(১০৯)

সেই হাড়জিরজিরে ব্যারামের মতো আমার সৎ হবার ব্যায়রাম আছে। মানে মাঝে মাঝে কিছু কিছু স্পেলে আমার অন্তরাত্মা টিকটিক করে ওঠে, আর বলে সব ঠিক সব ঠিক। মানে তখন আমি মেয়েদের দিকে অন্যচোখে(তৃতীয় নয়ন?) তাকাই না, পরীক্ষার খাতায় টুকলি করি না, রেডলাইট লাফাই না, দোকানদারের পয়সা মেরে দিই না ইত্যাদি এবং প্রভৃতি। সে এক ক্যাটাভরাস কাণ্ড। যে দেখে সেই কয়, এ ছেলে বাঁচলে হয়।

সেই আদ্যিকালের গোরুপোড়া দিনে কোচিং সেন্টারে বান্ধবীর দিকে না তাকাতে সে আমার প্রেমে পড়ে গেছিল। মানে সে ‘এক্সকিউজ মি!’ বলে রুমে ঢুকেছে আর আমি মন দিয়ে নোট টুকছি। সেই ক্যাড়াটা তখন হয়েছিল আর কি। আর সে কিনা সুন্দরী মহিলা পিতৃজন্মে এমন ছেলে দেখে নি যে তার দিকে তাকায় না। আর কি ক্যাচ কট কট। তারপর ভাগীরথী দিয়ে কত জল বয়ে গিয়ে এখন এসে দাঁড়িয়েছি অলকনন্দায়। মানে অলকনন্দা অ্যাপার্টমেন্ট- আমার বর্তমান বাসস্থান। কিন্তু তা বলে কি খিটকেলী ক্যাড়া আমাকে ছেড়ে যেতে পারে?

এই তো গত পরশুর কথা। ইণ্ডিয়ান অয়েল পেট্রোল পাম্প থেকে বেরিয়ে এসএমএস পেলাম যে আপনার এত টাকা এই পেট্রল পাম্পে কাটা হয়েছে। তার দশ মিনিট পরেই পেলাম যে আপনার তত টাকা সেই পেট্রল পাম্প থেকেই ফেরত এসেছে। এইসব ক্ষেত্রে, আমজনতা যারপরনাই উল্লসিত হয়ে পার্টি ফার্টির ব্যবস্থা করবে, আমিও করতাম। কিন্তু তখনই আমায় পেয়ে বসেছে ক্যাড়ামশাই। তাই আর কি সেদিন রাত্রে বেমালুম ভুলে গিয়ে পরের দিন গিয়ে হাজির হলাম পেট্রল পাম্পে। অ্যাটেণ্ড্যান্টগুলো তো চর্মচক্ষে বিশ্বাসই করতে পারছে না যে এরকম মদন মানুষ বর্তমান এবং তারা ভাগ্যবান যে এমন কাউকে দেখছে। খুব খাতির টাতির করল বটে কিন্তু ফ্রি পেট্রল দিল না! আরে বাবা সরকারী চাকুরে তো, ফ্রিতে বিষ পেলেও খেয়ে ফেলি। কিন্তু সেটা হল আজকেই

সততা দেখাতে গেলে আপনাকে কোন কিছু একটা ভুলে যেতে হবে এবং যার সঙ্গে ভুলে যাচ্ছেন তারও যেন মনে না থাকে যে আপনি ভুলে যাচ্ছেন। না না গোদা বাংলায় বলিঃ If you forget something with someone then let him/ her also forget that you have forgotten! কিছু উদ্ধার করা গেল না, না? জিলিপি পাকিয়ে লাভ নেই ঘটনায় আসুন।

