(১২১)

আমার ভাগ্নেবউ এসেছিল দিল্লি, তাদের গ্রুপ রণনের সঙ্গে। পাঠক পাঠিকারা, এই কারণেই স্টিফ আপার লিপেরা আঙ্কল আর আন্টি দিয়েই ম্যানেজ করে। অ্যামেরিকানরা তো আরও এককাঠি উপরে যায়। তারা বাবাকে ওল্ড ম্যান আর বাকিদের স্রেফ নাম দিয়ে ডেকে দেয়। স্রেফ বাঙালীরা মন দিয়ে ধারাপাত আর পারিবারিক গাছের সাহায্য নিয়ে সঠিক সম্পর্কগুলিকে সম্মান করে চলে। আমার জাঠতুতো পিসতুতো ভাগ্নে ভাইপোগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি স্যাম্পেল আমার থেকে এট্টু বড় বা সমবয়সী আছে। একমাত্র বাঙালীরাই বুঝতে পারে এই সমস্যাটা, বাকিদের সূক্ষ্মবুদ্ধিতে এসব ধরা পড়বে না।

সরকারী চাকুরীর পরীক্ষায় টেস্ট অফ রিজনিং-এ একটা প্রশ্ন হামেসাই থাকত। বল দেখি খোকা তোমার মামার শ্বশুরের মামাশ্বশুরের মামাতো ভাইয়ের মাসতুতো নন্দাই তোমার কে হয়? আমরা খুব প্যাঁচ কষে টসে বলতাম সে আমার ভায়রাভাইটাই হয়। এই রকম আর কি! তো আমার ভাগ্নে আর ভাগ্নেবউ ব্যাপারটাও সেইরকমই। আমার বাবা এবং মা উভয়ই নিজের নিজের পরিবারের কনিষ্ঠতম/ তমা! ফলে যা হবার তাই হয়েছে। আমার ছেলে তবু বৌদি বললে ঠিক ছিল, মেয়েকে দেখিয়ে যেই ভাগ্নেবউকে বলেছি যে এ তোমার ননদ, সে তো হাঁউমাউ করে উঠেছে, “অ্যাই তুই আমায় কাকিমা ডাকবি!” আর মেয়ে তো সবে সবে মুরগী কিভাবে ডাকে তা শিখেছে, ফলে সেও চটপট বলে উঠল, “কঁক কঁক”!

সে সব থাক, মুদ্দে কি বাতে আসি। রণন একটা সাংস্কৃতিক দল, বিভিন্ন জায়গার সংস্কৃতিবান মানুষদের নিয়ে তাদের কাজকারবার। এখানে এসেছিল বিক্রম আয়েঙ্গারের একটা পিস নিয়ে, যার কোরিওগ্রাফি করেছেন প্রীতি আত্রে। সে এক অদ্ভুত পরিবেশনা! খোলা লনে বর্গাকার ক্ষেত্র তৈরী হয়েছে, আর হয়েছে সেই বর্গক্ষেত্র থেকে দর্শক পর্যন্ত আসার একটি পথ। সীমারেখা নীল রঙ এবং বর্গক্ষেত্রের বাইরের অংশটুকু বালি দিয়ে ঢাকা। শুরুতে শুধুমাত্র শরীরের ঊর্দ্ধাংশ দিয়ে শুরু হল দর্শকদের সঙ্গে পারফর্মারের মানসিক সংযোগ। তারপর সমস্ত প্রপ্স এবং লনের প্রতিটি উপকরণ যুক্ত হল সেই প্রকাশে। শেষ হল কত্থক ও ধারাভাষ্য সমেত। শুরুতে দর্শকদের অধরা থাকলেও ধীরে ধীরে নীল ও হলুদের মিশ্রণে আকাশের নীচে সবুজ বালিয়াড়ির মধ্যে সেই পারফরম্যান্স ধরা দিল উপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে। মন্ত্রমুগ্ধতা বোধহয় এক শব্দে প্রকাশ করার পক্ষে কমই।

