(১০৫)


(১০৫)
“বাবা তারকনাথের চরণে সেবা লাগি…………”
একটা সময় সন্ধ্যা রায়ের এই সিনেমাটি সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে আবেগের বান ডেকে এনেছিল মনে আছে? আর তারপর সারা ছেলেবেলা জুড়ে তারকেশ্বরে বর্ষা নামার ধূম। আহা বৃষ্টি ভেজা কোলকাতার রাস্তা দিয়ে খালি পায়ে, বাঁশের বাঁখারি কাঁধে ঘড়া ভরা জলের উপর মাটি লেপে আর প্লাস্টিকের ত্রিশূল ম্যুরাল চাপিয়ে, ছেলেগুলো বাবা তারকনাথের মাথায় জল ঢালতে চলেছে, যদি বাবা মাথা ঠাণ্ডা হয়। যদি একটু আধটু জোগাড় টোগার হয় একটু হিল্লে হয়ে যায় আর কি। আজ বছর পঁয়ত্রিশ পরে এসে এর হিসাব নিতে গেলে আবার ভক্তির ভাঁড়ারে টান পরে যেতে পারে। তার চেয়ে বরং স্বীকার করে নিই যে দূরবীনে চোখ রাখব না। বরং জিন্দেগী না মিলেগি দোবারার নায়কের মতো খোলা মাঠে ঘোড়ার নৃত্য দেখি আর আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিই। কি বলেন পাঠক পাঠিকারা?

এ তো গেল ফ্ল্যাশব্যাক! এবারে আসুন ফিরে আসি বাস্তবের গল্পে, এই পচা শহরের পচা গরমের পরিমণ্ডলে বৃষ্টির বরাভয় আসতে আসতে সময় হয়ে গেছ শ্রাবণ মাস। কিন্তু তাতে কি? প্রথম বৃষ্টি আর প্রথম প্রেম কি কখনও পুরনো হয়? যখনই এসেছিল ঝমঝমিয়ে ভিজিয়ে দিয়ে যায়। ছেলেটাও, “মা ভিজতে যাচ্ছি!” বলে ছাদের উপর উপর হয় সমবয়সীদের সঙ্গে। যত পোড়া কালঘাম, ঘামাচি আর দুর্ভাবনা নর্দমার পথে তেপান্তরে পাড়ি লাগায়।

আমিও ক দিন ধরে বেণী ভেজাব না পণ করে ছাতা হাতে চলেছি সুদূর আইএসটিএম-এ। সরকারী চাকুরেরা যাতে অ্যাসেম্বলী লাইন চাকর বাকরে পরিণত না হয় তার জন্য দক্ষতাবৃদ্ধির বরাদ্দ ইনস্টিটিউটখানিতে ঘানি ঘুরিয়ে উত্তম গুণমানের নির্যাস বার করা হয়। তাতে কেউ কেউ স্লিম ট্রিম ফিট ফাট হয়ে যায়। আর কেউ কেউ শুধু ছিবড়ে হয়ে পড়ে থাকে ডাস্টবিনের আশায়।
তা আমিও গত এক বছরের পদোন্নতিকে পোক্ত করার জন্য আবশ্যিক প্রশিক্ষণের কারণে বর্ষামঙ্গলে সপ্তাহের পাঁচ দিন ভিজিয়ে চলেছি।

তা আছি মন্দ না বুঝলেন! বুড়ো বয়সে পড়াশুনো চাপের হতে পারে কিন্তু ইনস্টিটিউটের সুন্দর ব্যবস্থাপনায় কনসেপ্ট পেপার প্রেজেন্টেশন, স্টেট অ্যাটাচমেন্ট স্টাডি ট্যুর আর মড্যিউল পরীক্ষার যাঁতাকলকেও শিমূল তুলোর পাশবালিশ বলে মনে হচ্ছে। তার সঙ্গে জুটেছে বিভিন্ন চরিত্রের সহকর্মী বা সহপাঠীরা। আরে রোজ রোজ বাড়িতে চিকেন চচ্চড়ি খেতে খেতে রেস্টুরেন্টে সামান্য নুডলস আর চিলি পনিরও মুখে অমৃতের দই আর দ্বারিক ঘোষের আমসত্ত্ব সন্দেশ মনে হয়।

তা গন্তব্যটা বেশ কাছাকাছি নয় বুঝলেন! কমফোর্ট জোনের বাইরে বার করে নিয়ে তবে জ্ঞান প্রবেশ করাবে! তা ভাল, তবে কিনা সাতটার সময় ত্রিশ কিমি গাড়ি চালিয়ে আবার সন্ধ্যা আটটায় ফিরে এসে বই মুখে বসতে ধক লাগে। বাড়ির চাতক পাখীগুলোর দিকে চাওয়া যায় না। তা কি আর করব। পেটে খেলে পিঠে সয়!

