(১০৭)


কি বলি বলুন তো? এমনিতে আমি বিশেষ ধম্ম কম্মের ধার দিয়ে যাই না… মানে আমি মনে করি যে ধর্ম ভীষণ ব্যক্তিগত বিষয়, কারুর কোথাও নাক গলাবার অধিকার নেই। কিন্তু কোন কিছুরই কি অতি ভালো? অগতির গতি অনাথের নাথ সবি তো থিক কিন্তু যদি প্রতি পদক্ষেপে মন্দির আর সেই মন্দিরের বন্দনার গল্প তৈরী হয় তাহলে কি আর কাজ করা সম্ভব হয়? এই যে আমি তামিলনাড়ুর ভিল্লুপুরমে এসে গ্রামীণ উন্নয়ন বিষয়ক একটি রিপোর্ট তৈরী করছি আরও বেশ কিছু সমপদভুক্ত অধিকারীর সঙ্গে সেখানে ভগবানের উপস্থিতি মাঝে সাঝে হলে মন্দ না। তবে বেশী খেলে বিরিয়ানী কেন ডালভাতও পেটে সয় না। ভগবান তো মনের জিনিস মনজিনিস।

তা কি হয় কাকা? নাইতে নেমে চুল ভেজাব না, নাচতে নেমে বাঁকা উঠোন এসব বললে ভবি ভোলে নাকি? এসেছ মন্দিরের রাজ্য তামিলনাড়ুতে, যেখানে প্রতিটি গ্রামে একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়য়, একটা অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র, একটা জনবন্টন ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গে একটা করে মন্দির উপস্থিত। তার তার মধ্যে তো কিছু কিছু জায়গায় ঢুকতেই হবে, না হলে ঘাড় শক্ত হয়ে যায়।
ভিন্ন ভিন্ন ব্যাকগ্রাউণ্ডের ব্যক্তিদের দলনেতার কাছে দাবী অনেক। সমতা ক্ষমতা এবং মমতা দুমদাম করে জায়গা বদল করে নেয় আর তখন হাতে পড়ে থাকে পেনসিল।

তবু দু একটা জায়গার কথা তো বলতেই হয়। এই যেমন কালকেই গেছিলাম চিদাম্বরমে। মানে আমাদের বিগত অর্থমন্ত্রীর দেশ আর কি! চিদাম্বরমের নটরাজ মন্দিরের অবশ্য ব্যাপারই আলাদা। কথিত আছে যে, এই নটরাজ মন্দির থেকেই ভারতনাট্যমের যাত্রা শুরু। মন্দিরের গোপুরমের চৌকাঠ পেরবার সঙ্গে সঙ্গেই যেন সম্পূর্ণ গল্প বদলে গেল।

তখন সন্ধ্যা হব হব করেছে কি হয় নি! সিন্দূরই আকাশের ছোঁয়া বেয়ে যখন চিদাম্বরম শহরটাতে প্রবেশ করছি তখন সারাদিনের পরিশ্রমের শেষে, তখন শরীর বেয়ে ক্লান্তির ধারা। আশা আকাঙ্ক্ষার বিন্দুমাত্র বাকি ছিল না, পথচলতি মন্দিরে মন্দিরে হতাশার বোঝা বয়ে বেড়ানো ছাড়া তো কিছুই পাই নি।

গোপুরমটি বেশ সুন্দর এবং সমস্ত দক্ষিণই মন্দিরের মতই দশাসই। কিন্তু চমকটা ছিল দু কদম দূরেই। মন্দিরে প্রবেশের দরজায় যথারীতি বিধিবদ্ধসতর্কীকরণ, ক্যামেরা এবং মোবাইল প্রয়োগ নিষিদ্ধ। কিন্তু অন্যান্য অসহিষ্ণুদের মতো বিদেশীদের প্রতি কোন নিষিদ্ধিবার্তা নেই। আশ্চর্য! এমনিতে দক্ষিণভারতীয় মন্দিরগুলিতে বিদ্বেষভাবের জন্য আমার নিজবিদ্বেষের অন্ত থাকে না। প্রত্যেক মন্দিরেই সাধারণ দর্শনার্থী, বিশেষ দর্শনার্থী এবং বিশেষ বিশেষ দর্শনার্থীদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থা। আরে ভগবানের কাছে ভক্তের আবার শ্রেণীবিভাগ হয় না কি রে পাগলা? তাও আবার অর্থের বিনিময়ে কিনে নেওয়া ভক্তের ভালবাসা! তার উপর বিদেশী দেখলেই নিষেধাজ্ঞা- যেন বিদেশীদের মধ্যে হিন্দু আর স্বদেশীদের মধ্যে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হয় না।