সে যাই হোক, তারপর মিয়াবিবি গিয়ে হাজির হলাম ইন্ডিয়া হ্যাবিটাটের ক্রাইম লেখকদের মিটে। ব্যোমকেশ, ধৃতিমান চ্যাটার্জী, রজিত কাপুর আর দিবাকর ব্যানার্জী পেরিয়ে সেদিনের রাত্রিটা শেষ হল পিপলস থিয়েটারের ‘ওহ নেহি গান্ধী’ নাটক দিয়ে।

দিল্লির বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহগুলির হলভাড়া যখন আকাশচুম্বী, তখন বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের মুক্তধারা হলটি বিশেষতঃ দিল্লির বাঙালী নাটক এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক গ্রুপগুলির কাছে ক্যারাবিয়ান দ্বীপের মতই মনোরম ও সহজলভ্য।
সোমবার অবশ্য অন্যদিন ছিল, যদিও অফিশিয়াল কাজকর্ম নিয়ে বিশেষ কিছু বলার থাকে না। তবুও সোমবার আমার হাজিরা ছিল দিল্লি হাইকোর্টে অফিশিয়াল একটি কোর্টকেস সম্বন্ধীয়। যাদের কোর্ট সম্পর্কে অভিজ্ঞতা আছেন তারা খুব ভালো করেই জানেন যে, সিনেমার কোর্টরুম আর বাস্তবের কোর্টরুমের মধ্যে আকাশপাতাল পার্থক্য। কিন্তু নাটকীয় উপাদান তো সর্বত্রই থাকে। যেমন সোমবার সমগ্র আদালতের সামনে ‘আর্লি হিয়ারিং’-এর অনুরোধ আসা একাধিক আবেদনে জাজ মহাশয় উল্লেখ করলেন দিওয়ারের সেই অমোঘ ডায়লগ,

‘যাও, যাকে হর উস আদমিসে এনওসি লেকে আও, যিস নে ভি আপকা অরিজিনাল ডেটসে প্যাহলে হোনেওয়ালি হিয়ারিং কে লিয়ে পেসেন্টলি ইন্তেজার কর রাহা হ্যায়।’ কেয়াবাত! ফাটা পোস্টার নিকলা হিরো। অপর একটি কেসে বিচারকই আর্গুমেন্ট করতে লাগলেন, ‘ধরে নিচ্ছি আপনি যা বলছেন সেটাই ঠিক! পরে কিন্তু বলবেন না ওটা নয় সেটা! যাই হোক, তাহলে ‘এ’-র অর্থ হচ্ছে ‘বি’; আর ‘সি’ হল গিয়ে ‘ডি’?’ ব্যাস উকিল নিজেই ঘাবড়ে গিয়ে না না, হ্যাঁ হ্যাঁ করে একসা কাণ্ড। সে যাই হোক, এমনিতে আমরা সরকারি উকিলকে বেশী টাকা পয়সা দিই না বলে সে নিজে খুব মন দিয়ে কেস লড়ে না বলে বদনাম করি বটে, কিন্তু সঠিকভাবে উকিলকে ব্রিফিং করলে যে কত সহজে কার্যোদ্ধার হয় তা আমার কেসটিতেই পরিস্ফুট হল। কেস ডিসমিস করিয়ে অফিস থেকে দ্রুত ফিরে এলাম পার্শ্ববর্তিনী আর ভাগ্নেবউকে নিয়ে বাড়িতে। তারা এতদকালযাবত দিল্লি ভ্রমণ করছিলেন, কিন্তু ভাগ্নেবউটির ট্রেন ধরার ছিল। তবে কুয়াশায় মোড়া দিল্লিতে তো ট্রেনও ধরা দেয় না দেয় না। (আচ্ছা এতক্ষণ ধরে খালি ভাগ্নেবউ ভাগ্নেবউ করে যাচ্ছি! তা তার কি কোন নাম নেই? জয়তী জয়তী)

যাই হোক, কুয়াশার চক্করে সাড়ে চারটের শিয়ালদা রাজধানী ছাড়বে সাতটা চল্লিশে। আমার বাড়ি থেকে মোটামুটি চল্লিশ মিনিট লাগে। তাই মোটামুটি ছটা কুড়িতে বেরবো বলে গড়িমসি করতে করতে গাড়ি নিয়ে যখন বড় রাস্তায় পড়লাম তখন গাড়ির ঘড়ির কাঁটাটা আরও কুড়ি মিনিট গড়িয়ে গেছে।