হয়েছে কি, গত শনিবার এক কফিশপে পার্শ্ববর্তিনীকে নিয়ে গিয়ে দু কাপ কফি আর এক প্লেট পনির স্যান্ডউইচ পিটিয়ে (অবশ্যই চিকেন ছিল না বলে! না হলে কে আর হবিষ্যি খেতে যায়!) আলবেয়ার থেকে মুখার্জী সব কামু-র গুষ্টির তুষ্টিপুজো করে বেমালুম ভুলে চলে এসেছিলাম ঘরের ছেলে ঘরে। কফিশপের ছেলেটি পরিচিত ছিল। তার উপর আগের দিন কাপের বদলে হ্যাণ্ডেলহীন গ্লাসে কফি পরিবেশন করে পার্শ্ববর্তিনীর কাছে কড়া আর আমার কাছে মিঠে করে বকু খেয়েছে। তাই সেও বোধহয় জোর করে ভুলে গেছিল যে দাম দেওয়া হয় নি বা দিতে হবে। সে তো নম্বর বাড়াবার চক্করে গদগদ।

তা যাই হোক, আজ গিয়ে কথাটা পাড়লাম, যে দেখ ভাই দেখ, আমি পয়সা দিতে ভুলে গেছিনু। আর সেই দিন থেকে ঘুম নেই কারও চোখে। তা সে ছেলেটির ডিউটি ছিল না আজ। কিন্তু যার ছিল, সে এতটাই ক্ষীর হয়ে গেছিল যে, আজকের খাওয়া কফিটাও ফ্রিতে দিয়ে দিল। মানে আগেই খেয়ে নিয়েছিলাম, দামটা নিল না। আর আমিও ভাবতে শুরু করলাম পৃথিবীতে সবুজ ভাব যেন এই অকাল বর্ষণের ফলে বেড়ে গেছে। বেড়েই গেছে।

আরেকটা গল্প বলি আসুন। হয়েছে কি, আমি এমনিতে ক অক্ষর গোমাংস। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সরকারী চাকুরী করার ফলে একটা অদ্ভুত সুন্দর জলের মতো গ্রহণযোগ্যতা তৈরী হয়েছে। মানে একটু সময় আর যা কিছু দিলেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যা কিছুও জলবৎ তরলং হয়ে যায়। তা পেট্রলে ইথানল মিশ্রণই বলুন আর সাধারণ প্রশাসনিক রুটিন কারবারই বলুন। যা দেবেন সবেতেই সারেগামাপা বাজিয়ে দেব।

তা আর পরীক্ষার মুখ্য পর্যবেক্ষক বা উত্তরপত্র পরীক্ষকই বা কি এমন ইয়ে? হয়েছে কি দৃষ্টিহীনদের জাতিয় ইনস্টিটিউট থেকে আর্জি এল যে তাদের রিসার্চ অফিসার, অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এবং প্রশাসনিক আধিকারিক ইত্যাদি প্রথম শ্রেণীর পদের নিয়োগ পরীক্ষায় পর্যবেক্ষকের ভূমিকা নিতে হবে এবং প্রশাসনিক আধিকারিকের খাতাও পরীক্ষা করতে হবে। এমিতেই আমার বিজ্ঞ বিজ্ঞ হাবভাবে তাদের ধারণাই ছিল যে আমি অনেক কিছু জানি! তার উপর আবার দু মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরেছি। শুধু তারা কেন? আমার সংযুক্ত সচিবেরও ধারণা হয়ে গেছে যে আমার দুটি পাখা একটি শিং এবং একটি সুকেশী ল্যাজ গজিয়েছে।

তাই কাল আমার দায়িত্ব পড়েছিল ইউনিকর্ণের ডিমটি প্রসব করতে। এমনিতে তো কিছু না- পদবলে হুম হাম সহযোগে হাঁকডাক করা আর লিখে রাখা নির্দেশগুলি হিন্দি ও ইংরাজিতে স্পষ্ট করে বলে কেউকেটা হাব ভাব নিয়ে ঘুরে বেরানো। তা শেক্ষপীরই তো বলে গেছেন সমস্ত দুনিয়া মঞ্চ আর আমরা সবাই ভায়রাভাই! তা সে কাজ তো করেই ফেললাম।