তাই রোজ সকালে উঠে গোপাল বড় সুবোধ ছেলের মত, পিঠে ব্যাগ আর হাতে জলের বোতল নিয়ে গুটগুটিয়ে গাড়িতে উঠে বসি! আর নিঃস্বর্গের বিসর্গ বাদ দিয়ে ছাঁকনিতে ছেঁকে নেওয়া তলানিটুকু দেখতে দেখতে পৌঁছে যাই পঠনের পথে।

এখন তো আবার শ্রাবণ বা শাওনের সময়। শাওন যে তোর বাঁধন মানে না- ভাসান দিয়ে যা রে শাওন ভাসান দিয়ে যা…

শাওনে কাঁওয়ারদের ভিড় বাড়ে। তা এই পোড়ার দেশে তারকেশ্বর আর কোথায় পাবে, তাই তারা গাঁ উজিয়ে ছুটে যায় হরিদ্বারে, হরের মাথায় জল ঢালতে। হরিদ্বার বলতে সেই দুহাজার চারের কথা মনে পড়ে গেল। আমি আর আমার এক বন্ধু সপরিবারে সেথা গিয়েছিলাম শ্রাবণের ধারার মাঝেই। তা একদিন হর কি পৌরিতে ঘোরাঘুরির সময় উভয়েরই বেগ সঙ্কট এসে উপস্থিত। উঠেছিলাম ভারত সেবাশ্রম পেরিয়ে কাটিয়া বাবার আশ্রমে। সে প্রায় সেখান থেকে আধ ঘণ্টার পথ। লট বহর নিয়ে সেখানে ফিরে যাবার থেকে দুজনেই মনস্থ করলাম যে হালকা হবার শুদ্ধ স্থান কাছাকাছি কোথাও খুঁজে বের করব। কিন্তু আমরা তো শহুরে সচেতনবাদী। পরিবেশ এবং দৃশ্যদূষণে বেজায় বিরাগ। তাই সহধর্মিনীদের “এই একটু আসছি” বলেই সোনার হরিণের খোঁজে গরু খোঁজা করে যখন প্রাণ যায় যায় অবস্থা তখনই বিষ্ণু ঘাটের কাছের এক ধরমশালায় ভুজুং ভাজুং দিয়ে পতিতোদ্ধারিণী গঙ্গের স্পর্শ লাভ।
আহা গোপাল ভাঁড় বড়ই সত্যবাদী ছিল হে। তা ততক্ষণে স্টুডিওর ঘড়ির কাঁটা দেড় ঘণ্টার পথ অতিক্রম করেছে। আর মোবাইলের অস্তিত্বও তখন বাঙালীর পকেটের ইতিউতি উঁকি ঝুঁকি শুরু করে নি। অতএব বাস্তবের জমি বড়ই কঠোর ছিল হে পড়ুয়া পাবলিক। সহধর্মিনীদের না বলিয়া কোন কাজ করিলে রাখাল বালকের দশা হয়। তখন পালে বাঘ পড়লেও নট নড়ন চড়ন।

সে যাই হোক, মোদ্দা কথা হল কাঁওয়ার আর কাঁওয়ারি! এ কিন্তু উচ্চারণের ফেরে কাওয়ারি হয়ে যাওয়া নয়। কাওয়ারি আপনার বাড়ির আবর্জনা কিনে নেয়। আর কাঁওয়ারি তার মনের আবর্জনা কৃচ্ছসাধনের মাধ্যমে বইয়ে দেয় গঙ্গার জলে। তা সে যাই হোক শাওন মানেই কাঁওয়ারি মরসুম শাওন মানেই কাঁওয়ার কাঁধে পথ চলার ধুম। কিন্তু সেটা তো নতুন কিছু নয়। নতুন হল তার ইনস্টিটিউশনালাইজড প্রফেশনালাইজেশন বা সংস্থাগত ব্যবসায়িকরণ।

সারা পৃথিবীর উত্তর ভারতীয় রাজনীতিবিদরা কাঁওয়ারিদের যাতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা না হয় তাই জাতীয় সড়ক পথের ধারে ধারে “নমস্কার ডানদিকে” মার্কা পোস্টার লাগিয়ে ঘাঁটি বানিয়ে দিয়েছেন।
নমস্কার ডানদিকে জানেন না? গাইড ফিল্মের দেব সাহাবকে মনে আছে? মুখ ঢেকে যায় নমস্কারে, তা দেব সাহাবের মুখ বিমুখ হলে তো চলবে না! তিনি তো আর মনোজ কুমার নয় যে হাত ঢেকে মুখের ডায়লগের চব্বিশ শতাংশ ইনফ্লেশনের ঘুর্ণিতে হারিয়ে দেবেন। তাই তিনি আবিষ্কার করলেন “নমস্কার ডানদিকে” মানে নমস্কার করবেন কিন্তু ডান দিকে, যাতে মুখ দেখা যায়। আর কি সেই মান্ধাতা আমল থেকে আজকালকার রাজনেতারাও শিখে গেছে সেই ট্রিক। মোদী বাবু অবশ্য সবেতেই নতুন পথের দিশারী! তিনি আবার বাহু মূলে হাওয়া লাগিয়ে মাথার উপরে ঘোরা ফেরা করা মশা মারেন পট পট।

