(১২০)

প্রত্যেক বছরের শুরুর দিকে কিছুদিন দিল্লি কুয়াশার কম্বল মুড়ে অসূর্যম্পশ্যা হয়ে শুয়ে থাকে। তাপমাত্রা তখন নামতে নামতে নামতে শিমলা পেরিয়ে অমৃতসর শ্রীনগরের পথ ধরে। জামাকাপড় শুকোয় না, নাক অনুভব করা যায় না, চশমাতেও ওয়াইপার লাগাবার দরকার পড়ে। সেই হিসেবমতো গত তিন চার বছর ধরে দিল্লির স্কুলটুলগুলো চালাক চতুর হয়ে গিয়ে ক্রিসমাসের ছুটিটা বছরের শুরুতে ট্রান্সফার করে দিয়েছিল। কিন্তু প্রকৃতি দেবীর খামখেয়ালীপনার সামনে মানুষজন আর তাদের তৈরী স্কুলটুলগুলো তো শিশু। তাই এবারে তিনি এক সপ্তাহ আগে থেকেই বেগড়বাঁই শুরু করে দিয়েছিলেন।

fog

দিল্লিতে বইমেলা হল ২৩-২৮শে ডিসেম্বর, ২০১৪। তা প্রকৃতির খেয়ালে তখন থেকেই রাম্বা ঠাণ্ডা আর হাম্বা কুয়াশায় শহরটা গেল হারিয়ে। মাঝে দু চার দিনের জন্য সূয্যিমামা ফ্রেঞ্চ লিভ ভেঙে অফিসে মুখ দেখিয়েছিলেন বটে, কিন্তু তাতে খোঁয়ারি ভাঙে নি। (সত্যিই এত সুন্দর একটা কাব্যিক ঊর্দু শব্দ “খুমারি”, বাংলায় এসে একেবারের খোঁয়াড়ের মাল হয়ে গেল!!) যেই দু সপ্তাহের ছুটি কাটিয়ে কচিকাঁচারা স্কুলে ফিরে যাচ্ছে। তখনই আবার কুয়াশার উৎপাত শুরু হল।

এমনিতেই বইমেলার শেষ দিন কুয়াশা দানবিক রূপ ধারণ করেছিল। বড় বড় রাস্তা তো ছেড়েই দিচ্ছি। রাত্রি দশটার সময় ছোট ছোট গলিগুলোতেও ল্যাম্পপোস্ট দেখা যাচ্ছিল না। যেন নিশ্ছিদ্র রাত মায়াঘোমটায় মুখ ঢেকে গোঁসাঘরে শিকল দিয়েছে।

এই সময় আবার রোদ আপনার সঙ্গে লুকোচুরি খেলে। আপনি হয়তো ঝলমলে আকাশ দেখে বেরোলেন, একটু পরেই রাস্তায় যমদূতের মতো কুয়াশা পথ ঢেকে এসে দাঁড়াবে। ব্যাস সব কটা গাড়ি তার ঝাঁপ ফেলে দিয়ে টো লাইট জ্বালিয়ে দপ দপে লম্ফের মতো গুটগুটিয়ে রাস্তা দিয়ে চলতে থাকবে। হাঁটতে বেরোলে বউয়ের হাত ধরবার ইচ্ছা হলেও তার জো নেই। শূন্য দর্শাবস্থায় কার ধরতে কার হাত ধরে ফেলবেন আর তারপর কি যে নাটক হবে সে কথা ভাবলেও হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। বাহ্যিক তাপমাত্রার প্রকোপেরও দরকার পড়ে না।

আর বড় রাস্তায় দশ কিমি প্রতি ঘণ্টা গতিবেগে যাওয়া গাড়িগুলোও এর ওর পায়ে পা দিয়ে আগ বাড়িয়ে ঝগড়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে, সে তো বলাই বাহুল্য। অথচ, আজ থেকে ঠিক চার মাস পড়েই দেখবেন, আকাশের জলবিন্দুগুলো সব আপনার শরীর থেকে গড়াতে শুরু করবে। মাথা ডিম সেদ্ধ করে ফেলার মতো গরম হয়ে উঠবে, কান লাল ঠোঁট ফ্যাকাসে হয়ে যাবে। সারা শরীরের জল আপনার গলায় জড়ো হয়ে আর্ত চিৎকারে ব্যস্ত হয়ে পড়বে- “একটু জল পাই কোথায় বলুন তো?”

