(১০৪)


জাকির হুসেনের জন্মের পরে পরেই আল্লারাখা উস্তাদ তার কানে তবলার বোল তুলে দিয়েছিলেন। আমার কানে ক্যানেস্তারা কে বাজায়েছিল গা? গলাখানা যা বাজখাই হল। ছেলে বেলা থেকেই গান আমার কান মন প্রাণ তৈরী করে দিয়েছিল। খুব ছোটবেলায় বাবা মা রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে বসত। আর আমি বসতাম ল্যাক্টোজেনের কৌটো নিয়ে- ধা ধিন ধিনতা না তিন তিনতা!

তারপর ভাগীরথী দিয়ে জল গড়িয়েছে কত। আমার কানও গুপ্ত মৌর্য স্বর্ণযুগ পেরিয়ে পৌঁছেছে জীবনমুখীর ঘাটে- হেমন্ত না সুমন, সুমন না হেমন্ত? সুরের আকাশে তখন রঙমশাল। নীল দিগন্তে ম্যাজিক। বাংলা গান ভাঙছে গড়ছে গড়ছে ভাঙছে। স্বপ্ন দেখছে সবাই স্বপ্নে দেখছে গানে গানে, বন্ধন যাক টুটে।

উনিশশো একানব্বই। রবীন্দ্রনাথ কি ছাড়া পেলেন? না লক্ষ্মীছাড়া শ্রী ছাঁদে ধরা রইলেন! বারন্দায় রোদ্দুর ছায়া ঘনায় বনে বনে। মিঠে কড়া পরীক্ষা নিরীক্ষা বেয়ে বাংলা গান গলা ছাড়ছে তখন। ছাড়ছি আমিও। ‘আমার প্রতিবাদের ভাষা দ্বিগুণ জ্বলে’- চোখ জ্বলে বুক জ্বলে- নিঃশ্বাস নেব কিসে? কেনো গানের শিস আর ধানের শীষ মাখা মাখি হয়ে গেল গলা দিয়ে নেমে আসে সুর অসুর।

তখন আমিও গাইছি, ‘পুকারতা চলা হুঁ ম্যায়’ গঙ্গার ধারে ‘প্যাহলি পেয়ার কি খুশবু’, ‘তুমি রবে নীরবে’ ‘আজি বিজন ঘরে’! আমি গাইছি, ইউনিভার্সিটি ইন্সটিউটে, ‘হেই সামালো ধান গো’ গলার বাড়ছে ধার, কাস্তেয় পড়ছে শান! আমি গাইছি, ‘হৃদমাঝারে রাখব, ছেড়ে দেব না’। কলামন্দিরে শুনছি, ‘গান তুমি হও গরমকালের সন্ধ্যেবেলার হাওয়া’, ‘পেটকাটি চাঁদিয়াল’, ‘গানওলা- আমার আর কিচ্ছু করার নেই’! সারা রাত জেগে জেগে শুনছি ধূসর নীলাভ এক তারার গল্প। শুনছি ‘নীলাঞ্জনা’ শুনছি ‘আকাশমুখী সারি সারি পাশাপাশি বাক্সবাড়ি’!

গান ছড়াচ্ছে তখন, গোকুলে বাড়ছে ব্যান্ড, আমি হারাচ্ছি, আমি হারাচ্ছি জীবিকার ভিড়ে। গান ভালবেসে গান! দেখে যা কি সুখে বেচেছি গান! শহর পাল্টাচ্ছে পাল্টাচ্ছে সময়, গান পাল্টাচ্ছে পাল্টাচ্ছে সুর- অসুর। রবি বারোয়ারী হলেন। মুক্তির আনন্দে লাগাম ছাড়া পাগলপারা রবি আমার। হেমন্ত, মান্না, শ্যামল, তরুণ মানবেন্দ্র- সব আসছে এদিক ওদিক দিয়ে। সুমন যেন কমে গেছে বাজারে? মেটেরিয়া মেডিকার কাব্য? ব্যান্ডে হাত ব্যান্ডেজ ভূত ধরতে পারছি না আর। ডুবে যাচ্ছি, অন্য শহরের প্রেমে ডুবে যাচ্ছি। গান? সে তো মোবাইল আর এফ এম-এ। নতুন কি হচ্ছে নতুন কি হচ্ছে? হাতড়াচ্ছি শুধু অন্ধকারে।

দু হাজার ছয়, একরাশ তাজা হাওয়া নিয়ে এল সে! বাংলা গান তো বদলে গেছে গো! শোন না কি কি হচ্ছে। ধীরে ধীরে আপ টু ডেট হচ্ছি। জ্ঞান বাড়ছে, শিখছি কত কিছু। ব্লুজ, জ্যাজ, কান্ট্রি মিউজিকে কান পাকাচ্ছি, মন পাকাচ্ছি। কলমে কবিতা গলায় গান। নতুন লেখা ভাষা কথা সুর মিলে মনন তৈরী হচ্ছে আমার মধ্য যৌবন পেরনো মনন। ভাঙছে গড়ছে সময় ভাঙছে গড়ছে জীবন ভাঙছে গড়ছে গান। বাংলা গান বাড়াচ্ছে রাস্তা। পথ খুঁজে কোন পথে গেল গান। জীবনে নতুন গান, গানে গানে গড়ছে জীবন। নতুন তারকারা গানের জগত আলো করে উজলে উঠেছে। ঢেউ উঠেছে কারা টুটেছে। তারপর? তার পর আর কি তার ছিঁড়ে গেল কবে, একদিন কোন হাহারবে… শুধু রয়ে গেল তার স্মৃতি! ল্যাপটপ ভর্তি গান! ছবি আর গান নিয়েই রয়ে গেল সে আমার ভাই আমার সহোদর আমার নবীন সঙ্গীতশিক্ষক। ‘মেঘ জমে আছে মন কোণে’ ‘বৃষ্টি বিদায়’ আর ‘বরষণ মন্দ্রিত অন্ধকারে’- যখন আলো নিভে যায় তখন ল্যাপটপটা খুলে বসি, জমে থাকা গান জমে রাখা জল ধীরে ধীরে বেরিয়ে যায়। জমতে থাকে মনে, প্রাণে বসন্ত বাতাসটুকুর মতো। চলে গেছে সে মাস সাতেক। বাঁধনহীন হয়ে গান শুনিয়ে গেছে সে। কান দিয়ে প্রাণ দিয়ে গান দিয়ে গেছে সে। আমার ভাই… আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা। প্রজন্ম প্রজন্ম গান আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা।

“গান তুমি হও আমার মেয়ের ঘুমিয়ে পড়া মুখ
তাকিয়ে থাকি- এটাই আমার বেঁচে থাকার সুখ…”
—-
(আদরের নৌকায় প্রকাশিত)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s