(১১৮)

মাঝে মাঝে কিছু দিন একে দুইয়ে মিশে গিয়ে এক দিন হয়ে যায়।

এই যেমন শনিবারের কথাই ধরুন। পিকে নিয়ে বেশ হাইপ্স অ্যাণ্ড হুপলা শুনছিলাম এবং সমালোচনাগুলো আস্তে আস্তে আসতে শুরু করেছিল।

তা শনিবার সকালে এমনিতেই গোল্লা চোখ নিয়ে ভারত অস্ট্রেলিয়া দেখার কথা ছিল। কিন্তু সে দেখা কি যে দেখা। বুকমাইশোতে একটা করে ক্লিক করি আর একটা করে উইকেট পড়ে। কুড়ুমের কম্পিউটার কোথাকার।

যাই হোক পিকে দেখতে সকাল সকাল হাজির হয়ে গেলাম কাছাকাছি একটি মাল্টিপ্লেক্সে। কেমন সিনেমা, ব্যাকগ্রাউণ্ড স্কোর, সিনেমাটোগ্রাফি ইত্যাদি গুলি মেরে আসল কথায় আসি।

দেখুন পাঠক পাঠিকারা, একটু আধটু বইটই, বিশেষত কবিতার বইটই পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে যে সহজভাবে যদি কিছু কঠিন কথা কম সময়ে হাসতে খেলতে বলে দেওয়া যায় তার যা প্রভাব ও প্রসার তা বোধহয় গম্ভীর কথা নাকের ডগায় চশমা ঝুলিয়ে হুম হাম সহযোগে বলার থেকে কিঞ্চিত বেশীই হবে। তার জন্যে প্রয়োজনে ক্লিশে ব্যবহার করুন চমক দিন। কিন্তু ট্রেন যেন সর্দারজীর খোঁজে বেলাইনে না যায়।

আমি সমান্তরাল সিনেমার যে বিশাল ভক্ত তা তো নয়। এই তো আগের ফিসফাসেই ডিডিএলজে নিয়ে বলতে গিয়ে ভালো খারাপের প্রভেদ করতে পারলাম না। তবে কি জানেন, পরিবর্তিত সময়ে যদি গোডো বাবুর জন্য অপেক্ষাতেই জীবন অতিবাহিত করি তাহলে বাপু আমার মাহেন্দ্রক্ষণ মাছরাঙার মুখেই ধরা পড়ে যাবে আর আমার ছিপ থেকে যাবে খালি। বিশেষতঃ এই সব বাবাজীদের আসল রূপটা যখন সমাজের ঘুণের প্রতিচ্ছবিগুলোকে আরও স্পষ্ট করতে শুরু করেছে তখন তাদের ঘেঁটি ধরে তর্কের সরলতা দিয়ে আম কে আম আর আঁটির দাম করে দিলেই তো সাধারণ মানুষের কাছে তার সাফল্য। আর এইখানেই পিকে জিতে গেল বলে আমার মনে হল।

প্রচুর রূপক ব্যবহার করা হয়েছে। আমির খানকে নগ্ন করে হাজির করানোর মধ্যে দিয়ে দেখানো যে খালি মনে যদি প্রশ্ন করা শুরু করা হয় তবেই সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছয়। পিকে যেখানে এসে নামল সেটাও একদম জনমনুষ্যহীন স্থান। একই রূপক। তারপর বলিউডি চেজ যখন চলছে তখন দিল্লির সঠিক মানচিত্রের শব ব্যবচ্ছেদ করার মাধ্যমে এটা দেখানো যে এটা আসলে একটা গল্প। ম্যাজিক রিয়েলিজম? পরাবাস্তবতা?

ভগবান বানায় কে? আপনি আমি না তিনি নিজে। নাস্তিকতা আর আস্তিকতার মধ্যে যে রাজপথটা গেছে তার মধ্যে মাঝে মাঝে স্বল্পবিরামের মত ডিভাইডার- যে জায়গাটা খালি চোখে দেখা যায় না সেটাই তো বিশ্বাসের পথ। বাকিদুটো তো বিশ্বাসহীনতা এবং বিশ্বাস ভঙ্গের পথ। ধর্ম ও ধর্মীয়তা। রিলিজিয়ন ও রিলিজিয়াসনেস। আজকের খালি চোখে এই শব্দগুলো তো মিলে মিশে এক হয়ে গেছে। কিন্তু প্রাসঙ্গিকতা না বুঝে কান মাথা বন্ধ করে ধার্মিক শীতে যবুথবু হয়ে জিগির তুলে বাঁচার মধ্যেই তো এই ভেদাভেদের বীজ লুকিয়ে।