সে যাই হোক, সেই সব রাজনেতারা বিভিন্ন রাজনৈতিক রঙে রাঙিয়ে (সংখ্যাগরিষ্ঠ যে কে তা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না) যে সব বিশ্রাম স্থল করে দিয়েছেন তার তারস্বরে চোঙা লাগিয়ে চিল্লিয়ে বাজি মাত করছেন। তবে গানগুলো সবই ভক্তিগীতি! মানে চলতি হিন্দি গানের নকলনবিশি। বর্তমানে হিন্দিগানের বাজারটার কথা পাঠক পাঠিকারা ভালই জানেন। যে গুলো এখন মুম্বইয়ের কারখানা থেকে বেরোচ্ছে সেগুলো হিন্দি গানা না ইংরাজি গান তা তারাই ভাল বলতে পারবেন। অবশ্য জনগণ যদি বারুদ মুখে নিয়ে বসে থাকে তাহলে আর মুখ পুড়িয়ে পকেট ভরালে তাদেরই বা দোষ দিই কেমনে বলুন! অতএব সুদীর্ঘ তিন কিলোমিটার জুড়ে কানের দফা রফা থেকে বাঁচাচ্ছি কিভাবে তা ভগাই জানেন।

অবশ্য শুনতে সক্ষম না হলেও চোখের ব্যায়াম মন্দ হচ্ছে না। কাঁওয়ারিরা সব দলীয় জার্সি গায়ে ভজন সাধন করছেন। কারুর জার্সিতে সামরিক ছোঁয়া আবার কারুর জার্সির রং কমলালেবুর কোয়া। বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে শিবের খোঁয়ারি একেবারে শিকেয় উঠেছেন। মাথা গরম হবে তারপর জল ঢেলে ঠাণ্ডা করতে হবে! এতে আর নতুন কি! সেই ছেলেবেলায় দেখা পরেশনাথের প্রশেশন! আহা চমকিলা ভড়কিলা আলোর মালায় গরু ঘোড়া যন্ত্রচালিত কাঁওয়ারদের গাড়ি পেরিয়ে যেতে যেতে বেলা বয়ে চলে যাচ্ছে বটে। কিন্তু মজা মন্দ লাগে না। খাবি যদি হাওয়া খাবি ঢেঁকুর তুলবি কেমনে! আহা রাজনীতি আর ধর্মের নামে যে টাকা ছড়ানো হয় তা যদি শিক্ষা ও স্বাস্থে ছড়ানো যেত, তাহলে ভারতের উন্নতির পথটাই আজকের দিনে মসৃণ হয়ে যেত, বাজার অর্থনীতি আর বিদেশী বিনিয়োগকে হেঁচকি তোলানো গাল পেড়ে খামোখা আমাদের জিন্দেগী খারাব হতো না।

তা সে যাক গে গিয়া। এসব ফালতু ব্যাপারে চিন্তা করে করব কি বলুন, বোকো হারেম আর গাজাতেই তো মন মজে পড়ে আছে। বিদেশ কথাটার মধ্যেই তো দেশ লুকিয়ে! বিশ্বনাগরিক হয়ে সেখানেই মন্তব্যের বন্যা বইয়ে দিই না হয়! পোড়ার দেশের একটু মুখ পুড়লে আর ক্ষতি কি? তেলা মাথায় তেল দিলে বিশেষ ফারাক তো আর হয় না!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ হামাস আর ইজরায়েলের কাটাকুটি খেলায় গাজার যে সব নিরীহ শিশুগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে তাদের জন্য দু ফোঁটা জলও ফেলতে পারছি না! কি জানি আমিও যদি ফেসবুক সমাজতাত্ত্বিক হয়ে গিয়ে নিজের দায়িত্ব ভুলে যাই! তবু এই হানাহানি বন্ধ হোক এই প্রার্থনা করি! কাঁওয়ার বাবুরা যদি কেউ গিয়ে হরিদ্বারে এমন কিছু চায়? আহা নিজের জন্য না চাইলে কিন্তু তৃতীয় নয়ন খোলেন তিনি! চাহিদা পূরণ হতেও সময় লাগে না! বিশ্বাসে মিলায় বস্তু ফিসফাসে বহুদূর…

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s