কিন্তু গোলমাল বাঁধল খাতা চেক করার সময়! বুক ধুকপুক ধুকপুক করছিল। এই বুঝি শিয়ালের আসল রঙ বেরিয়ে পড়ল। পরীক্ষার্থীরা সব এমবিএ এবং ন্যুনতম পাঁচবছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। কিন্তু যেই অবজেক্টিভ টাইপে চোখ গেল তখনই আত্মবিশ্বাসটা বাঁধাকপির পোশাক ছেড়ে রোদ্দুরে সপাট দাঁড়ালো। গোলাপ, ডেইজি, ফুলের কুঁড়ি এবং টিউলিপের মধ্যে টিউলিপই হল ভীন গ্রহের জীব। কারুর মৃত্যুর পর বইয়ের রিভিউ প্রকাশিত হলে তাকে মরণোত্তর প্রকাশন বলে। যত দেখছি ততই জ্ঞান বৃদ্ধি হচ্ছে।
কোন আইনের অধীনে প্রতিবন্ধীদের সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে তা চল্লিশ শতাংশই লিখতে ভুল করেছে অথচ তার ঠিক দুটি প্রশ্ন নীচেই প্রশ্ন আছে, “পার্সন্স উইদ ডিস্যাবিলিটি আইন, ১৯৯৫” অনুসারে দৃষ্টিহীনদের জন্য সংরক্ষণ কত শতাংশ।

বিবরণধর্মী প্রশ্নে গিয়ে তো আরও খারাপ অবস্থা। সাধারণ অর্থনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী ক্যাপিটাল গুডস ব্যবহারের অযোগ্য হলে তা বাতিল করার পন্থা বিস্তারিত বলতে গিয়ে সীতা কার পিতা তার গল্প করা হয়েছে। ব্যবহারের অযোগ্য হলে তা কি করে যোগ্য করে তুলতে হবে তার ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শেষ মেষ যদি সত্যিই তা ব্যবহার না করা যায় তাহলে সাধারণ অর্থনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী না কি তাকে বাতিল করতে হবে। সত্যি বলতে কি বিবরণধর্মী প্রশ্নে কুড়িতে চারের বেশী কাউকে দিতে পারলাম না!

প্রতিষ্ঠানের ডাইরেক্টর প্রায় কেঁদে ফেলেন আর কি- “সৌরাংশুজি সব কো ফেল করা দিজিয়ে! নহি তো ইনি …সে হামে কাম করওয়ানা পরেগা!” কিন্তু সরকারী নির্দেশ! যোগ্যতামান নীচে করে অন্তত চারজনকে ইন্টারভিউয়ের যোগ্য ঘোষণা করিয়ে তবেই ছুটি পেলাম।

স্টুডিয়োর ঘড়িতে ছোট কাঁটা তখন সাত ছুঁই ছুঁই। কিন্তু মনের মধ্যে এতদিন ধরে পুষে রাখা এমবিএ করতে না পারার দুঃখটা যে সন্ধ্যার সূর্যের মতই দিগন্তে বিলীন হয়ে গেছে।
“লেখা পড়া করে যে/ অনাহারে মরে সে/ জানার কোন ‘সেস’ নাই জানার চেষ্টা বৃথা তাই/ যায় যদি যাক প্রাণ হীরকের রাজা ভগওয়ান!”

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ মোদী সাহাব শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষক দিবসে গুরুপূর্ণিমা পালন করবেন, আপনারা পারলে স্কুলে সরাসরি সম্প্রচার করবেন- মানব কল্যাণ দফতরের এই আপাত নিরীহ অনুরোধটাকে বহু স্কুলেই দেখছি মোজেসের প্রথম নির্দেশের মতো অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার জন্য এবং আপামর শিক্ষার্থীকূলকে মান্য করানোর জন্য হামলে পড়েছে! সত্যিই বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়!!

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s