সত্যিই দিল্লি উগ্রপন্থী আবহাওয়ার শহর। তবে শীতকাল মানেই কি শুধু কম্বল আর কুয়াশা, আকাশের ধূসর রঙ ভারসাম্য রাখার জন্যই যেন আপনার খাবার থালায় রঙচঙে হয়ে উঠে আসে। তাজা সবজি, রকমারি ব্যঞ্জন আর সর্বোপরি গুড় তিল আর পৌষ পার্বণ। সর্বোনাশের সঙ্গে পৌষ মাসও যে আসে। গুড় বলতেই মনে পড়ে পয়রা গুড় আর ভোর রাত্রের খেজুর গাছে উঠে রসাস্বাদন। নগর কোলকাতার ছেলে হয়েও যে রস থেকে বঞ্চিত থাকি নি কখনও।

সে প্রসঙ্গেই মনে পড়ে গেল একবার হাওড়ায় চড়ুইভাতি করতে গিয়ে দুই বন্ধুর বেলাবেলি খেঁজুরের রস খেয়ে কি অবস্থা হয়েছিল। ঘড়ির কাঁটার ঘায়ে সেই রস তখন তাড়ি হয়ে গিয়েছে। একজন তো বুঁদ হয়ে বসে রইল। আরেক বন্ধু সমানে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুরতে লাগল। তাকে খালি গা করে দিয়ে ছাদে দৌড় করিয়ে, গলায় আঙুল দিয়ে বমি করিয়ে, একশো আটবার “আমার নাম বু…, আমার নাম বু…” বলতে বলতে নেশাওদ্ধার করা হল।

কিন্তু সত্যি বলতে কি, সূর্য ওঠার আগে সেই রস একদম অমৃতসমান হয়ে দাঁড়ায়। আর তা জ্বাল দিয়ে যে গুড় তৈরী হয়, আহা তার সঙ্গে সম্মুখ সমরে একমাত্র আসতে পারে তালের গুড়। আঁখ তো সেখানে ছিবড়ে।

গুড় তো হল! এবার একটু চালগুঁড়ি আর ডালগুঁড়ি নিয়ে আসুন, আর একটু নারকেল কোরা ব্যাস তাতে কটা এলাচ দানা মিলিয়ে দিন আর নানা প্রকারে বানান পিঠে, পুলি পিঠে, রসবড়া, মুগসামলি, আস্কে পিঠে! আহা পেটে সইবার জন্য কতই না আয়োজন।

pithe

উত্তরে আবার গুড়ের দোসর হচ্ছে তিল আর বাদাম। তিল দিয়ে রেউড়ি আর বাদাম চাকি। আহা ঢাকি ছাড়াই তালে তালে মনের ঢাক ঢ্যামকুড়কুড় বাজতে থাকে। আর মরসুমি শীতে কাঠকুটো নিয়ে একটু আগুন জ্বালিয়ে নিলেই হল! রাত নেশার মতোই আপনার চারপাশে “মেহবুবা মেহবুবা” গেয়ে দুলতে থাকবে।

