(১১৪)

মতি নন্দীর সেই উপন্যাসগুলো? সেই হারতে হারতে ঘুরে দাঁড়ানো মানুষগুলো? স্ট্রাইকার, স্টপার, কোনি, শিবার ফিরে আসা? এরা আমাদের এত প্রিয় কেন বলুন তো? সাফল্যের গণ্ডীর মধ্যে খুব কম লোকেই ঢুকতে পারে বলে? গড়পড়তা গবাদির আম জনতা সাফল্য আর ব্যর্থতার মাঝখানের ত্রিশঙ্কুর তেঁতো স্বাদ চাখতে চাখতে গল্পের মধ্যেই বাস্তব খুঁজে পায় তাই? নাকি নিজের মতো কেউ জিতে গেল এই আত্মশ্লাঘায় আরাম বোধ করে?

অনেকগুলো প্রশ্ন, উত্তর নিজে নিজে খুঁজে নিতে হয়। আপনারাই ঠিক করবেন হার জিতের সংজ্ঞা কি হবে। আজকের রেসের মাঠের ঘোড়াগুলো পোডিয়ামে না উঠতে পারলেই কি গুলির সম্মুখীন হবে? নাকি হার জিত তো হোতাই রহতা হ্যায়, যো টিকতা হ্যায় ও হি বিকতা হ্যায়? কথায় আছে না যে জীবনে শূন্য করে নি সে ব্যাটই ধরে নি।

মহেশ মঞ্জরেকরের অ্যাহসাস ছবিটি দেখেছেন? অবশ্য সিনেমাটা বিশেষ চলে নি যে আপনাকে দেখতেই হবে। এন্টারটেনমেন্ট তো হারে হয় না দাদা। লাগানেও শেষ বলের ক্যাচটা ছয় হয়ে গেছিল। অ্যাহসাসের মা মরা ছেলেটা বাপের কোচিং-এ লড়াই করতে শেখে কিন্তু রেসে দ্বিতীয় হয়। রুপোর পদকদের কে আর মনে রাখে বলুন? সৌরভের ভারতের থেকে ধোনির ভারত বা কপিলের ভারত ওই এক জায়গাতেই এগিয়ে থাকে। স্কোরবোর্ড কি শুধুই গাধা নাকি, কার্ডাস বাবু? নাকি মার্কশিট দিয়েই জীবন চলে? কিন্তু তাহলে তো বোরোলিনের বিজ্ঞাপনটাই ব্যর্থ হয়ে যায় কি বলেন?

“জীবনের নানান ওঠাপড়া যেন সহজে গায়ে না লাগে…”

আহা এই আপ্ত বাক্যটি যে আমরা কতবার শেখার চেষ্টা করি। মেয়েটা পড়ে গেলে কি ওকে সব সময় কোলেই নিয়ে থাকি? নাকি বলি চেষ্টা করে যা মা, একদিন তোরও হবে। হয়ও তো। হাঁটে বা সাইকেল চালাতে গিয়ে কে আর হুমড়ি খেয়ে পড়ে নি বলুন! সূর্য অস্তাচলে গেলেও তো সেই পরদিন ভোর হয়, সোনার আলোয় ভরে যায় বুক।

কিন্তু ফিসফাসে তো শুধু গৌর চন্দ্রিকা করেই কাটানো নয়, ঘটনা না ঘটলে অলংকারও তো আসে না। তাই ঘটনায় চলে যাই।

বিরেন্দর শেহবাগ সফল কেন বলুন তো? বর্তমানে বাঁচতে জানে বলেই। আগের বলটায় কি হয়েছে তা মনে না রেখে, বর্তমানে চোখ রাখে তাই। কিন্তু বর্তমান যদি অসহনীয় হয়? যদি মনেই হয় এই তেপান্তরের পথ শেষই হচ্ছে না। সুসময় তো চট করে ফুরিয়ে যায় কিন্তু দুঃসময়? তখন মনকে সোজা রাখা কি সোজা কাজ? বলা যত সহজ করা তো নয়! ঢের ঢের অধ্যাবসায় দরকার।

কিন্তু কচি বয়স তো ধৈর্যের বয়স নয়। লক্ষ্যের দিক অবিচল এগিয়ে যাবারও বয়স নয়। কিন্তু সত্যি যদি সে রকম ঘটে তাহলে কি একটু ঢাক পেটানো উচিত নয় বলুন? নিজের সন্তান হলেও?

