিই নর্মদায় জল এল! ভাকড়ায় ভাঙন! আপনি পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করুন আমি আমার বায়োডাটা আপনাকে সবিস্তারে দিচ্ছি কিন্তু তারপর যদি আমার মোবাইলের আওয়াজ না শুনতে পাই তো আপনি কাল ভোরের সূর্য দেখবেন না! (মাস্টারমশাই, আপনি কিন্তু কিছু দেখেন নি!)

সারা বিশ্বের পরিষেবা অধিকারীদের দোষ হল, মধুর ভাষণ না শুনলে তারা বিশেষ পাত্তা টাত্তা দেয় না! আহা আপনাকেও তো সঠিক পরিষেবা কোড ব্যবহার করতে হবে! প্রয়োজনে তা দু অক্ষর থেকে চার অক্ষর পেরিয়ে ছয়েও যেতে পারে। আমি অবশ্য ভিন্ন কোড ব্যবহার করলাম। ভাষার কোড। বাঙালী হয়ে নিজের শহরে ফিরেও দিল্লির দোহাই দিয়ে আমি ফোন ব্যবহার করতে পারব না? কাজ হল ম্যাজিকের মতো। সে সব দেখে শুনে বলল, যান আপনার কাজ হয়ে গেছে! অফ করে অন করুন! ম্যাজিক সত্যিই! প্রায় চার দিন পরে আবার আমি নিজের মুঠোফোন পরিচিতি ফিরে পেয়েছি। এ যেন বিশ্বকাপ জেতার সুখ। আহা গোবরের পদ্মফুল যেন।

আজ তবে এই পর্যন্তই থাকুক! তবে কি না একটা কথা বলব পাঠকপাঠিকারা মাথায় রাখবেন! কলকাতায় দেখছি শুদ্ধ হিন্দি বললে বাংলাভাষীর থেকে বেশী কদর পাওয়া যাচ্ছে। বলতে গিয়ে মনে পড়ে গেল কদিন আগের কেকেআরের সরকারি সেলিব্রেশনের স্যাটায়ারখানা! শহরের ভাষা পাল্টাচ্ছে- ভাষা পাল্টাচ্ছে! বাঙালী এখন কলকাতায় সংখ্যালঘু! নগরবাসীরা একটু ভেবে দেখুন! মাথা বিকিয়ে গেলেও রোজকারের রোজগেরে জীবনের ফিকিরে যেন ভাষাটা সরস্বতী নদী না হয়ে যায়!

Advertisements

2 thoughts on “(১০১)

  1. কলকাতা গিয়েছ? অসাধারণ! 🙂
    লেখাটা দিব্য লাগলো, কাস্টমার সার্ভিস একটা আজব দুনিয়া, সবাই সামলাতে পারেনা, তুমি নরমে-গরমে হেব্বি সামলেছো। 😀
    বাংলা ভাষাটা দিনে দিনে কিরকম ভাসা-ভাসা হয়ে যাচ্ছে, এরপরে ‘দুষ্টু লোকের’ মতন একেবারে ‘ভ্যানিশ’ না হয়ে যায়!

    Like

    • না না চিন্তা নেই ভাষায় আপাত দূষণ থেকেই কিন্তু ভাষা সমৃদ্ধ হয়। টিকে যাবে। অন্তত আমার জীবদ্দশায়

      Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s