পাঠকও/ পাঠিকারা, একটু যে চাপ হয় নি তা নয়। বিশেষত অফিস ফেরত রাস্তা। সন্ধ্যায় কতটা খালি থাকবে সেই প্রশ্নও ছিল। কিন্তু দেখলাম মেয়েটি অতটি ঘাবড়ায় নি! তার দুটি কারণ হতে পারে, হয় সে একেবারেই ঘাবড়ায় না, অথবা দিল্লির রাস্তাঘাট এবং সর্বোপরি দূরত্ব সম্পর্কে সঠিকভাবে ওয়াকিবহাল নয়। যাই হোক, যখন অর্ধেকের বেশী রাস্তা বাকি আর ঘড়ির কাঁটা ৭টা ৭এ পৌঁছে গেছে, জয়তী জিজ্ঞাসা করেই ফেলল, সত্যি করে বলো দিকি ঠিক কতটা সময় লাগবে? আমি বেমালুম বলে দিলাম আধঘণ্টা! সে দেখি তখনও হিসাব কষছে কালকের ফ্লাইট কোনটা পাওয়া যেতে পারে! বাপরে!

তাকে প্রবোধ দেবার সময় সেই গল্পটা শোনালাম, যখন আমার ছেলে ছোট ছিল আর দেড় ঘন্টা আগে থেকে ট্রেন ধরার জন্য বাড়ি থেকে বেরতে গিয়ে তার খাবার ফ্লাস্কটা অসাবধানতায় ফেটে গেল আর বেরতে বেরতে সাড়ে তিনটে বেজে গেল আর রাস্তার আটটা রেডলাইটে দাঁড়াতে দাঁড়াতে অটোচালক এবং কুলির সহযোগিতায় এএস ফাইভে উঠেই দেখলাম ট্রেন ছেড়ে দিল।

আর তারপর পার্শ্ববর্তিনীর সেই গল্প। জার্মান বন্ধুদের নিয়ে দৌড়ে দৌড়ে প্ল্যাটফর্ম নম্বর তেরোয় ঢুকে দেখল, সামনে দিয়ে প্ল্যাটফর্ম নং এগারো থেকে ট্রেন ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এসব বলতে বলতেই দেখলাম। কঠিনতম রেডলাইটটা সবুজ হয়ে গেল আর আমি মনস্থির করে জয়তীকে বললাম, ‘সিটবেল্ট প্লিজ!’ আর তারপর অ্যাক্সিলারেটরে চাপ দিলাম, চাকা ঘড়ির কাঁটার থেকে জোরে ঘুরতে লাগল। আর কি আশ্চর্য রাস্তার যানজটও যেন সময়ের গুরুত্ব বুঝে পথ ছেড়ে দিল। যখন জয়তী ট্রেনে চড়ল তখনো এগারো মিনিট বাকি ট্রেন ছাড়তে।

ফেরার পথে পার্শ্ববর্তিনী আর ভাগ্নে দুজনকেই ফোন করে বললাম, দ্যাখ ভাই নিজের ট্রেন হলে চিন্তা করতাম না। কিন্তু এটা একে সরকারী, তারপর ভাগ্নের বউয়ের। তাই জ্বর দিয়ে তো ঘাম ছাড়লই।

যাই হোক, মাঝে সাঝে এই মধ্যবয়সী অ্যাডভেঞ্চার নাহলে জীবনটাই কেমন যেন পানসে মেরে যায়! কি বলেন? হেঁহেঁ!

4 thoughts on “(১২১)

  1. দিল্লির কুয়াশায় আর ট্রাফিকে ট্রেন যাকেই সময়মতন ধরতে হয়েছে সেই এই গল্পের মহিমা বুঝবে। যখন গ্রেটার নয়ডার বাড়ি থেকে নিউ দিল্লি রেল স্টেশনে রাজধানী ধরতে যেতাম, হাতে তিন ঘন্টা নিয়ে বেরোতাম আমরা।😦

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s