(১১৬)

দিল্লিতে এখন শীত কম্বল মুড়ি দিয়ে আসে নি, তবে মাঝে মধ্যে পাতলা চাদরের নীচ দিয়ে খোলা পায়ে সুড়সুড়ি দিয়ে উপস্থিতি জানান দিয়ে যাচ্ছে বটে। গরম জামা কাপড়গুলো রোদ্দুরে উঁকি ঝুঁকি মারছে। সারা বছরের আলিস্যি ঝেড়ে ফুলে ফেঁপে উঠছে। এর মাঝেই মনে হল শীতের রোববারের সকাল শুরু করার সবথেকে উপযুক্ত জায়গা হল চাঁদনী চক। এই সেই চাঁদনী, যেখানে বোয়ালের পেট না পাওয়া গেলেও মখমলি কাবাব, হাবসি হালুয়া, জলেবিওয়ালার জিলিপি আর পরান্ঠেওয়ালার রাবড়ির পরোটা দিল খুশ করে দেয়। আর শেষ পাতে একটু খুরচান। আহা উপর নীচে সরের বালিশে শুয়ে থাকা ক্ষীর মালাই। জিভের জল পড়ে কী বোর্ড ভিজিয়ে দেবার উপক্রম।

কিন্তু এ সব একটু বেলা বাড়ার সঙ্গে শুরু হয়। চাঁদনী চকের শীতের সকাল একটা ক্যামেরা আর ধানাই পানাই সঙ্গে করে ছবি টবি তুলে আর হেঁটে হুটে যদি হাঁপিয়ে যান তাহলে সব থেকে আরাম দায়ক উপশম ছিল করিমের নাহারি আর তন্দুরি রুটি। নাহারিটি হল মুঘলাই রান্নার অন্যতম মাসাল্লাহ নিদর্শন। পেঁয়াজ, দারুচিনি, লবঙ্গ, এলাচ ধনে, আদা রসুন কাঁচালংকার ভাজা পেস্টকৃত মশলার ঝোলে মাংসের টুকরো সারা রাত ধরে ঢিমে আঁচে রেখে মোলায়েম সুরুয়া তৈরী হয়। পরিবেশনের সময় আদা লঙ্কার জুলিয়েন উপরে সাজিয়ে সঙ্গে কালোজিরের ছোঁয়া দেওয়া হালকা হলুদ মধ্যপ্রাচ্যীয় তন্দুরি রুটি, শীতের সকালটাই রুমানি হয়ে যায়।

বছর দুয়েক আগেও সকাল ছটা থেকে এই খেটেখাওয়া মুঘলাই ব্রেকফাস্টের রস জিভে মাখিয়ে মন গলিয়ে আচমন করে নেওয়া যেত। কিন্তু করিম দু বছর আগে থেকে হঠাৎ কোন অজ্ঞাত কারণে বেলা নটার আগে ঝাঁপ খোলে না। তাতে কুয়াশার প্রথম আলো আর ধোঁয়া ওঠা সুরুয়ার যে কম্বিনেশনটা পাওয়া যেত সেটা কোথাও যেন মিসিং। কিন্তু যে স্বাদের ভাগ হয় না, তা যত দেরীতেই চোখ মেলুক না কেন, ভোরবেলার স্বপ্ন তো মিথ্যে হয় না। তার রেশ সারা দিন ধরেই গুনগুনিয়ে রয়ে যায় অন্তরের অন্তঃপুরে। বার বার ফিরে যেতে হয় সেই স্বপ্নের খোঁজে।

দিল্লিতে এয়েচেন অথচ করিমের নাম শোনেন নি এমন লোক পাওয়া বিরল। তবুও উৎসাহীদের খাতিরে বলে রাখি চাঁদনী চক বা জামা মসজিদের করিম আর নিজামুদ্দিনের করিমই একমাত্র আদি ঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয়। বাকিগুলো হাঁসের বন্ধুর বন্ধুর বন্ধু- অর্থাৎ ফ্র্যাঞ্চাইজি। আর জামা মসজিদের করিমের যেমন নাহারি তেমন নিজামুদ্দিনের মাথার মণি হল ইয়াখনি স্যুপ। খেয়ে দেখে মতামত জানাতে ভুলবেন না। আফটার অল বাঙালী তো। খেয়ে খাইয়েই জন্নত খুঁজে পাই।