ছেলেটা এমনিতে ছোটাছুটি করতে বেশ পছন্দই করে। শেষবার যবে স্কুলে স্পোর্টস হয়েছিল, বেশ বুদ্ধি করে সেবার বাধা দৌড় জিতেছিল। এবারেও ফেভারিট টেভারিট বলে বেশ আশা টাশা জেগেছে কারণ সাব জুনিয়র অ্যাথলেটিক্সে স্কুলের বাছাই পর্বে সুযোগ টুযোগ পেয়েছে। কিন্তু বিধি তার বাম। আজকাল অবশ্য বামেদের বিধিও ফুটো হয়েই আছে। কারণ তার কপালে পড়েছে বিন্দি রেস। বিন্দি রেসে কিছু দূর ছুটে গিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা টিপের প্যাকেট থেকে টিপ খুলে নাকে মুখে কানে মোট পাঁচটি টিপ লাগিয়ে ছুটে গিয়ে রেস শেষ করতে হবে।

ওদের স্কুলে আবার এই ব্যাপারটা আছে সবাইকে দৌড়োবার সুযোগ দেয়। যারা ভালো দৌড়য় তাদের জন্য বাধা দৌড় আর বাকিদের ফ্ল্যাট রেস।

তা হুইসল বাজার সঙ্গে সঙ্গে সবাই উৎসাহের সঙ্গে ছুটে গেল বিন্দির দিকে। ক্যামেরার লেন্সও ভিডিওয় দেখছে যে ছেলেটাই সবার আগে গিয়ে পৌঁছেছে বিন্দির কাছে। উত্তেজনা উত্তেজনা! কিন্তু এ কি? ছেলেটা তো আটকেই আছে। বিন্দির প্যাকেট থেকে বিন্দি খুলতেই পারছে না। চেষ্টা করেই যাচ্ছে। একে একে সবাই পৌঁছে গেল শেষ বিন্দুতে- কিন্তু ছেলেটা বিন্দিতেই আটকে। তাও সে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দর্শকাসনে বসে থাকা বাবা মারা তখন বয়স ভুলে গিয়ে এন্টারটেনমেন্টের সামগ্রী হিসাবে দেখছে ছেলেটাকে। হাহা হাসি টিটকিরি চলছে। ক্যামেরার ভিডিওও চোখ বন্ধ করেছে ততক্ষণে। কিন্তু ছেলেটা অবিচল। শেষ পর্যন্ত বোধহয় সফল হল পাঁচটা টিপ পরতে। ছুটে গিয়ে দৌড় শেষ করে মাথা উঁচিয়ে চলে গেল ড্রেসিংরুমের দিকে। বাবামা সান্ত্বনার ভাষা খুঁজছে। একজন খালি তার মধ্যেই বলে উঠলেন, “উসনে মাগর হিম্মত নহি হারি, রেস খতম কিয়া!”

পাঠক পাঠিকা এসব তো অলিম্পিকে ঘটে, এশিয়ান গেমসে, ওয়র্ল্ড অ্যাথলেটিক মিট! পা মচকে পড়ে গিয়ে অ্যাথলেটের চার বছরের পরিশ্রম জলে, তাও সে যখন দৌড় শেষের জন্য ঘসতে ঘসতে যায় তখন হাততালি পদকের থেকেও বড় দেখায়। কিন্তু এ তো টিভির পর্দা নয় বাবু মশায়, ইয়ে জিন্দেগী কা রঙ্গমঞ্চ হ্যায় অউর হাম সব কাঠপুতলী। কতজন পারি ব্যর্থতাকে মাথায় করে, ন্যুব্জ না হয়ে ফিরে আসতে?

আশীর্বাদ করুন ছেলেটা যেন এই ভাবেই জীবনের লড়াই লড়তে পারে। হারুক জিতুক কিচ্ছু এসে না যায়, যেন হার না মানে! তাতেই নিজে না জিতলেও শেষ পর্যন্ত জীবন জিতে যায়। তাই না?

জিজ্ঞেস করেছিলাম, বাড়ি আসার আর অনেক আদর দেবার ফাঁকে, হ্যাঁ রে বুক কাঁপে নি? উত্তর দিল টিপগুলো বাজে ছিল প্লাস্টিক থেকে খোলা যাচ্ছিল না, কি করব শেষ তো করতেই হতো। খারাপ তো লাগছিলই। কিন্তু শেষ তো করতেই হতো।

মাঝপথে পালানো যায় নে হে হোরাশিও। আমেন

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ এত প্রশ্ন কেন? আরে জীবন তো মাঝে মাঝে প্রচুর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, কি বলেন?

Advertisements

2 thoughts on “(১১৪)

  1. আমার একটা হালফিল সিনেমার ডায়লগ মনে পড়ে গেল সৌরাংশুদা, হারো তো হারো, ইজ্জত মাত উতারো…গল্প- সিনেমা আমাদের শেষমেশ জিতিয়ে দিয়ে হারিয়ে দেয়… একমাত্র এই জীবনই হারিয়ে দিয়ে এমন একটা জিতের গল্প বলে যায়, যেখানে গল্পেরা হেরে যায়… আবার একটা পপুলার ডায়লগ মনে পড়ছে…নাহ, কমেন্টটাই পুরো ফিল্মি হয়ে যাচ্ছে… ফিল্ম তো বড়জোর সত্যি ঘটনা অবলম্বনে হতে পারে… এই ছেলেটাকে কী আর সে ছুঁতে পারে !!!…

    Liked by 1 person

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s