পাকিস্তানের ক্লিশেটা তো সেই কারণেই ব্যবহার করেছে। “ঠাপ্পা আছে কোথাও? ঠাপ্পা?” আমি পাকিস্তানি তুমি ভারতীয়, আমি মুসলিম তুমি হিন্দু? দেখ দেখ ইয়ে হ্যায় হিন্দুকা খুন অউর ইয়ে হ্যায় মুসলমানকা খুন। আব মিলা দিয়া। আব বতা কোনসা হিন্দুকা অউর কোন সা মুসলমানকা।

ভিতর থেকে কেউ বলতে পারল না। আর বাইরে থেকে একটা ভিনগ্রহী এসে সাদা মনে কাদা দেখিয়ে দিল। কারণ তার মন ছিল অমলিন। আনকোরাপ্ট। এটাই তো পিকের সাফল্য। রাজন্যবর্গ, ধর্মীয় বেহালা আর যুদ্ধের দামামা মিলে পাশের দেশটাকে শত্রু করেছে। আমাদের যারপরনায় ক্ষতি করাই এখন তাদের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তাতে সাধারণ মানুষের দোষ কোথায় বলুন দিকি? আমার দ্বিতীয় প্রিয় ক্রিকেটার পাকিস্তানি, প্রিয় গায়ক পাকিস্তানি। নুসরত আর ওয়াসিমদের নিয়ে কি করি বলুন দেখি। না আমি সব ভুলে পাকিস্তানকে আলিঙ্গন করার পক্ষপাতী নই। যতক্ষণ বিভেদীশক্তি আমার দেশকে ছিন্নভিন্ন করছে ততক্ষণ তো নইই। কিন্তু তা বলে শুধুমাত্র পাকিস্তানি বলে কাউকে দূরে ঠেলে দেব? আহা কানাকে কানা বলিও না, খোঁড়াকে খোঁড়া বলিও না, শুধু পাকিস্তানিকে পাকিস্তানি বল।

আরে কোই হ্যায়। এক টিউবওয়েল লেকে আ রে! পুরা পাকিস্তানপে গাড়না হ্যায়।

ও দাদা যুদ্ধে যাবেন কামান গোলা বন্দুক নিয়ে হাতে
তার চেয়ে নয় মুখেই মারুন পাকিস্তানকে ভাতে…
পেশোয়ারের ছবিগুলো আমাদের বুকে হাত দিয়ে ভাবায় নি বলুন? বলতে পারব ঠিক হয়েছে? আরও উগ্রপন্থাকে দুধ কলা খাওয়াও! পারব না! কারণ ওরা আমাদের সন্তানও তো হতে পারত!

পরের দিনই ২৬/১১-র মাস্টারমাইণ্ড প্রমাণের অভাবে জামিন পেয়ে গেলে হ্যাসট্যাগ পাকিস্তানেই তৈরী হয়ে যায় তার বিরুদ্ধে। আরে মানুষ তো! যতই জন্ম থেকে জন্মদাগ নিয়ে জন্মে থাকি না কেন। একই সময়ে আধঘণ্টার ওদিক এদিকে একই হাওয়ায় শ্বাস তো নিই। বিভেদকামীরা উচ্ছন্নে যাক, আমার দেশ আমার মাথায় থাকুক। কিন্তু জাত ধর্ম বিভেদ নিঃশ্বাসে বিষ ভরে দেয়। পিকেকে জিজ্ঞাসা করুন।

একবারই শ্লেষ ব্যবহৃত হয় তার বক্তব্যে, “তুম বাঁচাওগে ভগোয়ান কো? তুম? জিসনে সারে জাহান বানায়া উসকো বাঁচাওগে তুম? আরে ও আপনা বাচাও খুদ কর সকতে হ্যায়?”

আরে রবি ঠাকুরই কি সত্যি কথাটাই না বলে গেছেন, সহজ কথা যায় না বলা সহজে… পিকে সেটাই করে দেখায়। আর সেখানেই পিকের সাফল্য। যখন সিনেমার টাইটেলকার্ড চলছে তখন পরিক্ষিত সাহনীর মতই আমার ছেলেও সিটি দিচ্ছে প্রথমবার বাপ-মার সামনেই। সেখানেই পিকের সাফল্য!
রিভিউয়ের খাতায় লাল কালিতে কাটাছেঁড়া পরে করবেন। আগে মানুষ একটু বেঁচে নিক না হয়! কি বলেন?

