(১১১)


আরে নিজে একটা ব্লগ লিখি বলে নিজের হিরোগিরির গল্প ফাটাবার একটা চেষ্টা করব না বলুন? সাহসিকতা বলতে গেলে রাস্তাঘাটে নিজের সততা বজায় রাখার চেষ্টা বলতে পারেন। আফটার অল দুই বাচ্চার বাপ। এটুকু তো করাই উচিত।

তা এসব গল্প বলতে গেলে ফিরে যেতে হয় নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে, তখনো কোলকাতা শহরটা আমায় দেশান্তরে পাঠায় নি। চাকরি বাকরি আর প্রেম উভয়ই চুটিয়ে চলেছে। সন্ধ্যায় আলিপুর থেকে বাসে করে টি বোর্ড তারপর বান্ধবীর অফিস থেকে হাঁটা পথে মানিকতলা। সরষে দানার তো অভাব ছিল না।

এমনই এক দুরন্ত দিনে সেন্ট্রাল মেট্রো স্টেশনের সামনের রাস্তা পার করার সময় একটা টাটা সুমো হঠাৎ গতি বাড়িয়ে প্রায় চাপা দিয়ে দেয় আর কি। রক্ত আর আবহাওয়া উভয়ই গরম থাকায় কিছু একটা মুখ থেকে বেরিয়ে যায়, যা আজ আর মনে নেই। কিন্তু তাতে সুমো গাড়িটা হঠাৎ সামনে গিয়ে ক্যাঁচ করে ব্রেক মেরে দুটি ছেলে নেমে আসে এবং অশ্রাব্য তর্পন চলাকালীন আমার তলপেট লক্ষ্য করে জুতোর সোলের দাগ নেমে আসে। প্রথমে একটু হকচকিয়ে গেলেও হাত আমিও চালাই। কিন্তু পিছন থেকে একজন ধরে ফেলে আর সামনে লোকটি কোমরের কাছে ফুলে থাকা কিছুতে হাত দিয়ে আমার বান্ধবীকে বোঝাতে শুরু করে, যে আমার বেঁচে থাকার জন্য তার আমাকে বোঝানো কতটা জরুরী- “সমঝাও ইসে, জান গওয়া বয়ঠেগা”। তা এহেন সময়েও দিগ্বিদিক হারাই নি। আমায় ছেড়ে গাড়িটা কলেজ স্ট্রিটের দিকে বাঁক নেবার সঙ্গে সঙ্গে আমি ছুটে যাই একশো মিটার দূরে দাঁড়ানো পিসিআর ভ্যানে অভিযোগ জানাতে। যদিও তাদের আর পাওয়া যায় নি আর বান্ধবীর প্যাল্পিটেশন সে রাতের মতো থামে নি।

কিন্তু স্বভাব কি কখনো অভাবে যায়। কাট টু কাট ফিরে আসি দিল্লীর বুকে। তখন থাকি আশ্রম বলে এক জায়গায়। একদিন অফিস থেকে স্কুটারে সওয়ার হয়ে ফেরার পথে হঠাৎ দেখি একটা রিক্সা রেলব্রীজের তলা দিয়ে ঢালু জমিতে নামতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয় সামনের স্যান্ত্রোর গায়ে পড়েছে। আর সে স্যান্ত্রো চালক কথা বার্তা কিছু বিশেষ না বলে গাড়ি থেকে নেমে এক ঘুষিতে দিয়েছে রিক্সাওলার ঠোঁট ফাটিয়ে। আহা বিবেক বাবাজী তো র্যােম্পে হাঁটতে উদ্যত, সে কি আর চুপ থাকতে পারে। নেমেই ড্রাইভারের কলার চেপে মস্তানি, “মারা কিঁউ? গরীব বোল কি ইজ্জত নহি হ্যায় কেয়া?” সে যা হোক পুলিশ ডেকে গাড়ির আসল মালিক ডেকে রিক্সাওলার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিয়ে তারপর শান্তি। আহা সমাজ কল্যাণে যা ন্যাজ মোটা হয় না! কি যে বলব?

