(১০২)

‘বন্ধু বিনে প্রাণ বাঁচে না
আমি রব না রব না গৃহে…’

বন্ধু কারে কয়? কারুর পেটে সয় কারুর পিঠে সয়। এসব ডেফিনেশন সংজ্ঞার মধ্যে না গিয়ে বরং আমরা গল্পের মধ্যে ঢুকে চলে যাই। নগর কলকাতা ছেড়েছি সেই কবে রামচন্দ্রের আমলে। কিন্তু বার বার ফিরে ফিরে যাই। খুঁটে নিই তিল তিল করে পড়ে থাকা ভালোলাগা ভালোবাসাগুলো। আর একটা উদ্দেশ্য থাকে বন্ধুবাসন। কোন মতে সবাই মিলে একত্রিত হতে পারলেই হল। দেশ কাল স্থান পাত্র ভুলে মহোল্লাসে মোচ্ছব।

আমার স্কুলের বন্ধুদের একটা খাসবুনোট গ্রুপ আছে যা ইণ্ডিয়াটাইমস চ্যাট আউটলুক অর্কুট পেরিয়ে এসে ফেসবুকে বহাল তবিয়তে বাসা বেঁধেছে। ফি বছর আমরা কোন না কোন অছিলায় একত্রিত হই আর বাজার খুলে বসে মিস্ত্রি মালিক খরিদ্দারের নামগান করে কলতানে মুখরিত করে তুলি আকাশ বাতাস। আমি কেমন করে জানি না বড় গেট টুগেদারগুলো ফসকে যাই প্রতিবার। তাই আমার জন্য পড়ে থাকে ছড়ানো ছিটানো। সত্তর আশির জায়গায় বড় জোর দশ পনের। তাই ইনস্টলমেন্টে আমার স্কুলজীবন বেরানো সমাধা হয়।

এবারো অন্যথা নয়। বার তিনেকের প্রচেষ্টার পরেও ফাঁক থেকে যায়। তাই বাকিটা ফেসবুকের ‘রামা হৈ’ দিয়ে ভুলিয়ে থাকা। যারা বহুদিন ধরে দূরে তাদেরও লস্যি টস্যি খাওয়া হয়ে যায়। তা এসব থেকেই গল্প উঠে আসে আর আমি সুবিধাবাদী ফিসফাস শিকারী, সেখান থেকেই তুলে নিই খান দুই তিন যা থাকে কপালে।

এক সদ্য চশমালব্ধ বন্ধু ক্লাস নাইনে পড়ার সময় ক্রিকেটে সহজতম ক্যাচ ফেলে অজুহাত দিয়ে ফেলে, ‘বুঝলি তো আসলে, চশমাটা অপটিকাল আর বলটা স্ফেরিকাল! তাই ম্যাচ না করতে পেরে ক্যাচ ফেলে দিয়েছি!’ সব কিছুই ঘুরে ফিরে আসে।

বললে বিশ্বাস করবেন না। আমিও প্রাকযৌবনকালে খুব মনোযোগ দিয়ে মাঠচর্চা করেছিলাম। একটু আধটু হাত ঘোরানো আর ব্যাট হাঁকড়ানো। তাই দিয়ে ফার্স্ট ডিভিশনটা হয়ে গেছিল বটে কিন্তু জীবনের যুদ্ধে ফেল না করে ফেলি বলে অন্য কিছু আঁকড়ে ধরেছিলাম। তবে কি না জানেন তো যা থাকার তা থাকে যা। যাবার তা যায়। খেলা থেকে চলে গেলেও খেলা আমায় ছাড়ে নি। দিল্লিতেও এই সেদিন পর্যন্তও ছিল গায়ের সঙ্গে লেগে। হাঁটু ঘুরিয়ে ব্যাণ্ডেজ ভূত হয়ে যাবার পরেও। তাই মাঠের বন্ধুদের সঙ্গেও ভরা বিশ্বকাপের বাজারে ঝিঁ ঝিঁ চর্চা করে গালবাদ্য বাজাই। আর নেটতুতো সাহিত্যতুতো বন্ধুরা তো আছেই। তারা আবার ডেকে রান্না করে খাওয়ায় আর বাইক করে বাড়িতেও পৌঁছে দিয়ে যায়।

কিন্তু বন্ধুত্বের একটি সুন্দরতম নিদর্শন আমার আশেপাশেই ঘোরাফেরা করছে গত বছর দুই ধরে। আমি দেখে দেখে আশ্চর্য হই। আজ মনে হল আপনাদেরও দেখানো দরকার। আসলে ভাল জিনিস একা খাই কি করে বলুন। হাজার হোক ফিসফাসের পাঠকপাঠিকারাও তো আমার পরিবার- আমার দ্বিতীয় বা তৃতীয় পরিবার।

আমার ছেলের একদম ছোট্টবেলার একটা বন্ধু ছিল। তার নাম ছিল রাজা। তখন থাকতাম দিল্লির আশ্রম বলে একটি জায়গায়। এটা নিয়ে একটা গল্পও আছে- মানে ওই আশ্রম নিয়ে। দুহাজার দুই নাগাদ ট্রেনে করে কোলকাতায় আসছি (এখন হলে বলতাম কোলকাতা যাচ্ছি! কিন্তু তখনও কোলকাতায় যাওয়াটা ‘আসছি’ই ছিল!) একা, একদল বয়স্ক লোকজন সহযাত্রী। একজন জিজ্ঞাসা করলেন, “কোথায় থাক বাছা!” “আশ্রম” শুনে চিন্তিত হয়ে পড়লেন তাঁরা- এত কম বয়সেই আশ্রমে? আহা! তা তাঁদের ধারণা বদলাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। সে যাক ফিরে আসি ছেলের কথায়। তা গাজীয়াবাদে চলে আসার পরে তারাও ফরিদাবাদের কোথায় যেন চলে যায়। খুঁজে পেতেও পাওয়া যায় নি। ছেলে আমার দুঃখজাগানিয়া- বলে না কিছুই। কিন্তু বন্ধুত্বের জন্য জান দিতে তৈরী থাকে।