কিন্তু শুধু মানুষ বাঁচলেই হবে? এই যে শীত থেকে দূরে থাকতে শুকনো পাতা পোড়ানো হয়, তাতে পরিবেশ বাঁচবে? আর ওই যে ফিরে আসার সময় চোখের সামনে একটা ইনোভা পনেরো দিনের একটা কুকুর ছানাকে চাপা দিয়ে চলে গেল। আর আমি তাকে কোলের মধ্যে তুলে নিয়ে রক্তাক্ত মুখটায় একটু জল দেবার চেষ্টা করলাম আর সে আমার হাতের মধ্যেই গরম থেকে ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা হয়ে গেল। আর তার বাবা মা ভাই বোন মাসি পিসি অদ্ভুত সম্মানে আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রইল। বাচ্চাদের দূরে রাখল। আর ফেরার সময় একটু লাফিয়ে আমার হাঁটুর কাছটা চেটে দিল। তাতে মানুষ কি হেরে গেল না? ওই মরা কুকুরছানাটা আর তার পরিবার হারিয়ে তো জিতে গেল বাওয়া। হারকে জিতনেওয়ালো কো বাজীগর কহতে হ্যায়।

ও হ্যাঁ, শেষে শনিবারের শেষ কিন্তু শেষ নয় ঘটনাটা দিয়ে আজকের মতো শেষ করি। মঙ্গলবার থেকে দিল্লিতে বইমেলা শুরু। তার প্রস্তুতি সেরে রাতে আইটিও দিয়ে ফিরছিলাম। সাড়ে নটার সময়। তিলক ব্রিজের দিকে টার্ণ নিয়ে দেখি একটি ওয়াগন আর আর একটি ইন্ডিকা ভিস্তা জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে। ওয়াগন আরের দুই লোক হেই মারি কি সেই মারি। আর ভিস্তাও কম যায় না। গাড়ি ডিভাইডারের সামনে সাবধানে রেখে দৌড়ে এলাম থামাতে। ওয়াগন আরকে থামানো গেল নরমে গরমে। কিন্তু এবার ভিস্তা চড়ে বসে আছে। দেশী গন্ধে মজলিশ বেইমান কিন্তু ১০০ ফোন করা থেকে কে আটকায়। বাধ্য হয়ে কাছের পুলিশ বিটের কচি ঘুমন্ত পুলিশটাকে ডাকলাম। সে আর আমি মিলে ভিস্তাকে বোঝালাম যে ভাই উভয়ের দোষেই হয়েছে। বেশী ট্যাণ্ডাই ম্যাণ্ডাই করলে উভয়েই জেলে ঢুকবা। তা সে ঝাজ্জড়বাসী জাঠপুঙ্গব শুনবে কেন। সে তো খরচা পানি নিয়েই ছাড়বে। এর পর কচি পুলিশটা ময়দানে নামলো। কাটাকাটা জাঠ কণ্ঠে বোঝালো, “তন্নে ভি মরোগে অউর মন্নে ভি রাত কা নিন্দ খরাব করনা হ্যায়।” দেশোয়ালি ভাষা শুনে ভিস্তা সম্মত হল। তখন আবার কচি পুলিশের অন্য চিন্তা শুরু হল। “আরে তু তো ইহা হাঁ বোল রেয়া হ্যায়। দোশো মিটার দূর যা কে আগর ফোন ঘুমা লিয়া তো মন্নে তো নোকরি গয়ই।” শেষে আমাকে বটঠাকুর বানাবার জন্য নম্বর নিয়ে ছাড়ল। ওয়াগন আর তো তখন গোপাল বড় সুবোধ ছেলে…!

রাত্রে যখন বাড়ি ফিরছিলাম তখন দেখলাম বড় কুকুরগুলো এসে দাঁড়িয়েছে। চোখগুলো দেখতে পেলাম না, কিন্তু অন্ধকারেও জ্বলজ্বল করছিল তা বুঝলাম। কিন্তু এই নিস্তব্ধতাটাই বা কম কিসের।

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ পেশোয়ার নিয়ে কি আর বলি বলুন! ছবির অ্যালবামটা শেষ করতে পারলাম না বাচ্চাগুলোর। আর প্রিন্সিপালের জন্য একশো আটবার গান স্যালুট (স্যালুটটাতেও gun আনতে হল, গান নয়!)। গত কয়েক হাজার বছরেও মানুষ হয়ে উঠতে পারলাম না আমরা। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে প্রাগৈতিহাসিক বইকে দুষ্কর্মের বটঠাকুর হিসাবে খাড়া করি! বিভেদ রুটির জায়গায় হাতে বন্দুক ধরিয়ে দেয়। তাতে পেট ভরে না- বুক ভরে, বিষে।

প্রপূ ২ঃ কাল থেকে দিল্লি বইমেলায় ফিসফাসের মুখ দেখানোর শুরু! সবার শেষে তো পেটটাই থেকে যায়। প্রকাশকের জন্য আমার জন্য ভালো রম্যরচনার জন্য বইটা কিনুন! পড়ুন! উপহার দিন! এই আবেদন রাখলাম। দায় বদ্ধতার কান কাটা হয় না।

2 thoughts on “(১১৮)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s