Sing Chikki

উত্তুরে শীতের গল্প হবে আর তন্দুর কাবাবের গল্প হবে না তা কি করে হয় বলুন। বছর চারেক আগে ভোগলের এক দোকান থেকে ছোট একটা অ্যালুমিনিয়াম ও লোহার তৈরী তন্দুর আর আমিষ ও নিরামিষ শিক নিয়ে এসেছিলাম। আমিষ শিক বড় মাংসের টুকরো ধরে রাখে বলে একটু মোটা হয় নিরামিষের তুলনায়। তারপর কাঠ আর কাঠ কয়লা আর ফুঁয়ের সহযোগে গনগনে আঁচকে গুনগুনে আঁচে পরিবর্তন করে নেওয়া। তারপর শোকেস থেকে শিকে বাঁধা রেশমি মাংস আর রাজস্থানি প্রিন্টের সবজি আর পনির বিছিয়ে রাখুন। গুলতানির ফাঁকে ফাঁকে একটু উলটে পালটে দিন, মাঝে মাঝে ভিতর আর বাইরের আগুন উস্কে দিন নরমে গরমে। ব্যাস, মেহফিল কে মেহফিল, বাজার মে ভি দিল খিল জায়েঙ্গে দোস্তো।

kabab

জামা মসজিদের করিমে একটা পুরো বকরা রোস্ট পাওয়া যায়। ৮-১০ জন মিলে শেষ করে উঠতে পারবে না, কিন্তু আমার নিজের তার পরশ পাবার ইচ্ছাটা মনের মধ্যেই রয়ে গেছে। কোন না কোন দিন তো পূরণ হবেই।

mutton

আর দিল্লিতে আছে দৌলত কা চাট! এটার বিষয়েও লিখেছিলাম কোন একটা ফিসফাসে। এক বাটি চেরাপুঞ্জীর মেঘে একটু আবীর আর ফাগ মাখিয়ে আপনার হাতে দিয়ে দেবে, আর আপনি পরবর্তি পাঁচ মিনিট ধরে হালকা হয়ে ভেসে ভেসে বেরাবেন। কিন্তু সেই স্বর্গীয় পরশ শুধুমাত্র দিওয়ালি থেকে হোলি পর্যন্তই পাবেন। গরমে গলে যায় এই তুলো! দুধকে জ্বাল দিয়ে গার ফেনা সরিয়ে সরিয়ে সেই ফেনার সঙ্গে গুঁড়ো চিনি মিশিয়ে খুব কশে নেড়ে নিলে এই তুলোর মতো মেঘের উৎপত্তি হয়।
Món-Daulat-ki-chaat

পাঠক পাঠিকা, এইবারের ফিসফাসের মজার ব্যাপার হল, দুপাতা জুড়ে গৌরচন্দ্রিকা! আর আসল গল্পটা হয়তো দুই লাইনের। কিছুই না। সকালে কুয়াশার মধ্যে সরায় কালে খাঁর সামনে দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছিলাম। খান তিনেক কাক উড়ে এল (এমনিতে দিল্লিতে কাকের আনাগোনা খুব বেশী নয়! কুয়াশাতে তো আরই চোখে পড়ার কথা নয়!)। এমনিতেই গন্তব্যের হদিশ পাওয়া দুষ্কর! তাই তাদের মধ্যে দুই কাক আবার ফিরে গেল ঘরের ছেলে ঘরে। তৃতীয়টি বোধহয় সর্দার সিং ছিল! (এইচআইএল হকি লিগের বিজ্ঞাপনটা দেখে নেবেন!) সে অত সহজে হার মানবার বান্দা/ বান্দি নয়! সে গুছিয়ে বসল একটা ষণ্ডামার্কা কোয়ালিসের মাথায়। প্রথম প্রথম দু পায়ে ভারসাম্য রাখতে বেশ অসুবিধা হচ্ছিল। কিন্তু অভ্যস্ত হয়ে পড়ার পর স্মার্টলি ডানা দিয়ে ব্যালেন্স করতে করতে সে এগিয়ে চলল ধোঁয়ার দিকে। বুদ্ধিমত্তা কি শুধুমাত্র মানুষের পৈত্রিক সম্পত্তি নাকি? জিওহ!
lonecrow

Advertisements

4 thoughts on “(১২০)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s