ওর প্রাণের এক সহপাঠী হঠাৎ বাবার বদলির সূত্রে ত্রিবান্দম চলে গেল না বলেই। বেজেছিল তার বুকে। তাই বন্ধুত্বের খাতিরে নিঃস্বার্থ কাঙালপনা। বছর খানেক আগে আমার আদি শ্বশুরবাড়ি জামশেদপুরে যখন এসেছিলাম তখন আলাপ হয়েছিল তার বিট্টুর সঙ্গে। বিট্টুর গল্পটা আর পাঁচজনের থেকে আলাদা। ছেলেটা শুধুমাত্র পড়াশুনো করবে বলে বাবা মাকে ছেড়ে আমার শ্বশুরবাড়িতে থেকে গেছে। ক্লাস সেভেনে পড়তে পড়তেই সামান্য আয়োজন দিয়ে টর্চ বানিয়ে ফেলে।

এমনিতে হয়তো বলা উচিত নয়, তবে উদ্ভাবন আমার ছেলেরও মধ্যনাম। তাই আমে দুধে বেশ মিশে গেছিল তখন। ফোন বা হাতে লেখা চিঠিতেও যোগাযোগ ছিল ওদের। গতকাল এসে পৌঁছেছি জামশেদপুরে। আর গতকাল থেকেই জোড়া হেডলাইট আমাদের আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দুই বন্ধুকে আলাদাই করা যাচ্ছে না। আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে।

তার উপর গতকাল নিকটবর্তী এক মেলায় দুজনে মিলে আমায় নিয়ে গেল। মেরিগোরাউন্ড আর জায়েন্ট ঢেঁকির মধ্যে বসে আমিও ফিরে গেলাম শৈশবে। সেই সুভাষমেলা আর চড়কের মেলা। সেই ঝুলন্ত ঘুর্ণি, সেই চাঁদমারি করে মোমবাতির আগুন নেভানো। ছেলেবেলাগুলো বড় ভাল হয় হে কত্তা। বুড়ির মাথার পাকাচুল আর আলো ঝলমলে লাট্টু, প্যারাসুট আর পপকর্ন- আহা মাল্টিপ্লেক্সের এসিসম্বলিত সজ্জাও ম্লান হয়ে যায় এর নির্মলতার কাছে। কালকে সাময়িক বিচ্ছেদের সময় পরও যার রেশ থেকে যাবে নতুন কোন স্মৃতি, নতুন কোন অঙ্গীকারের মাধ্যমে। সুন্দর থাকুক ওরা।

ছেলের কথা যখন এল তখন মেয়েও না হয় একটু থাকুক। আজকাল বাপের কান তার বড়ই পছন্দের হয়েছে। আর কে না জানে বাপ, কান টানলে মাথা আসে। আরে বস ছেলে মেয়ে পার্শ্ববর্তিনীদের জন্য তো জান হাজির। প্রকৃত বন্ধুদের জন্যও।

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ বন্ধুত্বের ডাকনামের এক একটা ইতিহাস থাকে। আমাদেরই এক বন্ধু ছানাকে নিয়ে গল্প করছিল! ‘ছানা’ আমাদের ক্লাসমেট কি ভাবে ছানা হল নাম সেটা আন্দাজই করে নিন। কিন্তু ডাকনাম আবার মাঝেমাঝে আসল নামের থেকে ভয়ঙ্কর হয়ে দাঁড়ায়। মুছে দেয় অন্য পরিচিতি। ‘পেলে’ বা ‘নেতাজী’ বা ‘বাপুজী’ মনে করুন। তা আমাদের সেই বন্ধু কোন এক রাস্তায় ট্যাক্সিসফর করার সময় রেডলাইটে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ‘ছানা’কে দেখতে পায় অল্প বয়সী একটি মেয়ের সঙ্গে রাস্তা পার হতে। সে এখন অবস্থার গুরুত্ব বুঝেও আসল নামটা কিছুতেই মনে না করতে পেরে ডেকে ওঠে, ‘ছানা! এই ছানা!’ স্বাভাবিকভাবেই প্রেস্টিজের পুলটিশ বাঁচাবার জন্য ছানা আড়চোখে দেখেও দেখে না। কিন্তু বিপদ বাড়ে, যখন আমাদের খোট্টা ট্যাক্সি চালকটিও পরোপকারের চক্করে ট্যাক্সি থেকে নেমে বিশুদ্ধ বিহারী বাংলায় কঁকিয়ে ওঠে- ‘ছেনা! আরে ও ছেনা বাবু!’ প্রেস্টিজ তখন বোধহয় নিজের লেবেল মুছে ফেলে মাটিতে মিশে যেতে পারলেই বাঁচে।

পরে কে কাকে কি বলেছিল সে নিয়ে আর কিছু বলছি না। তবে মেয়েটি ছানার একদম নিজের রেজিস্টার্ড শালী ছিল বটেক। তার নির্ভেজাল চরিত্র- পাঠকপাঠিকারা অন্য কিছু ভেবে না বসে বরং দুটো সন্দেশ খেয়ে জল খান। ছানার সন্দেশ হলেই সবথেকে ভাল। পেট ঠাণ্ডা থাকবে!

2 thoughts on “(১০২)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s