এবারে আমির খানী ফিসফাসটা শেষ করি গত রবিবারের করিমি যাত্রাপথের দুইখান গল্প দিয়েঃ

গল্প ১- বিয়ে শাদির মরসুম হলে ব্যাণ্ড বাজা বারাতের উপদ্রব বহুত বেড়ে যায়। সন্ধ্যে হলেই লম্বা লম্বা ট্রাফিক জ্যাম আর প্যাঁপ্যাঁপ্যাঁপ্যাঁ প্যাঁঅ্যাঁ প্যাঁপ্যাঁপ্যাঁ আর ঝাম্পড় ঝাম্পড়ের ধুম পড়ে যায়। ছেলেবেলায় তো আমার ছেলে বলেই ফেলত মানুষ এত বিয়ে করে কেন? আরে বিয়ে হল রাম্বা ঝাল আর টক কৎবেল খাবার মতো। শিরদাঁড়া ভেদ করে তার প্রভাব ব্রহ্মতালুতে চাঁটি মারে কিন্তু মুখে একবার দিলে নালে ঝোলে একাকার কাণ্ড। এ লাড্ডুর অস্তিত্বই পস্তানোর জন্য। তাই মানুষ আর বিয়ে সমার্থক হবার আশায় বা আশঙ্কায় প্রতি বিয়ের মরসুমে রাস্তা দিয়ে ঘোড়ির পিঠে তা দিতে দিতে সমাজ সংসার আলো করে চলতে থাকে। তা সে নিয়ে এফ এমে প্রশ্ন করেছিল জনসাধারণকে এক কন্যে। এক ব্যথিত হৃদয় ব্যক্তি হেঁচকি তুলে বলে উঠল, “আপনি তো আমার ব্যাথার জায়গায়, হাত পা পুরো শরীর রেখে দিয়েছেন। দু দিন আগে শীতকালের দুপুরে আমার বউ গরম জামা কাপড়ের সঙ্গে বিয়ের লেহঙ্গাটাও রোদ্দুরে দিচ্চিলো। বললে বিশ্বাস করবেন না, ন বছর আগেই তার দাম ছিল পঞ্চান্ন হাজার! বউকে জিগালাম, হ্যাঁ রে, কবার পরেছিস এটা? বউ কয়, বিয়ের পোশাক বিয়েতেই পরতে হয়। স্পেশাল অকেশন। এখানেই শেষ নয়। বাসনউলিকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম, এই লেহঙ্গার বদলে কি দেবে? সে বলে একটা দুধের ক্যান আর একটা কড়াই!!” বুঝুন ঠ্যালা।

গল্প ২- গল্পটা জোর করে পয়দা করলাম। তবে ঘটনাটা সত্যি। বাক্সপ্যাঁটরা নিয়েই করিম যাচ্ছিলাম তা লালবাতির বিরামে এসে ফটোকপি করা বই বিক্রিকারী একটি ছোকরা আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “হাফ গার্লফ্রেণ্ড চাহিয়ে?” আমি নিরস গলায় বিরস বদনে বললাম, “মেরি শাদি হো চুকি হ্যায়!” কি বুঝল কি জানি না। কিন্তু চেতন ভগতের সাম্প্রতিক অশ্বডিম্বটিরে গলা চেপে ধরে সে অন্য গাড়ির দিকে হাঁটা লাগালো হনহনিয়ে। গাড়ির আয়নায় দেখলাম মাঝে মাঝেই আমাকে ঘুরে ঘুরে দেখছে। বিটকেল উত্তর রে বাবা! বেঁচে থাক আমার চেতন ভগত!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ খাওয়া দাওয়া নিয়ে অভিযান আমার বেশ প্রিয় বিষয়। কিন্তু এক্ষুনি এক্ষুনি লেখার ইচ্ছা হল কুন্তলার অবান্তর পরে। abantar-prolaap.blogspot.in আর bongpen.net আমার প্রিয়তম দুটি বাংলা ব্লগ।

প্রঃ পুঃ দুইঃ নতুন বই বাজারে আসছে দেখে http://www.fisfas.inটাকে একটু সাজানো গোছানোর চেষ্টা করলাম। কেমন হল বলবেন কিন্তু!

Advertisements

2 thoughts on “(১১৬)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s