সেই রকমই একটা কিছু ঘটল আজ। এমনিতে মহালয়ার সকালে আলোর বেণুপথ বেয়ে গেছিলাম মুম্বই। তা তার তো ভীষণ বদনাম, আবহাওয়া সব সময় ছিঁচকাঁদুনে বলে। কিন্তু কেন জানি না, মা জননী আসবেন বলে সমস্ত কায়নাৎকে মাসাআল্লাহ বানিয়ে রেখে দিয়েছিলেন। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরেই তাই ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে গেলাম একটু ময়ূর বিহারের পথে। তা প্রায় গন্তব্যে পৌঁছব পৌঁছব করছি। শেষ চৌমাথায় দেখি একটা ট্রাক ট্যারা হয়ে দাঁড়িয়ে আর তার সামনে থেকে একটা বাইকের সিট কেউ তুলে নিয়ে সাইডে গেল। কোন রকমে পেরিয়ে আস্তে গিয়ে দেখি মারমুখী জনতার রোশে ট্রাকবাহনের শোলের ম্যাকমোহনের মতো অবস্থা। নিজের গাড়িটাকে ধারে দাঁড় করিয়ে ছুটে এসে দেখি। কয়েকটি তাজা তাজা দেশের ভবিষ্যৎ মুখে ভুরভুরে গন্ধ আর অকথ্য সম্ভাষণ সহ বেড়ে বেড়ে গিয়ে ট্রাক ড্রাইভারটাকে মারার চেষ্টা করছে।

সত্যি বলতে কি পাঠক পাঠিকারা, মায়া হল খুব! আহা ড্রাইভারটা না হয় গড়বড়িয়ে ফেলেছে! তা বলে অবেলায় তার জান চলে যাবে? পাবলিকের মধ্যে থেকেও তো আমরা মানুষ! সবার আগে তাই সবুজ টি শার্ট পরিহিত যে ছেলেটি গ্লুকোজ টেনে ফুটছে তাকে আটকালাম। গালাগালির গতিপথ আমার দিকে পরিবর্তিত হল। আমি নরমে গরমে সামলে দেবার চেষ্টা করছি। সমানে বলছি, “মারো মত পুলিশকো দে দো!” কিন্তু সমর্থন বিশেষ যেন পাচ্ছি না। আর ওদিকে নব্য যুবকের দল তাকে খুনই করে ফেলবে। আমি তখন বেগতিক দেখে বললাম “উসকো ম্যায় উতার রাহা হুঁ- মগর মার না নহি!” ছেলেগুলো কি বুঝল কে জানে একটু থমকে গেল। কিন্তু কেউ আমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না, বাইকচালকের কি হয়েছে। যাই হোক ড্রাইভারটা ভবিষ্যতের হাতে নিজেকে সঁপে দেবার প্রস্তুতি নিয়ে নেমে এল। আর উন্মত্ত জনতা মঙ্গলবার দিন মানুষের মাংসের লোভে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপর। জনতা বলতে জনা চারেক পাঁচেক ছোকরা আর দুটো মুসকো লোক। পরে বোঝা গেল তারাই বাইকে ছিল এবং মরেই যেত। যদিও অনেক খুঁজেও তাদের গায়ে আমি বিশেষ আঁচড় টাচ-ওর দেখতে পাই নি। তবে কি না মরে যেত বলে কথা।

কি জানি আমার ভিতরে তখন কি যেন একটা ভর করেছিল। শান্ত গলায় দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে শুরু করলাম, “মুঝে মারনা হ্যায় তো মার দো, মগর ঈশ গরীবকো মারনে নহি দুঙ্গা!” শুকনো মুখে ফিরে যেতে হবে দেখে উৎসাহীরা আমার দিকে ফিরল। কিন্তু কেন জানি না যুত করে মারতে পারছিল না আমায়। কেন তা বলতে পারব না, তবে কলার ধরা খান দুয়েক চড় চাপড়ের মধ্যেও আমি বলে যেতে লাগলাম, “বাইকওয়ালা কিধার হ্যায়? প্যাহলে বতাও! মারো মাত!” সত্যি হয়তো মজা ঠিক হচ্ছে না দেখে তারা সরে যেতে লাগল। আর এই সময়ই দেবদূতের মতো হাজির হল এক কনস্টেবল। ব্যাস তখন আম জনতা মস্তানদের দিকে আঙুল তুলতে শুরু করল। আর আমি পেলাম পূর্ণ চন্দ্রকলা হাতে। হেব্বি কনফি নিয়ে ছুটে গেলাম ছোকরা মস্তানদের দিকে।