যাই হোক নটরাজে ফিরে আসি। আরও দু কদম এবার মন্দিরের দরজা দিয়ে ঢুকতেই যেন এক ধাক্কায় সময়টা পিছিয়ে গেল একেবারে দুশো তিনশো বছর। সন্ধ্যার আলোটাতেও কেমন যেন নস্টালজিয়ার ছোঁয়া। মন্দিরের গায়ে গায়ে কষ্ঠিপাথরের কারুকার্য আর ভরতনাট্যমের মুদ্রা। আহা ঘণ্টার আওয়াজ তো নয় যেন যুগের ঘড়ি ঢং ঢং করে সময়কে বুকের মধ্যে আগলে রেখে দিয়েছে।

এদিক ওদিক বিষ্ণু পার্বতীর মন্দির ছুঁয়ে সবার অলক্ষে ঢুকে গেলাম গর্ভগৃহে। নাহ হে নটরাজ আমি সত্যিই হেরে গেলাম! মন সরিয়ে ঢুকে রাখতে গিয়েও কেমন যেন রোমাঞ্চ অনুভব করলাম। এই কি সেই গদাধরের বক দর্শন?

চুপচাপ আরতির সময় হেঁটে হেঁটে বেরিয়ে এলাম বাম দিকের পুষ্করিণীর পাড়ে। দূরে আকাশে নীল কমলা মেঘ সূর্যের মাখামাখির মধ্যে দিয়ে চারদিকের চারটে গোপুরম মাথা উঁচু করে রয়েছে আর দিঘির শ্যাওলা ধরা জলে তার টলমলে ছায়া। আবীর লেপে দিয়েছেন তিনি আকাশ ভরে। পুকুরের ওপারে বোধহয় শ্যুটিং চলছে। প্রদীপ আর পদ্ম ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাঁ দিকের মন্দিরের গা বেয়ে ভেসে আসছে ঘণ্টার শব্দ আর আরতির গন্ধ। কেউ কোত্থাও নেই। মোবাইলও অবস্থা অনুধাবন করে বাসের খোপে আশ্রয় নিয়েছে। অতীত বর্তমান আর অনাদৃত ভবিষ্যৎ মিলে মিশে একাকার হয়ে বসে আছে। বসে আছি আমিও অনন্তের অপেক্ষায়।

আরও একটু পিছিয়ে যাই, আরও একটা দিন। অনেক কসরত করে তবেই অরোভিলের মাতৃমন্দিরে ঢুকতে পারলাম। শব্দহীন বর্ণহীন আড়ম্বরহীন প্রবেশ। ভক্তের বেশ ছেড়ে মানব বেশে প্রবেশ। প্রার্থনা গৃহে স্ফটিক গোলকের মধ্যে দিয়ে আমার ফেলে আসা দিনগুলি ফিরে ফিরে আসছে। নিচের তলার কলকল শান্ত জলের মধ্যে দিয়ে বিলীন হচ্ছে মহাশূন্যে।

হারিয়েছি যত তা সত্যিই কি হারিয়ে গেছে? সামান্য মোবাইল থেকে শুরু করে, চটি ছাতা ওয়াটার বোতল এমন কি মানুষও। ছেলেবেলার যারা সব ছিল তারা কি আর কোথাও নেই! নাকি সময়ের অন্তরালে তারা আমার আশেপাশেই অবস্থান করছে। অরোভিলের কেন্দ্রের বিশাল বটগাছের বিশালত্বের মধ্যেও অনুভূতি হয়, মানব সম্ভাবনার কথা। ভিতর পানে একটু ঝাঁপাও দেখি মন! ডুবে দে ডুবে দ্যাখ দিকি। কি সৌন্দর্য্য ছড়িয়ে রয়েছে সেখানে।
আমার রুমমেট ঝাজী আমায় বললেন সকলের মধ্যেই তিনি বাস করেন। তাকে খুঁজে পেতে নিজের নিজের পথ ধরতে হয়, তার জন্য ভিতরে তাকালেই চলে, খুড়োর কলের দরকার পরে না।

মনে পড়ে গেল সেই ছিয়ানব্বইতে প্রথমবার অরোভিলে আসার সময় আমার ভাইটাও সঙ্গে ছিল। এখনো আছে বোধহয় আনাচে কানাচে! চোখের জল যে মিথ্যা বলে না…!

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s