কনস্টেবলটাও করিৎকর্মা! সে গিয়ে ছোকরাদের গাড়ির মধ্যে স্যাট করে সেঁটিয়ে গিয়ে বার করে আনল বিয়ারের বোতল। ছোকরারা তখন জনতার মধ্যে মিশে গেছে। শুধু ধরা পড়েছে সেই গাড়ির ড্রাইভার বাবাজী। ট্রাকের ড্রাইভারটা ভদ্রলোকের মতো ট্রাকটাকে ধারে নিয়ে ফিরে আসছিল। কনস্টেবলটির কথায় তার টিকি নাকি স্থানীয় থানায় বাঁধাই আছে। বাইক চালক ও তার সহযাত্রীকে আমি বেশ ঘ্যাম নিয়েই বললাম যে ১০০ নম্বরে ফোন করে অভিযোগ জানাতে, যে তারা মরতে বসেছিল। কিন্তু ট্যাঙ্কি তো ঠনঠন গোপাল। তাই তারা বলল না তারা এসব নিয়ে আর এগোতে চায় না। তখন চড়ল আমার গলা, “মাজাকি পায়া হ্যায়? আভি আপ লোগোকা জান যা রাহা থা বোলকে আপ দুসরো কো ইন্সটিগেট করকে ড্রাইভারকি জান লেনে পে তুলে হুয়ে থে!” সে আমতা আমতা করতে শুরু করেছে। কনস্টেবলের সঙ্গীরাও এসে গেছে। তারা তখন সেই গাড়ির (স্যান্ত্রো) ড্রাইভারকে নিয়ে পড়েছে। সে তো স্মার্টলি বলতে শুরু করেছে, সে তো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মোমো খাচ্ছিল। ছেলেগুলোকে কাউকে চেনে না। আমি তখন প্রবল পরাক্রমশালী প্রতাপাদিত্য মহারাজ। বললাম, “ঝুট বোল রহা হ্যায়! থানে পে লে যাকে দো চার হনুমান চালিশাকা শ্লোক শুনা দো!” পুলিশগুলোও দেখলাম সহমত হল।

এক ভদ্রলোক খালি এসে ইংরাজিতে বলল- বাইক চালক যখন অভিযোগ করছে না তখন ছেড়ে দেওয়া হোক না। ইংরাজরা প্রায় সত্তর বছর হল চলে গেছে এ দেশ ছেড়ে কিন্তু ভাষার যা ওজন দিয়ে গেছে কি আর বলি। আমিও দেখলাম সারা দিনের শেষে এসব নিয়ে ন্যাকামো করে লাভ নেই। সমবেত জয়ধ্বনি ও করতালির মধ্যে দিয়ে দু চার বাণী জ্ঞানগর্ভ ভাষণ দিয়ে রওনা হলাম গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। এখনো মেপে দেখি নি। কিন্তু ঠিক জানি ছাতি এখন মদনলাল হয়ে গেছে। ফিরে আসার সময় সেই ট্রাক ড্রাইভার ছেলেটার চোখে চোখ পড়ল। এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে সে। ভাষা পড়ার দরকার পড়ল না।

এই হল গিয়ে আমার হিরোগিরির গল্প। ভাগ্যিস ফিসফাস ছিল! তা বলি কি পাঠক পাঠিকারা, ফিসফাস-২ বই হয়ে বেরোবে বলে প্রকাশক আশা দিয়েছেন। আমিও বুক বেঁধে আছি, যে আপনারা উৎসাহ দিতে থাকবেন আর আমিও কমন অব আ পাওয়ার ম্যান দেখাতে থাকব। পাঠক আছে বলেই তো কলম বেঁচে থাকে। আর পাঠিকাদের জন্য কলমধারী। জয় হিন্দ, জয় মহারাষ্ট্র, জয় বাংলা।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s